জ্যৈ ষ্ঠ মাস এলেই আমরা দূরদর্শনে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে নানান অনুষ্ঠানের পরিকল্পনায় মেতে উঠতাম। ১১ জ্যৈষ্ঠ তাঁর জন্মদিন। নজরুল-গবেষকদের মধ্যে কল্পতরু সেনগুপ্ত, নারায়ণ চৌধুরী, ব্রহ্মমোহন ঠাকুর, অরুণ বসুদের পেতাম নানা অনুষ্ঠানে। নজরুলের স্নেহধন্য বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়রা আসতেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ নজরুলকে নিয়ে অনেক অনুষ্ঠান সংযোজনাও করতেন। সংগীত বিভাগের অনুষ্ঠানে তথ্যভাণ্ডার নিয়ে আসতেন বিমান মুখোপাধ্যায়। নজরুল-গবেষক বাঁধন সেনগুপ্ত আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতেন। বাঁধনদা অর্ধ শতক ধরে নজরুল গবেষণা ও নজরুলের জীবনী রচনার কাজ করে চলেছেন।

অল্প বয়সে নজরুলের জন্মদিনে কবির ক্রিস্টোফার রোডের বাড়িতে গিয়ে তাঁর পায়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতাম। দেখতাম, কবি শূন্য দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে। কখনও হারমোনিয়ামের দিকে হাত দেখাচ্ছেন, অর্থাৎ গান শুনতে চাইছেন। গান শুনে তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত। আমরাও কাঁদতাম। নজরুলের জন্মদিনের অনুষ্ঠান টেলিভিশনে করতে গিয়ে সে সব দিনের কথা মনে পড়ে খুব আক্ষেপ হত। কবিপুত্র কাজী সব্যসাচীকে বলেছিলাম, সানিদা, এখানে টেলিভিশন এল কিন্তু কবিকে কোনও দিন আমরা ছবিতে দেখাতে পারলাম না, তার আগেই তো তাঁকে বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া হল। ১৯৭৬ সালের ২৯ অগস্ট, রবিবার, বাংলাদেশ সময় বেলা ১০টা ১০ মিনিটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে নজরুলের প্রয়াণ ঘটল। খুব আক্ষেপ হল, এত বড় একটা ঘটনা আমরা মানুষের কাছে টিভির মাধ্যমে সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে দিতে পারলাম না। খবর পেলাম, কাজী সব্যসাচী এবং কবির পুত্রবধূ কল্যাণী কাজী ঢাকায় গিয়ে পৌঁছেছেন, কিন্তু তাঁরা শেষ চোখের দেখা দেখতে পাননি, আগেই কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কবর দেওয়া হয়ে গেছে। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিলেন, সূর্যাস্তের আগেই তাঁদের কবর দেওয়ার রীতি। পরের দিনই তাঁরা দুজন কবরের মাটি নিয়ে ফিরে এলেন। যখন দুই বাংলার মধ্যে প্রথম বাস চলাচল আনুষ্ঠানিক ভাবে সূত্রপাত হল, সেই ঘটনা দূরদর্শনে সরাসরি সম্প্রচারের জন্যে সদলবলে ঢাকায় গেলাম, আর সেই সুযোগে কবির সমাধিস্থল নানা অ্যাঙ্গল থেকে শুটিং করে এনে দর্শকদের দেখালাম।

নজরুলের প্রয়াণের খবর পাওয়া মাত্র তাঁর স্মরণ-অনুষ্ঠানের তোড়জোড় শুরু। গাড়ি নিয়ে ছুটলাম প্রথমেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের বাড়ি, তাঁকে তুলে আঙুরবালার কাছে। আঙুরবালা চুলে পাতা কেটে খোঁপা বাঁধতে অনেক সময় নিলেন। তাঁকে তাড়া দিয়ে গাড়িতে তুলে সুপ্রভা সরকারের কাছে। সবাইকে তুলে স্টুডিয়োতে আসতে লাইভ অনুষ্ঠানের সময় হয়ে গেল। অনুষ্ঠানে সুপ্রভা সরকার ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব তবু আমারে দেব না ভুলিতে’ গানটি গাইতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন।

রবীন্দ্রনাথের চেয়ে নজরুল অনেক বেশি গান লিখেছেন বলে বলা হয়। ঠিক সংখ্যা কত? অরুণ বসু আমাদের অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন, নজরুলের সৃষ্টিশীল জীবন ১৯২০ থেকে ১৯৪২, মাত্র বাইশ বছরের। সংগীত সৃষ্টির কাল মাত্র এগারো-বারো বছরের। তখন পর্যন্ত নজরুলের ২৮৭২টি গানের খোঁজ পাওয়া গেছে। অনেক বছর পর বাঁধন সেনগুপ্ত অনুষ্ঠানে জানান, আরও অনেক গানের খোঁজ পাওয়া গেছে, দেখা যাচ্ছে নজরুল প্রায় সাড়ে তিন হাজার গান সৃষ্টি করে গেছেন।

এক বার সাহিত্যসংস্কৃতি অনুষ্ঠানে আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক  শিশির কর জানিয়েছিলেন ব্রিটিশ শাসনে বাজেয়াপ্ত নজরুলের বইয়ের কথা। জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ জানিয়েছিলেন নজরুলের সঙ্গীতগুরু জমিরুদ্দিন খানের কথা। নজরুল তাঁকে ‘বন-গীতি’র উৎসর্গপত্রে ‘আমার গানের ওস্তাদ’ বলে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া মস্তান গামা, মঞ্জু সাহেব, নজরুলের এই সব সংগীতগুরুর কথাও তিনি শুনিয়েছিলেন। নজরুল অনেক নতুন রাগ সৃষ্টি করেছিলেন, যেমন দোলনচাঁপা, দেবযানী, মীনাক্ষী, অরুণরঞ্জনী, নির্ঝরিণী, রূপমঞ্জরী, বনকুন্তলা ইত্যাদি। এই সব রাগনির্ভর তাঁর সৃষ্ট গানগুলোর কথাও নারায়ণ চৌধুরী জানিয়েছিলেন। এক অনুষ্ঠানে এই তথ্য উঠে এসেছিল: দেবব্রত বিশ্বাসের প্রথম রেকর্ডটি ছিল নজরুলের ট্রেনিংয়ে নজরুলগীতি ‘বনকুন্তল এলায়ে’।

‘মানুষ, মানুষই শেষ কথা’ নামে অনুষ্ঠানে নজরুলের সৃষ্টিতে কী ভাবে মানুষের জয়গান ধ্বনিত হয়েছে, তা তুলে ধরা হয়। শুরুতে নজরুলের মন্তব্য ক্যাপশনে দেওয়া হয়: ‘আপনারা আমার কবিতা সম্পর্কে যা ইচ্ছা হয় বলুন, কিন্তু গান সম্পর্কে নয়।’ শেষে ওঁর আর একটি কথা ভেসে ওঠে: ‘আমি যদি আসি, আসব হিন্দু-মুসলমানের সকল জাতির ঊর্ধ্বে যিনি একমেবাদ্বিতীয়ম্‌ তাঁরই দাস হয়ে।’

১৯৯২ সালে সাহিত্যসংস্কৃতি অনুষ্ঠানে করেছিলাম ‘নজরুলগীতি তো?’ নামে দুই পর্বে একটি অনুষ্ঠান। রেকর্ড সংগ্রাহক সুরাজলাল মুখোপাধ্যায় এসেছিলেন তাঁর পুরনো গ্রামোফোন নিয়ে। অনুষ্ঠানের শুরুতে কবিকণ্ঠে ‘পাষাণে ভাঙালে ঘুম’ গানটির রেকর্ড তিনি বাজিয়ে শোনালেন। তার পর সুকুমার মিত্র গাইলেন ‘আমায় বোলো না ভুলিতে বোলো না’। গান শেষ হওয়া মাত্র সংযোজক বিনয় চক্রবর্তী বললেন, সুকুমারদা, এটা তো নজরুলগীতি নয়। সুকুমার মিত্র বিস্মিত। তখন বাঁধন সেনগুপ্ত বললেন, এই গানটির সুরকার তুলসী লাহিড়ী। এমনই অসংখ্য গান নজরুলগীতি হিসেবে বিখ্যাত হয়েছে কিন্তু সে-সব গানের সঙ্গে নজরুলের কোনও সম্পর্কই নেই, তাই নিয়েই এই অনুষ্ঠান। কৃষ্ণা মজুমদার গাইলেন ‘ফিরিয়া ডেকো না মহুয়া বনের পাখি’। ভুল ধরিয়ে দেওয়া হল, গানটি কিন্তু প্রণব রায়ের লেখা। সুকুমার মিত্র ধরলেন ‘আবেশ আমার যায় উড়ে’। জানানো হল, এটির গীতিকার সুবোধ পুরকায়স্থ। কৃষ্ণা গাইলেন ‘চোখ মুছিলে জল মোছে না’। বলা হল, এটির রচয়িতা ধীরেন মুখোপাধ্যায়। এ রকম একের পর এক ভুল ধরিয়ে দেওয়া হল। দ্বিতীয় পর্বের শুরুতে সুরাজলাল বাজালেন নজরুলের স্বকণ্ঠে গান ‘দিতে এলে ফুল কে আজি সমাধিতে মোর’। গাওয়া হল নজরুলগীতি বলে প্রচলিত অনেকগুলো গান, যেমন ‘আজি নিঝুম রাতে কে বাঁশি বাজায়’ (কথা: তুলসী লাহিড়ী), ‘কেমন করে বাজাও বলো’ (হেমেন রায়), ‘পিয়ালা কেন মিছে আনলে ভরি’ (ধীরেন মুখোপাধ্যায়), ‘বিদায়ের শেষ বাণী’ (অজয় ভট্টাচার্য)। বাঁধনদা জানান, ১৮৬টি এ রকম গান চিহ্নিত করা গেছে, যেগুলো নজরুলগীতি হিসেবে প্রচলিত কিন্তু নজরুলগীতি নয়। যে সব বিখ্যাত শিল্পী ভুল করে নজরুলগীতি হিসেবে এ সব গান রেকর্ড করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন আব্বাসউদ্দিন, শচীনদেব বর্মন, জ্ঞান গোস্বামী, কৃষ্ণচন্দ্র দে, হরিমতী, কমলা ঝরিয়া, মৃণালকান্তি ঘোষ, আঙুরবালা, ইন্দুবালা, আরও অনেকে।

এই ভ্রান্তির একটি কারণ মনে হয় তখন নজরুলের অসম্ভব জনপ্রিয়তা। নজরুলগীতি লেবেল থাকলে তো হু-হু করে রেকর্ড বিক্রি হত। আরও কি অন্য কোনও কারণ ছিল?

 

pankajsaha.kolkata@gmail.com