খুব সাবধান! শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে নানা ভবঘুরে, বাউন্ডুলে, ছেলেধরা, ঘুরঘুর করছে সন্দেহজনক লোক, চুপিসারে শিকারের পিছন নিচ্ছে অনুসরণকারীরা, ঢুকে পড়ছে অবাঞ্ছিত লোক। একটু সন্দেহ হলেই পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে, তাতে কারও কোনও শাস্তি হবে না। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ঢিলেঢালা মনোভাব দেখালে চলবে না। অচেনা মানুষের সঙ্গে কোনও কথাবার্তা নয়। এই সব অবাঞ্ছিত মানুষদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারলে সবচেয়ে ভাল। পিটিয়ে মারার ক্ষেত্রে আমাদের পশ্চিমবঙ্গবাসীদের পঞ্চাশ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য মানুষ এটা মেনে নিয়েছে, এমনকি মানবাধিকার কর্মীরাও এ ব্যাপার নিয়ে বেশি উচ্চবাচ্য করেন না।

মনস্তাত্ত্বিকরা মানুষের কাল্পনিক ভীতির কথা বলতে গিয়ে বলছেন, ইদানীং অনেক বেশি মানুষ এসে তাঁদের বলেন, কেউ যেন সর্বদা তাঁদের অনুসরণ করছে। মনস্তাত্ত্বিকদের এই পর্যবেক্ষণ বিষয়ে বলা যায় যে অন্য লোক আমাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে এই বিশ্বাস নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। এই ধরনের বিশ্বাস মানুষের মনে ভীতি উৎপাদন করেছে সব সময়েই। যা সত্যি নতুন তা হল এই অনুসরণকারীর চরিত্রটি: এর সঙ্গে অবশ্যই যোগ করতে হবে চুপিসারে ঘুরঘুর করা মানুষ, ভবঘুরে প্রভৃতিকে, যাদের ঘাড়ে এখন সব দোষ গিয়ে পড়ছে। এরাই আজকাল দুষ্ট আত্মা, শয়তান, জুজু, ডাইনির ভূমিকায়, এরাই মানুষের উপর পীড়াদায়ক ভর চাপায়, কুনজর দেয়। এই নাগরিক ভয় এখন একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। মধ্যবিত্ত নাগরিক দেশের বহুবিধ সমস্যা নিয়ে আর ততটা চিন্তিত নয়, যতটা চিন্তিত নিজের নিরাপত্তা নিয়ে। নিরাপত্তার এক প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে, মানুষ নিরাপত্তা কিনছে।

আজকের পাবলিক কালচারের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হল দৈনন্দিন ভয়ের রাজনীতি। রক্ত হিম করা, স্নায়ু বিপর্যস্ত করা, নিরাপত্তাহীন, বিপজ্জনক শহরের অনেক রাস্তা পরিহার করতে হবে; এই ধরনের পাবলিক স্পেসে ঢোকা নিরাপদ নয়। এর ফলে পাবলিক জীবনে অংশগ্রহণ করার আর্ট ও দক্ষতা মানুষ আর শিখতে পারছে না। প্রাচীরের মধ্যে আবদ্ধ আবাসিকরাই আজ তাই কমিউনিটির সংজ্ঞা পায়, কমিউনিটি রক্ষণের অর্থ হল সশস্ত্র গেটকিপার নিয়োগ করা, যে বা যারা প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করবে; অনুসরণকারী ও শিকারসন্ধানী ঘুরঘুর করা চরিত্র আজকে এক নম্বর পাবলিক শত্রু; শহরের পাবলিক এলাকায় সুরক্ষিত অংশকে আলাদা করে নিতে হবে যেখানে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত হবে; একই ধরনের জীবনের মধ্যে আপস-আলোচনার বদলে পৃথকীকরণ হল আজকের মেট্রোপলিটান মন।

সমাজতাত্ত্বিক রিচার্ড সেনেট শহর সম্বন্ধে এক ক্লাসিক উক্তি করেছেন। তিনি বলেছেন, শহর হল সেই জায়গা যেখানে অচেনা মানুষ অচেনা মানুষের সঙ্গে মিলিত হয়। বলার প্রয়োজন নেই অচেনা মানুষের পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঠিক বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের পরস্পরের সাক্ষাতের মতো নয়। অচেনা মানুষের সাক্ষাৎকারে শেষ বার যেখানে কথাবার্তা শেষ হয়েছিল সেখান থেকে কথাবার্তা শুরু করার সুযোগ নেই, মাঝে কী হয়েছে সে বিষয়ে অবগত করানোর কোনও অবকাশ নেই, এখানে দুজনে কোনও অতীত স্মৃতির অংশীদারও নন, বস্তুত এখানে কোনও অবলম্বনই নেই। অপরিচিতদের সাক্ষাৎ এমন এক ঘটনা যার কোনও অতীত নেই। এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর কোনও ভবিষ্যৎও নেই। এটা কোনও ধারাবাহিক গল্প নয়, এই গল্পের কোনও পরের এপিসোড নেই। এই ঘটনা এক বারই ঘটে, কথাবার্তার জাল তৈরি হয় চাহনি, শব্দ ও অঙ্গবিক্ষেপের মাধ্যমে। 

যেটা বলতে চাই সেটা হল, নাগরিক জীবনযাপন দাবি করে কিছু বিশেষ ও পরিশীলিত স্কিল, একগুচ্ছ স্কিল যাকে আমরা বলতে পারি ‘ভদ্রতাবোধ’। এই ‘ভদ্রতাবোধ’-এর মধ্যে আছে সেই কাজকর্ম যার মাধ্যমে মানুষ পরস্পরের থেকে সুরক্ষিতও থাকে আবার পরস্পরের সঙ্গ উপভোগও করে। ভদ্রতাবোধের মূল কথা হল একটা মুখোশ পরা, কিন্তু এই মুখোশ সামাজিকতাকে সম্ভব করে। এই ভদ্রতাবোধ, ভাষার মতোই প্রাইভেট হতে পারে না, এটা সব সময়েই সামাজিক পরিবেশে গ্রথিত। অর্থাৎ নাগরিক পরিপার্শ্ব  ভদ্র হতে হবে যদি নাগরিককে ভদ্রতাবোধ শেখাতে হয়। নাগরিক পরিপার্শ্ব ভদ্র হওয়ার অর্থ কী? অর্থ হল এই যে সব নাগরিক তাদের পাবলিক ভূমিকায় সব রকম পরিসরে স্বাধীন ভাবে অংশগ্রহণ করবেন। শহর তার নাগরিকদের কাছে নিজেকে এক ‘কমন গুড’ হিসেবে উপস্থাপন করবে। মুশকিল হল এখন যে ধরনের পাবলিক স্পেস ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সেখানে এর উল্টোটাই দেখা যায়। যেমন উপভোক্তাদের জন্য নির্মিত শপিং মলগুলি। এখানে সকলেই উপভোক্তা, সকলে একই উদ্দেশ্যে এসেছে কিন্তু এর কোনও সমষ্টিগত চরিত্র নেই, এরা সকলেই ব্যক্তি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল এই স্থানগুলি যারা এর নিয়ম ভঙ্গ করবে তাদের থেকে সুরক্ষিত— সব রকমের অনাহূত প্রবেশক, অনধিকার চর্চী, ফুর্তিতে বাধা সৃষ্টিকারী— যারা উপভোক্তাদের চমৎকার নিঃসঙ্গতায় বিঘ্ন ঘটাবে— এখানে ব্রাত্য। সুন্দর ভাবে তদারকি করা, সঠিক ভাবে সুরক্ষিত ও নজরদারির ব্যবস্থা সম্বলিত এই উপভোক্তাদের মন্দিরগুলি শৃঙ্খলার এক দ্বীপ যেন। এই মন্দিরগুলি ভিখিরি, ভবঘুরে, বাউন্ডুলে, অনুসরণকারীদের থেকে মুক্ত। মানুষ এই মন্দিরে কথা বলতে বা সামাজিকতা করতে যায় না।

শহরে অবশ্য আরও অনেক জায়গা আছে তার ছন্দ যে ভাবে প্রবাহিত হয় তার সঙ্গে মন্দিরের অভ্যন্তরে যা হচ্ছে তার কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু সে খবর কে রাখে? এক বার ভারতের অন্য এক শহরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে যখন সেই শহরে যাই, তখন এয়ারপোর্টে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ অধ্যাপক আমাকে নিতে আসেন। যুবকটি ওই শহরের মোটামুটি এক ধনী পরিবারের ছেলে, নিজের গাড়িতে আমাকে হোটেলে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বলেন, অন্য কোনও রাস্তা নেই আর এই পথে যেতে ট্রাফিকের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগবে। সত্যি হোটেলে পৌঁছতে আমাদের দু’ঘণ্টা সময় লাগল। বিদায় নেওয়ার সময় তিনি বললেন আমি যে দিন ফিরে যাব, তিনিই আমায় পৌঁছে দেবেন। উত্তরে আমি তাঁকে বলি তার কোনও প্রয়োজন নেই, আমি হোটেল থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে নেব। যাওয়ার দিন যে ট্যাক্সি নিলাম তার ড্রাইভার আমাকে জীর্ণ, অপরিচ্ছন্ন, ম্যাড়মেড়ে, বস্তির সারির পর সারি এক পেঁচানো রাস্তা দিয়ে নিয়ে চলল। বস্তিতে অলস মানুষ ও ন্যাংটো বাচ্চারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এয়ারপোর্ট পৌঁছতে আমার কুড়ি মিনিট লাগল। তরুণ অধ্যাপকটি যে একমাত্র রাস্তার কথা  আমাকে বলেছিলেন সেটি কিন্তু মিথ্যা নয়। কারণ যে শহরে, পরিবারে তিনি জন্মেছেন ও বড় হয়েছেন, তার মানসিক ম্যাপ তাঁর মাথায় যে ভাবে আছে তাতে এই অঞ্চলগুলির কোনও অস্তিত্ব নেই। সেই ম্যাপে এই সব সরু অলিগলি, বস্তি এবং ইংরেজিতে যাকে বলে ‘রাফ ডিস্ট্রিক্টস’, যে পথ দিয়ে ট্যাক্সি আমাকে নিয়ে গেল, তার কোনও রেকর্ড নেই। তাঁর মানসিক ম্যাপে এই স্থানগুলি হল শূন্য স্পেস বা ফাঁকা পরিসর। এই স্পেসগুলি বাদ দিলে বাকি স্পেসগুলি অনেক বেশি উজ্জ্বল ও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই শূন্যস্থানে মানুষ প্রবেশ করে না। এখানে সে অরক্ষিত, বিস্মিত বোধ করে, এখানকার মানুষদের দেখে সে কিছুটা ভয়ও পায়।

আবার বলি, ভদ্রতাবোধ বা সৌজন্যবোধের মূল কথা হল অপরিচিতের সঙ্গে এমন ভাবে মেশা, যেখানে তার এই অপরিচিতি তার বিরুদ্ধে কাজ করবে না। সৌজন্যবোধ অপরিচিতের বৈশিষ্ট্যগুলি তাকে ত্যাগ করতেও বলে না। কিন্তু যে পরিসর ‘পাবলিক কিন্তু সভ্য নয়’ সেখানে অপরিচিতদের ব্যাপারে হাত ধুয়ে ফেলাই ভাল। তাদের সম্পর্কে কোনও ঝুঁকি নেওয়া নিরাপদ নয়। এদের জীবন থেকে ছেঁটে ফেলাই হল সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিকল্প। পার্থ্যককে সঙ্গী করে জীবন কাটানোর ক্ষমতা এবং তাকে উপভোগ করার দক্ষতা সহজে আসে না। এই ক্ষমতা হল এক আর্ট এবং অন্য সব আর্টের মতোই এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষা ও অনুশীলন। কিন্তু আজকের সমাজে এই সব গুণের আর কোনও সমাদর নেই। ফলে এই ভাবনার কোনও প্র্যাকটিসও নেই। ফলে আজকে কেউ জানে না অন্যের সঙ্গে কী ভাবে কথা বলতে হয়। আজকে নিজের জন্য যথাযোগ্য বাসস্থান বেছে নেওয়ার অর্থ হল স্থানিক পৃথকীকরণ, যা বাসস্থানকে সুরক্ষিত করবে। পৃথকীকরণের ফলেই তা দেওয়াল পরিবেষ্টিত। গেটে আছে দারোয়ান, যে অন্য কাউকে ঢুকতে দেবে না, শুধু নিজেদের লোক ছাড়া। প্রহরাবেষ্টিত এই বাসস্থানে সকলেই সকলের মতো, ফলে কথা বলাও খুব সহজ। যদিও কথা বলারও কিছু নেই।

‘অন্য’ পৃথক অচেনা বহিরাগতকে দূরে রাখার, কোনও রকম যোগাযোগ বিনিময় পারস্পরিক কমিটমেন্টকে প্রতিরোধ করার এই যে সিদ্ধান্ত, এটা অবশ্যম্ভাবী ছিল। এই সিদ্ধান্ত বস্তুত আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে অবসেশনের পরিণাম। এ হল এক সামাজিক বিকার। এই বিকার কিন্তু মনের বিকার নয়। বরং পাবলিক স্পেসের বিকারতত্ত্ব। এর পরিণাম হল ডায়ালগের আজ আর কোনও জায়গা নেই, আমরা মানুষের সঙ্গে নিজেকে বিজড়িত করার বদলে পালিয়ে যাওয়ার এক টেকনিক রপ্ত করে ফেলেছি। এক সময় উদ্বিগ্ন পিতামাতা তাদের সন্তানদের বলতেন, ‘অচেনা মানুষদের সঙ্গে কথা বলবে না’, এই উক্তি এখন বয়স্কদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের স্ট্রাটেজি। এই নীতিবাক্য বিচক্ষণ নিয়ম হিসেবে জীবনের বাস্তবতাকে পুনর্গঠিত করে। যেখানে অচেনা অপরিচিতরা হল সেই মানুষ, যাদের সঙ্গে কোনও রকম কথাবার্তা প্রত্যাখ্যান করা উচিত।

আগেই বলেছি, এই ভয়ের এক রাজনীতি আছে। এই রাজনীতি হল আরও বেশি সিসিটিভির মাধ্যমে নজরদারি, আরও বেশি পুলিশ নিয়োগ প্রভৃতি দাবি। এক নিরাপত্তা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে এবং তা আরও প্রসারিত হচ্ছে। এমন নতুন বাড়ির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা যে কত সুদৃঢ় সেটা বিজ্ঞাপিত করতে বলা হচ্ছে। এখানে শুধু গেট আর পাহারাদার নেই, ফ্ল্যাটের নিরাপত্তা সব চেয়ে আধুনিক মোবাইল টেকনোলজির সঙ্গে যুক্ত, যার ফলে অফিসে বসে নিজের মোবাইলে আপনি আপনার ফ্ল্যাটে কী ঘটছে তা দেখতে পারেন। সুতরাং আজকের সরকার এই নিরাপত্তাহীনতার শিকড়ে আঘাত হানতে অপারগ। সুবিধাবাদী রাজনীতির জন্য সরকার তা চায় না। শক্তপোক্ত প্রাচীর, উঁচু গেট, মজবুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, চব্বিশ ঘণ্টার নিরাপত্তারক্ষী দিয়ে মানুষ যে অনধিগম্য দ্বীপ তৈরি করেছে, এই দ্বীপের বাসিন্দাদের সঙ্গে সে অবশ্য স্বচ্ছন্দে স্বাধীন ভাবে কথাবার্তা বলতে পারে। কিন্তু কথাবার্তা বলার তো কিছুই নেই, কিছু রুটিন কথা বিনিময় করা ছাড়া। তার স্বপ্নের নিরাপত্তা সে লাভ করেছে সংযোগচ্যুতির ও ভেঙে যাওয়া বন্ধনের মূল্যে।