জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথের ঘরে সাহিত্যসভা বসেছে। বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিকরা বসে আছেন। একটি লম্বা-চওড়া যুবক সেখানে ঢুকে সোজা রবীন্দ্রনাথের কাছে এসে দাঁড়ালেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পরিচয় নিয়ে জানলেন, যুবকটি জোড়াসাঁকো থানার পুলিশ। জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি কিছু লেখো? যুবকটি বললেন, সামাজিক প্রবন্ধ লিখি। এই তো এ বারের ‘কল্লোল’ পত্রিকাতে ‘নীচের সমাজ’ নামে একটা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। কবি বললেন, হ্যাঁ লেখাটা পড়েছি মনে হচ্ছে। ভাল হয়েছে। তা তুমি সামাজিক প্রবন্ধ লিখছ কেন? এই বিষয়ে লেখার জন্য তো আমি আছি, শরৎ আছে। পারবে তুমি আমাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে? যুবকটি জিজ্ঞেস করলেন, তা হলে কী লিখব? রবীন্দ্রনাথ বললেন, শোনো, তুমি অপরাধীদের নিয়ে আছো, তাদের বিষয়েই লেখো।

গল্পটা স্বয়ং সেই যুবক, মানে, পঞ্চানন ঘোষালের কাছেই শোনা। পঞ্চাননবাবু শুধুই যে ভারতের প্রথম অপরাধবিজ্ঞানী ছিলেন তা নয়, বহু বই লিখেছেন অপরাধীদের নিয়ে। তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা। প্রায়ই তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন, আর জমিয়ে বসে গল্প করতেন।

নৈহাটি মাদরাল গ্রামে ছিল তাঁদের চারমহলা চকমিলানো বাড়ি। প্রত্যেক ঘরে-দালানে দেওয়াল ঘিরে উপরে নীচে ঝাড়লণ্ঠন, কুলুঙ্গিতে রাখা থাকত বাতিদানি। এক সময়ে পাইক-বরকন্দাজও ছিল। শরিকি ভাগাভাগি হওয়ার পর বড় বড় লোহার সিন্দুক থেকে সমস্ত মোহর চুরি যায়। ঠাকুমার একটা সিন্দুক ছিল, তাতে কয়েকটা তামার ঘড়া ভর্তি আকবরি মোহর। সিন্দুকটা প্রহরে প্রহরে অদ্ভুত ভাবে ডেকে উঠত। এটা ঘড়ির কাজ করত।

এক বার এক দল ডাকাত ঘোষালবাড়ির ছোটকর্তা রতনলালকে পালকি-সমেত ধরে ফেলল। জঙ্গলের ডেরাতে এনে বন্দি করে রাখল, মা কালীর সামনে বলি দেবে বলে। বলির আগে রতনকে কাছের দিঘিতে চান করে আসতে বলল। রতন ভাল সাঁতারু, জলে নেমেই ডুবসাঁতার দিয়ে ও-পারে গিয়ে একটা গাছের মগডালে উঠে রাত্রি কাটাল। ডাকাতরা সারা জঙ্গল খুঁজেও তাকে পেল না। পর দিন সকালে ছোটকর্তা বাড়ি ফিরে এল।

পঞ্চাননবাবুর ঠাকুমা এই গল্পটা শেষ করেই বলতেন, এটা সত্যি ঘটনা, কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র এটাকে একটা উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র ওঁদের আত্মীয়। তিনি পঞ্চাননবাবুর ঠাকুরদা কমলাপতির মাসতুতো ভাই। পঞ্চাননের ঠাকুরদার কাছে বঙ্কিম ইংরাজি শিখতেন।

মাদরাল গ্রামে প্রায় একশো বিঘে জমির ওপর কালাদিঘি নামে এক বিশাল দিঘি আছে। বঙ্কিমের ‘ইন্দিরা’ উপন্যাসে এর উল্লেখ আছে। ব্রিটিশ আমল থেকে এখানকার জঙ্গলময় জায়গাটা পঞ্চানন ঘোষালের দখলেই ছিল। সেখানকার জীর্ণ শিবমন্দিরটি তিনিই সংস্কার করেন। পরে এক ব্যবসায়ীকে দিয়ে মন্দিরের ওপরে একটি অন্নপূর্ণা মন্দির তৈরি করান। কালাদিঘির চার দিকের পাড়ে ডাকাতিয়া কালীমন্দির পর্যন্ত নানা দেবদেবীর মন্দিরগুলো সংস্কার করে, তিনি নতুন করে মন্দিরও করে দিয়েছিলেন। কালাদিঘির একটা ঘাটে এক পুরনো বটগাছের তলায় বঙ্কিমচন্দ্র প্রায়ই এসে বসতেন, লিখতেন। জায়গাটিকে সুন্দর করে বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন পঞ্চাননবাবু।

পঞ্চাননবাবুর পুলিশে আসার ঘটনাটাও চমৎকার। তিনি বলতেন, ‘আমার জ্যাঠামশাই হিরণ্ময় ঘোষাল ভারত সরকারের পক্ষে রুশ এমব্যাসিতে ফার্স্ট সেক্রেটারি ছিলেন। আমরা দু’ভাই হুগলিতে গিয়েছিলাম নজরুলের সঙ্গে দেখা করতে। জানতাম না, সেখানে স্পেশাল ব্রাঞ্চ গোয়েন্দা পুলিশের গোপন ওয়াচ মোতায়েন আছে। খবরটা সঙ্গে সঙ্গে তখনকার পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টের কাছে পৌঁছয়। টেগার্ট সাহেব তক্ষুনি আমাদের ডেকে পাঠালেন, আর জ্যাঠামশায়কে বললেন, এদের দুজনকে কলকাতার বাইরে যেতে দেবেন না। জ্যাঠামশায় বললেন, এতে কী সমাধান হবে? তখন টেগার্ট সাহেব বললেন, ‘Put them into police.’ তার পরেই আমাকে পুলিশ ট্রেনিং স্কুলে যেতে হল।’ এর পরে পঞ্চানন ক্রমশ নিজের চেষ্টায় পুলিশ অফিসার, কমিশনার, শেষে হোম অ্যান্টি করাপশন হতে পেরেছিলেন। নানা বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য তিনি বহু পুরস্কার পান।

কলকাতার বড় বড় ডাকাত-গুন্ডা-বদমাইশরা পঞ্চানন ঘোষালকে চিনতেন ও ভয় পেতেন। বাংলা-বিহার-ওড়িশা-অসমের দুর্ধর্ষ দস্যুসর্দার খোকা গুন্ডাকে তখনও তিনি বাগে আনতে পারেননি। বহু দিন ধরে তাকে ধরার চেষ্টায় ছিলেন। হঠাৎ এক বার সিভিল ড্রেসে তিনি দেওঘর এলেন, একেবারে খোকা গুন্ডার মুখোমুখি!

পঞ্চানন ঝাঁপিয়ে পড়লেন তার ওপর। খোকা তক্ষুনি একটা ধারালো ছুরি বের করে পঞ্চাননের বুকে বসিয়ে দেওয়ার আগেই কয়েক জন লোক খোকার কোমর ধরে ঝুলে পড়ল। কিন্তু খোকা একটা বিকট হুংকার দিয়ে ধাঁই করে এক ঘুসি মারল পঞ্চাননের মুখে। ঠোঁট-মুখ ফেটে রক্তারক্তি অবস্থা। কিন্তু সেটাও তিনি গ্রাহ্য না করে পালটা ঘুসি মারলেন। কিছু ক্ষণ ধস্তাধস্তির পর, পঞ্চানন জিতলেন, খোকাকে হাজতে তুলে আনলেন।

বিচারে খোকা গুন্ডার ফাঁসির অর্ডার এল। স্নান করে, ফুলের মালা পরে, সেন্ট মেখে, ঘর থেকে বেরিয়ে খোকা দেখল, পঞ্চাননবাবু তার সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছেন।

খোকা গুন্ডা ছুটে এসে পঞ্চাননকে জড়িয়ে ধরল। পঞ্চানন বললেন, আমার বড় লজ্জা করছে, আপনার মতো বীরকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলে হয়তো ভালই হত। খোকা বললেন, আপনার কাছে আমার একটা শেষ অনুরোধ আছে। শুনেছি, আপনি শুধু পুলিশ নন, এক জন ভাল লেখকও। পারবেন, আমার জীবন-ইতিহাস লিখতে? পঞ্চানন ঘোষাল বললেন, পারব। খোকা গুন্ডা তাঁর হাত দুটো ধরে বলল, মানুষ চোর-ডাকাতের গল্প পড়তে ভালবাসে, আমার ফাঁসির পরে আমি আপনার লেখার মধ্যে বেঁচে থাকতে চাই। এর পর ঘণ্টা বেজে উঠল।

পঞ্চানন ঘোষাল খুব শিগগির লিখে ফেললেন খোকা গুন্ডার জীবনের নানা কাহিনি। মাঝে মাঝে তাঁর নিজের জীবনের কিছু কাহিনিও এতে যোগ করেছেন। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের মানুষের জীবনকাহিনি একসঙ্গে লেখা হয়ে আছে ‘রক্তনদীর ধারা’ বইটিতে।