• শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ছোটগল্প

পুলিশের লোক

চোর, ভূত, আরশোলা, মাতাল, গুন্ডা বা লাফাঙ্গাকে ভয় পায় না, এমন মেয়ে বিরল। গঙ্গামণি সেই বিরলদের এক জন। দশ বছর বয়সে তাকে খড়ের গাদার মাচার নীচে দুপুরবেলা চিতি সাপে কামড়াল। মেয়ের তেমন চেঁচামেচি নেই।

Photo

হরিপদ পাড়ইয়ের তিন নম্বর মেয়ে হল গঙ্গামণি। হরিপদর বৌ ওই একটা জিনিসই জানে, মেয়ের পর মেয়ে বিয়োতে। মা ষষ্ঠীর বরই হবে বোধ হয়, হরিপদর বৌ মনসাবালা এ পর্যন্ত পাঁচখানা মেয়ে দিয়েছে হরিপদকে। তবে হরিপদ অন্য সব চোয়াড়ে মানুষের মতো অবিবেচক নয়। সে জানে এ সব উপরওয়ালার ইচ্ছেতেই হয়। মানুষের কিছু করার নেই। তাই বৌয়ের এবং ভাগ্যের উপর তার কোনও রাগ নেই। তবে রাগ আছে মহেশ্বরী পাড়ইয়ের। মহেশ্বরী হল গে হরিপদর গর্ভধারিণী মা। আর তার বাবা পীতাম্বর পাড়ইয়েরও বংশরক্ষার ব্যাপারটা নিয়ে একটু খুঁতখুঁতুনি আছে বটে, তবে সেটা ধর্তব্যের মধ্যেই নয়, কারণ পীতাম্বর হরিপদর মতোই ভারী নিরীহ মানুষ। তার উপর পীতাম্বর নাতনি বলতে অজ্ঞান। বিশেষ করে তিন নম্বর গঙ্গামণি হল তার চোখের মণি। গঙ্গামণির উপরের দু’জন হল সন্ধ্যামণি আর পদ্মমণি, নীচের দু’জন হল পঞ্চমণি আর দীক্ষামণি। লোকে বলে, হরিপদর পাঁচ-পাঁচটা মেয়ের একটাকেও নারী জাতীয় বলে ভাববার উপায় নেই গা। পাঁচটাই যেমন গেছো তেমনই দামাল আর দস্যি। সারা বিষ্টুপুর গাঁখানা যেন মাথায় করে রেখেছে। গাঁয়ের ডানপিটে ছেলেছোকরারাও তাদের ভয়ে তটস্থ, পারতপক্ষে তাদের পিছনে কেউ লাগে না। তারা গাছে উঠে নারকোল পাড়তে পারে, সাঁতরে ভৈরব নদী এ পার-ও পার করতে তাদের মেহনত করতে হয় না, গুলতিতে প্রত্যেকের হাত পাকা, কাবাডি বা এক্কা-দোক্কায় তাদের ধারেকাছে কেউ নেই, এক নাগাড়ে পাঁচ-ছ’শো স্কিপিং তাদের জলভাত। বলতে নেই হরিপদর অবস্থা ভাল। তেলকল আছে, চালের কল আছে, সার আর বীজের ব্যবসা আছে। তাই তার মেয়েরা খেয়েপরেই বড় হয়েছে। তবে হরিপদর মেয়েদের উপর গাঁয়ের লোক সন্তুষ্ট নয়, মেলা নালিশ আসে। মনসাবালা মেয়েদের শাসন করার সময় পায় না, উদয়াস্ত সংসার সামলাতে ব্যস্ত। শাসকের ভূমিকা ঠাকুমা মহেশ্বরীর, আগে তার তর্জন-গর্জনের দাপট থাকলেও বয়স হওয়ায় আর সেই দাপট নেই। উল্টে নাতনিরাই এখন তড়পায়। মহেশ্বরী বহু বার ঘোষণা করেছে, নাতনিরা শ্বশুরঘরে গিয়ে সবাইকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারবে এবং ফেরত আসবে। মাঝে মাঝে সে রাগ করে মনসাবালাকে বলে, কী সব ছাইপাঁশ গর্ভে ধারণ করলে বৌমা! মানুষের আকারে এগুলো কী জীব বিয়োলে বলো তো! মনসাবালা ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, মেয়ে তো আমি বাপের বাড়ি থেকে আনিনি! যেমন পেয়েছি তেমন উগরে দিয়েছি। এখন আপনারা বুঝুনগে। তা কথাটা ন্যায্যই, তাই বেশি ট্যাঁ-ফো করতে পারে না মহেশ্বরী। 

গত বছর বোশেখ মাসে গৌরীপুর গাঁয়ের এক মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে সন্ধ্যামণির বিয়ে হয়ে গেল। তা এই দেড় বছরে তার শ্বশুরবাড়ি থেকে কোনও নালিশ আসেনি। সন্ধ্যামণি ফেরতও হয়নি। গত অগ্রহায়ণে পদ্মমণি এন্টনিগঞ্জের এক বড় কাপড়ের ব্যবসাদারের মেজো ছেলেকে বিয়ে করে বেড়ালপার হয়েছে। এন্টনিগঞ্জ থেকেও কোনও খারাপ খবর আসেনি আজ পর্যন্ত। যদিও দুরুদুরু বুকে এখনও বাড়ির লোকে অপেক্ষা করছে। এক বছর পুরোতে চলল। চিন্তা সব চেয়ে বেশি গঙ্গামণিকে নিয়ে। পাঁচজনের মধ্যে সেই সব চেয়ে ডাকাবুকো, মিচকে এবং বজ্জাত। আবার তার একটা ভারী ভালমানুষির মুখোশ আছে বলে সে কতটা বজ্জাত তা বোঝার উপায় নেই। আর সমস্যা হল, হরিপদ আর তার বাপ পীতাম্বর এই তিন নম্বরটার প্রতিই বেশি দুর্বল। গঙ্গামণি কিছু চাইলে বা বায়না করলে লুকিয়ে-চুরিয়ে হলেও বাপ হরিপদ মেটায়। আর পীতাম্বর হল গে গঙ্গামণির ভারী বশংবদ, সেজো নাতনি যাই করুক পীতাম্বর তাতেই মুগ্ধ। গঙ্গার বখে যাওয়ার পিছনে যে এ দু’জনের যথেষ্ট অবদান আছে তা উচ্চস্বরে সবাইকে জানাতে ভোলে না মহেশ্বরী। 

চোর, ভূত, আরশোলা, মাতাল, গুন্ডা বা লাফাঙ্গাকে ভয় পায় না, এমন মেয়ে বিরল। গঙ্গামণি সেই বিরলদের এক জন। দশ বছর বয়সে তাকে খড়ের গাদার মাচার নীচে দুপুরবেলা চিতি সাপে কামড়াল। মেয়ের তেমন চেঁচামেচি নেই। উল্টে সাপটার লেজ ধরে টেনে এনে সেটাকে নিয়েই ছুটল গাঁয়ের হাতুড়ে ডাক্তার বদ্যিনাথের কাছে। বদ্যিনাথ তার হাতে জ্যান্ত সাপ দেখে ভিরমি খায় আর কি। গাঁয়ে মোটরবাইকের অভাব নেই। গঙ্গাকে গুণিনের বাইকে চাপিয়ে, সাপটাকে একটা হাঁড়িতে পুরে সরা চাপা দিয়ে নিয়ে গিয়ে হাজির করা হল গোপীনাথপুরের হাসপাতালে। মরতে মরতে বেঁচে গেল গঙ্গা, ঠিক সময়ে অ্যান্টিভেনম পড়ায়। অন্য কেউ হলে আক্রোশে সাপটাকে মেরে ফেলত, গঙ্গা মারতে দেয়নি। ছেড়ে দিয়েছিল। তবে সেই থেকে তার সাপ ধরার নেশা। সাপুড়ে নিচানাথকে ধরে-করে সে মাসছয়েকের চেষ্টায় সাপ ধরা শিখে ফেলল, মহেশ্বরীর চেঁচামেচি বা বড়দের ধমক-চমক উড়িয়ে দিয়ে। শুধু পীতাম্বর তার পক্ষ নিয়ে বলল, আমার গঙ্গাদিদির উপর মা মনসার ভর আছে, তোমরা চিন্তা কোরো না। সাপ যে কস্মিনকালেও দুধ-কলা খায় না বা কার্বলিক অ্যাসিডে যে সাপ বিদূরিত হয় না তা গঙ্গাই বাড়ির লোকজনকে বোঝাল। আর এও বোঝাল যে বাস্তুসাপ বলেও কিছু হয় না। গঙ্গামণির এই সব ধিঙ্গিপনা মহেশ্বরীর দু’চক্ষের বিষ, কিন্তু সে করেই বা কী! চেঁচামেচি করে লাভ হয় না, গলার সেই জোর তো আর নেই, তার উপর হাঁপ ধরে যায়, তাই এখন বাধ্য হয়ে অন্য পন্থা ধরেছে সে। কপিল খাটুয়া নামে এক ঘটককে পাকড়াও করে নাতনির সম্বন্ধ করার ফিকিরে নেমে পড়েছে। তা কপিল প্রথমেই দু-দুটো দোজবরের সম্বন্ধ আনল, তার পর খবর আনল এক আধপাগলা মাঝবয়সির যে নাকি তন্ত্রসাধনা করে। মহেশ্বরীর ধমক খেয়ে দু-একটা পাতে দেওয়ার যুগ্যি খবরও আনছে বটে। কিন্তু বাড়ির কারও গাল উঠছে না। এই সব ষড়যন্ত্রের বিন্দুবিসর্গও টের পায়নি গঙ্গামণি। যখন টের পেল তখন তার রুদ্রমূর্তি দেখে কে? তার উপর তার মস্ত সহায় হল হরিপদ আর পীতাম্বর। মহেশ্বরী হার মেনে ঠাকুরঘরেই একরকম নির্বাসন নিল। তার দৃঢ় বিশ্বাস হল, এই গেছো মেয়েকে কারও ঘরেই গছানো যাবে না।  

গয়লাপাড়ার পরি ক্লাস সেভেনে মোটে পড়ে। মেরেকেটে তেরো-চোদ্দো বছরের হবে। তার বাবা যতন ঘোষ বাঁকড়োর এক সরেস ছেলে পেয়ে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য হন্যে হয়ে পড়ল। পরি কেঁদেকেটে একশা। সে বিয়ে বলতে বোঝে পরের বাড়িতে গিয়ে ঝি-গিরি বা রাঁধুনিগিরি করা। আমোদ-আহ্লাদ দু’দিন হয় বটে, কিন্তু তার পর কাঁধে জোয়াল। আজকাল সব মেয়েই বিয়ের চালাকিটা বুঝে গিয়েছে। পরি কেঁদে এসে গঙ্গামণিকে ধরল, ‘‘ও দিদি, আমায় গলায় দড়ি দিতে হবে।’’ গঙ্গামণি বলল, ‘‘দাঁড়া, কার গলায় দড়ি দিতে হবে সে আমি জানি।’’ গঙ্গামণির একটা ছোটখাটো দল আছে, তাতে শুধু মেয়েরাই নয়, কয়েকটা ছেলেও নাম লিখিয়েছে। তারা দল বেঁধে গোপীনাথপুরের থানায় হাজির হয়ে বেজায় চিল্লামিল্লি জুড়ে দিল। নতুন দারোগা এক জন ইয়ং ম্যান, রক্ত গরম, নাবালিকার বিয়ে শুনে তক্ষুনি ফোর্স নিয়ে পরির বাড়িতে এসে হামলে পড়ল। যতনকে নিয়ে যাওয়া হল থানায়। বিস্তর হাতেপায়ে ধরাধরির পর মুচলেকা দিয়ে বাড়ি ফিরল সে। পরির বিয়ে ভেঙে গেল। গাঁয়ে ব্যাপারটা কেউ তেমন সুনজরে দেখল না। শুধু ছেলেছোকরা আর ফচকে ছুঁড়িরা ছাড়া। যতন ঘোষ তো হরিপদ আর পীতাম্বরের মুখদর্শন করাই ছেড়ে দিল। 

মাধ্যমিকে স্টার পেয়েছিল গঙ্গামণি। কিন্তু অতিরিক্ত বারমুখো হয়ে পড়ায় আর সমাজসেবার জেরে উচ্চমাধ্যমিকে সাদামাটা ফার্স্ট ডিভিশনটা হল মাত্র। তবে গাঁ-গঞ্জে সেটাও ফেলনা নয়। ভর্তি হল গোপীনাথপুর কলেজে। গোপীনাথপুর বড় গঞ্জ জায়গা। কলেজে ছাত্রছাত্রী গিজগিজ করছে। সেখানে গিয়েই একেবারে ডানা মেলে দিল গঙ্গামণি। দেখা গেল ডানপিটে মেয়ে হিসেবে তার নাম কলেজে সবাই জানে। বাঁ, ডান দুটো ইউনিয়ন থেকেই তাকে নিয়ে টানাটানি। কার টিকিটে দাঁড়াবে সেটা ঠিক করতে পারছিল না সে। আর সেই সময়েই তাকে ভজানোর জন্য এ অন্যকে দায়ী করায় দুই ইউনিয়নে লাগল মারপিট। সেটা পুলিশ অবধি গড়াল। তদন্তে এল সেই ছোকরা দারোগা অরুণাংশু। তাকে দেখে অবাক হয়ে বলল, ‘‘আরে! তুমি সেই বিষ্টুপুরের গঙ্গামণি না! এ তো দেখছি, যেখানে তুমি সেখানেই গন্ডগোল!’’ গঙ্গামণি ঠোঁট উল্টে বলে, ‘‘সে তো আর আমার দোষ নয়! অন্যায় হলে আমি রুখে দাঁড়াবই।’’ 

অরুণাংশু আর কথা বাড়াল না, তদন্ত আর জিজ্ঞাসাবাদ করার পর তাকে ডেকে বলল, ‘‘তোমাকে নিয়েই যখন গন্ডগোল তখন তোমাকেই তা মেটাতে হবে। তুমি কোন দলের হয়ে লড়বে সেটা জানিয়ে দিলেই তো হয়।’’ 

‘‘আমাকে তো ভাববার সময়ই দিচ্ছে না এরা! কেবল হুড়ো দিলে কি করব বলুন তো!’’

তা হলে একটা কাজ করো, ‘‘নির্দল হয়ে দাঁড়াও। মনে হয় তাতেও জিতবে। তোমার ইন্ডিপেন্ডেন্ট পপুলারিটি আছে, বুঝতে পারছি।’’ 

গঙ্গামণির কথাটা পছন্দই হল। তবু বলল, দাঁড়াতেই বা হবে কেন, না দাঁড়ালে ক্ষতি কী? 

‘‘ওরে বাপ রে, তা হলে কি এরা তোমাকে তিষ্ঠোতে দেবে! কোনও ক্যান্ডিডেট শিয়োর জিতবে জানলে তার পিছনে দিনরাত লেগে থাকবে, এমন কী বড় চাঁইরাও এসে ঘ্যানঘ্যান করতে থাকবে।’’ 

কথাটা মিথ্যে নয়, ইতিমধ্যে পুরসভার চেয়ারম্যান আর দু’জন জেলাস্তরের নেতা তার সঙ্গে দেখা করে গিয়েছে। 

তাকে ভাবতে দেখে অরুণাংশু বলে, ‘‘তুমি কি গোপীনাথপুরেই থাকো নাকি গাঁ থেকে যাতায়াত করো?’’

‘‘আমার একটা স্কুটি আছে, তাইতেই যাতায়াত করি। কেন বলুন তো!’’ 

‘‘তার মানে তুমি এক্সট্রিমলি ভালনারেবল। গাঁয়ের রাস্তায় অ্যাটাকও হতে পারে। তুমি বরং নির্দল হয়ে নমিনেশন সাবমিট করে দাও। তুমি জিতবে বলেই মনে হচ্ছে, তখন ওরা আবার তোমার সঙ্গে নেগোশিয়েট করতে চাইবে। কিন্তু এখন রেহাই দেবে। এ সব সিচুয়েশন আমি অনেক ফেস করেছি তো, তাই বলছি।’’

তাকে নিয়ে অরুণাংশু রায়ের এত মাথাব্যথা কেন তা বুঝতে পারছিল না গঙ্গামণি। তবে মাথাব্যথাটা তেমন অপছন্দও হচ্ছিল না তার। সে মুখ টিপে একটু হেসে বলে, আচ্ছা, ভেবে দেখি। 

এবং সেটাই করল। বেশি পোস্টারিং বা বক্তৃতাও করতে হল না তাকে, অনেক মার্জিনে জিতে গেল। শুরু হল আর এক দফা টানাটানি। দক্ষিণপন্থীরা ক্ষমতায় এসেই প্রস্তাব দিল, দলে এলে তাকে জি এস করে দেওয়া হবে। কারণ জি এস কে হবে তাই নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেই ঝামেলা হচ্ছে। গঙ্গামণি ভাববার সময় চেয়ে নিল। কিন্তু সে দিনই তার ফেরার পথে গঞ্জের সীমানা ডিঙিয়ে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তায় পড়তেই দেখল সামনে পথের ধারে পুলিশের জিপ দাঁড়ানো, তাতে হেলান দিয়ে অরুণাংশু দাঁড়িয়ে। তাকে দেখে স্কুটি থামাল গঙ্গা। ভদ্রতা বলেও তো একটা কথা আছে! 

‘‘শোনো, তোমার নিরাপত্তার জন্যই কিন্তু তোমার জি এস হওয়া দরকার, বুঝলে! তোমার মধ্যে একটা ন্যাচারাল লিডারশিপের কোয়ালিটি আছে। তুমি পারবে। রিফিউজ় করলে ওদের প্রেস্টিজে লাগবে, আর তা থেকে তোমাকে ম্যালাইন করার চেষ্টা শুরু হয়ে যাবে, বুঝেছ?’’ 

‘‘জি এস হলেই কি ঝামেলা কমে যাবে ভাবছেন? বরং আরও বাড়বে।’’ 

‘‘ঠিক কথা। কিন্তু তুমি তো এ রকম ঝামেলায় জড়াতে পছন্দই করো, তাই না! লিডারের ঝামেলায় তো থ্রিলও আছে! ’’

কথাটা মিথ্যাও নয়, তবে সেটা অরুণাংশু টের পেল কেমন করে সেটাই প্রশ্ন। ফের একটু মুখ টিপে হাসল গঙ্গামণি। তার ভালমন্দ নিয়ে দারোগাসাহেব বড্ড উচাটন হয়ে পড়েছেন গো! বেচারা! 

তবে তাই হল। গঙ্গামণি জি এস হল এবং সেই সঙ্গে যেন দশটা হাতও বেরোল তার। সব দিক সামলে, সবাইকে নিয়ে চলাটা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! মাথাও ঘামাতে হয় বিস্তর। দারোগাবাবু বুঝি একটু লজ্জা পেয়েছেন, মাস দুই আর দেখাসাক্ষাৎ নেই। কিন্তু মাস দুই পরেই এক দিন দারোগাবাবুর ফোন, ‘‘এই যে গঙ্গামণি, তোমাকে একটা জরুরি কথা বলার ছিল।’’

নিজের ফোন নম্বর সে অরুণাংশুকে কস্মিনকালেও দেয়নি, তবে জানল কী করে কে জানে বাবা! ফস করে জিজ্ঞেস করে বসল, ‘‘আমার ফোন নম্বর কোথায় পেলেন?’’ 

‘‘ভুলে যাচ্ছ কেন যে আমি পুলিশের লোক!’’

‘‘ও হ্যাঁ, তাও তো বটে! জরুরি কথাটা কী বলুন তো!’’ 

‘‘বলছি যে, লিডাররা পড়াশুনোয় ঢিলে দেয় বলে কিন্তু রেজ়াল্ট খারাপ হয়। তোমার ক্ষেত্রে সেটা যেন না হয়। বুঝেছ তো ! শুনলাম ক্লাস বাঙ্ক করছ খুব।’’ 

‘‘হুঁ, কথাটা ঠিক। আমার বাবাও আমাকে কথাটা বলেছে। তবে আমি আজকাল সিরিয়াসলি পড়াশুনো করছি। অনার্স ছেড়ে দেব বলে ভেবেছিলাম, কিন্তু ছাড়ছি না।’’ 

‘‘থ্যাঙ্ক ইউ। আমার বেশ টেনশন হচ্ছিল।’’ 

কেন যে দারোগাসাহেবের টেনশন হয় তা আর জানতে চাইল না সে। দারোগাসাহেবের কিছু একটা হচ্ছে। ইচিং সেনসেশন? নাকি উসখুস? এ সুইট ট্রাবল অব দি পুয়োর হার্ট? 

কিছুই তো আমাদের হাতে নেই, যতই জীবন যাপন করে যাও, লাগাম অন্য কারও হাতে।

মেয়ে হয়ে না জন্মালে কতগুলো জিনিস টেরই পাওয়া যায় না। যেমন সে আজকাল টের পায় ছেলেরা, প্রায় সব ছেলেই কতটা সেক্সমুখো। তাই বহু কাল ধরেই পৃথিবীর সব দেশেই গণিকাপল্লি স্থাপিত রয়েছে। মেয়েদের জন্য সে রকম ব্যবস্থা নেই। পরিসংখ্যান বলে, ওখানে যাতায়াতকারীদের মধ্যে বিবাহিত পুরুষের সংখ্যাই বেশি। আর তাই পুরুষদের বিশ্বাস করতে ভয় করে তার। আর ছেলেরা যখন মেয়েদের দিকে এবং তার দিকে তাকায়, তাদের চোখে লালসাই দেখতে পায় গঙ্গামণি। সেই প্রস্তরযুগ থেকেই পুরুষদের মাথাপিছু গন্ডা-গন্ডা বৌ, আইন না হলে এখনও তাই হত। আইনকে কাঁচকলা দেখিয়ে এখনও পুরুষরা ঘরের মেয়েমানুষকে ফেলে কি ছোটে না অজানা সব মেয়েমানুষের খোঁজে! 

ইতিহাস অনার্সে বার্ষিক পরীক্ষার ফল খুব খারাপ হল তার। মেরামত করতে উঠেপড়ে লেগে পড়ল সে। দিনের অনেকটা সময় লাইব্রেরিতেই কেটে যায় তার। তবে পড়তে তার ভাল লাগে, মনেও থাকে। ব্যস্ততার মধ্যেই এক দিন শহরের একটা গুঞ্জন কানে এল। গোপীনাথপুরের মস্ত মহাজন জয়দেব পানের মেয়ে সীতালক্ষ্মীর সঙ্গে ওসি অরুণাংশুর বিয়ে ঠিক হয়েছে। পান মহাজন নাকি বিশাল টাকার পণ দিচ্ছে, সেই সঙ্গে গাড়ি, বিশ কাঠা ধানি জমি, আরও কী কী যেন। গঙ্গামণি একা একাই ফিচিক-ফিচিক করে হাসল। বেচারা দারোগাসাহেব বোধ হয় এক সময়ে তারও একটু প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। তেমন ডেঁড়েমুশে পড়েননি বলে বাঁচোয়া, পড়লে কত বড় দাঁও হাতছাড়া হত! 

দিন দশেক বাদে হাওয়ার মুখে খবর এল, দারোগাসাহেবের বিয়ে ভেঙে গেছে। আর পরের পরীক্ষায় গঙ্গামণি ইতিহাসে শতকরা সত্তরের ওপর নম্বর পেল। 

ফের দারোগাসাহেবের ফোন এল এক দিন, ‘‘শুনলাম এ বার পরীক্ষায় ক্লাসে হায়েস্ট পেয়েছ!’’ 

দীর্ঘশ্বাস ফেলে গঙ্গা বলে, ‘‘আমিও তাই শুনছি। কিন্তু আপনার বিয়েটা ভেঙে গেল কেন বলুন তো! আমি তো ভেবেছিলাম আপনি আমাদের ভোজ খাওয়াবেন।’’ 

‘‘খুব ফাজিল হয়েছ কিন্তু। যাকগে পড়াশুনোটা বজায় রেখো। প্লিজ়! ’’

ব্যাপারটা বুঝতে পারল না গঙ্গা। ‘প্লিজ়’টা কেন রে বাবা! আমি পরীক্ষায় ভাল করলে ওর কী? 

এক বিকেলে বাড়ি ফিরতে গিয়ে দেখে, স্কুটির পিছনের চাকায় হাওয়া নেই। ঠেলে মদনদার গ্যারেজ অবধি নিতে হবে। অবশ্য অসুবিধে নেই, কলেজে তার হাজারও বন্ধু। তারাই ঝামেলাটার ভার নিল। সে বসে রইল লাইব্রেরিতে। 

একটু বাদেই ফোন। অরুণাংশু। 

‘‘তোমার স্কুটি নাকি খারাপ হয়েছে!’’ 

‘‘ও তেমন কিছু নয়, চাকা পাংচার। আপনাকে কে বলল?’’ 

‘‘আরে, আমি যে পুলিশের লোক! ’’

‘‘ও, তাই তো। ভাববেন না, ঠিক হয়ে যাবে। ’’

‘‘বলো তো আমি তোমাকে আমার জিপে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি।’’ 

‘‘না না, পাংচার সারাতে কয়েক মিনিট লাগবে মোটে।’’ 

‘‘না গঙ্গামণি, আমি খবর পেয়েছি, মোটরটাও বিগড়েছে। কালকের আগে হবে না।’’ 

‘‘সে কী, আপনি জানলেন কী করে?’’ 

‘‘আরে, ভুলে যাচ্ছ কেন, আমি যে পুলিশের লোক!’’

ছবি: সুব্রত চৌধুরী

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন