সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ভাঙা সম্পর্কের জাদুঘর

এক পাটি জুতো। ভাঙা হাতঘড়ি। কফি মেশিন, হাতে-আঁকা ছবি, ঘরের চাবি। ভালবাসার সম্পর্কের সঙ্গে অজান্তে জড়িয়ে যায় যে সব তুচ্ছ জিনিস, তারাই স্থান পেয়েছে এখানে। সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়

main
ঠিকানা: জাগ্রেব শহরে সেই সংগ্রহশালা। ডান দিকে, ঘরে এ ভাবেই সাজানো এক-একটি জিনিস। ছবি সৌজন্য: উইকিমিডিয়া কমন্স

সব কিছু ঠিকঠাক যাচ্ছিল না। মেয়েটা ভেবেছিল হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু হল না। এক সকালে ছেলেটা হঠাৎ জানাল, সে আর এক জনকে ভালবাসে। শুধু তা-ই নয়, সে দিনই ব্যাগপত্র গুছিয়ে চলে গেল অন্য মেয়েটির সঙ্গে থাকবে বলে। বাড়িটা ছেলেটারই, আসবাবও তারই কেনা। ছেলেটা বলে গেল, ইচ্ছে করলে মেয়েটা সেখানে থাকতে পারে। মেয়েটার হাতের কাছে একটা কুড়ুল ছিল, সেটা হাতে নিয়ে বহু আসবাব ফালাফালা করে দিল সে। কয়েকদিন পর নাকি ছেলেটা এসেছিল আর সমস্ত ভাঙা কাঠ সযত্নে গুছিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

যে কুড়ুলটা দিয়ে এই ধ্বংসলীলা হয়েছিল সেটিকে নিয়ে কী করা উচিত? জাদুঘরে রাখা উচিত? বাস্তবে তা-ই হয়েছে। যে সে জাদুঘর নয়, বিশেষ এক সংগ্রহশালা। নাম ‘মিউজ়িয়ম অব ব্রোকেন রিলেশনশিপস’— ভাঙা সম্পর্কের জাদুঘর। সেখানেই শোভা পাচ্ছে এই কুড়ুল, সঙ্গে উপরের গল্পটুকু। অ্যাড্রিয়াটিক সমুদ্রতীরে, মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত দেশ ক্রোয়েশিয়া, তারই রাজধানী জাগ্রেব এই জাদুঘরের ঠিকানা। 

চলচ্চিত্র প্রযোজক ওলিঙ্কা ভিসটিকা ও ভাস্কর দ্রাজেন গ্রুবিসিক-এর চার বছরের সম্পর্ক ভেঙে যায় ২০০৩ সালে। বিচ্ছেদের বেদনার মধ্যেই তাঁরা মজা করে বলেছিলেন, তাঁদের সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা জিনিসপত্র নিয়ে একটা সংগ্রহ করলে বেশ হয়। গোড়ায় সেটা ছিল নেহাতই কথার কথা, কিন্তু বছর তিনেক পরে সত্যিই নড়েচড়ে বসেন দু’জনে। বন্ধুদের কাছে চাইতে থাকেন এমন কোনও জিনিস যার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বেশ কিছু জিনিস জুটেও গেল, আর তা প্রদর্শিত হল জাগ্রেবের এক আর্ট গ্যালারিতে।

এর পর এই সংগ্রহ চলল বিশ্ব ভ্রমণে। জার্মানি, বসনিয়া, আর্জেন্টিনা, দক্ষিণ আফ্রিকা, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, আমেরিকা, আরও বহু দেশে গেল। সমব্যথী মানুষের দানে বাড়তে থাকল সংগ্রহ সম্ভার। এক বার্লিনেই পাওয়া গেল ৩০টি নতুন জিনিস, সবই বিচ্ছেদের বেদনা মাখা। ওলিঙ্কা ও দ্রাজেন ক্রোয়েশিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রকে বেশ কয়েকবার আবেদনও করেছিলেন এই সংগ্রহের একটা স্থায়ী ঠিকানার জন্য। প্রতি বারই আবেদন ব্যর্থ হতে রোখ চেপে গেল ওঁদের। নিজেরাই ভাড়া করলেন জাগ্রেব শহরের ৩২০০ বর্গফুট জায়গা। ২০১০-এর অক্টোবরে সেখানেই স্থাপিত হল ক্রোয়েশিয়ার প্রথম ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জাদুঘর।

কী আছে এই জাদুঘরে? মেয়েদের এক পাটি স্টিলেটো জুতো, এক পাতা গ্যাস্ট্রাইটিসের ট্যাবলেট, একটা ভাঙা হাতঘড়ি, কফিমেকার, মেট্রোয় আঁকা কোনও দম্পতির স্কেচ, বট্‌ল ওপেনার, ঘরে বানানো বর-বৌ পুতুল, মা আর ছানা-ব্যাং পুতুল, ছেঁড়া দস্তানা, আরও অসংখ্য জিনিস। বলা বাহুল্য, প্রতিটি জিনিসের সঙ্গেই জোড়া আছে এক-একটি গল্প। ভাঙা সম্পর্কের।

সত্যজিৎ রায়ের গল্পে রাস্তাঘাট থেকে কুড়িয়ে আনা জিনিসের এক আজব সংগ্রহ ছিল ‘বাতিক- বাবু’র। তার মধ্যে ছিল চশমার কাচ, কাচের সুরাপাত্র, ছেঁড়া দস্তানা। জাগ্রেবের এই জাদুঘর দেখলে সেই গল্পের কথা মনে পড়তে পারে। তফাত আছে অবশ্য। বাতিকবাবুর সব কিছুর সঙ্গেই আকস্মিক বা অপঘাতজনিত মৃত্যু জড়িত, তাঁর অতিপ্রাকৃত ক্ষমতায় তিনি সেই সব জিনিস দেখেই পিছনের ঘটনাটি সিনেমার মতো দেখতে পেতেন। ভাঙা সম্পর্কের জাদুঘরে সবই নিতান্ত লৌকিক।

মেয়েটি থাকত আর্মেনিয়ায়। প্রতিবেশী ছেলেটির ভাল লাগত তাকে। মুখে কিছু বলতে না পেরে সে শুধু একটা পোস্টকার্ড মেয়েটির দরজা গলিয়ে ফেলে দিয়েছিল। তাও তিন বছর ধরে মেয়েটিকে ভালবাসার পর। ছেলেটির বাবা-মা এর কিছু দিন পর মেয়েটির বাড়িতে আসে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। কিন্তু বিধি বাম। মেয়েটির বাবা-মা কী কারণে দুর্ব্যবহার করে তাড়িয়ে দিলেন তাঁদের। সেই সন্ধ্যাতেই গাড়ি চালিয়ে পাহাড়চূড়ায় গেল ছেলেটি, গাড়ি নিয়ে ঝাঁপ দিল সেখান থেকে। সেই পোস্টকার্ডটা আছে এই সংগ্রহশালায়। সে দিনের সেই মেয়েটি সেটা জমা দিয়েছে সত্তর বছর পর!

হেলসিঙ্কির এক ভ্যালেনটাইনস ডে পার্টিতে আলাপ, আর প্রথম দর্শনেই প্রেম দু’জনের। ছেলেটির তখন দুর্দশা। নিজের কোম্পানি বন্ধ হয়ে গিয়েছে, গলা অবধি দেনা। সকাল-বিকেল দুটো আলাদা চাকরি করতে হচ্ছে দেনা শোধ করতে। মেয়েটির তাতে কিছু আসে যায় না। সে চলে এল ছেলেটির সঙ্গে থাকতে। এক দিন এক সঙ্গে রাতের মেট্রোয় ফিরছে, এক অচেনা ভদ্রলোক এক টুকরো কাগজ বাড়িয়ে দিলেন। ওদের দুজনের একটা স্কেচ করেছেন তিনি! স্টেশনে নেমে গেলেন, তাঁর নামটাও জানা হয়নি ওই জুটির। মেয়েটি অসম্ভব ভালবাসত ছেলেটিকে, তার জন্য সব কিছু ছাড়তে প্রস্তুত সে। গোল বাধল সেখানেই। মেয়েটি বিদেশের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বৃত্তি পেল, কিন্তু প্রেমিককে ছেড়ে যাবে না সে। ছেলেটি অনেক বোঝাল, কিন্তু ফল শূন্য। শেষমেশ চরম পথ নিল ছেলেটি। তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে জানিয়ে দিল, তাদের সম্পর্ক শেষ। চোখের জল মুছে সেই মেয়ে চলে গেল বিদেশে। এর চার মাস পরে ছেলেটি তার কারখানায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হল। প্রাণে বাঁচল বটে, কিন্তু মারাত্মক আহত হল। সেই মুহূর্তে অনুভব করল প্রেমিকা পাশে না থাকার শূন্যতা। সে মেয়েটিকে লিখল, সেরে উঠেই সে ও দেশে আসছে। ওখানেই কাজ করবে, এক সঙ্গে থাকবে তারা। মেয়েটির উত্তর এল, অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। সে অন্য এক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে, এই ছেলেটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কোনও ইচ্ছে তার আর নেই। না, ছেলেটিও আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি। হয়তো খুঁজে চলেছে সেই মেয়েটির মতো কাউকে। আর মেট্রো রেলে সেই আগন্তুকের আঁকা তাদের দু’জনের সেই স্কেচ জমা দিয়েছে এই জাদুঘরে।

সম্পর্কের অনেক রূপ, অনেক নাম। সম্পর্ক ভাঙার কারণ ও দর্শনও বিচিত্র। সব মিলিয়ে এই জাদুঘর হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবনের এক পাঠশালা। সমাজতত্ত্ব, অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞানের অনেক বইয়ের প্রায়োগিক পাঠ পাওয়া যাবে এখানে। তত্ত্ব আর তথ্যে ভরা বই অনেক সময়ই রসকষহীন, কিন্তু এই সংগ্রহশালায় পাওয়া যাবে প্রাণের পরশ।

আমস্টারডাম, ১৯৫৯। ওরা দু’জন ছিল খুব কাছের বন্ধু। এক সঙ্গে একটা খালে স্নান করতে গিয়ে কানমলা খেয়েছে। শাস্তি হিসেবে স্কুলের পুরো ছুটিটা মেয়েটাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল খিটখিটে এক পিসির সঙ্গে থাকতে। ওদের দু’জনের বয়স যখন পনেরো, তখন ছেলেটি তার বাবা-মায়ের সঙ্গে জার্মানি চলে গেল। অনেক চোখের জল ফেলে দু’জনে দু’জনকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, প্রতি সপ্তাহে চিঠি লিখবে। পরে, কোনও এক দিন বিয়ে করবে ওরা। তা আর হয়নি। জীবন দু’জনকে নিয়ে গিয়েছে পরস্পরের থেকে বহু দূরে। জীবনের নানা বাঁকে ঘা খেয়ে মেয়েটি তখন পেশা করেছে দেহব্যবসাকে। এক দিন এক ‘অন্য রকম’ খদ্দের এল তার কাছে— সে পীড়িত হতে, চাবুক খেতে চায়। ছোটবেলায় তার মা তাকে জুতো দিয়ে পিষত, আর বাবা মারত চাবুক। সেই ‘অনুভূতি’ সে ফিরে পেতে চায়। মেয়েটি চিনতে পারে, এ তার সেই ছোটবেলার খেলার সঙ্গী। ছেলেটি এর মধ্যে দ্বিতীয় বার বিয়ে করেছে। সে চায় না সেই বিয়েও ভেঙে যাক। তাই এই মেয়েটির সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখতে সে আগ্রহী নয়। কিন্তু সে তাকে ভুলতেও পারবে না। তাই সে চেয়ে নেয় মেয়েটির এক পাটি স্টিলেটো জুতো। সেই জুতোও রাখা আছে এই জাদুঘরে।

‘ইউরোপিয়ান মিউজ়িয়ম ফোরাম’ ২০১১ সালে এই জাদুঘরকে দিয়েছে ‘কেনেথ হাডসন’ পুরস্কার। এই পুরস্কার দেওয়া হয় সেই সমস্ত সংগ্রহশালা বা প্রকল্পকে, প্রচলিত চিন্তাভাবনার বিপরীতে গিয়ে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করেছে যারা। ২০১৬ সালে এই জাদুঘরের একটি শাখা স্থাপিত হয়েছে লস অ্যাঞ্জেলসে। এই জাদুঘর সম্পর্কে ইউরোপিয়ান মিউজ়িয়ম ফোরাম-এর বিচারকেরা বলেছেন, এই জাদুঘর শুধু মানুষের সম্পর্কের ভঙ্গুরতার কথাই বলে না, সম্পর্ক ভাঙার পিছনে যে রাজনৈতিক সামাজিক এমনকি সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিত, তা নিয়েও চিন্তাভাবনায় উৎসাহিত করে। একান্ত ব্যক্তিগত পরিসরের উত্তরণ ঘটেছে এখানে, এক-একটা জিনিসের মধ্য দিয়ে চিনে নেওয়া যাচ্ছে সময়বিশেষে এক-একটা দেশ বা সমাজের বৈশিষ্ট্যগুলোকে।

স্লোভেনিয়ার ছেলেটি মেয়েটিকে খুবই ভালবাসত, কিন্তু কখনও তাকে বিয়ের কথা বলেনি। শারীরিক সম্পর্কও হয়নি তাদের মধ্যে। রোজই সে মেয়েটিকে কোনও উপহার দিত, ছোটখাটো কিছু। যেমন একটা চাবি, একটা বট্‌ল ওপেনার। দুটোই মিনিয়েচার, আর ব্রোঞ্জের তৈরি। মেয়েটির আজ মনে হয়, সেই চাবিটা তার হৃদয়ের দরজা খোলার চাবি, আর বট্‌ল ওপেনারটা তার মাথা ঘুরে যাওয়ার প্রতীক। ছেলেটি যে তাকে কত ভালবাসত, মেয়েটি বুঝতে পারে অনেক পরে। খবর এসেছিল, ছেলেটি মারা গিয়েছে এডস-এ। অনেক অনুরোধ-উপরোধ, অভিমান সত্ত্বেও মেয়েটির সঙ্গে সে কারণেই শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি সে।

আদর্শ সম্পর্কের সংজ্ঞা কী? কেউ বোধহয় তা ঠিক বলতে পারবেন না, কারণ সংজ্ঞার গণ্ডিতে তাকে বাঁধা যায় না। আদর্শ সম্পর্কের কয়েকটা বৈশিষ্ট্য জানতে চাইলে অনেকেই অনেক কিছু বলবেন। একটা কথা সবাই বলে থাকেন, দু’জনের সম্পর্কে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা থাকা দরকার। অনেকেই আক্ষেপ করেছেন, ব্যক্তিজীবনে তাঁরা সেই স্বচ্ছতা অর্জন করতে পারেননি, সব কথা অন্যকে বলতে পারেননি। টোকিয়োর এক জুটির মত অবশ্য ভিন্ন।

ছেলেটি ছিল মুখচোরা, মেয়েটিকে ভাল লাগা সত্ত্বেও বলতে পারেনি। এক বড়দিনের ভোরে সে দেখে তার বালিশের নীচে একটা চিঠি, যা লেখা হয়েছে একটি ছবির বইয়ের প্রথম পাতায়। তারা প্রতিবেশী। মেয়েটি তখন এক মুখ দুষ্টু হাসি নিয়ে এসে উপস্থিত। ছেলেটি ভীষণ খুশি। কত কিছু বলার আছে, কিন্তু বলতে পারেনি। আজ মেয়েটি সেই বরফ গলিয়েছে। দারুণ জমে উঠল সেই প্রেম। প্রচুর গল্প, বিস্তর আড্ডা। কিন্তু রংমশাল যেমন দারুণ আলো ছড়িয়ে তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়, সেই প্রেমও তেমনই নিভে এল। দু’জনে দু’জনের কাছে কোনও  দেওয়াল রাখেনি, একে অন্যকে বড় বেশি জেনে ফেলেছিল। আগ্রহও উবে গিয়েছিল তাই। বিচ্ছেদের অনেক পরে সেই ছবির বই আর চিঠিটা সেই ছেলে জমা দিয়েছে এই জাদুঘরে— এই বইটা আজও তাকে কষ্ট দেয়। নীচে লিখেছে, ‘বিদায় প্রথম প্রেম, স্বাগত মহাপৃথিবী।’

সম্পর্কের অনেক নাম, অনেক রূপ। এখানে শুধু প্রণয়সম্পর্কের কথাই বলা নেই। একটা সুন্দর পুতুল রয়েছে, মা ব্যাং ছানা ব্যাং-কে কোলে নিয়ে বসে আছে। তার তলায় লেখা, ‘এই পুতুলটা মা আমাকে দিয়েছিল বড়দিনে। আমার তিন বছর বয়সে মা আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল।’

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন