‘মুদির দোকান’ খুলে গেল

শেষ পর্যন্ত এমএ ক্লাসে ‘মুদির দোকানের’ কাগজপত্র পড়ানো শুরু হয়ে গেল। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯১৮। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেটে বাংলা ও আরও কয়েকটি নব্য-ভারতীয় ভাষাকে এমএ ক্লাসে পড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হল। ১৯২২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায় দেশভক্ত গণসচেতন নাগরিকদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভারতীয় ভাষা বিভাগগুলির কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। ভারত সরকারের ছাড়পত্র পেয়ে ১৯১৯-এ বিভাগগুলির পড়াশোনার কাজ শুরু হয়েছে, এ তো বলবার মতোই বিষয়। এই ছাড়পত্র সহজে জোটেনি। কত জনের কত বাঁকা কথা। 

উনিশ শতকের নব্বইয়ের দশক। সেনেটের এক সদস্য বাংলা ভাষা-সাহিত্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠনপাঠনের বিষয় হবে শুনেই ফুট  কাটলেন, তা হলে তো মুদির দোকানের কাগজপত্র পড়ালেই হয়। বাংলা যে পড়ানোর মতো বিষয়, তা যে মুদির দোকানের কাগজের থেকে গুরুতর, তা প্রমাণ করার জন্য শিক্ষাকর্তা আশুতোষকে উঠেপড়ে লাগতে হল। 

তিনি একা হলে অবশ্য ১৯১৯-এর মধ্যে সফল হতেন কি না সন্দেহ! বহু জনের বহু সাধনার ফলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও নানা স্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য, বাংলা ভাষার মর্যাদা আদায়ের জন্য অনেকে উদ্যোগ নিয়েছিলেন— উনিশ শতকের প্রথমার্ধেই তা শুরু হয়েছিল। এই সম্মিলিত প্রয়াসেই বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা খুলে গেল।

 

ভাগ্যিস সাহেবরা এল!

সাহেবরা আসার আগে অবশ্য বঙ্গজরা নিয়মমাফিক তাঁদের স্বদেশি ভাষা লিখতে-পড়তে বসতেন না। ভারতচন্দ্রের কথাই ধরা যাক। তিনি কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার বড় কবি, গুণী মানুষ। তাঁর খ্যাতি তো এত দিনে দেশ ছাড়িয়ে আবার নতুন করে বিদেশেও হাজির। বাংলা ভাষার কবি ভারতচন্দ্র সংস্কৃত-আরবি-ফারসি ভাষা নিয়মমতো শিখেছিলেন, বাংলা ভাষা আলাদা করে শেখার প্রয়োজন তাঁর হয়নি, সে ব্যবস্থাও তখন ছিল না। অক্ষরজ্ঞান পাঠশালায় হত বটে, বাংলা পড়তে-লিখতে শেখারও ব্যবস্থা ছিল। তবে বিষয় হিসেবে বাংলার প্রতিপত্তি ওই পর্যন্তই।  

