প্রথম যৌবনের গন্ধ। রেললাইনের ধার ঘেঁষে সোজা রাস্তা, তার পর পুরনো কবরস্থান পেরিয়ে ঝিলের পাড়ে বুনো ফুলের সুবাস। প্রথম বিড়ি খাওয়ার স্বাদ। মেয়েদের স্কুল শ্রীপুর গ্রাম। সব এখন স্মৃতি। কত দিন পরে ঘরে ফেরা। আঠারো বছরের এক কিশোর আজ প্রৌঢ়ত্বের ছায়ায় ঢাকা পড়েছে। 

স্টেশনে নেমে কিছু ক্ষণ চুপ করে দঁাড়িয়ে থাকে দেবনাথ। রেল লাইনের পাশে একটা লাল ইটের ঘর।  বুড়ো ছকুলালের হাড় জিরজিরে ঘোড়ার গাড়িটা ওখানে দঁাড়িয়ে থাকত। সারা দিনে হাতে গোনা ট্রেন আসত। সেই ছবিটা হারিয়ে গিয়েছে। এখন চওড়া প্ল্যাটফর্ম, মাথার উপর টিনের শেড, বেঞ্চি, অফিস, টিকিট কাউন্টার, লোকজনের ভিড়। 

একটু ভাবল দেবনাথ। কোথায় যাবে, সব অচেনা মুখ। সেই ভোর থাকতে বার হয়েছে। ঘড়ির দিকে তাকাল। এগারোটা বাজে। সামনে মেয়েদের সাজের জিনিসের দোকান। কাউন্টারে অল্পবয়সি একটা মেয়ে দঁাড়িয়ে। জিনস আর টাইট টপ পরা দুটো মেয়ে ঢুকল। উদ্ধত যৌবন! 

একটা খণ্ডচিত্র। তার বয়েসটা ছিল এই রকম, কিংবা আরও কম। স্কুল থেকে ফেরার সময় মাঝে মাঝেই চোখ পড়ত একটা মেয়ের দিকে। পাশের গ্রামে থাকত। নাম জানত না, তবু নেশার মতো আকর্ষণ। মেয়েটার দৃষ্টিতেও ছিল হালকা প্রশ্রয়। বৃষ্টি ভেজা সেই দুপুর। হঠাৎ বৃষ্টি। একাই বাড়ি ফিরছিল। দেবনাথ শিবমন্দিরের চাতালে বসে নেশা করত। ষোলো বছরেই বিড়ি, গঁাজা। হঠাৎ চোখে পড়ল। ভিজে শাড়িতে মেয়েটা এসে দঁাড়িয়েছে। সমস্ত শরীর জুড়ে শিহরন বয়ে গিয়েছিল। নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি। দু’হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিয়েছিল। প্রথম নারীদেহের স্পর্শ। কেউ এক জন এসে পড়েছিল। এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে  নিয়ে ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল মেয়েটা। গোপন থাকেনি সে সংবাদ। গঁায়ের প্রধানের ছেলে। কারও ক্ষমতা ছিল না কিছু করার। গোটা অঞ্চল জুড়ে নিন্দার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। বাড়ির সকলে ক্ষুব্ধ। সবচেয়ে বেশি বাবা। চাবুক দিয়ে পিটিয়ে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। 

দুরন্ত ক্ষোভে কাউকে কিছু না বলেই বেরিয়ে পড়েছিল। পকেটে সম্বল একশো টাকা। শক্ত সমর্থ জোয়ান ছেলে। ভাগ্যও সাহায্য করেছিল। ট্রেনেই পরিচয় এক নিঃসন্তান দম্পতির সঙ্গে। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিেলন স্বামী। অসহায় স্ত্রী। সব দায়িত্ব নিজের কঁাধে তুলে নিয়েছিল দেবনাথ। কী চোখে তাঁরা দেখেছিলেন কে জানে। নিজের ঘরে সন্তানস্নেহে আশ্রয় দিয়েছিলেন। শ্রীপুর থেকে ইলাহাবাদ। বাড়ি, গাড়ি, কারখানা। সংসার পেতেছিল। সে সুখটুকু সয়নি। একটা দুর্ঘটনা। বৌ ছেলে, সব হারিয়ে গিয়েছিল। আজ এত বছর পরে কেন আবার শ্রীপুরে ফিরে এল, নিজেও জানে না। 

বাজারের মধ্যে দিয়ে হঁাটতে হঁাটতে মনে হল গ্রাম হারিয়ে গিয়েছে। শ্রীপুর এখন আধা শহর। এক দিন এখানে মিশে ছিল তার শৈশব কৈশোর। ডান দিকে রাস্তাটা বঁাক নিয়েছে। একটা তিনতলা বাড়ি। বেশ নতুন। সামনে নেমপ্লেটে লেখা, ডাক্তার পরেশনাথ ভট্টাচার্য। ডাক্তার কাকা কি এখনও বেঁচে আছে, না নামটা শুধু রয়ে গিয়েছে? 

এক ভদ্রলোক পাশ দিয়ে হঁাটছিলেন। তঁাকেই জিজ্ঞেস করল দেবনাথ, পরেশ ডাক্তার কি এখনও বেঁচে আছেন? 

‘‘আমি জানি না।’’

এগিয়ে যায় দেবনাথ। কত নতুন বাড়ি। আর একটু গেলেই তাদের বাড়ি। এখনও কি তাদের বাড়িটা আগের মতো আছে! চল্লিশ বছরে বাড়ির কোনও খবরই জানে না। অভিমান। বাবা মা নিশ্চয়ই নেই। ও ছোট ছিল। বড়দা ছোড়দা কি এখানে থাকে? বৌদি, দাদার ছেলেমেয়েরা কেউ তাকে চিনতে পারবে না। 

ওই তো তাদের বাড়িটা। হতশ্রী অবস্থা। বাড়ির চারদিকের পঁাচিল ভেঙে পড়েছে। কেমন ভূতুড়ে বাড়ির মতো চেহারা। ভাঙা গেট পেরিয়ে বারান্দায় উঠে এল।  বন্ধ দরজা। একটু ইতস্তত করে কড়া নাড়ল কয়েকবার। 

ভিতরে পায়ের শব্দ। মুখ তুলে তাকাল দেবনাথ। কেউ আসছে। এক পা পিছিয়ে গেল। দরজা খুলল। তিরিশ পঁয়ত্রিশের একটা মেয়ে। সাদা শাড়ি। শাখা সিঁদুর নেই। চোখেমুখে পোড়-খাওয়া একটা জীবনের ছবি।

‘‘কাকে চাই?’’ মেয়েটার চোখে জিজ্ঞাসা। 

চাপা অস্বস্তি। কে হতে পারে মেয়েটা! আস্তে আস্তে বলল, ‘‘এ বাড়িতে কে থাকে?’’

‘‘মা আর আমি থাকি।’’

একটু ভাবল দেবনাথ, ‘‘বাড়ির মালিকরা নেই?’’

‘‘অমলবাবু কলকাতায় থাকেন। ভাড়া নিতে মাসের প্রথমে আসেন। কখনও এক দিন দু’দিন থাকেন।’’ 

ভাবনার তল পায় না দেবনাথ। অমল হয়তো বড়দা কিংবা ছোড়দার ছেলে হবে। 

মেয়েটার স্থির দৃষ্টি। ‘‘আপনাকে তো চিনতে পারলাম না?’’

‘‘বহু বছর আগে আমি এই বাড়িতে থাকতাম। বাড়িটা ছিল আমার বাবার। দুই দাদা। মনে হয় তারা  আর কেউ বেঁচে নেই।’’ 

মেয়েটা অবাক চোখে চেয়ে থাকে দেবনাথের দিকে, ‘‘আপনি! আমি কোনও দিন আপনার কথা শুনিনি।’’ 

‘‘আমি ষোলো বছরে বাড়ি থেকে চলে যাই। আসলে একটা খারাপ কাজ করেছিলাম। তার পর চল্লিশ বছর আর গ্রামে আসিনি। কিছু দিন ধরেই অনুভব করছিলাম ঘরের টান।’’ 

‘‘আমি বুঝতে পারিনি। ভিতরে আসুন।’’ 

একটু ভাবল দেবনাথ। কিসের টানে আর ঘরে যাবে? মাথা নেড়ে বলল, ‘‘না থাক। এখানে দেখতে এসেছিলাম। সব কেমন পাল্টে গিয়েছে। আসি।’’

ঘড়ি দেখল। ট্রেন থেকে নামার পরে প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গিয়েছে। মুখবন্ধ গরম হঁাড়িতে যেমন একটু একটু করে বাষ্প জমে, চাপা একটা ক্ষোভ। কী দেখবার জন্য গ্রামে এল! সেই মন্দিরটা এখনও কি আছে? গোপন এক আকর্ষণ। 

নতুন সব রাস্তা। তবু চিনতে ভুল হল না। বাড়ি ঘর পেরিয়ে শিবতলার মাঠ। মাঠের এক দিকে শিব মন্দির। মুহূর্তে বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক শিরশিরানি। মন্দিরের বারান্দায় এসে বসে পড়ে। সব আগের মতোই আছে। কালো পাথরের শিব। কেউ পুজো দিয়েছে। ফুল ছড়ানো। মেঝের উপর বসে পড়ল। ঠিক এই জায়গাতেই সে দিন বসেছিল। জীবনের একটা ভুল। চাপা শূন্যতা। অনেক পাওয়ার মাঝে কিছু না পাওয়ার যন্ত্রণা। চুপ করে কিছু ক্ষণ বসে থাকে। কোনও অনুভব জাগে না। সময় এক আশ্চর্য জিনিস। রাগ ক্ষোভ পাপ দুঃখ যন্ত্রণা, বালির উপর পায়ের ছাপের মতো সব মুছে যায়। চোখ দুটো বুজে এসেছিল। 

‘‘শুনছেন।’’ 

তাকাল দেবনাথ। ধুতি পরা এক জন। খালি গা। ব্রাহ্মণত্বের নিদর্শন বুকের উপর পৈতে ঝুলছে। বোঝা যায় মন্দিরের পূজারি। 

‘‘নতুন মানুষ মনে হচ্ছে।’’ 

‘‘বহু বছর আগে এখানে থাকতাম।’’ 

‘‘শ্রীপুরে থাকতেন! কোন বাড়ি কী নাম?’’

‘‘সেন বাড়ি। বাবা ভূদেব সেন। গ্রামের প্রধান ছিলেন।’’ 

‘‘ভুদেব কাকার ছেলে। দেবু!’’

মুহূর্তের আবেগ। কত দিন পরে কেউ হারিয়ে যাওয়া নাম ধরে ডাকল। চেনা কেউ হবে। চোখ বড় বড় করে চেনবার চেষ্টা করে। 

‘‘আমি শিবু। ভাল নাম শিবনাথ। এক ক্লাসে ছিলাম। বাবা পুজো করত।’’ 

দু’হাত বাড়িয়ে দিল দেবনাথ। ‘‘মনে আছে ঝিলের পাড়ে বসে দু’জনে প্রথম বিড়ি খেয়েছিলাম। তার পর কী কাশি। তখন আমরা ক্লাস নাইনে পড়ি।’’

হেসে ফেলল শিবনাথ, ‘‘তুই ভুলিসনি!’’ 

‘‘শৈশব কৈশোরের জীবনটাকে বোধহয় ভোলা যায় না।’’

‘‘এখানে কোথায় এসেছিলি?’’

পলকে কেমন যেন উদাস হয়ে যায়। আস্তে আস্তে বলল, ‘‘চল্লিশ বছর পরে গ্রামে এলাম। কোথায় গ্রাম। এ তো শহর হয়ে গিয়েছে। বাড়ির কেউ নেই। সবাই অপরিচিত। ভাবছিলাম ফিরে যাব।’’ 

‘‘এই তো চেনা মানুষ পেয়ে গেলি। আমার ঘরে চল।’’

‘‘তোর বাড়ির লোক, তাদের অসুবিধে হবে না?’’ 

‘‘বাড়ির লোক তো আমি আর আমার বৌ। বুড়ো আর বুড়ি। আজ আবার ঝিলের পাড়ে বসে বিড়ি খাব। চল!’’ হাসতে হাসতে বলল শিবনাথ।

শিবনাথের বাড়িতে ছোটবেলায় অনেক বার এসেছে দেবনাথ। দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট। আশপাশে ঝোপঝাড়। এমন একটা বাড়িতে আসতে হবে ভাবেনি দেবনাথ। তবু ভালে লাগছিল। 

ভেজানো দরজা খুলে ঘরে ঢোকে দু’জন। একটা কাঠের চৌকি পাতা। ঠাকুর-দেবতার ছবি আর ক্যালেন্ডারে দেওয়াল অর্ধেক ঢাকা। 

‘‘বস। বৌকে ডাকি।’’ 

ডাকতে হয় না। পায়ের শব্দে ভিতরের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে শিবনাথের স্ত্রী। শীর্ণকায় চেহারা। পরনে কম দামের লালপেড়ে সাদা শাড়ি। এক সময় হয়তো দেহে যৌবন ছিল। আজ পাতাঝরা গাছ। 

‘‘আমার বৌ নীলিমা।’’

‘‘বুঝতে পেরেছি। আমি শিবুর ছোটবেলার বন্ধু। চল্লিশ বছর পর দেখা।’’ 

‘‘বসুন চা করি।’’ 

‘‘আমি ট্রেনে চা খেয়েছি।’’ 

শিবু চৌকির উপর নিজের শরীরটা মেলে দিয়ে বলল, ‘‘এখন আর চা নয়। তুমি খাবারের ব্যবস্থা করো।’’ 

অস্বস্তি লাগছিল দেবনাথের। বাড়ির যে চেহারা চোখে পড়ছে তাতে ঘরে দু’জনের খাবার আছে কি না সন্দেহ। তার পর বাড়তি এক জন। তাড়াতাড়ি বলল, ‘‘দুপুরে খাওয়ার ঝামেলা করছিস কেন, আমি দুটোর ট্রেনে কলকাতা ফিরব।’’ 

চৌকির উপর জোরসে চাপড় মারল শিবু, ‘‘যাবিটা কোথায়? আজ সারা রাত গল্প করব। নীলিমা তুমি রান্নাটা শেষ করো। অনেক সকালে বার হয়েছে দেবু।’’ 

বেলা গড়ায়। নীলিমা আসে। বলে, ‘‘তোমাদের ভাত দিয়েছি।’’ 

ভাত ডাল একটা তরকারি। শিবুর চোখেমুখে কুণ্ঠা ফুটে ওঠে। 

‘‘তুই প্রথম এলি আমার বাড়ি। বেশি কিছু করতে পারলাম না।’’

হাসল দেবনাথ, ‘‘যা করেছিস অনেক। তোর সঙ্গে দেখা হল তাই! না হলে তো না খেয়েই কলকাতায় ফিরছিলাম। কত দিন পরে সেই ছেলেবেলার মতো আসন পেতে মাটিতে বসে ভাত খাচ্ছি।’’

‘‘মাঝে মাঝে চলে আসবি। ভাল লাগবে।’’ 

খাওয়া শেষ করে উঠে পড়ে। বাইরের ঘরে এসে বসে। একটা সুপুরি মুখে দিয়ে দেবনাথ বলে, ‘‘তোর বৌকে দেখে  খুব শান্ত মনে হচ্ছে।’’ 

হাসে শিবু। ঠিকই বলেছিস। বরাবরই এই রকম। কম কথা বলে। আসলে ওর মনে অনেক দুঃখ। তবু আমার সংসারের অভাব অনটন সব হাসিমুখে মানিয়ে নিয়েছে।’’ 

‘‘ইলাহাবাদে চল। আমার বড় বাড়ি খালিই পড়ে আছে। যত দিন খুশি থাকতে পারবি।’’ 

খোলা দরজা দিয়ে বাইরের দিকে কিছু ক্ষণ তাকিয়ে থাকে শিবু। বলে, ‘‘ইচ্ছে করে। পারি না। মন্দির ছাড়াও  কয়েকটা বাড়িতে নিত্যপুজো করতে হয়। বুঝতেই পারছিস, ওটাই আমার একমাত্র সম্বল।’’ 

সামান্য ইতস্তত করে দেবনাথ, ‘‘একটা কথা বলব, আমি ইলাহাবাদে তোর জন্য ভাল কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারি। ওখানেই থেকে যাবি।’’

অল্প ক্ষণ চুপ করে থেকে শিবু বলে, ‘‘বাপঠাকুরদার গ্রাম ছেড়ে কোথাও গিয়ে থাকতে পারব না। অনেকেই চলে গিয়েছে শহরে। একটা সুযোগও এসেছিল। এখানকার মায়া কাটিয়ে যেতে পারলাম না। নীলিমাও যেতে চাইল না।’’ 

ঘড়ি দেখে দেবনাথ জিজ্ঞেস করে, ‘‘কলকাতায় ফেরার শেষ ট্রেন কখন?’’

‘‘ছ’টায়। আজ কি ফিরবি?’’

‘‘সকালে কলকাতায় কাজ আছে। রাতে ইলাহাবাদের ট্রেন। তুই ঝিলের ধারে যাবি বলছিলি না?’’

বেরিয়ে পড়ে দু’জন। মাঠের ধার দিয়ে রাস্তা। রোদের তাপ নেই। মেঘলা ভাব। এক সার খেজুর গাছ। চলতে চলতে আপন মনে কথা বলে দেবনাথ, ‘‘শীতের সময় কত রস পাটালি, কত দিন তার স্বাদ পাইনি।’’ 

‘‘এখন আর সেই পুরনো দিন নেই। গাছ কাটার লোক পাওয়া যায় না। আমার দুটো গাছ আছে। অল্প রস হয়। নীলিমা গুড় তৈরি করে।’’ 

মাঠ পেরিয়ে আসে। চোখে পড়ে মাটির বঁাধ। বাবলা গাছের ঝোপ। দেবনাথের চোখেমুখে কৈশোরের  উচ্ছ্বাস। ঝিলের ধারে উঁচু পাড়। আস্তে আস্তে উপরে উঠে আসে দু’জন। কৈশোরে দেখা ঝিলে টলটল করত জল। এপার ওপার দেখা যেত না। এখন জল নেই। চার দিক শুকনো। মাঝখানে অল্প জল। মজে যাওয়া পুকুরের মতো। 

‘‘ঝিলটা শুকিয়ে গিয়েছে,’’ দেবনাথের গলায় বিষণ্ণতা। 

‘‘আমিও বহু দিন পরে এখানে এলাম।’’

ইটের চাতাল। স্নানের জন্য এক সময় তৈরি হয়েছিল। সেখানেই বসে পড়ে দু’জন। রোদ নেই। অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। কোনও পাখি ডাকছে। 

‘‘তোর ইলাহাবাদ শহরটা কেমন?’’

‘‘ভাল। তবে কেন জানি না আজ মনে হচ্ছে এই শ্রীপুর গ্রামটা অনেক সুন্দর। তাই বোধহয় ভুলতে পারিনি।’’

‘‘তবু ইলাহাবাদে তুই কত কিছু পেয়েছিস।’’

শিবুর দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে দেবনাথ বলে, ‘‘তুই ঠিকই বলেছিস, অনেক কিছু পেয়েছি। বিনিময়ে অনেক কিছু হারিয়েছি। বাবা, মা, আপনার জন, তার চেয়েও বড় কি জানিস, একটা মেয়ের মাথায় কলঙ্ক চাপিয়ে  দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম।’’ 

কণ্ঠস্বর বুজে আসে দেবনাথের। তার হাতের উপর হাত রাখে শিবু। 

‘‘পুরনো কথা ভেবে কষ্ট পেয়ে কী লাভ। সব মানুষই জীবনে কিছু না  কিছু ভুল করে,’’ পকেট থেকে বিড়ি বার করে দেবনাথ। ‘‘বিড়ি খা, মনটা ঠিক হয়ে যাবে।’’

হেসে ফেলে দেবনাথ। ‘‘বিড়ির কথা ভুলিসনি। অনেক দিন অভ্যেস নেই। তবু দে, একটা খাই।’’ 

দুই বন্ধু বিড়ি ধরায়। হঠাৎ দেবনাথ মুখ ফেরাল। ‘‘শিবু তোর সংসার খুব কষ্টে চলে?’’

বিড়ির ধেঁায়া ছেড়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল শিবু, ‘‘কষ্ট হয়। তবে চলে যায়। বলতে পারিস নীলিমা চালিয়ে নেয়।’’ 

কেমন আনমনা উদাসী হয়ে যায় দেবনাথ। দিনের আলো ফুরিয়ে আসে। জীবন সায়াহ্নে আসা দুটো মানুষ ধীর পায়ে ঘরে ফিরে আসে। 

দেবনাথ বলে, ‘‘আমি এ বার যাব। ট্রেনের সময় হয়ে গিয়েছে।’’ 

নীলিমা বলে, ‘‘একটু বসুন, আমি চা করে দিই।’’ 

পুরনো কাপ। কম দামের চা, তবু তৃপ্তি করে খায় দেবনাথ। একটা প্লাসটিকের ছোট প্যাকেট নিয়ে আসে নীলিমা। বলে, ‘‘এতে ক’টা নারকেল নাড়ু আছে। ট্রেনে খেয়ে নেবেন।’’ 

হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নেয় দেবনাথ, ‘‘আসি।’’ 

‘‘আবার আসবেন।’’ 

বেরিয়ে পড়ে দু’জন। অল্প দূরে গিয়ে মুখ ফেরাল দেবনাথ। দরজার সামনে তখনও দঁাড়িয়ে নীলিমা। 

স্টেশনে  অল্প লোকজন। ট্রেন আসার ঘণ্টা বাজে। হঠাৎ দেবনাথ শিবুর হাতটা চেপে ধরে। ‘‘কোনও প্রয়োজন হলে আমায় জানাস। সঙ্কোচ করিস না। পারলে নীলিমাকে নিয়ে আমার ওখানে এক বার আসিস। বড় ভাল লাগল ওকে দেখে।’’ 

‘‘ঠিকই বলেছিল, কিন্তু ওর ভাগ্যটা ভাল নয়। ও কিন্তু ভাল ঘরের সুন্দরী মেয়ে। কত বড়  ঘরে বিয়ে হতে পারত। একটা ঘটনা... তাই আমার মতো চালচুলোহীন এক পূজারি বামুনের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত বিয়ে হল।’’ 

ট্রেন আসে। এগিয়ে যেতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেল দেবনাথ। ‘‘আচ্ছা, নীলিমার বাড়ি কোথায়?’’ 

‘‘কী হবে জেনে?’’

‘‘আমি জানতে চাই,’’ প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে দেবনাথ। 

কিছু ক্ষণ চুপ করে থাকে শিবু। তার পরে বলে, হরিশপুর। পাশের গ্রাম। ওর বাবা পাঠশালায় পড়াতেন। 

‘‘তবে কী?’’ দেবনাথের বুকের ভিতরে আর্তনাদ। 

তার পিঠের উপর হাত রাখে শিবু। তার পর ধীর গলায় বলে, ‘‘তোর ট্রেন এসে গিয়েছে।’’