সাম্যব্রত খেয়াল করলেন, দরিয়ার শরীরে ব্লাড চালানো শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন একটি স্যালাইন চলছে। ছেলেটি অ্যাম্বুল্যান্সের পাশে ট্রলি রেখে বলল, “ডেরাইভার কোথায়?”

“বুঝতে পারছি না,” বলে এ দিক-ও দিক দেখছেন সাম্যব্রত।

“এটা তো রাজুদার গাড়ি,” বলল ওয়ার্ড বয়, “চলে আসবে। আপনি চিন্তা করবেন না।” তার পরে ট্রলি রেখে দিয়ে চলে গেল। 

সাম্যব্রত চেঁচিয়ে বললেন, “ভাই, পেশেন্টকে গাড়িতে তুলে দিয়ে যাও।”

“রাজুদা তুলে দেবে,” ঘুরেও দেখল না ওয়ার্ড বয়। সাম্যব্রত ঘাবড়ে গিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। দরিয়ার চোখ বন্ধ। ভুরু কুঁচকে রয়েছে, দাঁতে দাঁত চাপা, চোয়াল শক্ত। সাম্যব্রত বললেন, “কী রে, কষ্ট হচ্ছে?”

চোখ খুলল দরিয়া। নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল, “সেই ব্যথাটা ফিরে এসেছে। আমি আর পারছি না বাবা! এইখানে সবার সামনে চেঁচালে খুব খারাপ হবে। তুমি প্লিজ় কিছু করো।”

‘কিছু করো’ বলার সময়ে দরিয়ার কথা জড়িয়ে গেল। নাক আর মুখ চেপে, নাভির থেকে উঠে আসা চিৎকার দমন করেছে সে। পরের বার আর চিৎকার চাপতে পারবে বলে মনে হয় না। সাম্যব্রত উত্তেজিত হয়ে সিগারেট ধরালেন। রাজু গেল কোথায়?

ভাবতে না ভাবতেই সাম্যব্রত দেখলেন, হাসপাতালের পিছনের ফটক দিয়ে রাজু ভিতরে ঢুকছে। দু’হাত ভর্তি অজস্র পতাকা। পতাকার বান্ডিল সাম্যব্রতর হাতে ধরিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সের পিছনের দরজা খুলে রাজু ট্রলিটা এমন ভাবে রাখল যে দরিয়া নিজেই টুক করে ঢুকে গেল। ট্রলি ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের সামনে রেখে ফিরে এসেছে রাজু। সামনের দরজা খুলে চালকের আসনে বসে পাশের সিট থাবড়ে সাম্যব্রতকে গান শুনিয়ে দিল, “দিয়ে জ্বলতে হ্যায়, ফুল খিলতে হ্যায়, বড়ি মুশকিল সে মগর দুনিয়া মে দোস্ত মিলতে হ্যায়।” তার পর বলল, “এখানে বসুন বন্ধু। যাওয়ার পথে অনেক কাজ আছে।”

সাম্যব্রত কথা না বাড়িয়ে রাজুর পাশে বসলেন। রাজু অ্যাম্বুলেন্স স্টার্ট দিল।

রাস্তায় পড়ে ডান দিকে ঘুরেছে গাড়ি। গাড়ির মাথায় নীল বিকন জ্বলছে। বাজছে হুটার। কিছুটা যাওয়ার পরেই চলে এল ফোরশোর রোড। এই রাস্তা দিয়ে গেলেই দ্বিতীয় হুগলি সেতুর টোল প্লাজ়া।

রাজু বলল, “রাস্তাঘাটের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। আর্মির জওয়ানরা টহল দিচ্ছে। তা সত্ত্বেও ক্যালাকেলি বন্ধ হচ্ছে না। হাওড়া আর শেয়ালদা থেকে কোনও ট্রেন ছাড়ছে না। কোনও ট্রেন ঢুকতেও পারছে না। বাস, ট্যাস্‌কি, রিস্‌কা – সব মায়ের ভোগে। আর্মির মালগুলো পাবলিক দেখলেই হ্যারাস করছে। এই অবস্থায় কাজ উদ্ধার করতে গেলে ভদ্দরলোক সেজে লাভ নেই। আমাদের ‘জেজেটিটি’ নিয়ম ফলো করতে হবে।”

“সেটা আবার কী?” জিজ্ঞেস করলেন সাম্যব্রত।

“যখন যেমন তখন তেমন। আমি রাস্তা থেকে কিশলয় পার্টি, খরাজ পার্টি আর গণতান্ত্রিক মোর্চার ফেল্যাগ জোগাড় করেছি। আপনি ওগুলো আলাদা করুন। তার পরে সিটের তলায় লুকিয়ে রাখুন। আর্মির জওয়ানের পাল্লায় পড়লে প্রেগন্যান্ট মাদার দেখিয়ে ছাড় পেয়ে যাব। কিন্তু পলিটিকাল 

পার্টি আজ কাউকে রেয়াত করছে না। যে দলকে সামনে দেখব, তার ঝান্ডা অ্যাম্বুল্যান্সের  জানালায় আটকে দেব।”

সাম্যব্রত নীরবে ঝাড়াই-বাছাইয়ের কাজ করতে লাগলেন। মিনিট তিনেকের মধ্যে গোছানো শেষ। রাজু বুদ্ধি করে সুতলি দড়িও নিয়ে এসেছে পতাকা বাঁধার জন্যে। 

কাজ চুকিয়ে দরিয়ার দিকে তাকালেন সাম্যব্রত। মেয়েটাকে দেখে কষ্ট হচ্ছে। একটা করে ব্যথার ঢেউ আসছে আর ও দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণা সামলানোর চেষ্টা করছে। মুখ ঘামে ভিজে গিয়েছে। চোখ বিস্ফারিত। অ্যাম্বুল্যান্সের বেডের হাতল এত জোরে চেপে ধরেছে যে আঙুলের গাঁট ফ্যাকাশে। পিছন দিকে হাত বাড়িয়ে দরিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে সাম্যব্রত বললেন, “আমরা প্রায় এসে গেছি।”

গোটা ফোরশোর রোডে কোনও মানুষ নেই। আর্মির সাঁজোয়া গাড়ি টহল দিচ্ছে। আকাশে উড়ছে বায়ুসেনার হেলিকপ্টার। পুলিশ ভ্যানও দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রতিটি মোড়ে। তারই মধ্যে দেখা যাচ্ছে রাস্তার ধারের ইলেকট্রনিক গুড্‌সের দোকানের শাটার বেঁকিয়ে উপরে তোলা হয়েছে। লুঠ করা হয়েছে মালপত্র। রাস্তায় পড়ে রয়েছে ভাঙা টিভি আর গেমিং কনসোল। পান-বিড়ির দোকান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। জ্বালানো হয়েছে পার্টি অফিস। পুড়ছে রাজনৈতিক পতাকা। 

অ্যাম্বুল্যান্স এখন টোল প্লাজ়ার সামনে। সব লেন ফাঁকা। পুলিশের প্রহরার মধ্যে টাকা দিয়ে কুপন সংগ্রহ করল রাজু। অ্যাম্বুল্যান্স প্রবল গতিতে উঠে গেল ব্রিজের উপরে। 

যাক! আর কোনও ভয় নেই। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে গাড়ি ঢুকে যাবে বেঙ্গল মেডিকাল কলেজে। ডক্টর সেন ফোন করে দিয়েছেন ওখানকার গাইনি বিভাগে। রেফারাল কার্ডে সব কথা লিখে দিয়েছেন। মেয়েকে ভর্তি করতে সমস্যা হবে না। এখন পৌনে পাঁচটা বাজে। আশা করা যায় সাতটার মধ্যে দরিয়ার সিজ়ারিয়ান সেকশান হয়ে যাবে।

গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন সাম্যব্রত। মেয়েকে বললেন, “এক বার বাইরে তাকিয়ে দেখ। এখান থেকে আমাদের হাওড়াকে কী সুন্দর দেখতে লাগে!”

দরিয়া কনুইয়ে ভর দিয়ে মাথা তুলল। তারা এখন অনেক উঁচুতে। এখান থেকে গঙ্গায় ভেসে থাকা দু’একটা ডিঙি নৌকোকে পুঁচকি দেখাচ্ছে। আজ কোনও লঞ্চ চলছে না। আকাশের রং গাঢ় নীল। তার ছায়া পড়েছে গঙ্গায়। চারিদিক কী শান্ত! কী সুন্দর! গোটা দুনিয়াটা যদি এই রকম হত!

ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ল দরিয়া। আর একটা ব্যথার ঢেউ আসছে!

চালকের আসনে বসা রাজু বলল, “দিদিমণি! আমরা ব্রিজ পেরিয়ে এলাম। নো ঝামেলা! আর এক মিনিট! একটু ম্যানেজ করুন!”

রাজুর কাঁধে হাত রেখে সাম্যব্রত বললেন, “গাড়ি আস্তে করো। সামনে খরাজ পার্টি রাস্তা অবরোধ করেছে। গাড়িটা সাজাতে সময় লাগবে।”

রাজু অ্যাম্বুল্যান্সের গতি কমিয়েছে। সাম্যব্রত দ্রুত হাতে সুতলি দড়ি দিয়ে দু’দিকের জানালায় পতাকা বেঁধে দিলেন। একটা অপেক্ষাকৃত বড় পতাকা হাতে নিয়ে জানলা দিয়ে বার করে চিৎকার করে উঠলেন, “লাল ঝান্ডা করে পুকার...”

দরিয়া চেঁচিয়ে বলল, “বাবা! কী হল তোমার? এখন পাগলামো করার সময় নয়।”

 

*****

বিহানের চটকা ভাঙল সুদামের কথায়। “চা যে জুড়িয়ে গেল। ভুরু কুঁচকে এত কী ভাবছ?”

লজ্জা পেয়ে ঘাড় নাড়ল বিহান। “কিছু না।” এক চুমুকে চা শেষ করে চায়ের দাম মিটিয়ে হাসপাতালে ঢুকল। অনুসন্ধান কেন্দ্রের কর্মচারীকে দরিয়ার নাম বলতে সে বলল, “সামনেই সার্জিকাল ওয়ার্ড। ওখানে গিয়ে আপনি ডক্টর ডলি সেনের সঙ্গে কথা বলুন।”

ডক্টর সেন সার্জারি ওয়ার্ডের বাইরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলছিলেন। বিহান তাঁর কাছে গিয়ে বলল, “নমস্কার ম্যাডাম। আমার স্ত্রী দরিয়া। আজ এখানে ডেলিভারির জন্য ভর্তি হয়েছে।”

দরিয়ার নাম শুনে ডক্টর সেন মোবাইল বন্ধ করে বললেন, “আপনি কিছু জানেন না?”

বিহান ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “আমি অনেক দূর থেকে আসছি। ফোনে যোগাযোগ করে উঠতে পারিনি।”

“এই সব গন্ডগোলের দিনে ফোনে যোগাযোগ না করে কেউ মুভ করে?” ডক্টর সেন বিরক্ত, “এনিওয়ে, আপনার বৌ যখন এখানে এসেছিল, তখন অবস্থা খারাপ ছিল। ওকে বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজে রেফার করা হয়েছে। আপনি ওখানে চলে যান।” ডক্টর সেন ব্যস্ত হয়ে ওয়ার্ডে ঢুকে গেলেন।

বিহানের মাথায় হাত। এত কিছু হয়ে গেল আর সে কিছুই জানল না? যাকগে! যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। এখনই সাম্যব্রতকে ফোন করতে হবে। 

ব্যাকপ্যাক থেকে মোবাইল বার করে বিহান দেখল, বিকেল সাড়ে পাঁচটা বাজে। সাম্যব্রতর নম্বরে ডায়াল করল সে। রিং হয়ে গেল। কেউ ফোন ধরল না। চিন্তিত মুখে রি-ডায়াল করল বিহান। 

অনেক ক্ষণ ধরে রিং হওয়ার পরে অচেনা একটি গলা ফোন ধরে বলল, “একটু পরে ফোন করুন।”

সাম্যব্রতর ফোন চুরি হয়ে গিয়েছে না কি? বিহান তড়বড় করে বলল, “যাঁর ফোন তাঁকে দিন। খুব জরুরি দরকার। আমি ওঁর জামাই বলছি।” কথাগুলো বলার সময়ে বিহান শুনতে পেল, ও দিক থেকে ভাষণের শব্দ আর স্লোগানের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। যে লোকটা ফোন ধরেছে, সে বলল, “বললাম তো! এখন উনি কথা বলতে পারবেন না। পরে ফোন করুন।”

বিহান চিৎকার করে বলল, “তা হলে ওঁর মেয়েকে ফোন দিন।” তার কথা শেষ হওয়ার আগেই ও দিকের লোকটা লাইন কেটে গিয়েছে। বিহান অবাক, বিরক্ত, চিন্তিত! সে সাম্যব্রতর নম্বরে রি-ডায়াল করতে গেল। কিন্তু সবুজ বোতাম টেপার আগেই দেখল মোবাইলে সনতের ফোন ঢুকছে। 

সাম্যব্রতর চোখে জল। চশমা খুলে চোখ মুছে বললেন, “মেরুদণ্ডটা অনেক কাল আগেই প্লাস্টিকের বানিয়ে ফেলেছি, মা! দীর্ঘ দিন আগে এক কবি বলেছিলেন, ‘চেতনাধারার ছাপ জীবনকে গড়ে না। জীবনধারার ছাপ চেতনাকে গড়ে।’ সেই বয়সে কথাটার মানে বুঝতে পারিনি। আজ পারছি।”

দরিয়া আঁচলে বাঁধা বিপত্তারিণী ঠাকুরের ফুল মুঠোয় নিল। অর্ধেক ফুল বাবার হাতে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “কবিতা-ফবিতা বুঝি না বাবা! প্লিজ় হাসপাতালে নিয়ে চলো। আর... পারছি... না!”

শুকনো ফুল হাতে নিয়ে সাম্যব্রত ঢোঁক গিললেন। চোয়াল শক্ত করে ফুলের পাপড়ি পাশঝোলায় ঢুকিয়ে রাখলেন। অ্যাম্বুল্যান্স ধীরগতিতে চলছে। অবরোধের সামনে এসে রাজু ব্রেক কষেছে। নিচু গলায় সাম্যব্রতকে বলল, “আপনি কথা বলুন।”

“তুমি আমার ফোনটা রাখো।” মোবাইল রাজুকে দিয়ে জ্বলজ্বলে চোখে গাড়ি থেকে নামলেন সাম্যব্রত। তাঁর কাঁধে খরাজ পার্টির পতাকা পতপত করে উড়ছে। 

পুলিশ ট্রেনিং স্কুল বা পিটিএস স্টপের সামনে, রাস্তার মাঝখানে শ’খানেক মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে। অনেকে রাস্তার মাঝখানে চটি বা খবরের কাগজ পেতে বসে আছে। এখানে রাস্তায় কোনও গাড়ি নেই। নেই কোনও যাত্রী। দু’একটা বাইক হুশহাশ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। সেগুলোর হ্যান্ডেলে খরাজ পার্টির ফ্ল্যাগ বাঁধা। অবরোধকারীদের মধ্যে বেশির ভাগই কমবয়সি চ্যাংড়া ছেলের দল। কপালে ফেট্টি বাঁধা, সারা মুখে খরাজ পার্টির পতাকার রঙের আবির লেপা রয়েছে। হাতে পতাকা, মুখে মদের গন্ধ। এদের সঙ্গে কথা বলে কোনও লাভ হবে না। এরা যুক্তি বোঝে না। এদের মধ্যে নেতাটি কে? তাকে খুঁজছেন সাম্যব্রত। 

লম্বাচওড়া একটি ছেলে এগিয়ে এসে হাত নেড়ে বলল, “ওয়াপস চলা যাইয়ে।”

গাড়িতে গর্ভবতী মেয়ে আছে, তার অবস্থা সঙ্কটজনক, তাকে ডাক্তার রেফার করেছে... এই সব কথা এখানে কেউ শুনবে না।

সাম্যব্রত ডিভাইডারে উঠে দাঁড়ালেন। চিৎকার করে বলছেন, “বন্ধুরা! আমি আসছি হাওড়া থেকে। সেখানে গণতান্ত্রিক মোর্চার ক্যাডাররা আমাদের মারতে এসেছিল। আমরা ছেড়ে কথা বলিনি। পাল্টা মার দিয়েছি। এলাকা ধরে ধরে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে খুঁজে বার করেছি শয়তানগুলোকে। তার পরে যা করার করেছি। আপনারা কি পেরেছেন, আমাদের মতো পাল্টা দিতে? না হাতে চুড়ি পরে বসে আছেন? কখন পুলিশ আর মিলিটারি আসবে সেই আশায়?”