ও পারে মুক্তিযুদ্ধ,  এ পারে উদ্বাস্তু স্রোত। ১৯৭১। শিকড়-ছেঁড়া লাখ লাখ মানুষ অস্থায়ী শিবিরে আক্রান্ত হতে লাগল কলেরায়। ক্রমশ মহামারি। বনগাঁ সীমান্ত জুড়ে পথেঘাটে মানুষের লাশ। শিবিরগুলোতে বমি-দাস্তের স্রোত। ভয়ঙ্কর সেই মৃত্যুমিছিলে ত্রাতা হয়ে এলেন বছর সাঁইত্রিশের এক বাঙালি চিকিৎসক, দিলীপ মহলানবিশ। আক্রান্তদের মধ্যে প্রয়োগ করলেন ওআরএস। সাড়া পেলেন ম্যাজিকের মতো। দ্রুত নামিয়ে আনা গেল মৃত্যুর হার। পাশাপাশি সংক্রমণ রুখতে চলল ওষুধ। ’৭১-এর ২৪ জুন থেকে ৩০ অগস্ট, বনগাঁ সীমান্তের শিবিরগুলোয় কলেরার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে আবিশ্ব পৌঁছে দিলেন ওআরএস প্রয়োগের ইতিহাসকে।

কলেরা বা ডায়রিয়ার চিকিৎসায় রিহাইড্রেশনের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই সব রোগে রক্ত থেকে নুন ও জল বেরিয়ে গিয়ে দ্রুত রক্তচাপ নামিয়ে দেয়। রিহাইড্রেশনের প্রয়োগ ছিল মূলত ইন্ট্রাভেনাস, সুচ ফুটিয়ে স্যালাইন দেওয়া। পানীয়ের মাধ্যমে তা চালু করার বিষয়ে গবেষণা শুরু হয় গত শতকের চল্লিশের দশকে। ১৯৬৪ সালে  মার্কিন সেনাবাহিনীর চিকিৎসক ক্যাপ্টেন বব ফিলিপস দু’জন কলেরা রোগীর ওপর ওআরএস প্রয়োগ করেন। কিন্তু এত মানুষের মধ্যে এর সফল প্রয়োগ ও প্রসার ঘটল এ বঙ্গের বনগাঁর মতো প্রান্ত থেকে।

৮৫ বছর বয়সেও সেই স্মৃতি  অমলিন দিলীপবাবুর। ‘‘ক্যাম্প ভর্তি রোগী। মাটিতে শুধু মল আর ফ্লুয়িড। জুতো পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছে। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে ইন্ট্রাভেনাস পুশ করে যাচ্ছি। পাল্লা দিয়ে রুগি বাড়ছিল। একটা সময়ে জোগান তলানিতে এসে ঠেকল। তখন আমাদের সেকেন্ড পলিসি নিতেই হল। যদি বাঁচানো যায় এক জনকেও! পানীয় হিসেবে প্রয়োগ করতে শুরু করলাম সলিউশন। সরকারি মেডিকেল টিমের অনেকে বাধা দিচ্ছিলেন। আপত্তির কারণ, তখনও স্বীকৃতির ছাপ পড়েনি ওআরএস-এর ওপর। ঝুঁকিটা নিয়েছিলাম।’’

এক লিটার জলে ২২ গ্রাম গ্লুকোজ় বা চিনি, ৩.৫ গ্রাম নুন বা সোডিয়াম ক্লোরাইড আর ২.৫ গ্রাম সোডিয়াম বাইকার্বোনেট বা বেকিং সোডা। মিশ্রণ তৈরি  করে খাওয়ানো শুরু হল। সাড়া পেলেন অচিরেই। মুমূর্ষু রোগীরা চোখ মেললেন। কিন্তু আরও ওআরএস চাই। দিলীপবাবু নিজে গাড়ি চালিয়ে চলে এলেন বড়বাজার। কেনা হল বস্তা বস্তা নুন, চিনি, সোডা। গাড়ি ছুটল বনগাঁ। ১৬ লিটারের ড্রামে তৈরি হল সলিউশন। টানা আট সপ্তাহ। মড়ককে পরাস্ত করে এল জয়। আর আই ভি-র (ইন্ট্রাভেনাস) পরিবর্ত হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃতি পেল ওআরএস।

১৯৫৮ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ডাক্তারি পাশ করে সেখানেই শিশু বিভাগে ইনটার্নশিপ শুরু করেন দিলীপবাবু। ১৯৬০-এ লন্ডনে চালু হল ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস, প্রচুর ডাক্তারের চাহিদা তখন সেখানে। আবেদন করলেন, সুযোগও এল। লন্ডনে ডিসিএইচ করলেন, এডিনবরা থেকে এমআরসিপি। কুইন এলিজ়াবেথ হসপিটাল ফর চিল্ড্রেন-এ রেজিস্ট্রার পদে যখন যোগ দিলেন এই বাঙালি ডাক্তার, তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৮। এই পদে তিনিই প্রথম ভারতীয়। পরে আমেরিকায় জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির মেডিকেল কেয়ার ফেলো পদে যোগ দিলেন। তখন এই প্রতিষ্ঠানের একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্র ছিল বেলেঘাটার আই ডি হাসপাতালে। কলেরা আক্রান্তদের চিকিৎসা হত এখানে। ১৯৬৪-তে দেশে ফিরে যোগ দিলেন সেখানে। এখানেই শুরু করেন ওআরএস ও স্পেশাল মেটাবলিক স্টাডি নিয়ে কাজ। হাতে-কলমে সাফল্য পাচ্ছিলেন, কিন্তু গবেষণাপত্র বার করা হয়ে ওঠেনি। তার পরেই ’৭১-এর ওই ঘটনা। জনা আটেক পরিচিত সাহসী ছেলে নিয়ে ছুটলেন বনগাঁ সীমান্তে। সঙ্গীরা  সাধারণ মানুষ।

দু’মাস অক্লান্ত কাজে সাফল্য এল। বিশদ তথ্য দিয়ে পেপার লিখলেন এ বার। ১৯৭৩-এ জন হপকিনস মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত হল তা। বিখ্যাত ‘ল্যান্সেট’ পত্রিকা স্বীকৃতি দিল সেই  প্রকাশনাকে। খবর ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফ সসম্মানে ডেকে নিল তাঁকে। ১৯৮০-র মধ্যপর্ব থেকে ১৯৯০-এর প্রথম পর্ব পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডায়রিয়া ডিজ়িজ় কন্ট্রোল প্রোগ্রাম-এর মেডিক্যাল অফিসার  নিযুক্ত হলেন তিনি। ১৯৯০-এ বাংলাদেশে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়ারিয়াল ডিজ়িজ় রিসার্চ-এর ক্লিনিক্যাল সায়েন্সের ডিরেক্টর ছিলেন। ১৯৯৪-এ রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স-এর সদস্য নির্বাচিত হন। যুক্ত ছিলেন পার্ক সার্কাসে ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ-এও। পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মান।

১৯৯১ সালে সল্টলেকের বাড়িতে তৈরি করেন ‘সোসাইটি ফর অ্যাপ্লায়েড স্টাডিজ়’। বায়োমেডিক্যাল ও হেলথ রিসার্চ ক্ষেত্রে অগ্রণী এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তবু দিলীপবাবুর আফসোস, ‘‘ডাক্তারি পাশ করা ছেলেমেয়েদের হাতেকলমে গবেষণা, ফিল্ডওয়ার্ক শেখানোর জন্য এই উদ্যোগ। অথচ সরকারি সহযোগিতা আর ছাত্রছাত্রী, দুয়েরই অভাবে  ধুঁকছে আমার সোসাইটি।’’

জন্মেছিলেন অবিভক্ত বাংলার কিশোরগঞ্জে। দেশভাগের সময় এ বঙ্গে চলে আসেন— প্রথমে বরাহনগর, পরে শ্রীরামপুর। এখনও সক্রিয় চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণায়।

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও। সাবস্ক্রাইব করুনআমাদেরYouTube Channel - এ।