হ্যাঁ, স্পষ্ট মনে আছে ঊর্মির, গত কাল রাতে ঘুমের ঘোরে ধ্রুবকে ও দু-দু’বার ‘বুঁচকি’ নামটা বলতে শুনেছে! 

আর সেই শোনা ইস্তক আপাদমস্তক ওর সমস্ত শরীর জুড়ে বয়ে চলেছে এক ভয়ানক অস্বস্তির চোরাস্রোত! নাহ, সোনা বৌয়ের মতো আর দিলখুশ হয়ে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে থাকতে পারেনি ঊর্মি! বাকি রাতটা ও উশখুশ করেই কাটিয়ে দিয়েছে। সকালে ধ্রুব ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে ঘুমহীন চোখে কত বার ভেবেছে ধ্রুবকে প্রশ্নটা করবে, ‘এই বুঁচকিটা কে?’ কিন্তু মুখফুটে এই ওয়ান-টুয়েলফথ ফুটের পুঁচকি প্রশ্নটা করতে গিয়ে ঊর্মি আজ দু-দু’বার বিষম খেয়েছে, তিন-তিন বার হেঁচকি তুলেছে! শেষে নিজের সঙ্গে ধুন্ধুমার লড়াই করে ঝকঝকে দিনের আলোয়, সদ্য বিয়ে করা বরকে এই প্রশ্ন করার ঝক্কি নেওয়াটা ওর পক্ষে নিতান্তই অসম্ভব বুঝতে পেরে অগত্যা রাতের একান্তে নিরালার জন্যে অপেক্ষা করাটাই ওর শ্রেয় বলে মনে হয়েছে। আসলে দিনের আলোর ছোঁয়া পেলেই রাতের অন্ধকারের দুঃস্বপ্নেরা সব কেমন যেন দূরে দূরে ছিটকে সরে গিয়ে আকারহীন, অলীক অবাস্তব রূপ নেয়। তার ওপর আজ ধ্রুবদের অফিসে একটা জরুরি মিটিং আছে। নিদেনপক্ষে সকালবেলা অফিস যাওয়ার আগে এই ‘ফিশি’ ব্যাপারটা নিয়ে ঘোলাজলে মাছ ধরার চেষ্টা করাটা হয়তো ঠিক হবে না ভেবেই নিজেকে অকারণ সান্ত্বনা দিয়ে গিয়েছে ঊর্মি! কিন্তু না, নিজে শান্ত হতে পারেনি। সারাটা দিন ধরে ওই ‘বুঁচকি’র বোঁচকাবুঁচকি ঘাড়ে নিয়ে বসে থাকাটা যে কতখানি অসহনীয়— তা ওর চেয়ে বেশি আর কে জানে! সুতরাং সকাল সকাল ধ্রুবর অফিস বাসটা মোড়ের মাথায় পাক খেয়ে বেরিয়ে যেতেই স্মার্টফোনে তিথিকে পাকড়াও করল অসহায় ঊর্মি।

“আরে, নববধূর গলার স্বরে এমন নব্বই বছরের দিদিমার ভার কেন রে ঊর্মি? ব্যাপারটা কী?” সম্প্রতি কর্পোরেট সেক্টরে চাকরি পেয়েছে তিথি। এখন আয়কর বাঁচানোর ফন্দিফিকির নিয়েই ব্যস্ত। কড়কড়ে নোটেরাও ওর কড়া কথার বশ! নাম তিথি হলে কী হবে, নিজে তিথি-নক্ষত্রের ধার ধারে না। সে স্বভাবচঞ্চল, ভাবনার ভাবে আছে। কাজে আছে, অকাজেও আছে! 

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

“আর ব্যাপার...” হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে ঊর্মি। “হাউ ক্যান দে...? তখনই বাবা মাকে বলেছিলাম, আর ক’টা দিন ছেলেটাকে একটু দেখেবুঝে নিই, তার পর না হয় বিয়ে। তো মায়ের আর তর সইল না। তড়বড়িয়ে বিয়েটা না দিলেই হচ্ছিল না! ফুলকিমাসি সম্বন্ধটা এনেছে বলে ছেলেটার সম্বন্ধে সে ভাবে কিছু না জেনেই...”  

“আরে, আরে... কী হয়েছে সেটা তো বল শুনি?” তিথির গলার স্বরে উদ্বেগ উপচে পড়ছে। 

“বুঁচকি নামের কোনও একটা মেয়ের সঙ্গে...” আর কথা শেষ করতে পারে না ঊর্মি। চোখের অলিগলি সব ঝাপসা হয়ে আসে। ফুঁপিয়ে ওঠে ও!    

“বুঁচকি নামের মেয়ের সঙ্গে... কী হয়েছে?” তিথির অবস্থাও ও দিকে তথৈবচ। ঊর্মির সঙ্গে ওর গলায় গলায় বন্ধুত্ব। বাকজালে দশদিক ব্যাপ্ত করতে ওস্তাদ যে তিথি, সেও কয়েক মুহূর্তের জন্য বাকশক্তিহীন হয়ে যায়! 

“কী বলছিস কী তুই?” তিথি ফোনের ও পারে। বিয়ের পরে একটা মাসও ঘোরেনি, তার আগেই যদি মেয়েটার জীবনে এমন সমস্যা হয়, তা হলে সে তো বড় চিন্তার ব্যাপার! এ তো ঘোর সমস্যা হল!

“তুই ঠিক শুনেছিস তো? শোন ঊর্মি, এ নিয়ে কোনও রকম আপোস করা চলবে না, তুই তো আর ওর পোষ মানা ময়না নোস! আজ রাতেই ধ্রুবদার সঙ্গে এই নিয়ে সরাসরি কথা বলে ধ্রুব সত্যটা জেনে নে...ভাবগতিক কিন্তু সুবিধের বলে মনে হচ্ছে না আমার!” তার পর কী যেন ভাবতে ভাবতে তিথি বলে ওঠে, “আবার এমনও তো হতে পারে, তুই যা ভাবছিস তা নয়।”          

এত ভাবাভাবির শেষে যে ওর কপালে এই আছে, তাই কি ছাই ঊর্মি ভেবেছিল? বাবা-মার এক মাত্র মেয়ে ও। কোনও অভাব নেই। ধ্রুবর সম্বন্ধটা নিয়ে এসেছিল ফুলকিমাসি। ধ্রুবর বাবা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। বদলির চাকরি। ধ্রুবর মা ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেছেন বছর দশেক হল। ধ্রুবর বাবা মারা যাওয়ার কিছু দিন পরেই মাসিদের পাড়ায় দু’বছর আগে ফ্ল্যাট কিনে উঠে এসেছিল ধ্রুব। ওখান থেকে ওর অফিসটা অনেক কাছে হয়। ভদ্র ছেলে, ভাল চাকরি। কখনও কোন খারাপ কিছু শোনা যায়নি ওর নামে! পিছুটানহীন ছেলেটার থাকার মধ্যে আছে এক বিধবা পিসি আর পিসতুতো ভাই। কোনও নেশাটেশাও নেই, এমনকি সিগারেট পর্যন্ত নয়। এমন হীরের টুকরো ছেলের সংসারের হাল ধরার জন্যে ঊর্মির চেয়ে এমন হাল ফ্যাশনের লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে আর কি পাওয়া যাবে? এ যে একেবারে রাজযোটক! বিয়ের সমস্ত ব্যবস্থা ফুলকিমাসিই করেছিল। মাসি মায়ের দূরসম্পর্কের বোন। ঊর্মির বাবা কলকাতায় একটা ভাল অফার পেয়ে শ্রীরামপুর ছেড়ে বেহালায় ফ্ল্যাট কিনে চলে আসার পরে ফুলকিমাসি খুব খুশি হয়েছিল। একটা মাত্র মেয়ে ঊর্মি, বাবা-মার অবশ্য তেমন কোনও তাড়া ছিল না। কলেজের পাট চুকোতে না চুকোতেই ঘটকালিতে সিদ্ধহস্ত ফুলকিমাসির তাড়নাতেই এই সিদ্ধান্ত। 

“আমি বলছি শোন, এমন ছেলে আর মাথা খুঁড়লেও পাবি না। পড়াশুনো বিয়ের পরে আবার করবি। সার সত্যটা বুঝে নে। তোর সংসার। তুই সব। কেউ নেই মাথার ওপরে।”             

সত্যি বলতে কী, ছেলেটাকে দেখে খারাপ লাগেনি ঊর্মির। লম্বা, ঋজু, শ্যামলা। মাথায় ঝাঁকড়া চুল। বেশ একটা ভরসাযোগ্য চেহারা। এমনিতেও সুজয়ের সঙ্গে প্রেমে ব্রেক আপ হয়ে যাওয়ার পরে ঊর্মি খুব ভেঙে পড়েছিল। সেই ভোকাট্টা ঘুড়ির টালমাটাল অবস্থায় ধ্রুবকে দেখে খড়কুটো নয়, রীতিমত শক্তপোক্ত স্টিমার বলেই মনে হয়েছিল ওর। তার পর তো কিছু দিন মাঝে মাঝেই ফোন, রেস্তরাঁয় গল্পের অবসর। সুজয়ের কথাও ঢাক পিটিয়ে ধ্রুবকে জানিয়েছিল ঊর্মি। ও কোনও রকম রাখঢাক রাখতে চায়নি ওদের সম্পর্কের মাঝে। ধ্রুব কিন্তু নিজের সম্বন্ধে সে রকম কিছুই বলেনি। একটু চাপা ছেলে, গল্প করতে বসলে একা ঊর্মিই বকে যেত, ধ্রুব খালি চুপচাপ শুনে যেত।      

বিয়ের পরে কেমন একটা বেশ সংসার-সংসার খেলায় মেতে উঠেছিল ঊর্মি। শৈশবের সেই খেলনাবাটির উচ্ছ্বাস এই নতুন খেলাঘরে আবার নতুন করে খুঁজে পেয়েছিল ও। ছড়ানোছিটানো ধ্রুব আর ওর অগোছালো ঘরদোর ঊর্মির দরদি হাতের ছোঁয়ায় বেশ সাজিয়েগুছিয়ে উঠেছিল। ধ্রুব আর ওর ভাল লাগা, পছন্দ-অপছন্দ মিলিয়ে ঘর সাজিয়ে তুলেছিল ঊর্মি। পর পর মানানসই পর্দা, সোফাসেট, সঙ্গে টিপটপ কুশন। টেবলটপ ল্যাম্প শেড। ব্যালকনিতে হ্যাঙ্গিং পটে সবুজের প্রশান্তি। ডিনার টেবলের বিলাসিতা। কিচেনের পাশে শৌখিন কি-চেন হোল্ডার। কাটাকুটির কাটলারি সেট। ধ্রুবর পছন্দের খাবারের লিস্ট অনুযায়ী অনুকরণ-উপকরণের ঢল।  

আজ কিন্তু সকালে ধ্রুবর পছন্দের চিজ় স্যান্ডউইচ আর দুপুরে টিফিনে দই, চাটনি সহযোগে মেথি পরোটার পরে রাতের জন্য ঊর্মির আর কিছুই করতে ইচ্ছে করেনি। স্রেফ মাছের ঝোল আর ভাত। ক্লান্ত রাতে খেতে বসে ধ্রুব তাই আজ একটু অবাকই হয়েছিল। কিন্তু নিজে আজ সারা দিন খাবি খাওয়ার পরে আর খাওয়ার চিন্তা করার মানসিকতা ছিল না ঊর্মির। এমনকি অস্থির হয়ে দুপুরে ফুলকিমাসিকেও এক বার ফোন করে বসেছিল ঊর্মি, “এত যে ভাল ছেলে বলেছিলে, সে রাতে ঘুমের ঘোরে অন্য মেয়ের নাম আওড়ায় কেন?” ফুলকিমাসির উত্তরের আর প্রতীক্ষা করেনি ঊর্মি। ফোনটা রেখে দিয়েছিল। মা-বাবাকেও ফোন করে আপডেট করার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু তিথির কথামতো আগে ধ্রুবকে জিজ্ঞেস করে তার পর বাবা-মার কাছে যাওয়ার ডেটটা ফিক্স করবে ভেবেই নিয়েছিল ঊর্মি!          

আজকের রাতটা ছিল আদ্যন্ত রোম্যান্টিক। ঠিক ওদের ফ্ল্যাটের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ছাতার মতো ঝাঁকড়া ছাতিম গাছটায় ঝেঁপে ফুল এসেছে। অদ্ভুত এক মাতাল করা গন্ধে ভেসে যাচ্ছিল ঘর। ছাতিমগাছের থোকা থোকা পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে এক ফালি চাঁদ। অথচ সব কেমন যেন অ্যান্টি রোম্যান্টিক বলে মনে হচ্ছিল ঊর্মির!  

জল টলমল শাওনের মেঘঝুরি মন নিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়া শীতল ঊর্মিকে কাছে টানতে গিয়েই আজ ছ্যাঁকা খেল ধ্রুব। “বুঁচকিটা কে?”

“বুঁচকি!” ধ্রুব যেন আকাশ থেকে পড়ল!     

“হ্যাঁ, বুঁচকি! ঘুমের ঘোরে যার নাম জপ করো তুমি!” ঊর্মি কঠিন গলায় প্রশ্ন করে সরাসরি।

ধ্রুব কিছু না বুঝে বোকার মতো চেয়ে থাকে উর্মির দিকে। তার পর বলে, “আমি ঘুমের ঘোরে বুঁচকি নামটা বলেছি?”  

“তা নয়তো কী? আমি কি আর বানিয়ে বলছি? কাল রাতেই বুঁচকি বুঁচকি বলে দু’বার চিৎকার করে উঠেছিলে তুমি,” ঊর্মির গলার পারদ চড়ে।

“কী অদ্ভুত, জানো ঊর্মি!” ধ্রুব আলো-অন্ধকারের মধ্যে শব্দ খুঁজতে থাকে। “নামটা শুনে আজ আমার হঠাৎ ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেল!” ধ্রুবকে থামিয়ে দিয়ে অন্ধকারের প্রশ্রয়ে প্রশ্নেরা ঝাঁঝিয়ে ওঠে, “আর হেঁয়ালি করতে হবে না। সে কে? আগে তাই বলো।”    

“বুঁচকি একটি ছোট্ট মেয়ে! অবশ্য এত দিনে সে তোমার বয়সি হয়ে গিয়েছে! মানুষের অবচেতন কী অদ্ভুত বস্তু মাইরি, এত দিন বাদেও নামটা আমার মনের মধ্যে ফসিলের মতো সিলড হয়ে ছিল!” নিজেও বেশ অবাক হয়ে গিয়েছে ধ্রুব। “এই এত এত দিন বাদে কাল রাতে হঠাৎ বুঁচকিকে স্বপ্নে দেখলাম, জানো। ফর্সা টুকটুকে এক পরি যেন। পাড়ার মোড়ে পড়ে গেছে, কাঁদছে। আমি হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছি। তার পর ...তার পর আর কিছু মনে নেই। জানো ঊর্মি, বুঁচকি আমাদের পাড়ায় থাকত। আমি তখন ক্লাস ফাইভ। আর ও ক্লাস ওয়ান। ভারী মিষ্টি ছিল মেয়েটা। এক দিন স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তার মোড়ে আমার সাইকেলের ধাক্কা লেগে পড়ে গিয়ে ওর হাতটা ভেঙেছিল। তার পর থেকেই ...কেন জানি না, বিকেলে সাইকেল নিয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম আমি, শুধুমাত্র  স্কুলফেরত বুঁচকিকে দেখব বলে! সেটা যে ঠিক কী ছিল— মায়া, সহানুভূতি, ভালবাসা নাকি নিছক ‘ইন’ হওয়া ইনফ্যাচুয়েশনটা আমি তখন বুঝিনি। তবে এটুকু জানি, সেই ছিল আমার প্রথম ক্রাশ। অবশ্য বেশি কিছু বোঝাবুঝির আগেই বাবা হঠাৎ বদলি হয়ে চলে গেলেন উত্তরবঙ্গে আমার প্রথম ক্রাশকে ক্রাশ করে। তার পরেও অবশ্য অনেক বার ওর কথা মনে হয়েছে, এখন সে কত বড়োটি হয়েছে, আগের মতোই মিষ্টি আছে নাকি আগের চেয়েও বেশি সুন্দর হয়েছে। নিষিদ্ধ আকর্ষণের মতো অনেক বার মনে হয়েছে একবার ওখানে যাই। কিন্তু তার পর মনে হয়েছে কী লাভ? ওরা যদি আর ওখানে না থাকে? কিংবা আমিই যদি ওকে আর চিনতে না পারি! হয়তো ওর বিয়েও হয়ে গিয়েছে।” ধ্রুব মোহিত হয়ে বলে যাচ্ছিল।      

“তুমি কি এখনও ওকে ভালবাসো?” ঠোঁটে তিরতিরে ঢেউ তুলে শব্দভেদী তির ছুড়ল ঊর্মি!

“আরে ধুর...” ঊর্মির কোমরে হাত রেখে ওকে কাছে টেনে নিয়ে ধ্রুব ওর খোলা চুলে বিলি কেটে দেয়। “সে হল গিয়ে ছেলেবেলার এক রূপকথার গল্পের না পড়া প্রথম অধ্যায়। সে গল্পের বইটা কোথায় হারিয়ে গিয়েছে! এখন আমার সামনে ঝকঝকে হার্ড কভারে বাঁধাই করা নতুন উপন্যাস!’’ ঊর্মির ছলছল চোখের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হয়ে ধ্রুব বলে, ‘‘তুমি কি এই সব ভেবে ভেবে আজ সারাটা দিন কেঁদেছ নাকি ঊর্মি?”       

ঊর্মির চোখে প্লাবন। ধ্রুবর বুকে লজ্জায় মুখ গুঁজে ভাবে, ফুলকিমাসির কাছে কী বলে ক্ষমা চাইবে এ বার?

“তোর এখনই ক্ষমা চাওয়া উচিত ফুলকির কাছে,” ফোনের ও পারে মায়ের গম্ভীর গলায় বিরক্তি ঝরে পড়ছে!

“সব ব্যাপারে তোর বেশি বাড়াবাড়ি। বাড়ির লোকটা বাড়ি ফিরুক, তার কাছে সব জেনে নিয়ে তবে সিদ্ধান্ত নে! তা না... আচ্ছা, মেয়েটার নাম কী বলেছিল রে ধ্রুব? বুঁচকি?” হঠাৎ মায়ের এই আউট অব কনটেক্সট প্রশ্নটা শুনে একটু যেন আউটই হয়ে গেল ঊর্মি!  

“হ্যাঁ, কিন্তু কেন বলো তো?” ঊর্মির গলায় বিস্ময়!  

“তোর নাকটা একটু বোঁচা ছিল বলে তোর দাদু ছোটবেলায় তোকে বুঁচকি বলে খেপাত। পাড়ার অনেকেই তোকে ওই ডাকনামেই জানতেন। নামটা শুনলেই তুই খুব খেপে যেতিস। পরে অবশ্য তোর দিদা আমায় সাবধান করেছিল, ‘ওরে, এই বুঁচকি নামটার সংস্কার না করলে কিন্তু ওই নামটাই থেকে যাবে।’ তার পর আমরা সেটাকে বদলে বুল্টি করে দিই। তুই যখন ক্লাস ওয়ানে পড়িস, স্কুল থেকে ফেরার পথে মোড়ের মাথায় পাড়ারই একটা স্কুলপড়ুয়া ছেলের সাইকেলের ধাক্কায় তোর বাঁ হাতটা ভাঙে। তখন আমরা শ্রীরামপুরে থাকতাম। তোর হয়তো এখন আর মনে নেই, থাকার কথাও নয়। কিন্তু... এক বার শুধু ধ্রুবকে জিজ্ঞেস করিস তো, তখন কি ওরা শ্রীরামপুরে থাকত?”      

জিজ্ঞেস করার আর দরকার নেই! কিছু দিন আগেই পুরনো অ্যালবামের পাতা উল্টোতে উল্টোতে ধ্রুবর ছবি দেখতে গিয়ে দেখেছে ঊর্মি, শ্রীরামপুর জুনিয়র হাই স্কুলের সামনে স্কুলের ট্রফি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বছর দশেকের চার-পাঁচটি ছেলে। তাদের মধ্যে একটি ওর ধ্রুব! ওর ‘জীবনের ধ্রুবতারা’!