সাহেবরা এ দেশে ধর্মপ্রচার ও ব্যবসা করতে এসে বুঝল, বিনে এদেশীয় ভাষা মিটিবে না ব্যবসার আশা। ভারত আবার বহু ভাষার দেশ। সব ভাষা তো শেখা সম্ভব নয়। তারা গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় ভাষাগুলি শিখতে শুরু করল। সে তালিকাতে বাংলাও ছিল। কোন ভারতীয় ভাষা গুরুত্বপূর্ণ আর কোন ভারতীয় ভাষা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তা নির্ভর করত ভাষীর সংখ্যার ওপর। বাংলা অনেকেরই মুখের ভাষা, সংস্কৃতের সঙ্গে এ ভাষার যোগাযোগ দেখানো সম্ভব, তা ছাড়া বঙ্গজদের অঞ্চলে সাহেবরা বাণিজ্য-বিস্তারে তৎপর। কাজেই ব্যাকরণ, অভিধান মেনে পাঠ্যবই পড়ে বাণিজ্যে লক্ষ্মীলাভের জন্যই সাহেবদের বাংলা শিক্ষার সূত্রপাত। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগ তো সাহেব-সিভিলিয়ানদের সে ভাবেই দ্বিতীয় ভাষা বাংলা শেখাত। সাহেবদের দেখাদেখি এদেশীয়রাও নিজেদের জন্য বাংলা ভাষার ও বাংলা ভাষায় বই লিখতে শুরু করলেন। এদেশীয়রা তত দিনে বুঝে গেছেন, সাহেবি-কায়দায় বই ছেপে পড়াশোনা করা ছাড়া গতি নেই।  বাংলা ব্যাকরণ, অভিধান, প্রাইমার— একে একে সব ছাপা হল। প্রাইমার-অতিরিক্ত পাঠ্যবই নির্বাচন করাও হল। বাংলা ভাষার বই লেখার পাশাপাশি বাংলা ভাষায় অন্যান্য জ্ঞানচর্চার বই রচনা চলল— গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞানের পাঠ্যবই না লিখলে ভার্নাকুলার স্কুল চলবে কেমন করে! এই ভার্নাকুলার স্কুলগুলোই তো বাংলা মিডিয়াম শিক্ষাব্যবস্থার আদিরূপ। এক দিকে যেমন এই পাঠ্যবই লেখা চলছিল, তেমনি পাশাপাশি প্রকাশিত হচ্ছিল নানান সাময়িকপত্র। ১৮৭২-এ বঙ্কিমের ‘বঙ্গদর্শন’ প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলা আর কেবল জ্ঞানের ভাষা, কাজের ভাষা রইল না— ভাব ও বোধের ভাষা হয়ে উঠল। রবীন্দ্রনাথ তখন বালক। তবে পাকা ছেলে তো! তাই ধারাবাহিক উপন্যাস ‘বিষবৃক্ষ’-সহ অন্যান্য লেখা গোগ্রাসে পড়তেন। বঙ্গদর্শনেই বঙ্কিম ছেপেছিলেন সিভিলিয়ান জন বিমস-এর ইংরেজি লেখার বঙ্গানুবাদ ‘বঙ্গীয় সাহিত্য সমাজ’ (আষাঢ়, ১২৭৯)। সাহেবের মত, ‘বঙ্গীয় সাহিত্য উৎকর্ষ প্রাপ্ত হইয়া, ইউরোপীয় সাহিত্য সদৃশ হইতেছে।’ সাহেবের সার্টিফিকেটের দাম কম নয়!

 

বঙ্কিমচন্দ্র ভোটে হারলেন

‘বঙ্গদর্শন’ পড়া বালক রবীন্দ্রনাথ যখন দাড়িমুখো তরুণ কবি, তখন রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনে পড়লেন ‘শিক্ষার হেরফের’। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা চালানো চাই— কেবল বুনিয়াদি স্তরে নয়, এগোতে হবে আরও ওপরের দিকে। ১৮৯২ সালে রবির এই অভিমত বড়রাও সমর্থন করলেন— সহমত বঙ্কিমচন্দ্র, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। এর আগে ১৮৯১ সালের মার্চে আশুতোষ এফএ, বিএ আর এমএ তে বাংলা, হিন্দি ও উর্দুকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষণীয় বিষয় হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব দিলেন। সেনেটের দুই সদস্য বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, চন্দ্রনাথ বসু সমর্থন করলেন। গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য বিশেষ প্রতিনিধি দলের কাছে পাঠালেন। পাঠালে কী হবে? বাংলাবাদীরা ভোটাভুটিতে হেরে গেলেন। যতই বাংলায় আধুনিক সাহিত্য লেখা হোক না কেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্তাব্যক্তি মুদি দোকানের কাগজপত্রই মনে করেন বাংলা সাহিত্যকে। বঙ্কিমের সমর্থনও বাংলাবাদীদের জেতাতে পারে না। বঙ্গভান্ডারে বিবিধ রতন কী আছে যে পড়াতে হবে?  

রবি-স্যর: বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে ঢুকছেন রবীন্দ্রনাথ। ‘শনিবারের চিঠি’-তে প্রকাশিত কার্টুন।

১৮৯৪ সালের অগস্ট মাসে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের একটি অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, নবকৃষ্ণ বসু, রজনীকান্ত গুপ্ত ও হীরেন্দ্রনাথ দত্তকে একটি গুরুদায়িত্ব দেওয়া হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় ইতিহাস, ভূগোল, অঙ্ক বাংলায় লেখা যাবে কি না এ বিষয়ে জনমত যাচাই করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এফএ আর বিএ পরীক্ষায় বাংলা ভাষাকে আরও জায়গা দেওয়া উচিত কি না সে বিষয়েও নেওয়া চাই রায়। জনগণ সেখানেও মোটেই বাংলার পক্ষে রায় দিলেন না। কলেজে বাংলা পড়ানোর দরকার নেই। বাংলার জন্য সময় নষ্ট করলে পড়ুয়াদের ধ্রুপদী ভাষার ভিত দুর্বল হয়ে যাবে। আর বাংলায় ভাল বইপত্র কোথায়? এই হল সংখ্যাগুরুর যুক্তি।

 

বিশের দশক বাংলার দশক

অবস্থা বিশ শতকে বদলে গেল। কেন? বাংলাবাদীরা জিতলেন কী ভাবে? কতগুলো ঘটনা বাংলাবাদীদের পালে অনুকূল হাওয়া দিয়েছিল। ১৯০২-এর বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনে বাংলা ভাষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গকে ঘিরে যে রাজনৈতিক আন্দোলন হল তাতে বাংলা রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পেল। রবীন্দ্রনাথ মডারেট কংগ্রেসি নেতাদের ইংরেজি বক্তৃতার দৌড় কত দূর তা জানতেন। দরিদ্র কৃষকেরা ইংরেজি বক্তৃতা হাঁ করে শুনত, কিছুই বুঝত না। ১৯০৫-এর অক্টোবরে ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ গাইতে গাইতে রবীন্দ্রনাথ যখন রাখিবন্ধন করছেন, তখন বাংলা গণজাগরণের ভাষায় পরিণত হচ্ছে। সন্ধেয় বাগবাজারে পশুপতি বসুর বাড়িতে জনসভায় রবি বক্তৃতা দিলেন। ১৯০৬-এ জাতীয় শিক্ষাপরিষদ গঠিত হল। সেখানে বাংলা ভাষার বিশেষ গুরুত্ব ছিল।

মাতৃভাষায় শিক্ষা বাঙালির রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসাধনের অঙ্গ হয়ে উঠল। ১৯১৩ সালে বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নোবেল পেলেন। ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হল ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’। আধুনিক বাংলা ভাষার কবি কেবল নোবেলই পান না, এ ভাষার ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরনো। বাংলাকে ‘দাবায়ে রাখা’ আর সহজ নয়। হরপ্রসাদ ছিলেন বেঙ্গল লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান। গ্রন্থাগারিক হয়ে তাঁর পুরনো বাংলা বই দেখা শুরু। আর ১৮৯১ সালে কম্বুলেটোলা লাইব্রেরির বার্ষিক উৎসবে এক বক্তৃতায় বাংলা সাহিত্যের ১৫০ জন কবির পরিচয় দিয়ে প্রবন্ধ পড়লেন। সে বক্তৃতা শুনে অনেকে অবাক। পুরনো বাংলায় এত সাহিত্য আছে বুঝি? হরপ্রসাদ ভাবলেন, ছাপা পুথির কথাতেই এই! তা হলে হাতে লেখা পুথির খোঁজ দিলে কী না হবে! যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। রাজেন্দ্রলাল মিত্রের প্রয়াণের পর হরপ্রসাদ এশিয়াটিক সোসাইটির পক্ষে বাংলা পুথি খোঁজার দায়িত্ব পেলেন। তাঁর অধীন ‘ট্রাবেলিং পণ্ডিতেরা’ কত জায়গা ঘোরেন। কুমিল্লার হেডমাস্টার দীনেশচন্দ্র সেন এই সময় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লেখার জন্য এশিয়াটিক সোসাইটির সাহায্যপ্রার্থী। দীনেশচন্দ্রকে হরপ্রসাদ সাহায্য করেন। তবে তাঁকে বেশি করে কাজে লাগান আশুতোষ। মুদির দোকানের কাগজ যে নয় তা প্রমাণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়যোগ্য বই চাই। লিখবেন কে? কেন, দীনেশচন্দ্র! 
১৯০৮ সালে শরৎকুমার লাহিড়ীর বইয়ের রয়্যালটির টাকা পেল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। স্থির হল, এই টাকা দেওয়া হবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লেখার জন্য কর্মরত এক জন গবেষককে। সেই গবেষক দীনেশচন্দ্র। প্রকাশিত হল তাঁর ইংরেজিতে লেখা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বই ‘হিস্ট্রি অব বেঙ্গলি ল্যাঙ্গোয়েজ অ্যান্ড লিটারেচর’ (১৯১১), ‘দ্য বৈষ্ণব লিটারেচর অব মিডিয়াভাল বেঙ্গল’ (১৯১৭), ‘চৈতন্য অ্যান্ড হিজ় কম্পানিয়ানস’ (১৯১৭)। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইংরেজিতে না লিখলে বিষয়ের মর্যাদা থাকবে কেন! সাহিত্যের ইতিহাসের বইটির ইংরেজি ঘষেমেজে দিয়েছিলেন ভগিনী নিবেদিতা। ১৯১৭ সালে বসল স্যাডলার কমিশন। তার ভারতীয় সদস্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। বাংলাবাদী আশুতোষ স্যাডলার সাহেবের সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ স্তরে পঠন-পাঠনের বিষয় হিসেবে বাংলা ভাষা-সাহিত্যকে ঠাঁই দিতে সফল হলেন, আজি হতে শতবর্ষ আগে।


পড়বে কিন্তু ক্লাস করবে না

ঠাঁই মিলল। তবে বাংলা পড়া-পড়ানো নিয়ে রঙ্গ হল অনেক রকম। রবিঠাকুরের কথাই ধরুন না কেন। সেনেটে এমএ ক্লাসে বাংলা পড়ানোর অনুমোদন মিলেছে। রবীন্দ্রনাথ মডার্ন রিভিউ-তে লিখলেন ‘ভার্নাকুলারস ফর দি এমএ ডিগ্রি’। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ানো নিয়ে তিনি মোটেই আশাবাদী নন। বাংলা পড়ানোর দায় যে বিশ্ববিদ্যালয় এত দিন নেয়নি, এ তাঁর মতে শাপে বর। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের নিজত্ব তৈরি হয়েছে। এ বার বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ানোর নামে পণ্ডিতি-কৃত্রিম বাংলা ভাষা না তৈরি হয়! রবীন্দ্রনাথ বাইরের মানুষ হিসেবে দুটি মোক্ষম পরামর্শ দিয়েছিলেন। বাংলায় এমএ পড়বে যারা তাদের যেন ক্লাস করতে বাধ্য করা না হয়। কারণ তাঁর মতে দুটি। ক্লাসঘরের চার-দেওয়ালের মধ্যে নিজের ভাষা-সাহিত্যের পঠন-পাঠন এক রকম সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। দ্বিতীয় কারণটি আরও মজার। এমএ ক্লাসে অনেক পড়ুয়াই বিবাহিত। বিবাহিত মেয়েরা কী ভাবে নিয়মিত ক্লাস করবে?  বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ডাক অবশ্য রবীন্দ্রনাথ ফেরাতে পারেননি। ১৯৩২-৩৪’এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের বিশেষ অধ্যাপক তিনি। খগেন্দ্রনাথ মিত্র তাঁর হয়ে ‘রোলকল’ করতেন। ছাত্রদের অনুরোধে নিজের কবিতার ব্যাখ্যা করতে হত। ১৯৩৭-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন ভাষণ দিলেন তিনি, ইংরেজিতে নয়— বাংলায়। 


পড়ছে কিন্তু শিখছে কি

বাংলায় এমএ পড়তে এসে অবশ্য সব প্রশ্নের উত্তর বাংলায় না লিখলেও চলত। ১৯২০ সালের বাংলা এমএ-র প্রথম পত্রের প্রথম অর্ধের পরীক্ষক রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন। প্রশ্নপত্রের নির্দেশ, ‘Unless otherwise specified, candidates may write their answers either in English or in their own Vernaculars.’  প্রশ্নপত্র ইংরেজিতেই করা হত। ১৯২৩-এ প্রথম বসন্তরঞ্জন রায় একটি অর্ধের প্রশ্ন বাংলায় করেছিলেন। পাঠ্যসূচিটিও কেবল বাংলা ভাষা-সাহিত্য ‘কলঙ্কিত’ ছিল না। পঞ্চম ও ষষ্ঠ পত্রে পড়তে হত বিকল্প ভাষা। সপ্তম পত্র বরাদ্দ ছিল মৌলিক ভাষার জন্য। এই পাঠ্যসূচি ছিল ১৯৩৯ পর্যন্ত। ১৯৭২-৭৩-এ কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাচর্চা’ বিষয়ক সেমিনারে উদ্বোধনী ভাষণে সুকুমার সেন হা-হুতাশ করেছিলেন। ‘বাংলার ...বিভাগীয় প্রধানগণ তাঁদের ইচ্ছানুযায়ী এই পাঠ্যতালিকাকে খাটো হতে খাটো করে এসেছেন।...বাংলার ছাত্রগণ এখন এমএ পড়তে এসে কিছুই শেখে না।’ আগেও কি শিখত? সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্তের অভিমত, ‘এমএ-তে বাংলা পরীক্ষার যে ব্যবস্থাপনা ১৯১৯ সালে করা হইল সেই বিষয়ে বহু কাগজপত্র দেখিয়াছি এবং তাহা দেখিয়া হতাশ হইয়াছি।’


হিন্দু্র বাংলা, মুসলমানের বাংলা

বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়া-পড়ানো নিয়ে সে কালে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে আসর মাত করত সজনীকান্তের ‘শনিবারের চিঠি’। রবীন্দ্রনাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়াতে আসছেন, তা নিয়ে জব্বর কার্টুন আঁকা হল। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার উঠোনে হিন্দু-মুসলমান ‘দ্বন্দ্ব’ জমিয়ে তুলল চিঠি। রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রবাসী’ও পোঁ ধরল। দীনেশচন্দ্র সেনের পর রামতনু লাহিড়ী পদের প্রার্থী শহীদুল্লাহ। প্রবাসীর বিবিধ প্রসঙ্গের বিষয় ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপকতা’ (১৩৩৯ শ্রাবণ)। যে বই শহীদুল্লাহ লেখেননি, সেই ‘মক্তব মাদ্রাসা শিক্ষা’ উদ্ধার করে তাঁর মুসলমানত্ব দেখানো হল। চিঠি (১৩৩৯ জ্যৈষ্ঠ) টুকরিতে লিখল ‘সংস্কৃত জানা পণ্ডিত তবু মাথায় ফেজ।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে বাঙালি মুসলমানদের ঠাঁই নেই। দীনেশচন্দ্র সেন ‘প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান’ লিখেছিলেন অনেক পরে। সত্যব্রত সামশ্রমী তো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমান ছাত্রকে ‘দেবভাষা’ পড়াতে অস্বীকার করেন। সুনীতিকুমার অবশ্য অন্য ধাতের মানুষ। শিশিরকুমারের বন্ধু স্টাফরুমে বসে খাদ্য-অখাদ্য নিয়ে সরস গপ্পো করতেন। ছাত্র সুকুমার সেন মাস্টারমশাইকে সাবধান করতেন, কী দরকার বদনাম কেনার! সুকুমার সেন আত্মজীবনীতে অকপটে লিখেছিলেন, চাকরি পাকা করার জন্য এক কর্তাব্যক্তিকে তিনি বই উৎসর্গ করেছিলেন, উন্নতি হওয়া মাত্র পরের সংস্করণের উৎসর্গপত্রে কর্তার নাম কেটে দিলেন। সে কর্তাও বাংলাবাদীই ছিলেন।
প্রতিষ্ঠান ধোওয়া তুলসীপাতা হয় না, তাই বলে শতবর্ষ আগের এই উদ্যোগকে খাটো করা অর্থহীন। কী ভাবে খুলে গিয়েছিল বাংলাবিদ্যার দরজা-জানলা, নতুন করে তার খোঁজখবর নেওয়া দরকার। ইতিহাসের ভান্ডারে বিবিধ রতন না-দেখা পড়ে আছে।