• গৌতম চক্রবর্তী
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

মানুষই তাঁর কাছে একমাত্র ইভেন্ট

পুরস্কার বা তা নিয়ে বিশ্বজোড়া ছিছিক্কার নয়। কোনটা রাজনৈতিক ভাবে সঠিক, তার ধার ধারেননি কস্মিনকালেও। নোবেলজয়ী লেখক পিটার হান্টকে এই রকমই!

Peter Handke
বিতর্কিত: পিটার হান্টকে। ডান দিকে, তাঁর লেখা একটি নাটকের দৃশ্য। ছবি: গেটি ইমেজেস

Advertisement

তারুণ্যের প্রতিস্পর্ধায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এক বার লিখেছিলেন, ‘তিন জোড়া লাথির ঘায়ে রবীন্দ্র রচনাবলী লুটোয় পাপোশে।’ অস্ট্রিয়ার নোবেলজয়ী লেখক পিটার হান্টকেও তাঁর যৌবনবেলায় রেয়াত করেননি গুন্টার গ্রাস, হাইনরিশ বোল-এর মতো রথী-মহারথীদের।

বাংলা সাহিত্যে যেমন ‘কল্লোল’ থেকে ‘পরিচয়’, ‘কৃত্তিবাস’ ইত্যাদি বিভিন্ন লেখক গোষ্ঠী, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সে রকম এক জার্মান সাহিত্যগোষ্ঠী— ‘গ্রুপ ৪৭’। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলারের পতন, দারিদ্র ও জাতিদাঙ্গায় বিধ্বস্ত গোটা দেশ, অতঃপর সোভিয়েট রাশিয়া, আমেরিকার মিত্রশক্তি মিলেমিশে পুরো জার্মানিকে পূর্ব ও পশ্চিম দুই ভাগে ছিঁড়ে ফেলা— সব মিলিয়ে সে বড় সুখের সময় নয়। সেই সময়েই ‘ডের রুফ’ নামে এক কাগজ ঘিরে একত্রিত হলেন কয়েক জন তরুণ জার্মান লেখক। এঁরা অনেকেই স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হিটলারের বাহিনীতে ছিলেন। ‘গ্রুপ ৪৭’ কোনও সংহত, নিগূঢ় সাহিত্যগোষ্ঠী নয়। বছরে এক বার, অক্টোবর মাসে এঁরা মিলিত হন। যে কেউ চাইলেই আসতে পারেন না, বেছে বেছে কিছু উদীয়মান তরুণকে ডাকা হয়। তাঁরা নতুন কোনও লেখার পাণ্ডুলিপি পড়ে শোনান, শুরু হয় বাকিদের কাটাছেঁড়া। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এই সাহিত্যগোষ্ঠীটি রাজনীতি-সচেতন। নাৎসিবাদ ও যে কোনও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাঁরা।

ঠিক হল, সবচেয়ে ভাল পাণ্ডুলিপিকে এই গোষ্ঠী পুরস্কার দেবে, সেই লেখা তাদের খরচে ছাপা হবে। প্রথম পুরস্কার পেল গুন্টার গ্রাস নামে এক তরুণ। ‘টিন ড্রাম’ নামে এক উপন্যাস লিখেছে সে। কয়েক বছর পরে আর এক লেখক হাইনরিশ বোল পড়ে শোনাল তার ছোটগল্প। আরও, আরও পরে গুন্টার গ্রাস ও হাইনরিশ বোল দু’জনেই নোবেল সাহিত্য পুরস্কারে সম্মানিত হবেন, কিন্তু সে অন্য কাহিনি।

কুড়ি বছরে প্রজন্ম বদলে যায়, পাল্টে যায় তাদের চিন্তাভাবনা। গ্রাস, হাইনরিশ বোলরা যখন খ্যাতির মধ্যগগনে, ১৯৬৬ সালে অস্ট্রিয়ার বছর চব্বিশের তরুণ পিটার হান্টকে এই জ্যেষ্ঠতাতদের সামাজিক বাস্তবতাকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে লিখলেন, ‘আধুনিক জার্মান সাহিত্য আজ নির্বীর্য এবং রক্তাল্পতার রোগী।’ তরুণ হান্টকের মনে হয়েছিল, অনর্থক সমাজ-বাস্তবতা আউড়ে লাভ নেই। জার্মান ভাষার শব্দগুলোও নাৎসি এবং কমিউনিস্টদের ব্যবহারে শুয়োরের মাংস। ভাষা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

যেমন ভাবনা, তেমনই কাজ! তরুণ নাট্যকারের একটি নাটক তখন জার্মানিতে মঞ্চ মাতিয়েছে....দর্শককে আহত করা। ইংরেজি অনুবাদে ‘অফেন্ডিং দ্য অডিয়েন্স’। নাটকে কোনও সেট বা ধরাবাঁধা দৃশ্যপট নেই। পর্দা ওঠার আগে অন্তরালে মাইক্রোফোন ও সেট সাজানোর শব্দ, তার পর আলো জ্বলে। অতঃপর দৃশ্যপটবিহীন নিরাভরণ মঞ্চ, সারা থিয়েটার জুড়ে উজ্জ্বল আলো। অভিনেতা ও দর্শকরা একই রকম উজ্জ্বল। এ বার অনামা চার নারী-পুরুষ মঞ্চে আসে, তারা নিজেদের মধ্যে নানা কথা বলে, কখনও দর্শককে সেই সব কথার শরিক করে নেয়। ‘আপনরাই আজকের ইভেন্ট’, দর্শকদের উদ্দেশে বলে ওঠে এক জন। 

মানে, টিকিট কেটে দেখতে-আসা শো নয়, সাধারণ দর্শক নিজেই ‘ইভেন্ট’! এখানেই শেষ নয়। ওই চার জনের কেউ কেউ বলে, ‘এটা নাটক নয়, নাটকের ভূমিকা।’ আবেগ, প্লট সব কিছুর খোলস ছাড়িয়ে দৈনন্দিনতার ভাষার চাবি দিয়েই অস্তিত্বের গহনে পৌঁছতে চান নাট্যকার। এই নতুন নাট্যঘরানা তাঁর হাতেই তৈরি... স্পিচ ইন!

এখানেই নোবেলজয়ী লেখকের বৈশিষ্ট্য।  নাটকে কেউ বলে, ‘আমি বর্ণমালার অক্ষরের মতো ছিলাম।’ মানুষের জীবন যে রকম! প্রথমে মা-বাবা-চার পাশের সমাজ থেকে ভাষাশিক্ষা।  একটু বাদে তারা নিজেদের অগ্রগতির কথা জানায়, ‘এর পর মূল নিয়ম ও আনুষঙ্গিকগুলি শিখে ফেললাম।’ মানুষ ভাষা ও সামাজিক নিয়মকানুন দুটো একই ভাবে আত্মস্থ করে যে! অতঃপর সামাজিক জীবটি জানায়, সে মূর্খ বড়, ‘ক্লিশে ব্যাপারকেই এত দিন জীবন বলে ভুল করেছিলাম।’ ভাষা, সমাজ এবং জীবনকে প্রথম থেকেই এক সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন পিটার হান্টকে। অস্ট্রিয়ার দার্শনিক ভিটগেনস্টাইনের মতো তিনিও যেন শুরু থেকেই বলতে চান, ‘ভাষার সীমাবদ্ধতাতেই আমার জগতের সীমাবদ্ধতা।’

তাঁর বিভিন্ন নাটক ও উপন্যাসে ভাষার এই সীমাবদ্ধতার কথাই বারংবার বলে এসেছেন হান্টকে। ষাটের দশকে লেখা ‘কাসপার’ নাটকে নুরেমবার্গের রাস্তায় কাসপার নামে এক বালক। সে কথা বলতে পারে না, ভাষা-টাষা বোঝে না, আস্তে আস্তে হয়ে ওঠে সমাজবিজ্ঞানী ও ডাক্তারদের আগ্রহের বস্তু। কাসপারকে সমাজ ভাষা শেখায়, শেখায় যুক্তিবাদ। ভাষার মধ্যেই তো আছে প্রবল প্রতাপান্বিত এক যুক্তিশৃঙ্খলা। আর, ভাষা ও যুক্তির সেই দোর্দণ্ড চাপে কাসপার ক্রমশ মূক হয়ে যায়। ভাষার একবগ্গা বাক্যবিন্যাস আসলে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য চেপে রাখার জন্য আধিপত্যকামী এক অত্যাচার—এটাই হান্টকের বক্তব্য। স্পিচ-ইন নয়, নাট্যকার এটিকে ‘স্পিচ-টর্চার’ বা ‘ভাষার অত্যাচার’ নামে অভিহিত করেছিলেন।

সেই ভাষাচিন্তকের নোবেল সম্মান নিয়েই এ বার দুনিয়া উত্তাল। উত্তাল তাঁকে আক্রমণ করায়। নাটক বা লেখালিখি নিয়ে নয়, হান্টকের রাজনীতি নিয়েই মুখর এই দুনিয়া।

এই ধিক্কারমুখরতার কারণ, নব্বইয়ের দশকে সার্বিয়ার স্বৈরাচারী শাসক স্লোবোদান মিলোসেভিচ। তাঁর আমলেই জাতিদাঙ্গায় বসনিয়া ও সার্বিয়া টুকরো হয়ে যায়, আট হাজার মুসলমানকে কোতল করা হয়। পরে হেগ শহরের আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার অপরাধে মিলোসেভিচের বিচার চলে, বিচারাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর।

এই স্বৈরাচারী শাসককেই সব সময় সমর্থন করে গিয়েছেন হান্টকে। সকলের বিরোধিতা সত্ত্বেও, ২০০৬ সালে মিলোসেভিচের শেষকৃত্যে হাজির ছিলেন তিনি। আর সেটাই অপরাধ! মাঝে এক বার ঠিক হয়েছিল, জার্মানির খ্যাতনামা হাইনরিশ হাইনে সম্মানে সম্মানিত হবেন হান্টকে। কিন্তু সেই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ‘রাজনৈতিক ভাবে সঠিক’ লোকেদের প্রতিবাদী চিৎকার, বিরক্ত হয়ে পুরস্কারটা নিলেন না হান্টকে। সাহিত্য এখানেই শাঁখের করাত। লেখকের সাহিত্যকর্ম নিয়ে এই দুনিয়ায় লোকে কথা বলে না। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই শুরু হয়ে যায় ছিছিক্কার।

আর, লেখককে সব সময় তথাকথিত প্রগতিশীলতার শিবিরে বিচরণ করতে হবে, এই ফতোয়াই বা কে দিয়েছে? ‘বিয়িং অ্যান্ড টাইম’-এর লেখক, জার্মান দার্শনিক মার্টিন হেইডেগার হিটলারের নাৎসি পার্টির সমর্থক এবং ঘোরতর ইহুদিবিদ্বেষী ছিলেন। ফরাসি লেখক লুই ফার্দিনান্দ সেলিন হিটলারের ঘোর সমর্থক। ‘ফ্যাসিস্টরাই মানুষের প্রকৃত বন্ধু’ ইত্যাদি নানা কথা লিখেছিলেন। কিন্তু সেলিন, হেনরি মিলার না পড়লে আধুনিক সাহিত্যের এক বিশাল ভূখণ্ড রয়ে যায় অনাবিষ্কৃত। হিটলার ভাগনারের সঙ্গীত শুনতে ভালবাসতেন, ভাগনারের চিন্তায় খাঁটি জার্মান জাতির আভাস পেয়েছিলেন বলে তাঁর অপেরাগুলি কি আজ বিসর্জন দিতে হবে? শিল্প, সাহিত্যের সঙ্গে ‘পলিটিকাল কারেক্টনেস’-এর সম্বন্ধ কোনও দিন ছিল না, আজও নেই।

গোলমালটা পাকিয়েছে নোবেল কমিটি নিজে। এমনিতে এক সেক্স-স্ক্যান্ডালের কারণে গত বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়নি। আর এ বার পুরস্কারের ক’দিন আগে নোবেল কমিটি জানিয়েছিল, ‘পুরুষকেন্দ্রিক’ ও ‘ইউরোপকেন্দ্রিক’ মানসিকতা থেকে সরে আসবে এ বারের পুরস্কার। তার পর আচমকা পোলিশ লেখিকা ওলগা তোকারচুক ও অস্ট্রিয়ার পিটার হান্টকে-কে পুরস্কার। দু’জনেই পূর্ব ইউরোপের মানুষ। নোবেল কমিটির ভাষাচিন্তায় পূর্ব ইউরোপকে পুরস্কার মানেই  যেন ইউরোপকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে আসা!

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক অভিজিৎ গুপ্তের মতে, প্রথম গোল পাকিয়েছে ওই নোবেল-ঘোষণা। অতঃপর মিলোসেভিচের সমর্থনে হান্টকের দাঁড়ানোর স্মৃতি। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকৃতি উড়িয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী নন অভিজিৎবাবু, ‘‘পুরস্কারটা ঠিকই আছে। কিন্তু এক দিকে মিলোসেভিচের স্মৃতি, অন্য দিকে সারা পৃথিবী জুড়ে ট্রাম্প, পুতিন, এরদোয়ানের প্রতিক্রিয়াশীল রমরমা...সময়টা ভুল।’’ নাট্যপরিচালক বিভাস চক্রবর্তীও হান্টকের সমর্থনে: ‘‘ধরে নিচ্ছি, মিলোসেভিচের সমর্থনে কথা বলে উনি ভুল করেছিলেন। কিন্তু বাকিদের বুঝতে হবে, আমার ভুল করারও অধিকার আছে।’’

প্রগতিশীলদের প্রধান দুর্বলতা এখানেই। তাঁরা যেটাকে ভুল ভাবেন, সেটাই ভুল। হান্টকে অবশ্য কোনও ভুল স্বীকার করেননি। সে প্রশ্ন আসেও না। তিনি সংশয়ী। মিলোসেভিচের শেষকৃত্যে তিনি প্রথম বাক্যটাই বলেছিলেন, ‘‘সত্য কী জানি না।’’ সত্য নিয়ে সংশয় পলিটিকাল কারেক্টবাদীদের থাকে না। তাঁদের ধারণা, তাঁরা যা ভাবেন, সেটাই সত্য।

ওই প্রথম বাক্যের পর হান্টকে আরও বলেছিলেন, ‘‘কিন্তু আমি দেখি, শুনি, অনুভব করি, স্মৃতির ঝাঁপি খুলি। সেই কারণেই আজ যুগোস্লাভিয়ার কাছে, সার্বিয়ার কাছে, মিলেসোভিচের কাছে এসেছি।’’ মুসলিমদের গণহত্যা? হান্টকে সে সময় লিখেছিলেন, সকলেই অত্যাচার করার জন্য নাৎসিদের মতো বন্দিশিবির খুলেছিল। বাকিরা রে-রে করে উঠে প্রতিবাদ জানিয়েছিল, বাজে কথা। মুসলিমরা যদি দুটি বন্দিশিবির খোলে, সার্বরা খুলেছিল দুশোটা। পৃথিবী বুঝল না, বিপক্ষের ওপর অত্যচারের জন্য দুটো শিবির খোলা যেমন অপরাধ, দুশোটাও তাই। তারা বন্দিশিবির শব্দটিকে গুরুত্ব না দিয়ে তার সঙ্গে সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু ইত্যাদি অনুষঙ্গ ভেবে ফেলল। বিতর্ক এতটাই যে সম্প্রতি নোবেল কমিটিকে বিবৃতি দিয়ে জানাতে হল, হান্টকে রাজনৈতিক ভাবে বেফাঁস, প্ররোচনামূলক কথাবার্তা বলেন ঠিকই। কিন্তু নাগরিক সমাজে আক্রমণ বা হিংসা ছড়ানোর মতো লেখা আজ অবধি লেখেননি।

নাগরিক সমাজে আক্রমণ? হান্টকের মা ছিলেন স্লোভেনীয়। বাবা জার্মান সৈন্য। মা আত্মহত্যা করেছিলেন। হান্টকের ‘স্বপ্নের ও পারে দুঃখ’ বা ‘সরো বিয়ন্ড ড্রিমস’ উপন্যাসে এসেছিল মায়ের সেই আত্মহত্যার কথা। কামুর মতো ‘মা গত কাল মারা গিয়েছেন, বা তার আগের দিন’ নয়। তিনি এখানে লেখেন, মা কেমন ভাবে জামাকাপড় গুছিয়ে রাখলেন, তার পর আস্তে আস্তে শুয়ে পড়লেন। কোনও আবেগ ছাড়াই চরিত্রদের চিরে চিরে দেখাতে চান তিনি, মায়ের আত্মহত্যাও ব্যতিক্রম নয়।

ওই জন্যই তাঁর নাটকে দর্শকদের বলা হয়, আজকের ইভেন্ট আপনারাই! মৃত্যু, রাজনীতি, পলিটিকাল কারেক্টনেস-এর ধিক্কার, ভাষার আধিপত্য— কোনও কিছুতেই এই লেখকের কিছু যায় আসে না। মানুষই তাঁর কাছে এক এবং একমাত্র ঘটনা— ইভেন্ট!

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন