• দিলীপ মাশ্চরক
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ছোটগল্প

সহযাত্রী

Painting
ছবি: সুমন পাল

পাশের লোকটিকে বলে রেখেছিল অরণি। খবরের কাগজ পড়তে-পড়তেই ভদ্রলোক অরণির বাহুতে একটা টোকা মেরে বললেন, ‘‘সামনেই আপনার স্টেশন।” অরণি উঠে তাড়াতাড়ি গেটের দিকে এগিয়ে গেল। বেরনোর সময় মা পইপই করে বলে দিয়েছেন, ‘‘আগেই গেটের কাছে চলে আসবি। ট্রেন মাত্র তিরিশ  সেকেন্ড থামে।’’ 

ট্রেন থামতেই অরণি নেমে পড়ল। প্রায় ফাঁকা প্ল্যাটফর্ম। রবিবারের বিকেল পাঁচটা, তা বলে এতটা ফাঁকা হবে অরণি আশা করেনি। জায়গাটা আদৌ শহর নয়, বড়জোর আধা মফস্সল বলা চলে। টিকিট দিয়ে স্টেশনের বাইরে এসে অবাক হল অরণি। পুরো চত্বরটায় একটা মাত্র রিকশা। আর কোনও যানবাহন নেই। দ্রুত পা চালিয়ে রিকশাটার কাছে গেল অরণি। গিয়ে কিছু বলার আগেই পিছনে ডান দিক থেকে নারীকণ্ঠ শুনতে পেল, ‘‘ব্যাগটা একটু ধরো তো, নিমাইদা।’’ 

অরণি পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখল, একটি কালো ছিপছিপে মেয়ে একটা পেটমোটা বড় ব্যাগ নিয়ে রিকশাওয়ালাকে ডাকছে। মাঝবয়সি রিকশাওয়ালা মেয়েটির হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে রিকশার পাদানিতে রাখল। মেয়েটির কাঁধে আর-একটা সুদৃশ্য চামড়ার ব্যাগ। 

বোঝাই যাচ্ছে রিকশাটি মেয়েটির পরিচিত। হয়তো নিয়মিত যাতায়াত করে। কিন্তু এখন অরণি যায় কোথায়? মা’র কথায়, রিকশাতেই আধ ঘণ্টার রাস্তা। হেঁটে গেলে তো আরও বেশি! এখনও তেমন গরম পড়েনি, তবু অরণির কপালে ঘাম দেখা দিল। 

মেয়েটি রিকশায় উঠে বসে রিকশাওয়ালাকে কী যেন বলল। রিকশাওয়ালা তার পর অরণির 

দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘‘আপনি কোথায় যাবেন?’’

অরণি মুখস্থর মতো বলে গেল, ‘‘গাঙ্গুলিবাগান, স্টেট ব্যাঙ্ক মোড়ের কাছে।’’ 

মেয়েটি রিকশাতে বসেই এ বার একটু গলা তুলে বলল, ‘‘আমি ও দিকেই  যাব, আপনি ইচ্ছে করলে এই রিকশাতেই আসতে পারেন।’’

অরণি ইতস্তত করছে দেখে আবার বলল, ‘‘আজ আর অন্য রিকশা পাবেন না, রিকশার স্ট্রাইক। নিমাইদা আমাকেই নিতে এসেছে।’’

সর্বনাশ! অরণি যার কাছে যাচ্ছে সেই সন্তোষবাবুর ফোন নম্বরও তো সঙ্গে নেই! যা থাকে কপালে, অরণি চটপট রিকশায় চড়ে বসল। এখানকার রিকশাগুলো ছোট ছোট। মেয়েটা ছিপছিপে হলেও ঘেঁষাঘেঁষি করে বসতে হল।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে শহরের পথ। বেশ সুন্দর পাকা রাস্তা।

মিনিট তিনেক দু’জনেই চুপচাপ। অরণি বাঁ দিকে তাকিয়ে রাস্তা দেখছিল। স্টেশনের কাছে ছোট বাজার,  তার পর দু’দিকেই বেশ ফাঁকা মাঠ। মাঝে-মাঝে বাড়ি, কখনও দু’-চারটে দোকান। মফস্সল যেমন হয়।

হঠাৎ মেয়েটি বলল, ‘‘আমি বিপাশা, বিপাশা সরকার।’’

অরণি কোনও দিনই তেমন স্মার্ট নয়, এই অবস্থায় পড়ে আরও একটু জড়সড় হয়েই ছিল। মুখ ফিরিয়ে আমতা আমতা করে কিছু বলার আগেই মেয়েটি বলল, ‘‘আমি আপনাকে চিনি।’’

অরণি খুব অবাক হল, তার পর ঢোঁক গিলে বলল, ‘‘আ-আ-আপনি কী করে…’’

মেয়েটি মুখ টিপে হাসছিল, হাসতে হাসতেই বলল, ‘‘আপনার নাম তো ফার্স্টবয়।’’

ইলেকট্রিক শকের মতো একটা ধাক্কা লাগল অরণির। এই দূর মফস্সলের মেয়েটির পক্ষে এই নাম কী করে জানা সম্ভব? 

নিজেকে যথাসম্ভব সামলে সপ্রতিভ হওয়ার চেষ্টা করে অরণি বলল, ‘‘আপনি কী করে জানলেন?’’

হাসিটা এখনও চোখে ঝিলিক দিচ্ছে, মেয়েটি বলল, ‘‘আপনি তো যতীন দাস রোডে থাকেন। তীর্থপতি ইনস্টিটিউশনে পড়তেন, আর প্রত্যেক পরীক্ষায় ফার্স্ট হতেন। আপনার জন্য শিশিরবাবুর কাছে কত বকুনি খেয়েছি।’’

আস্তে আস্তে অরণি বলল, ‘‘আপনি শিশিরবাবুর কাছে পড়তেন?’’

মেয়েটি কাঁধের ব্যাগটা কোলের উপর রেখে বলল, ‘‘আমি ইংরেজিতে খুব কাঁচা, প্রথম থেকেই শিশিরবাবুর ব্যাচে পড়তাম। আপনি পরীক্ষার তিন-চার মাস আগে ভর্তি হলেন। তখনই শুনেছিলাম তীর্থপতি ইনস্টিটিউশনের ফার্স্টবয়। আপনার লেখার সঙ্গে তুলনা করে স্যর আমাদের বকাবকি করতেন। খুব রাগ হত। এতই যদি ভাল লেখে, তা হলে এখানে পড়তে আসার কী দরকার ছিল! আসল নামটা তো মনে নেই, শুধু মনে আছে ফার্স্টবয়। স্টেশনে আপনাকে দেখেই চিনতে পেরেছি।’’ 

অরণি ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘‘আমি কিন্তু আপনাকে চিনতে পারিনি।’’ 

মেয়েটি এ বার রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘‘চিনবেন কী করে, আপনি তো কোনও দিন তাকিয়ে দেখেননি। অবশ্য একটা কালো, রোগা, লেখাপড়ায় পিছিয়ে থাকা মেয়েকে না দেখাটাই তো স্বাভাবিক।’’

একটু লজ্জা পেল অরণি। পরিস্থিতি বদলাতেই বোধ হয়, বিপাশা বলল, ‘‘আপনি এখানে কোথায় এসেছেন?”

“গাঙ্গুলিবাগানে সন্তোষ মিত্রের বাড়ি।”

বিপাশা অবাক চোখে তাকাল, “সন্তোষ মিত্র আপনার কে হন?”

অরণির জিভ আড়ষ্ট হয়ে আসছে। মাথা নিচু করে বলল, “কেউ হন না।”

বিপাশা কিছু ক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে অরণির দিকে তাকিয়ে রইল। তার পর বলল, “কেউ হয় না, আপনি কলকাতা থেকে এত দূর তার বাড়িতে যাচ্ছেন! আচ্ছা, আপনি কি টিস্কোতে চাকরি করেন? ইঞ্জিনিয়ার?”

নাঃ, এই মেয়ে গোয়েন্দা হলে ভাল হত। বুদ্ধিদীপ্ত চোখদু’টোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অরণি বলল, “ঠিকই ধরেছেন।” 

আবার সেই হাসিটা ঝরনার মতো বেরিয়ে এল, ‘‘দুই আর দুইয়ে চার। মানে আপনি অপরাজিতাকে দেখতে এসেছেন।”

অরণি যথাসম্ভব গাম্ভীর্য রেখে বলল, “কী করে বুঝলেন?”

মাথা দুলিয়ে হাসতে লাগল বিপাশা, “অপরাজিতা আমার বন্ধু, ওর কাছেই শুনেছিলাম কে এক রাজপুত্র, টিস্কোর ইঞ্জিনিয়ার, ওকে দেখতে আসবে। হ্যাঁ, আজকেই তো তেইশ! সব মিলে যাচ্ছে।” 

হাল ছেড়ে অরণি বলল, “আচ্ছা, আপনি কী করেন বলুন তো?”

 “আমি এখানে একটা ইশকুলে পড়াই। ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি। শনিবার বিকেলে বাড়ি যাই, সোমবার সকালে চলে আসি। আগামী কাল ক্লাস টেস্ট, তাই আজ রোববারই চলে এলাম।’’ 

‘‘আপনি অপরাজিতাকে চিনলেন কী করে?’’

‘‘অপরাজিতার বাবা, সন্তোষবাবু এলাকার সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টরির মালিক। আমাদের স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটিরও এক জন মাথা। স্কুলের অনেক প্রোগ্রামে অপরাজিতা এসেছে, ও খুব ভাল গান গায়। তা ছাড়া, আমিও স্কুলের কোনও কাজে ওঁদের বাড়ি গিয়েছি। এ ভাবেই বন্ধুত্ব। আজকাল ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপের যুগে সহজেই বন্ধুত্ব হয়ে যায়। নিজের বন্ধু বলে বলছি না, অপরাজিতা সত্যিই খুব ভাল মেয়ে। আমার মতো দাঁড়কাকমার্কা দেখতে নয়, ফর্সা টুকটুকে, লেখাপড়াতেও খুব ভাল।”

হঠাৎ কথা থামিয়ে বিপাশা চেঁচিয়ে উঠল, “নিমাইদা, দাঁড়াও...” 

রিকশা এখন শহরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। নিমাই তাড়াতাড়ি রিকশা থামাল। বিপাশা বলল, “এই রাস্তা ধরে একটু এগোলেই গাঙ্গুলিবাগান। আর-একটু এগিয়ে গেলে একটা মোড় পড়বে। ডান দিকে স্টেট ব্যাংক। ঠিক উল্টো দিকেই বড় তিনতলা ক্রিম রঙের বাড়ি। সন্তোষবাবুর নাম বললেই যে-কেউ দেখিয়ে দেবে। আমি এখানে নেমে যাব। এর বেশি যাওয়া ভাল দেখায় না।”

তার পর রিকশা থেকে নামতে নামতে নিমাইকে বলল, “নিমাইদা, তুমি সন্তোষবাবুর বাড়ি চেনো না?”

নিমাই ঘাড় নাড়ল, “খুব চিনি। আমি তো অপরাজিতা দিদিমণিকে কত বার নিয়ে গিয়েছি।’’ 

‘‘বেশ। এ বার তুমি এই দাদামণিকে অপরাজিতা দিদিমণির কাছে পৌঁছে দাও,” বলে আবার সেই হাসির ঝরনা। 

এ বার অবশ্য হাসিটা তাড়াতাড়ি থামিয়ে বলল, ‘‘আচ্ছা, তা হলে চলি। আপনার নামটা কিন্তু জানা হল না।’’

অরণি একটু হেসে বলল, ‘‘অরণি বসু।’’ 

“আপনার মোবাইল নম্বরটা একটু বলুন।”

অরণি ঠোঁটের কোণে হেসে বলল, ‘‘মোবাইল নম্বর দিয়ে কী হবে?’’

“বাঃ, আমার বন্ধুকে পছন্দ হল কি না, জানতে হবে না?’’

“লিখে নেবেন?’’

“মুখেই বলুন। আমার যে কোনও নম্বর এক বার শুনলেই মনে থাকে।’’                             

অরণি নম্বরটা বলে প্রশ্ন করল, “আপনি এখানে কোথায় থাকেন?”

“আমি এই সোজা রাস্তায় আর-একটু এগিয়েই থাকি।’’

“আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি চলুন না।’’

“না-না, আমি ঠিক চলে যাব। নিমাইদা, তুমি ঠিক মতো পৌঁছে দিয়ো।’’

রিকশা ডান দিকে মোড় নিল। একটু এগিয়ে এক বার পিছন ফিরল অরণি। মেয়েটা চলে গিয়েছে। 

 

গেট পেরিয়ে লন। বাঁ দিকে দু’টো গ্যারাজ। ডান দিকে বিশাল তিনতলা বাড়ি। পোর্টিকোর নীচে তিন ধাপ মার্বেলের সিঁড়ি উঠে বেল বাজাল অরণি। 

দরজা খুললেন ভারী চেহারার এক জন মহিলা। আন্দাজে অরণি বুঝল, ইনি অপরাজিতার মা। প্রণাম করতে ভদ্রমহিলা জড়িয়ে ধরলেন, ‘‘তোমার জন্যেই বসে ছিলাম বাবা। দেরি দেখে চিন্তা হচ্ছিল, আজ এখানে সব স্ট্রাইক। আর একটু দেখে স্টেশনে গাড়ি পাঠাব ভাবছিলাম।’’

‘‘না না, অসুবিধে হয়নি, রিকশা পেয়ে গিয়েছিলাম।’’

জুতো খুলে বিশাল ড্রয়িংরুমের সোফায় বসল অরণি। ভদ্রমহিলা বললেন, “অপরাজিতা গাড়িটা নিয়ে পড়তে গিয়েছিল, তাই গাড়ি পাঠাতে পারিনি। ও এইমাত্র ফিরেছে।’’

‘‘দাঁড়াও, ডাকি ওকে। তুমি কী খাবে বলো, বেশ গরম, এসি চালিয়ে দিই। একটু কোল্ড ড্রিঙ্ক খাও বরং...”                          

সুদৃশ্য কাচের গ্লাসে ঠান্ডা পানীয় এনে অরণিকে দিয়ে ভদ্রমহিলা ভিতরের ঘরে চলে গেলেন। 

গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে চারদিকটা দেখছিল অরণি। তাদের পুরো ফ্ল্যাটটাই এই ড্রইংরুমের মধ্যে ঢুকে যাবে। বিত্তের ঔজ্জ্বল্য যেন চারদিকে প্রতিফলিত হচ্ছে। দেওয়ালে রেমব্রান্টের রাতপাহারার ছবি। বাবাদের অফিসে কী সব সাপ্লাইয়ের কাজ করেন সন্তোষবাবু, সেই সূত্রে চেনাশোনা। বাবাকে ‘স্যর’ বলেন। বাবা নিশ্চয়ই এই বাড়ি দেখেননি। 

ভিতরের ঘরের পর্দা সরিয়ে ড্রইংরুমে ঢুকে এল অপরাজিতা। চোখ-ধাঁধানো সুন্দরী। কোনও মেক-আপ নেই। মাখনের মতো গায়ের রং। কানে হিরের দুলে আলো ঝিকমিক করছে। পরনে জি‌ন্‌স আর সাদা শার্ট। 

অরণি সপ্রতিভ হওয়ার খুব চেষ্টা করল, কিন্তু কী বলবে ভেবে পেল না। অপরাজিতাই প্রথম কথা বলল, “আপনার আসতে কোনও অসুবিধে হয়নি তো? আমি ইংলিশ টিউশনে গিয়েছিলাম...’’

অরণি তাড়াতাড়ি বলল, “না না, কোনও অসুবিধে হয়নি।”

তার পর একটু ভেবেচিন্তে বলল, “আপনার তো ইংলিশ অনার্স?”

“হ্যাঁ, যাদবপুরে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট করব ভাবছি।”

একটু ক্ষণ দু’জনেই চুপচাপ। তার পর অপরাজিতাই আবার বলল, “আপনি বি টেক কোত্থেকে করেছিলেন?”

“আমি যাদবপুর থেকেই বি টেক করেছি।”

“ ও, আইআইটি থেকে নয়?”

কথাটা একটু কেমন যেন। শুনতে ভাল লাগল না। অরণি একটু হেসে চুপ করে রইল। 

“আমার দাদা আইআইটি থেকে পিএইচ ডি করে এখন আমেরিকায় পোস্ট ডক করছে।”

অরণি আলগা ভাবে বলল, ‘‘ও।”

টুকটাক কথাবার্তা চলতে লাগল। তেমন গরম নেই, এসি চলছে, তাও অরণি একটু-একটু ঘামছে। পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখটা মুছে বলল , “মেসোমশাই বাড়িতে নেই?” 

“না, বাবা ফ্যাক্টরিতেই আছেন। কাল কোম্পানির মিটিং, অনেক ডেলিগেট আসবেন, একটু ব্যস্ত।”

একটি কাজের মেয়ে একটা 

বড় ট্রে এনে সেন্টার টেবিলে রেখে গেল। অপরাজিতা বলল, “নিন,” বলে একটা বড় প্লেট অরণির হাতে ধরিয়ে দিল। 

অরণি বলল, “আপনি কিছু খাবেন না?”

অপরাজিতা বলল, “আমি এ সময় শুধু ফ্রুট জুস খাই।”

সেই কাজের মেয়েটি একটা সুদৃশ্য কাচের গ্লাসে জুস দিয়ে গেল। অপরাজিতা জুসের গ্লাস হাতে নিল। 

অরণির প্লেটে অনেক খাবার, বেশির ভাগই ফেলে রাখল ও। এসির ঠান্ডাটা আরামদায়ক। আরাম করে কফিতে চুমুক দিয়ে সামনের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠল অরণি। 

ভিতরের ঘরের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে বিপাশা। আশ্চর্য! বিপাশা এখানে কী ভাবে আসতে পারে?

নিজেকে একটা ঝাঁকুনি দিল অরণি। আবার তাকিয়ে দেখল। কেউ নেই। পর্দাটা এক পাশে সরিয়ে রাখার জন্য ও রকম মনে হচ্ছিল! 

সন্ধে বেলায় এ রকম হ্যালুসিনেশন! অরণির একটু হাসি পেয়ে গেল। অপরাজিতা একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে। অরণি হাসিটা ঠোঁটে ধরে রেখেই বলল, ‘‘আপনি শুনেছি খুব ভাল গান গাইতে পারেন!’’ বলেই বুঝতে পারল প্রশ্নটা খুব বোকা-বোকা হয়ে গিয়েছে। 

প্রশ্নের আকস্মিকতায় চমকে গিয়ে অপরাজিতা বলল, ‘‘কে বলল?’’

অরণি কথা না খুঁজে পেয়ে বলল, “বোধ হয় বাবার কাছে শুনেছি।’’

অপরাজিতা বেশ অবাক হয়েছে। বলল, “হ্যাঁ, ওই আর কী।’’

অরণি প্রসঙ্গ পালটে নিল, “আপনার দাদা কী নিয়ে রিসার্চ করছেন?’’

‘‘অ্যান্টি-ক্যান্সার ড্রাগস।’’

‘‘উনি কি কেমিস্ট্রির ছাত্র ছিলেন?’’

“হ্যাঁ, কেমিস্ট্রি নিয়েই মাস্টার্স করেছিল।’’

অপরাজিতার মা এক বার ঘরে এলেন। হাতে মোবাইল। বললেন, “ওর বাবা ফোন করেছিলেন। দরকারি কাজে আটকে পড়েছেন। ক্ষমা চেয়ে নিলেন। পরে তোমার সঙ্গে দেখা করে নেবেন।”

অরণি ব্যস্ত হয়ে উঠল, “না-না, ঠিক আছে, অপরাজিতা বলেছে। আমি পরে আর-এক দিন আসব।” 

ভদ্রমহিলা আবার বললেন, “আমার ছেলে একটু পরেই ফোন করবে। তোমরা গল্প করো। একটু কফি দিতে বলি।”

অরণি বলল, “না মাসিমা, আমি উঠব। অনেকটা যেতে হবে। রাত হয়ে যাবে।”

ভদ্রমহিলা  বললেন, “আচ্ছা বাবা, সাবধানে যেয়ো। তোমার মা-কে এক দিন নিয়ে এসো। আমার ওঁর সঙ্গে আলাপ করার খুব ইচ্ছে।”

অরণি সোফা থেকে উঠতে যাচ্ছিল, অপরাজিতা বলল, “একটু বসুন, চাবিটা নিয়ে আসি।”

অপরাজিতা নিজেই ড্রাইভ করে অরণিকে স্টেশনে পৌঁছে দিল । 

 

অরণির মা পঙ্কজিনী বসু ছিলেন বকুলতলা গার্লস হাইস্কুলের ডাকসাইটে হেডমিস্ট্রেস। দু’বছর হল রিটায়ার করেছেন। বরাবর অরণির লেখাপড়ার দিকে তাঁর প্রখর নজর ছিল। অরণিও তাঁকে নিরাশ করেনি। সে মাকে এখনও ছেলেবেলার মতোই ভয় পায়। আবার একমাত্র মার কাছেই সব কথা খুলে বলতে পারে। 

বাড়ি ফিরে স্নান সেরে পোশাক পাল্টে মার ঘরে এল অরণি। পঙ্কজিনী বিছানায় বসে গল্পের বই পড়ছিলেন। বইয়ের ফাঁকে একটা আঙুল রেখে বললেন, “বোস। অপরাজিতাকে কেমন দেখলি? পছন্দ হয়েছে? বাবার তো ছবি দেখেই খুব পছন্দ।”

অরণি একটু ক্ষণ চুপ করে রইল। তার পর বলল , “তোমরা এক বারও যাওনি তো ওদের বাড়ি...” 

“যাব, আগে ঠিক হোক,” পঙ্কজিনী তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছেন ছেলের দিকে। 

অরণি মুখ নিচু করে বলল, “ওরা খুব বড়লোক। তুমি তো জানো আমি কত টাকা মাইনে পাই। আমাদের গাড়িও নেই...  মানুষ কিন্তু খুব বেশি কম্প্রোমাইজ় করতে পারে না।”

পঙ্কজিনী হাতের বইটা বিছানার উপর রেখে বললেন, ‘‘আমিও যে এই কথাটা ভাবিনি তা নয়। তবে তোর মতামতের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”

অরণি আস্তে আস্তে বলল, “তুমি সম্বন্ধটা ছেড়ে দাও। আমি বাবাকে সব কথা বুঝিয়ে বলতে পারব না।”

পঙ্কজিনী বললেন, “ঠিক আছে, বাবাকে আমিই বুঝিয়ে বলব।” তার পর কী যেন ভেবে বললেন, “তুই যে  এমবিএ করবি বলেছিলি?”

অরণি সোজা হয়ে উঠে বসল, বলল, “হ্যাঁ মা, আমি কালই ফর্ম ফিল আপ করব। লেখাপড়াটা আবার শুরু করতে হবে। খড়গপুর আইআইটি-তেই করব। এমবিএ হয়ে গেলে চাকরি ছেড়ে আইআইটি-তেই পিএইচ ডি করব ঠিক করেছি।”

পঙ্কজিনী অরণির এলোমেলো চুলে এক বার হাত বুলিয়ে দিলেন। 

অরণি বলল, “এগজ়িকিউটিভ এমবিএ করতে কিন্তু ছ’লাখ টাকা লাগবে।”

পঙ্কজিনী হাসলেন, “তোকে চিন্তা করতে হবে না। আমার রিটায়ারমেন্টের টাকা আছে।” 

 

নিজের ঘরে এসে নিজেকে খুব হালকা লাগছিল অরণির। টেবিলের বইগুলো গুছিয়ে রাখল। একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের সিডি চালিয়ে দিল। কাল থেকে পুরো দমে লেখাপড়া শুরু করতে হবে। অনেক দিন পর মোবাইলে ছ’টায় অ্যালার্ম দিল অরণি। কাজ সেরে বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে বসল। বুকের মধ্যে প্রজাপতির ডানার স্পন্দন। রেকর্ড প্লেয়ারে বাজছে, ‘সেই ভালো সেই ভালো, আমারে না হয় না জানো...’

কোথায় যেন চিনচিন করে লাগছে। আগে তো কোনও দিন এই গানটা এ রকম করে কষ্ট দেয়নি। প্লেয়ার বন্ধ করে শুয়ে পড়তে পড়তেও যেন কানে বাজতে লাগল, ‘দূরে গিয়ে নয় দুঃখ দেবে, কাছে কেন লাজে লাজানো...’ 

 

সকালে অ্যালার্ম বাজতেই লাফ দিয়ে উঠল অরণি। কত দিন পর! কী সুন্দর নরম রোদ এসে পড়েছে জানলা দিয়ে। চোখেমুখে জল দিয়ে টেবিলে এসে বসতেই পঙ্কজিনী চা নিয়ে এলেন। ওঁর মুখেও হাসি। 

টেবিলে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতেই মনটা হালকা হয়ে গেল। মোবাইলে টিং করে একটা মেসেজ ঢুকল। ইনবক্সে গিয়ে অরণি দেখল বিপাশার মেসেজ— ‘আমার বন্ধুকে পছন্দ হয়েছে তো? বলেছিলাম না, পছন্দ হবেই! অভিনন্দন। বিপাশা।’

অরণির উত্তর দিতে দেরি হল না— ‘অনেক দিন আগে একটা ভুল করেছিলাম। সেই ভুল শোধরানোর একটা সুযোগ এখন দেবে?’ 

তলায় ‘অরণি’ লিখেও মুছে দিয়ে লিখল, ‘ফার্স্টবয়’।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন