• 1
  • আর্যভট্ট খান
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ডাইনির গ্রাম

ঝাড়খণ্ডের এক গ্রামে ৭ অগস্ট পাঁচ মহিলাকে ডাইনি সন্দেহে পিটিয়ে মারা হল। পুলিশ আসতে গ্রামের লোকেরা বলল, বেশ করেছি।

1
  • 1

ইঙ্গমার বেয়ারমান-এর ছবি ‘দ্য সেভেন্থ সিল’-এর দৃশ্য। ডাইনি সন্দেহে মেয়েটিকে পুড়িয়ে মারার আগে।
রা ত তখন দুটো। গোটা গ্রাম যখন ঘুমোয়, তখনই ওরা জেগে ওঠে। কয়েক জন গ্রামবাসী অমাবস্যার অন্ধকারে নাকি দেখতে পেয়েছিল পাঁচ ছায়ামূর্তিকে। সেই মহিলারা নগ্ন হয়ে গ্রামের এক সদ্যমৃত কিশোরের কবরের ওপর নাচছিল। মাঝেমধ্যে আবার হাত দিয়ে কবরের মাটি খুঁড়ে মুখে তুলছিল। মাঝরাতে ওইখানে গিয়ে ভাল করে দেখার সাহস হয়নি কারও। কিন্তু পরের দিন ফিসফিস করে ছড়িয়ে  গিয়েছিল খবরটা। ওরা ডাইনি না হয়ে যায় না।
রাঁচির মান্দার ব্লকের কাঞ্জিয়া মারাইটোলি গ্রামে গিয়েছিলাম। ক’দিন আগেই, ৭ অগস্ট, এখানে পাঁচ মহিলাকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। ‘ডাইনি সন্দেহে তাদের মেরে ফেলা হয়েছে’ বললেও ভুল হবে। এখানে লোকে ‘সন্দেহ’ করে না, একদম ‘বিশ্বাস’ করে। ওঝারা যেই বলে দেয়, অমুকের জন্যেই গ্রামে লোক মারা যাচ্ছে বা গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে সেটা ‘সত্যি’ হয়ে যায়, আর অনুমান বা সন্দেহ থাকে না। তাই, গ্রামবাসীদের অধিকাংশেরই মতে, ওই পাঁচ মহিলাকে পিটিয়ে মারতেই হত। উপায় ছিল না।
গ্রামের লোকের সঙ্গে কথা বলে ওই বিশ্বাসের খুঁটিনাটি সম্পর্কে যে কথাগুলো জানা গেল, তা এই রকম:
ডাইনি যদি অপকার করতে চায়, গা ছোঁয়ারও দরকার নেই, দূর থেকে থুতু ছুড়ে দিলেই হবে। যার দিকে থুতু ছুড়ল, কিছু ক্ষণের মধ্যেই তার জ্বর আসবে। অথবা পেটব্যথা শুরু হবে। মাথা ঘুরতেও পারে। তার পর আস্তে আস্তে মরে যাবে। তাই ওদের হাত থেকে বাঁচতে সবচেয়ে ভাল উপায়: দূর থেকে দেখলেই রাস্তা বদল করো। বা পিঠটান দাও।
দরজার সামনে বা বাড়ির পাঁচিলের পেছনের বারান্দায় কে ফেলে রাখে চুল? ওটা তো ডাইনির চুল। লম্বা এক গোছা চুল কারও বাড়ির সামনে পড়ে থাকা মানেই তো সেই বাড়ির সর্বনাশ হতে চলেছে! কেউ না কেউ অপঘাতে মারা যাবে। বা পাগল হয়ে যাবে। নিজের গ্রামের নামও ভুলে যেতে পারে। ওঝারও ক্ষমতা নেই সেই ভূত তাড়ানোর।

বাড়ির পেছনে যদি পর পর কয়েক দিন দেখা যায় মলমূত্র পড়ে রয়েছে, সাবধান। এর মানে ওই বাড়ির দিকে কুনজর পড়েছে ডাইনিদের। তখন বাড়ির পেছনে বিছুটি গাছের পাতা ফেলে রাখতে হবে।

কখনও কখনও জানলা দিয়ে উঁকি মেরে ওরা খরদৃষ্টিতে তাকায়। যদি চোখাচোখি হয়ে যায়, ব্যস। তাই যতই গরম লাগুক, সব সময় জানলা বন্ধ রাখতে হবে। এক বার গ্রামের এক জন প্রচণ্ড গরমে বারান্দায় মশারি টাঙিয়ে শুয়েছিল, ভোরবেলা উঠে দেখে, মশারিটা এক দিকে তোলা। মশারি তুলে কে তাকে ছুঁয়ে গিয়েছে? পর দিন সকালে ওঝার কাছে গিয়ে ঝাড়ফুঁক করে তবে রক্ষা।

বাড়ির পোষা মুরগি, গরু, শুয়োর, ছাগলের  দিকেও ওদের কুদৃষ্টি পড়ে। তাই তো গ্রামের শেষ প্রান্তের খোঁয়াড়ে থাকা শুয়োরগুলো কেমন ধুঁকতে শুরু করেছিল। গত বছর তো অজানা রোগে মারাই গেল কয়েকটা গরু।

মারাইটোলি গ্রামে দিকে দিকে রটে গিয়েছিল ডাইনিদের ভবিষ্যদ্বাণীর কথা। ওরা নাকি বলেছিল, সামনের সেপ্টেম্বর মাসের কর্মা পরবের আগে দুজন বাচ্চা মারা যাবে গ্রামে। কয়েক দিনের মধ্যেই ওদের পেটব্যথা শুরু হবে। চোখ হলুদ হয়ে যাবে। গা হাত পা হলুদ হয়ে যাবে। তার পর নিস্তেজ হয়ে যাবে ওরা। ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল। যেমন কিছু দিন আগেই আবার শরীর হলুদ হয়ে মারা গেল ষোলো বছরের এক কিশোর।

গ্রাম থেকে যত রাজ্যের অসুখ বিসুখ দুর্ঘটনা অঘটন দূর করতে, অশুভ দৃষ্টির কোপ থেকে বাঁচতে, গ্রামবাসীরা মিলে তাই পাঁচ ডাইনিকে পিটিয়ে খুন করে ফেলল। এই কাজটা সেরে ফেলার পর, তারা খুশির চোটে মৃতদেহগুলো ঘিরে স্থানীয় নাগপুরি গান শুনছিল। গ্রাম থেকে একটু দূরে ভিডিয়ো হলে নাগপুরি সিনেমা দেখারও পরিকল্পনা করছিল ওরা। যাক, এখন আর ভিডিয়ো হল থেকে সিনেমা দেখে আর এক গলা মহুয়া খেয়ে রাত করে গ্রামে ফিরলেও, কোনও ভয় নেই। গ্রামে ঢোকার মুখে ডুমুর গাছ থেকেই কেউ পিছু নেবে, সে সব হবে না।

তাই আনন্দের চোটে গ্রামে পুলিশকে পর্যন্ত কেউ ঢুকতে দিচ্ছিল না। শেষে যখন জোর করে পুলিশ ঢোকে, গোটা গ্রাম বীরদর্পে ঘোষণা করে, ‘যা করেছি বেশ করেছি। ভোরের আলো ফুটে গেল তাই। না হলে আরও তিন জন ডাইনিকে পিটিয়ে মারতাম!’

ডাইনি ছিল, ডাইনি আছে, গ্রামে ডাইনির অস্তিত্ব টের পেলেই তাকে পিটিয়ে অথবা গলা টিপে মেরে ফেলতে হবে— এটা ঝাড়খণ্ডের এখনও অনেক আদিবাসীরই বিশ্বাস। শুধু বৃদ্ধ অশিক্ষিত গ্রামবাসী নয়, অনেক স্কুল-কলেজে পড়া কিশোর-যুবকও এই কথা বিশ্বাস করে। পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে সবাই গণপিটুনিতে শামিল হয়। তাই পুলিশ যখন তদন্ত করেছিল, কারা এই গণহত্যা করেছে, মারাইটোলির অধিকাংশ বাসিন্দাই এসে জানায়, ‘আমি মেরেছি। আমাকে ধরুন।’ পুলিশ হতভম্ব।

শুক্রবার রাতে পাঁচ জন ডাইনিকে মারার পরে, সবাই নিশ্চিন্ত হল, শনিবার থেকে গ্রামে অন্য সকাল। এখন থেকে কারও কোনও শরীর খারাপ হবে না। বাচ্চা জন্মাবে, তার পর বড়ও হবে। কাশি সর্দির মতো ছোটখাটো অসুখও হবে না, এক দিন বুড়ো হয়ে যাবে। আদিবাসীদের কখনও অসুখ করে না। অসুখবিসুখ তো শহরের লোকেদের জন্য।

ওই গ্রামের এক কিশোর বলে, ‘যা বাঁচা বেঁচে গিয়েছি কী বলব! গত ক’দিন ধরে জ্বর চলছিল। সোয়েটার পরে থাকতে হচ্ছিল। বুক ধড়ফড় করছিল। কিছুই মনে রাখতে পারছিলাম না। শনিবার সকাল থেকে সোয়েটার খুলে ফেলেছি। বুক ধড়ফড়ানিও কম। ভুলে যাওয়া কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। শরীর এত চাঙ্গা, ফুটবলও খেলতে পারব।’

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আর এক কিশোরও বলল, ‘কয়েক বছরের মধ্যে আমার দাদা, মা, বাবা মারা গেল অজানা রোগে। আসলে কোনও রোগ নয়, ওরা মারা গিয়েছে ডাইনির ম্যাজিকে।’ সে এও বলল, যে পাঁচ জন ডাইনকে মারা হয়েছে, তাদের এক জন নাকি পরচুলা পরে থাকত। সেই পরচুলা থেকে এক একটা করে চুল তুলে, বিভিন্ন বাড়ির সামনে ফেলে রাখত, সর্বনাশ ডাকার জন্য। কিশোরটি হেসে বলল, ‘শেষে শুক্রবার রাতে বাগে পেয়ে যখন মনের সুখে চুলের মুঠি ধরে ওদের পেটানো হচ্ছিল, কী যে মজা লাগছিল!’ 

অনেকের সঙ্গে কথা বলে এও বুঝলাম, আদিবাসী গ্রামে বেশির ভাগ ‘ডাইনি’র জন্ম হয় প্রথমে তার স্বামীকে মেরে। অর্থাৎ, লোকটি মারা যায় আর হঠাৎই কেউ কেউ বলতে শুরু করে, মেয়েটাই তার মরদকে ‘খেয়েছে’। তার পর ডাইনির ‘শিকার’ হয় তার ছেলে বা মেয়ে বা নিকট আত্মীয়। ভাশুর বা দেওরের ছেলেমেয়েরাও রক্ষা পায় না। ঘরের সর্বনাশ করার পর সে বাইরে বের হয়। আসলে যে কোনও ধরনের অপ-আত্মা কোনও মহিলার শরীরে ঢুকে তাকে ডাইনি করে ফেলে। তার পর তো তাকে মারা ছাড়া আর কিছু করার নেই।

কিন্তু ডাইনির মৃত্যুও অত সহজ নয়। পিটিয়ে মেরে ফেলার পরেও কিছু কাজ বাকি থাকে। ২০০৪ সালে এই মারাইটোলির পাশের এক গ্রামের এক ডাইনি মারার পর ওঝারা বলেছিল, ওই ডাইনির মুন্ডু কেটে সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে পুরো গ্রাম ঘুরতে হবে। তবেই গ্রাম অভিশাপমুক্ত হবে। পুলিশকে লবডঙ্কা দেখিয়ে সে রকম করেই সাইকেলে মুন্ডু নিয়ে ঘোরা হয়েছিল। তার দু’বছর পরে একটা গ্রামে দুজন ডাইনিকে একসঙ্গে মারার পর ওঝারা বলেছিল, ওদের একসঙ্গে, এক জনের ওপর আর এক জনকে শুইয়ে, কবর দিতে হবে। মারার আগে নগ্ন করে দেওয়াটাও নিয়ম। মারাইটোলি গ্রামের পাঁচ জনকে মেরে ওই লাশ গ্রাম থেকে অনেক দূরে কবর দেওয়ার জন্য বলেছিল ওঝারা। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সম্ভব হয়নি। গ্রাম থেকে কিছুটা দূরেই তাদের কবর দেওয়া হয়। কখনও কখনও অবশ্য কোনও ডাইনিকে না মেরে, তাকে মানুষের মলমূত্র খাওয়ানোর বিধান দেয় ওঝারা। নগ্ন করে পাড়া ঘোরানো তো খুব সহজ শাস্তি। তবে শুধু এতেই রেহাই পাওয়া ডাইনির সংখ্যা খুব কম।

পুলিশের সামনেই গ্রামবাসীরা ঘোষণা করেছিল, ওই গ্রামে আরও তিন জন ডাইনি রয়েছে। তাদেরও পিটিয়ে মারতে হবে। প্রশ্ন, সেই তিন জন কারা? কিছুটা দূরে, পিঠে বাচ্চা কাঁধে ও মাথায় ঝুড়ি বয়ে এক আদিবাসী মাঝবয়সি মহিলা রাঁচিতে মজদুরি করতে যাচ্ছিল। আচ্ছা, ও কি ডাইনি? উত্তর এড়িয়ে যায় গ্রামবাসীরা। ওই মহিলার চোখেমুখে অসহায়তা। কে জানে, ওঝারা তাকে মারার বিধান দেবে না তো?

ব্যাপার তো খুব সহজ। মহিলারা সদ্যোজাত শিশুকে পিঠে কাপড় দিয়ে বেঁধে কাজে যাবে, আর গ্রামের পুরুষরা মহুয়া খেতে খেতে বলবে, এই, তোদের কারও পেট ব্যথা করছে না তো? মাথা ঝিমঝিম? গা বমি-বমি? গা হাত পা হলুদ হয়ে যাচ্ছে কি? তার মানেই ডাইনির উৎপাত শুরু হয়েছে! খুঁজে বের কর। তার পর এক রাতে ভরপুর মহুয়া খেয়ে পিটিয়ে মেরে ফেল সেই ডাইনিকে।

পরিসংখ্যান বলছে, ঝাড়খণ্ডে ২০১৩ থেকে ২০১৫-র এই অগস্ট পর্যন্ত, ডাইনি সন্দেহে ১২৪ জন মহিলাকে খুন করা হয়েছে। এই বছরই এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন জেলাতে ১১ জন মহিলাকে ডাইনি সন্দেহে খুন করা হয়েছে। শুধু পিটিয়ে মারাই নয়— গুলি করে, গলা টিপেও খুন হয়েছে। অনেক সময় যাকে ডাইনি বলে মারা হচ্ছে, তাকে খুনের পেছনে আসল কারণ হল ওই মহিলার জমি ‘হরপ’ করা। তবে কারণ যা-ই থাক, দেখা গিয়েছে যে সব গ্রামে ডাইনি সন্দেহে খুন হয়, সেখানে সভ্যতার আলো খুবই কম পৌঁছেছে। যেমন কাঞ্জিয়া মারাইটোলি। ৭০ থেকে ৮০টি কাঁচা বাড়ির এই গ্রামে মাত্র চারটি বাড়িতে বাথরুম আছে। বাথরুম মানে, নিজেদের বাড়ির মধ্যেই একটা পেচ্ছাপ-পায়খানা করার জায়গা। বাকিরা সবাই মাঠে যায়। পরিষ্কার পানীয় জল নেই। কুয়োর জলে আবর্জনা ভাসছে। বাড়ির পাশে গর্তে নোংরা জমা জল। যুক্তিবাদীরা বলছেন, এখানে জন্ডিস, আন্ত্রিক, ম্যালেরিয়া না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। সকাল থেকে কেউ যদি মহুয়া আর হাঁড়িয়া নিয়ে বসে, তার সিরোসিস অব লিভার হবে না তো কার হবে?

কিন্তু যুক্তিবাদীদের কথা কে শোনে? মাঝরাতে কেউ যদি বাড়ির সামনে মলমূত্র ত্যাগ করে চলে যায়, রাতে কেউ যদি মশারি তুলে ছুঁয়ে দিয়ে চলে যায়, দাওয়ায় চুল ফেলে যায়, তখন কি যুক্তিবাদীরা বাঁচাতে আসবে? তাই কাঞ্জিয়া মারাইটোলিতে কান পাতলেই শোনা যায়, এর পর কে?

 

aryabhatta.khan@gmail.com

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন