আমাদের অনেকের জীবনেই একটা বুকচাপা কান্না ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে চিরকাল। যেমন, ‘দাদা, আমি তো বাঁচতে চেয়েছিলাম’, বা ‘অপু আমাকে একদিন রেলগাড়ি দেখাবি?’ আমার শিশু থেকে বড় এবং বুড়ো হয়ে ওঠার ইতিহাসে দ্বিতীয় প্রশ্নটি এক দুরপনেয় সিগনেচার টিউন। 

আমি বড় হয়েছি ষাট আর সত্তর দশকে বর্ধমান জেলার কাটোয়া শহরে। সে ঠিক নিশ্চিন্দিপুর না হলেও সত্যি বলতে কী, ‘রেলগাড়ি’ আর ‘ট্রেন’-এর মধ্যবর্তী আবছায়া সীমারেখাটি তখনও কাটেনি। জ্ঞানবয়সে আমার প্রথম ট্রেনে চড়া ন্যারো গেজ বা ‘ছোট লাইনের’ গাড়ি চেপে কাটোয়া থেকে বলগোনা, ভাতার হয়ে বর্ধমান, যেখানে আমার দাদু ১৯৩০ নাগাদ বরিশাল থেকে বদলি হয়ে এসে আস্তানা গাড়েন।

 উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতীয় গণতন্ত্রে আমার হাতেখড়ি বছর ছয়েক বয়েসে, যখন এক বার সেই যাত্রাকালে সকৌতূহলে লক্ষ করি, আমরা ছাড়া গোটা কামরায় কারও কাছে টিকিট নেই, চেকার সলজ্জ এসে দাঁড়ালেই লোকেরা চটপট এগিয়ে দিচ্ছেন গ্রামীণ বর্ধমানের আদিগন্ত খেত থেকে সদ্য-তুলে আনা বেগুন, মুলো বা ছাঁচি কুমড়োর ফালি, শীতের শিশির লেগে থাকা সেই অতুলনীয় শস্যরাজিতে চেকারের ঝোলা হয়ে উঠছে ভারী, ভিজে। এই বিনিময়প্রথার সামান্য বদল হল বছর দুয়েক পরে, যখন সদ্য-চালু অ্যালুমিনিয়ামের নতুন দশ পয়সার কাঙাল আমি লোলুপ দৃষ্টিতে লক্ষ করলাম, চেকারের কাঁধের ঝোলা ছিঁড়ে পড়ার উপক্রম রাশি রাশি নতুন দশ পয়সার ভারে। কাটোয়া-বর্ধমানের সেই ছোট লাইন এখন ব্রডগেজ, কয়েক মাস আগেই সেখানে চালু হয়েছে বিদ্যুৎচালিত ইএমইউ ট্রেন, সেই খবর পড়ে অবিশ্বাসে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলাম বেশ কিছু ক্ষণ।

আমার আসল লোভ ছিল কলকাতায় মামাবাড়ি যাওয়ার জন্য। নবদ্বীপ-কালনা-গুপ্তিপাড়া-ত্রিবেণী হয়ে সেই আশ্চর্য ভ্রমণের শেষ পর্ব ছিল ব্যান্ডেল থেকে ইলেকট্রিক ট্রেন। আমার এক সদ্য কলকাতা-ফেরত বন্ধু বলেছিল, ‘‘বুঝলি, জানালার শিকে মুখ লাগিয়ে বসে আছি, হঠাৎ ভাল করে দেখতেই পেলাম না, উল্কার মতো চলে গেল, সাঁ-আ-আ-আ-আ, কী বল তো?’’ শিহরিত আমি বোকার মতো বলতাম, কী? বন্ধু সগর্বে বলত, ‘‘কোন্নগর লোকাল।’’ চলমান অশরীরীর থেকেও ক্ষিপ্র সেই কোন্নগর লোকাল তার সমস্ত বিদ্যুৎবাহিত গরিমা নিয়ে সে দিন থেকেই আমার মনে চারিয়ে গেল। 

এই রকম সময়ে বাবা কিনে দিলেন এক অত্যাশ্চর্য পুরনো বই, হ্যারি গোল্ডিং-এর ‘দ্য ওয়ান্ডার বুক অব রেলওয়েজ ফর বয়েজ অ্যান্ড গার্লস’, লন্ডনের ওয়ার্ড, লক অ্যান্ড কোম্পানি থেকে ১৯২৫ সালে প্রকাশিত। শয়ে শয়ে ছবি, ফার্থ অব ফোর্থ ব্রিজ পেরোচ্ছে অ্যাবার্ডিন এক্সপ্রেস, বিলেতের তখনকার সবচেয়ে বৃহদায়তন স্টিম ইঞ্জিন ‘গ্রেট বেয়ার’-এর ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে গ্লস্টারশায়ারের সেভার্ন টানেল বা আমেরিকার নিউ মেক্সিকোর রিও গ্রান্ডে নদীর উপর দিয়ে অবলীলায় দড়িদড়ার দোলনায় পার করে দেওয়া হচ্ছে হুমদো সাইজের ইঞ্জিন।

তার পর থেকে লক্ষ করতাম টর্পেডোর মতো, নাক উঁচিয়ে থাকা ইঞ্জিন, যাকে আমরা সসম্ভ্রমে বলতাম, ‘ক্যানাডিয়ান ইঞ্জিন’— বস্তুত ষাট-সত্তরের দশকের সে সব বৃহৎকলেবর গন্ডারসদৃশ ‘ডব্লিউ পি’ ইঞ্জিনের বেশ কিছু তৈরি হত কানাডায়, সম্ভবত মন্ট্রিয়লে। এ দেশে সেই সব ইঞ্জিনের দৌলতে পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো ছুটত আমাদের যত কুলীন ট্রেন— ফ্রন্টিয়ার মেল, গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক এক্সপ্রেস, মাদ্রাজ মেল, তাজ এক্সপ্রেস বা প্রথম দিকে হাওড়া-দিল্লি এয়ারকন্ডিশন্‌ড (এখনকার পূর্বা) এক্সপ্রেস।

প্রথম থেকেই অবশ্য জানতাম যে এ সব ট্রেনের বাবা হল রাজধানী এক্সপ্রেস, তাকে টানে কয়লার নয়, চিতাবাঘের মতো তেজিয়ান ডিজেল ইঞ্জিন। বন্ধুরা বলে দিয়েছিল, রাজধানী যখন যায়, প্ল্যাটফর্মে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে নেই, অতি শক্তিধর এক মহাচুম্বকের মতো সে সাঁৎ করে টেনে নেয়। ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টের একটা চটি বই ছিল আমার, ‘রেলের কথা’ না কী যেন নাম, তাতেও ধাবমান রাজধানী এক্সপ্রেসের একটা দ্রুতিবিলীন, ঝাপসা ছবি ছিল, যা দেখে ওই ধারণা আমার মনেও বদ্ধমূল হয়ে যায়। তাই বছর আটেক বয়সে এক ঠা-ঠা গরমের বিকেলে জ্যাঠামশাইয়ের বর্ধমানের বাড়ি থেকে মাইল তিনেক হেঁটে সাড়ে পাঁচটা নাগাদ স্টেশনে চলে এলাম, উদ্দেশ্য নিরাপদ দূরত্ব থেকে রাজধানী এক্সপ্রেস দর্শন। ঝাড়া পঁয়তাল্লিশ মিনিট অপেক্ষার পরে সে এল বটে, কিন্তু ও হরি— মাত্র সাত-আটটা কালো কাচ লাগানো কামরার একটা ডিজেল ইঞ্জিনের ট্রেন, এক রণক্লান্ত শ্বাপদের মতো মন্থর ভাবে এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে গেল। 

এর কিছু দিন পরেই আমার জীবন পাল্টে দেয় দুটি বই। ‘নতুন পৃথিবীর মানচিত্র’ নামে এক বাংলা ম্যাপের বই (নামে নতুন হলেও তখন পৃথিবীর রাষ্ট্রসংখ্যা এখনকার অর্ধেক বা তার কাছাকাছি), যেখানে পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের সব জেলার ম্যাপে আমি অনুপুঙ্খ দেখতে পেতাম কোথায়, কী ভাবে আমার মানচিত্রে রেলগাড়ি চলে যাচ্ছে গেদে থেকে দর্শনা, বনগাঁ থেকে যশোর-খুলনা, বালুরঘাট থেকে হিলি হয়ে দিনাজপুর, বা গৌহাটি থেকে কুমিল্লা হয়ে চট্টগ্রাম। কী ভাবে যেন হাতে এসে পড়ে পূর্ব আর দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়ের দুটি টাইমটেবিল, আর তার অল্প দিনের মধ্যেই কলকাতার এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ধার করে আনি স্ফীতকায় ‘অল ইন্ডিয়া রেলওয়ে টাইমটেবল’। আমার সামনে এক অত্যাশ্চর্য জগৎ খুলে দিল সে বই। শুধু কি সুবিশাল দেশের গহন কন্দরের আনাচে-কানাচে দ্রুত ও মন্দচারী হাজার হাজার ট্রেনের গতিবিধির ঠিকুজি-কুষ্ঠী? সঙ্গে অসংখ্য বিজ্ঞাপন, রকমারি সংকেত-নির্দেশিকা, কোন কোন স্টেশনে পাওয়া যাবে রিটায়ারিং রুম, ক্লোক রুম, আমিষ ও নিরামিষ রিফ্রেশমেন্ট রুম, ক’টা রুটি, কত গ্রাম চালের ভাত, ডাল, সব্জি, মুরগি বা মাটন (এবং অনিবার্য ভাবে, ১০ গ্রাম আচার), ব্যাগ জমা রাখতে ক’পয়সা লাগে, দূরপাল্লার মেল বা এক্সপ্রেস ট্রেনে চড়তে ন্যূনতম কত কিলোমিটার ভ্রমণ করা বাধ্যতামূলক, আরও কত কী!

ইদানীং স্কুলে ইতিহাস আর ভূগোল মিলিয়ে যে ‘সোশ্যাল স্টাডিজ়’ বলে একটা জগাখিচুড়ি বিষয় থাকে, তাতে আমার হাতেখড়ি হয় ‘নূতন পৃথিবীর মানচিত্র’, ‘অল ইন্ডিয়া রেলওয়ে টাইমটেবল’ আর দেবসাহিত্য কুটির থেকে প্রকাশিত ‘সোনার ভারত’ নামে এক সুখপাঠ্য ইতিহাসের বইয়ের ত্র্যহস্পর্শে। বইয়ের ইতিহাসের জায়গাগুলোকে মানচিত্র এবং টাইমটেবিলে এক সঙ্গে প্লট করার চেষ্টা করতাম, সেই সূত্রে জেনে যাই বিপুল এই উপমহাদেশের আনাচে-কানাচে কী ভাবে মাকড়সার মতো তার জাল বিছিয়ে দিয়েছে রেল। বিশেষ আগ্রহ ছিল অচেনা মধ্য ও দক্ষিণ ভারত সম্পর্কে, কত যে স্টেশনের নাম, স্থানাঙ্ক আর রেলসংযোগ আমার কণ্ঠস্থ ছিল তার ইয়ত্তা নেই। আমি জেনে গেলাম, বম্বে থেকে মাদ্রাজ আসতে গেলে রায়চুর দোয়াব পেরোতেই হবে, যা নিয়ে আগে গুর্জর-প্রতিহারদের সঙ্গে রাষ্ট্রকূটদের, পরে বিজয়নগরের সঙ্গে বাহমনীদের বিস্তর লড়াই চলেছিল। এ-ও জানলাম যে ওই লাইনে হসপেটে নেমে গেলে পাশেই তুঙ্গভদ্রার তীরে তার অস্তমিত গরিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে হাম্পি, আর অনতিদূরে বাদামি, যেখানে রাজধানী গড়েছিলেন পরাক্রান্ত চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশী। সত্যি বলতে, দাক্ষিণাত্য আর ততোধিক দক্ষিণে সাতবাহন-পল্লব-পাণ্ড্য-চোল-হোয়সাল-কাকতীয় বংশরাজির কলকোলাহলমুখর ভিড়ে নাকানিচোবানি খাওয়া থেকে আমাকে বাঁচায় অল ইন্ডিয়া রেলওয়ে টাইমটেবিল। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে রেল কোম্পানির কাছে আমি তাই আজও কৃতজ্ঞ।
আমার সৃষ্টিশীল সত্তার প্রথম উদ্ভাসের অনুঘটকও টাইমটেবিল। একটা খাতায় রেলপথের বহুগামী বিস্তারকে আমি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম এমন অনেক জায়গায়, যেখানকার অনাম্নী দুর্গারাও অকালমৃতা ওই কিশোরীটির অপূর্ণ আকুতি নিয়েই বেঁচে এসেছে চিরকাল। সবিস্ময়ে লক্ষ করি, আমার নিজের হাতে তৈরি সেই সব মানস-ট্রেনের অনেকগুলোই পরে প্রাণ পেয়েছে ভারতীয় রেলের হাতে। যেমন পাঠানকোট (জম্মু তাওয়াই তখনও দূরায়ত) থেকে কন্যাকুমারী ট্রেন সংযোগ আমি প্রথম পরিকল্পনা করি, নাম দিয়েছিলাম আর্যাবর্ত-দ্রাবিড় এক্সপ্রেস (আম-সদৃশ হিমসাগর এক্সপ্রেসের থেকে ঢের ভাল), সময় লাগত ৩৫ ঘণ্টা মতো।
যখন একটু-আধটু গল্পের বই পড়তে শুরু করি, তখন হল আর এক সমস্যা। সে সব বইয়ে বিস্তর ট্রেন, কিন্তু স্টেশনগুলো কোথায়? মাঝেরপাড়া স্টেশনের ডিসট্যান্ট সিগন্যালটা ঠিক কোন লাইনের উপর? তখন আমার মানচিত্রে মাঝেরপাড়া খুঁজে পাইনি, তবে জানি বিভূতিভূষণ বনগাঁ-ইছামতী অঞ্চল নিয়ে অনেক লিখেছেন, গুগল ম্যাপে এখন দেখি বনগাঁ টাউনের কাছাকাছি দিয়ে মাঝেরপাড়া-আপনজন রোড বলে একটা রাস্তা যাচ্ছে বটে, কিন্তু সে তো বনগাঁ লাইনের কোনও স্টেশন নয়, তবে কি ‘পথের কবি’ এটা বেমালুম বানালেন? আবার ‘ভোম্বল সর্দার’-এ পড়ি ভোম্বল বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতার ট্রেনে চাপতে গিয়ে ভুল করে গোয়ালন্দ ঘাটের ট্রেনে উঠে পড়ে, অর্থাৎ দেশভাগের আগে শিয়ালদা থেকে যে সব ট্রেন রানাঘাট-গেদে-দর্শনা-চুয়াডাঙা-পোড়াদহ হয়ে গোয়ালন্দের পদ্মাপারে যাত্রীদের নামিয়ে নারায়ণগঞ্জ-চাঁদপুর-বরিশাল-মাদারিপুরের স্টিমার ধরিয়ে দিত। কিন্তু ভোম্বল ভোরে ঘুম ভেঙে দেখল ট্রেন সাতকোদালে, ট্যাংমারি, আলমপুর ধরনের সব এলেবেলে স্টেশন পার হচ্ছে, তার খানিক পরেই টিকিট চেকারকে এড়াতে সে নেমে পড়ল শালুকডাঙা বলে অমনই একটা স্টেশনে। এই স্টেশনগুলোই বা কোথায়— ‘পূর্ব্ববঙ্গ রেলপথের প্রচার বিভাগ হইতে প্রকাশিত’ দু’খণ্ডের অসামান্য ‘বাংলায় ভ্রমণ’-এও তাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাইনি। এর থেকে অনেক সহজ ছিল ‘যখের ধন’, যেখানে বিমল আর কুমার রানাঘাট দিয়ে অসম যাচ্ছে কেন প্রথমে বুঝিনি, পরে দেশভাগ-পূর্ব রেলযাত্রার রুট বুঝতে পেরেছিলাম— রানাঘাট থেকে বগুলা-চুয়াডাঙা হয়ে দামুকদিয়া ঘাটে ট্রেন থেকে নেমে ফেরিতে পদ্মা পেরিয়ে অন্য পারে সারা (বা সাঁড়া) ঘাট থেকে অসম মেল ধরে সান্তাহার-পার্বতীপুর-চিলাহাটি-হলদিবাড়ি পেরিয়ে শিলিগুড়ি হয়ে অসম, যে ‘ব্রেকজার্নি’র প্রয়োজন ঘুচিয়ে দেবে ১৯১৫ সালে সাঁড়া-য় তৈরি হওয়া হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। ‘ওবিন ঠাকুর’-এর ‘বুড়ো আংলা’-তেও রিদয়কে নিয়ে মানস সরোবরের পথে উড্ডীয়মান হাঁসের দল খানিকটা এই রেলের রাস্তাতেই তাদের রুট ছকেছিল— ‘পাবনা, রামপুর-বোয়ালিয়া, বোগরা, রাজসাহি, দিনাজপুর, রংপুর, কুচবেহার, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি’।
উপমহাদেশের পশ্চিমেও অসংখ্য কূটপ্রশ্ন— যার জবাবে মান্টোর টোবা টেক সিং-এর স্টাইলে গাছে উঠে বুঝভুম্বুল বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। সৈয়দ মুজতবা আলির ‘দেশে বিদেশে’-তে ফিরিঙ্গি-সর্দার-পাঠানের মেহমানদারি উপভোগ করতে করতে তাঁকে কলকাতা থেকে পেশওয়ার রেলযাত্রা করতে দেখি, কিন্তু আলিসাহেব গেলেন কোন ট্রেনে? মাঝপথে ট্রেন বদলের কোনও বর্ণনা নেই, আর ইতিহাস বলে তাঁর কাবুলযাত্রা ১৯২৭ সালে, কিন্তু ওই সময়ে কলকাতা থেকে পেশওয়ারের সরাসরি ট্রেন কোথায়? গতি আর আভিজাত্যের মেলবন্ধনে সবাইকে ধাঁধা লাগিয়ে দিয়েছিল বোম্বাই-পেশওয়ার যে ফ্রন্টিয়ার মেল— চলনে-মেজাজে যা ছিল আমাদের ‘ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’— তারও শুরু তো ১৯২৮-এর আগে নয়। তবে কি আলি সাহেবও...? এখন আর কলকাতা-দিল্লি-বোম্বাই কোথাও থেকেই আর ট্রেনযোগে পাঠানমুলুকে পাড়ি দেওয়ার জো নেই, ফ্রন্টিয়ার মেলের সীমান্তগামী আভিজাত্য দেশভাগের পর তার অমৃতসরে যাত্রাসমাপ্তির মাধ্যমেই ঘুচে গিয়েছিল, এখন ‘গোল্ডেন টেম্পল মেল’ নামকরণের মধ্যে দিয়ে তার এক ছন্নছাড়া সন্ন্যাসদশা ঘটেছে। 
এখন রেলযাত্রা আমার জীবনে খুবই অনিয়মিত। অল ইন্ডিয়া রেলওয়ে টাইমটেবিল আর হাতের কাছে পাই না, এই জগৎজোড়া জালের আমলে আইআরসিটিসি-র ওয়েবসাইটই ভরসা। সেখানে এবং আশপাশে চর্মচক্ষে যা দেখি, মনে ঠিক ভরসা হয় না। রাজধানী প্রথমে একটা থেকে দুটো হল, এখন খোলামকুচি। তার পর হল শতাব্দী, সে-ও এখন দেখি যেখানে পেরেছে একটা করে গুঁজে দিয়েছে; তার পর জনশতাব্দী, অতঃপর সম্পর্কক্রান্তি এক্সপ্রেস সিরিজ়, তার পর হল দুরন্ত, শেষমেশ এখন দেখছি গতিমান এক্সপ্রেস বলে একটা জিনিস হয়েছে, সে নাকি দেশের দ্রুততম ট্রেন। এ সব গোত্রকুলহীন ট্রেন কতগুলো আছে, কোথা থেকে কোথায় যায়, জানি না। উত্তরপ্রদেশের চিত্রকূট জেলার মানিকপুর (অধুনা গঢ়ী মানিকপুর) থেকে দিল্লির হজরত নিজ়ামুদ্দিন পর্যন্ত একটা সম্পর্কক্রান্তি এক্সপ্রেস আছে, জানতেন কি, বা আমাদের এই বিদ্যাসাগর সেতু পেরিয়ে শালিমার স্টেশন থেকে পটনা দুরন্ত? কারা ঠিক করে কোথা থেকে কোথায় ট্রেন হবে, আর কতগুলো? রেলমন্ত্রী? রেল বোর্ড? নাকি আজকের অপু-দুর্গাদের জন্য এই সব বিস্মরণযোগ্য ট্রেন বানায় কোনও গণদেবতা? কে জানে!
এ সব ট্রেনে দু’এক বার চড়েছি বটে, কালো কাচের ও-ধার থেকে দ্রুত অপস্রিয়মাণ ‘ইন্ডিয়া শাইনিং’-ও দেখেছি, কিন্তু তাতে মন ভরে না। মনে হয়, আগেকার সে দিনই ভাল ছিল। হোক সেই টানা দু’দিন ধরে গরম, কয়লার ধোঁয়া আর ধুলোয় বেমালুম কালিয়ে যাওয়া, তবু সেখানে অনেক কিছু ছিল। ট্রাঙ্ক, হোল্ডঅল, লিলুয়া পেরোতেই অবর্ণনীয় দক্ষতায় লুঙ্গির আড়ালের মধ্যে থেকে ট্রাউজ়ার্স সড়াৎ করে নামিয়ে দেওয়া, খুরদা রোড স্টেশন থেকে ওঠা স্টিলের থালিতে ভাত-ডাল-তরকারি-ডিমের ঝোল (কেলনারের কারি-রাইস খাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি), ভ্যাপসা লুচি আর আলুর দম বা ফুলকপির ছেঁচকি, মশলা মুড়ি, মুমফলি, শসা-বিটনুন, দু’দিনের বাসি ডিমসেদ্ধ, দুটো কটকটি বাজিয়ে ‘দফলিওয়া-য়া-য়া-লে’ বা অন্ধ গায়কের ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’, হকারের ট্রে-তে সফ্‌ট পর্ন গোছের ম্যাগাজিন থেকে আরম্ভ করে দুনিয়ার যাবতীয় সব্জির খোসা ছাড়িয়ে চাকাচাকা বা জিরিজিরি করে কাটার ম্যাজিক-যন্ত্র, এক ঘণ্টা পরে-পরে হাওয়া-বেরিয়ে-যাওয়া এয়ার পিলো, রাত আড়াইটের সময়ে গয়া স্টেশনে জানালার হাতায় সন্তর্পণে রেখে-দেওয়া ‘এই চা-আ-য়ে গর্ম’— এই সব দিয়েই গড়ে উঠেছিল আমাদের নশ্বর ও অর্থহীন জীবনের পরম কাঙ্ক্ষিত সব মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট। প্রথম যখন কালকা মেলে চাপি, পর দিন সকালে মোগলসরাই থুড়ি, দীনদয়াল উপাধ্যায় স্টেশন পেরোনোর পর আমার সদ্যজাগ্রত শিশুপুত্রকে ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রাথমিক পাঠ দেওয়ার জন্য এ মুড়ো থেকে ও মুড়ো গোটা ট্রেনটা দেখাতে নিয়ে যাই। প্যান্ট্রি কারের কিচেনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রান্নার অপেক্ষায় সারি সারি চিকেন কোয়ার্টার দেখে সে স্তব্ধ হয়ে যায়, তার মুখে বিস্ময় ও পুলকের যে সমাহার দেখেছিলাম, তা এখনও ভুলিনি। 
আর ভুলিনি স্কলারশিপের ইন্টারভিউ দিতে পূর্বা এক্সপ্রেসে (তখন নিছকই ‘বাতানুকূল এক্সপ্রেস’) প্রথম দিল্লি যাওয়া। পুজোর সিজ়নে মাত্র দশ দিন আগে চিঠি পেয়ে ভোর পাঁচটা থেকে নিউ কয়লাঘাটে লাইন দিয়েও আমার কোনও টিকিট পাওয়ার কথা নয়, পাইওনি। শেষমেশ যাওয়াই হত না, যদি না আমার করুণ আত্মবিলাপ শুনে কাউন্টারের পরমকারুণিক ভদ্রলোকটি আমাকে ‘বদ্যি কোটায়’ একটা টিকিট বার করে না দিতেন (‘আচ্ছা, দাঁড়ান তো এক মিনিট, আপনি সেনগুপ্ত, না? আমি গুপ্ত’)। ভারতীয় রেলের তেরো লক্ষ কর্মচারীর মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন এমন কিছু সন্ত-দরবেশ।
তখন উত্তর ভারতে মণ্ডল কমিশনের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন চলছে। ভোর রাতে কানপুরের আগেই কয়েকটা ছেলে এসে ট্রেন থামিয়ে তার ভ্যাকুয়াম ব্রেকের পাইপটা কেটে দিয়ে চলে গেল। চোদ্দো ঘণ্টা পড়ে রইলাম হেমন্তের শিশিরভেজা উত্তরপ্রদেশের গমখেতের ধারে। ডাইনিং-এর হাসিখুশি ছোকরাটি বলল, ‘‘স্যর, লাঞ্চের তো এমনিতে ব্যবস্থা নেই, ডিমভাত লাগিয়ে দিই?’’ আমরা সমস্বরে হ্যাঁ হ্যাঁ। বিকেল চারটে নাগাদও যখন ট্রেন নট নড়নচড়ন, সে ফের হাসিমুখে এসে বলল, ‘‘স্যর, ডিনারেরও তো কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে, এখান থেকে উ-ই-ই দিকে একটা হাট বসে, বলুন তো কিছু আনাজপাতি নিয়ে আসি?’’ তার পরের দৃশ্যটা এখনও মনে আছে। পড়ন্ত সূর্যের নীচে ঝিরঝিরে হাওয়ায় বাতানুকূল এক্সপ্রেসের পাশে আদিগন্ত গমের খেত চিরে বাজারের থলি হাতে ছেলেটি হাটের পানে যেতে যেতে বিন্দুবৎ বিলীন হয়ে যাচ্ছে, আন্দ্রেই তারকভস্কির ‘নস্টালজিয়া’ ছবিতে সবুজে আকীর্ণ প্রান্তর পেরিয়ে আগন্তুকের ধীরে ধীরে চলে যাওয়ার মতো। 
আমরা এখন যতই বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম রেলব্যবস্থা হই না কেন, রেলের সেই রমরমা আর নেই, অন্তত আমার কাছে। এই মোহভঙ্গ হয়েছে একটু একটু করে। যে রাজধানী এক্সপ্রেস দেখতে ছুটে গিয়েছিলাম বর্ধমান স্টেশনে, তাতে প্রথম চড়ার সময় দেখেছিলাম সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ সবাই উঠে বসছে, ‘এই বার স্যুপ দেবে, এই বার স্যুপ দেবে!’ বলতে বলতে, তার খানিক পরেই আচমকা হোঁচট খেয়ে এক সাফারি স্যুট পরিহিত ভদ্রলোকের পায়ে ব্যবহৃত প্লেটের মুরগির হাড়গোড় উল্টে দেওয়ার অব্যবহিত পরেই ডাইনিং কারের অ্যাটেনডেন্ট অতি দক্ষতায় পা দিয়ে সে সব হাড়গোড় ঢুকিয়ে দিচ্ছে কার্পেটের তলায়। এক সময়কার সব কুলীন ট্রেন, যাদের দ্রুতি আমি আমার ছোটবেলার টাইমটেবিল বা ব্র্যাডশ’তে অবাক হয়ে লক্ষ করতাম— যেমন দিল্লি-আগ্রা তাজ এক্সপ্রেস, বম্বে-পুণা ডেকান কুইন, বা মাদ্রাজ-বাঙ্গালোর বৃন্দাবন এক্সপ্রেস— তাদের অভিজাত্য গিয়েছে, তাদের শরীরে-চলনেও গণতন্ত্রের প্রৌঢ়ত্বের অবসাদ। 
বিবিসি তাদের ‘গ্রেট রেলওয়ে জার্নিজ় অব দ্য ওয়র্ল্ড’ এখন বানালে, বা পল থেরো তাঁর ‘গ্রেট রেলওয়ে বাজার’ এখন লিখলে আজকের সব এলেবেলে সুপারফাস্ট ট্রেন সে সবের মধ্যে কতখানি জায়গা পেত জানি না।
কিন্তু আমাদের মন চিরকালের রেল-রোম্যান্টিক থেকে যাবে। ছোটবেলায় চিত্রহারে কানন দেবীর ‘দুনিয়া ইয়ে দুনিয়া তুফান মেল’ শুনে যে আবেগে উদ্বেল হয়েছিলাম, কিছু দিন বাদেই ওই অখাদ্য ট্রেনটিতে চড়েও তা কাটেনি, কারণ তার কয়েক দিন বাদেই আবার সিনেমার পর্দায় দেখলাম ‘সোনার কেল্লা’র সেই অবিস্মরণীয় দৃশ্য— ফেলুদা আর তোপসেকে নিয়ে কাঁটায় কাঁটায় ন’টা পঁয়ত্রিশে হাওড়া স্টেশন থেকে গম্ভীর গজেন্দ্রগমনে বেরিয়ে আসছে তুফান এক্সপ্রেস (কোনও দিনই যা ‘মেল’ ছিল না), আর সাউন্ডট্র্যাকে সেই অনবদ্য প্যাঁর‌্যার‌্যাপ্প্যাঁপ্প্যাঁ! সত্যজিৎ রায় যদি তুফান এক্সপ্রেসকে অমরত্ব দিয়ে যেতে পারেন, তবে আমাদের রেল-রোম্যান্সও ওই সব ডাইনোসরদের ঘিরেই ঘোরাফেরা করুক।