• দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সচেতনতার অনুসন্ধান

অসাধু ব্যবসায়ী আর মিথ্যা বিজ্ঞাপন শুধু এ যুগে নয়, উনিশ শতকের বাংলাতেও ছিল। তা থেকে ক্রেতাদের বাঁচাতে শুরু হল পত্রিকা। সম্বল শুধু সততা, সহানুভূতি।

Anusandhan magazine
‘অনুসন্ধান’ পত্রিকা। ছবি সৌজন্য: বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ

সাধারণী বা সোমপ্রকাশ-এর মতো উনিশ শতকের উল্লেখযোগ্য পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর লেখা তত দিনে সমাদর পেয়েছে সংস্কৃতি বলয়ে। সদ্য সম্পাদনা শুরু করেছেন ‘বঙ্গরবি’ নামে একটি সাময়িক পত্রিকা। এমন সময় সহচর কয়েক জনকে নিয়ে তৈরি করে ফেললেন এক অভিনব সমিতি। ১৮৮৬ সাল সেটা।

দুর্গাদাস লাহিড়ী যখন ‘অনুসন্ধান সমিতি’ তৈরি করছেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র তেইশ। এক বছরের মধ্যেই, ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে (১৩ শ্রাবণ, ১২৯৪) এই সমিতি প্রকাশ করে ফেলল তাদের পত্রিকা ‘অনুসন্ধান’। যে পত্রিকা সর্বার্থেই অনন্য। যে উদ্দেশ্য নিয়ে ‘অনুসন্ধান’ যাত্রা শুরু করেছিল, আজ ১৩০ বছর পরও ভাবলে বিস্ময় জাগে। এই পত্রিকার উদ্দেশ্য ছিল ক্রেতা-সাধারণকে বিজ্ঞাপন-জুয়াচুরি থেকে বাঁচানো। মফস্‌সল থেকে এসে চরম দারিদ্র আর প্রবল লড়াইকে যুঝে কলকাতায় টিকে থাকা দুর্গাদাস লক্ষ করেছিলেন, নানা বিজ্ঞাপনী-ফাঁদে নিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন দরিদ্র অসহায় সাধারণ মানুষ। তাঁদের বিপর্যয় ব্যথিত করছিল দুর্গাদাসকে। সেই অসহায় মানুষদের সামলাতে প্রথম উদ্যোগ হিসেবে তিনি তৈরি করলেন অনুসন্ধান সমিতি। পত্রপত্রিকা বা লিফলেটে কোনও বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হলে সমিতির সদস্যরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিজ্ঞাপনদাতার সন্ধানে বেরিয়ে পড়তেন। বিজ্ঞাপনটিতে মিথ্যে প্রচার বা প্রতারণার আঁচ পেলে তা প্রকাশ্যে এনে সচেতন করতে চাইতেন মানুষকে। এর জন্য গণমাধ্যমে সমিতি সদস্যরা বিজ্ঞাপন-প্রতারকের বিষয় জানিয়ে খবর পাঠাতেন। কিন্তু অধিকাংশ সংবাদপত্রেই তা প্রকাশ হত না। ফলে সমিতির বিস্তর ছোটাছুটি তেমনই সাফল্যই পেত না।

কিন্তু দুর্গাদাস দমে যাওয়ার পাত্র নন। তাই অচিরেই সমিতি তার নিজস্ব পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিল। প্রকাশিত হল ‘অনুসন্ধান’ পত্রিকা। যার প্রথম সংখ্যায় দুর্গাদাস লিখেছেন—‘সকল সংবাদপত্র দ্বারা ঠিক সময়ে সে কার্য (বিজ্ঞাপন-প্রতারকের খবর প্রকাশ) হওয়া অসম্ভব। আমরা যে সমস্ত রিপোর্ট পাঠাই-না কেন, নানা কার্যে লিপ্ত সংবাদপত্রে ঠিক সময়ে তাহার আলোচনা হয় না। আর বিলম্বে আলোচনা হেতু তাহাতে অনেকে ঠকিয়া যান ও জুয়াচোর সাবধান হয়।’

পরাধীন ভারতবর্ষে ক্রেতা সুরক্ষার ভাবনা যখন তৈরিই হয়নি, তখন এক বাঙালির ক্রেতা-স্বার্থরক্ষার এমন উদ্যোগ একুশ শতকের মানুষদের চমকে দেয় বই কি। কী ভাবে সাধারণ মানুষকে বিজ্ঞাপন-জুয়াচুরি (এই শব্দ-দ্বয়ের ব্যবহার করেছেন দুর্গাদাস) থেকে রক্ষা করতেন তিনি?

‘অনুসন্ধান’-এর সদস্যরা কোনও বিজ্ঞাপনে মিথ্যে প্রচার বা জালিয়াতির সন্ধান পেলে প্রতারক বিজ্ঞাপনদাতার নামধাম-সহ প্রতারণার ধরনটি সবিস্তার প্রকাশ করতেন পত্রিকার পাতায়। পত্রিকার প্রথম পাতায় ‘প্রতারণা-প্রব়ঞ্চনা’ শিরোনামে সেগুলি ছাপা হত। ১৩ শ্রাবণ ১২৯৪ অর্থাৎ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত দু’টি সংবাদের নমুনা দেওয়া যেতে পারে— ‘‘নফরচন্দ্র দত্ত, ৪৬ নং শোভাবাজার স্ট্রিট। কলিকাতা। এই ব্যক্তি নানাবিধ ঔষধ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মূল্য দিলে সুলভমূল্যে পাওয়া যাইবে বলিয়া ‘গৃহচিকিৎসাসার’ নামক পুস্তকের জাঁকালো বিজ্ঞাপণ দেন। কিন্তু বিজ্ঞাপণে ভুলিয়া টাকা পাঠাইয়া লোকে পুস্তক তো পানই না, তাছাড়া ঔষধেরও ফল নাই। সন্ধানে জানা যায়, নফর দত্ত ও বহুরূপী দত্তজা জুড়িদার এবং স্বয়ং গা-ঢাকা দিয়েছেন।’’ ‘‘রজনীকান্ত ভট্টাচার্য, ২ নং হাটখোলা। ইনি ১৮৮৬-’৮৭ সালের এন্ট্রেন্স পরীক্ষার্থীর জন্য ইংরাজি-অর্থ পুস্তক বাহির করিবেন বলিয়া অগ্রিম টাকা লন। কিন্তু পুস্তক প্রকাশ দূরে থাক, পাড়ার লোকে বলে এখন দেশে পলাইয়াছে।’’

আর একটি নমুনা, ১৫ ভাদ্র ১২৯৪-এর। ‘‘রায়চৌধুরী এণ্ড কোং ১৪৪ নং আমহার্স্ট স্ট্রীট। এই ঠিকানা হইতে বঙ্গবাসী প্রভৃতিতে চক্ষুরোগের ঔষধ ‘নেত্রকমল’, ‘সুখসেব্য-প্লীহাদলন’, ‘অম্লান্তক রেণু’ ও ‘তোতলার মহৌষধ’ প্রভৃতির জাঁকালো বিজ্ঞাপন বাহির হয়। তাহা দেখিয়া সমিতির জনৈক মেম্বর ওই বিষয়ের সন্ধান জন্য ও তিন শিশি নেত্রকমল কিনিতে গিয়া এইরূপ রিপোর্ট দিয়াছেন—‘ওই ঠিকানায় ওই নামের কোনও দোকান নাই। বাজারের উপর একটি ঘরে একটি ছোকরা ওই ওষুধ বিক্রয় করে। সে বলে— ঔষধ দমদম বারাসতের হরিনাথ রায়চৌধুরীর তৈয়ারী, তিনি ডাক্তার-কবিরাজ কিছুই নন।’’

পাক্ষিক এই পত্রিকাটির এমন উদ্যোগ (যদিও এ সবের পাশাপাশি অন্য রচনাও প্রকাশিত হত) জনমনে তুমুল প্রভাব ফেলল। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সমাজের উচ্চস্তরের মানুষেরাও অচিরেই পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠলেন ‘অনুসন্ধান’-এর। দুর্গাদাস সাড়া পেলেন বর্ধমানের পারাজ পরগনার বাবু নন্দলাল বাগচি, তমলুকের বাবু উপেন্দ্রনাথ দাস, শান্তিপুর সূত্রাগড় বেড়পাড়ার বাবু লক্ষ্মীকান্ত অধিকারী প্রমুখের থেকে। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস আঁকড়ে ‘অনুসন্ধান’ পাক্ষিক থেকে সাপ্তাহিক হল,  ১৮৯৪ সালের মধ্যেই। ১৫ ফকিরচাঁদ দে-র গলির স্বল্প পরিসর ছেড়ে পত্রিকার অফিস উঠে এল ১৮৯ বউবাজার স্ট্রিটে। বার্ষিক গ্রাহক মূল্যও দেড় টাকা থেকে বেড়ে হল চার টাকা। কিন্তু শুধু দাম বাড়িয়ে তো কাগজ চালানো যায় না! চাই বিজ্ঞাপন। কিন্তু কে বিজ্ঞাপন দেবে অনুসন্ধানকে?

কাগজ চালানোর জন্য দুর্গাদাস আর একটি কৌশল নিলেন। অনুসন্ধানের পাতায় ছেপে দিলেন থ্যাকার, নিউম্যান, স্কুলবুক সোসাইটি, বেঙ্গল মেডিক্যাল লাইব্রেরি, স্মিথ, বাথগেট, ব্যানার্জি কোম্পানি, গঙ্গাপ্রসাদ সেন, কে দত্ত প্রভৃতি সেকালের কলকাতার কিছু সৎ এবং সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নাম। বিজ্ঞাপন এবং উৎপাদনে যারা সততা বজায় রাখে। এদের থেকে বিজ্ঞাপন নিচ্ছে অনুসন্ধান। নিরবচ্ছিন্ন দু’দশক ‘অনুসন্ধান’ শিরদাঁড়া সোজা করে নিজের লক্ষ্যে স্থির থেকেছে। তত দিনে দুর্গাদাস জড়িয়ে পড়েছেন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজে। শুরু করেছেন ‘সাহিত্য সংবাদ’ ও ‘স্বদেশী’ পত্রিকা সম্পাদনার কাজ। ইংরেজ সরকার এ দেশ থেকে খাদ্যদ্রব্য বিদেশে রফতানি করে মুনাফা লাভের চেষ্টা শুরু করলে দুর্গাদাস এর প্রতিবাদে গঠন করেছেন ‘অন্নরক্ষিণী সভা’। লিখেছেন রানি ভবানী কিংবা লক্ষ্মণ সেনের জীবন-উপন্যাস। অনুবাদ করেছেন ঋক, সাম, যজুঃ, অথর্ব সহ চারটি বেদই।

২৮ এপ্রিল ১৮৬৩ থেকে ৫ অগস্ট ১৯৩২, তাঁর ৭০ বছরের জীবনে আরও দু’টি উল্লেখযোগ্য কাজ ‘পৃথিবীর ইতিহাস’ (সাত খণ্ডে, ১৯০৯-’১৯) এবং ‘বাঙালীর গান’ (১৯০৫)। ‘বাঙালীর গান’ প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার গানের অমূল্য সংগ্রহ। সঙ্গে ২২৭ জন বাঙালি গীতিকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী।

সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বর্ধমানের এই বাঙালির কৃতিত্ব অসামান্য। কিন্তু এ দেশে ক্রেতা সুরক্ষার ধারণা তৈরিতে তাঁর অবদানের কথা আমরা ভুলেই গিয়েছি। উনিশ শতকের বাংলায় ক্রেতা সুরক্ষার ধাঁচাটি কার্যত একক উদ্যোগে নির্মাণ করে দিয়েছিলেন দুর্গাদাস লাহিড়ী ও তাঁর ‘অনুসন্ধান’ পত্রিকা। একুশ শতকেও বিজ্ঞাপনে জুয়াচুরি আছে। কিন্তু এখন ক্রেতার হাতে অনেক ঢাল-তরোয়াল, পাশে সরকারও। কিন্তু তখন দুর্গাদাসের অবলম্বন বলতে ছিল সততা। কপটতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের তীব্র মনোবল।
আর অসহায়, প্রতারিত মানুষগুলির প্রতি গভীর সহানুভূতি।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন