কার্ল হ্যামারগ্রেন নামে এক সুইডিশ সাহেবের কথা জানেন রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠক। এ দেশকে ভালবেসে, এ দেশের তরুণদের জন্য লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার কাজে তিনি অক্লান্ত ছিলেন আমৃত্যু। ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে গভীর যোগ ছিল তাঁর। হ্যামারগ্রেনের অকালমৃত্যু ১২৫ বছর আগে (১৩০১ বঙ্গাব্দ) জন্ম দেবে ‘অনধিকার প্রবেশ’ আর ‘বিদেশীয় অতিথি এবং দেশীয় আতিথ্য’ নামক রচনা। ব্যবধান প্রায় ৭৮ বছরের। রবীন্দ্র-অনুষঙ্গে জুড়ে যাবেন আর এক সাহেব। এ দেশকে ভালবেসে পরম মমতায় বাংলার মন্দিরশিল্পের হারানো গৌরব উদ্ধারে যিনি প্রাণান্ত প্রয়াস করবেন।

ডেভিড জন ম্যাককাচ্চন। ছিপছিপে চেহারা। স্মিত হাসি। কাঁধে ছোট একটা ব্যাগ আর গলায় ক্যামেরা। ও পার-এ পার বাংলা জুড়ে যিনি ছুটছেন পুরনো মন্দিরের খোঁজে। চিনছেন এবং চেনাচ্ছেন সে সব মন্দিরের গঠনরীতির স্বাতন্ত্র্য। গত শতাব্দীর ষাটের দশক জুড়ে বাংলা চিনত এমন এক সাহেবকে। মন্দিরের টানে যিনি মাইলের পর মাইল মেঠো পথ পাড়ি দিচ্ছেন অক্লেশে। তথ্য জানতে যিনি গভীর আগ্রহে শুনছেন গ্রামের সাধারণতম মানুষটির কথাও।

১৯৩০-এর ১২ অগস্ট ইংল্যান্ডের কভেন্ট্রিতে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম ডেভিডের। স্কুল শিক্ষা শেষে বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ১৮ বছরের তরুণ। এক বছর সেনাবাহিনীতে থেকে ভর্তি হন কেমব্রিজের জিসাস কলেজে। ১৯৫৩-য় স্নাতক হন ইংরেজি, জার্মান ও ফরাসি ভাষাসাহিত্যে। ১৯৫৭ সালে স্নাতকোত্তর। ইতিমধ্যেই তিনি শিক্ষকতার কাজে যোগ দিয়েছেন ফ্রান্সে। কিন্তু মন টিকল না সেখানে। ফিরে এলেন কভেন্ট্রিতে, বাবা-মায়ের কাছে। ১৯৫৭-র সেপ্টেম্বরে যোগ দিলেন বিশ্বভারতীতে।

রবীন্দ্র-প্রয়াণের ষোলো বছরের মাথায় ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে বিশ্বভারতীতে যোগ দেন ডেভিড। বাংলার শিল্প-সংস্কৃতিকে নিবিড় ভাবে চিনতে শুরু করেন এখান থেকেই। সাহেব মানুষ, এ দেশের জল চট করে সইবে কেন? এমনিতেই রোগা–পাতলা ডেভিড পড়লেন পেটের রোগে। অসুস্থ ডেভিডের শুশ্রূষায় এগিয়ে এলেন আর এক ভারত-প্রেমী। লীলা রায় তখন শান্তিনিকেতনে। নিজে হাতে রেঁধে খাইয়ে তিনি সুস্থ করে তুললেন সাহেবকে। শরীরে সয়ে গেল শান্তিনিকেতন, কিন্তু মন টিকল না নানা কারণে। বীরভূমের মন্দির ইতিমধ্যে তাঁর মধ্যে জাগিয়ে তুলেছে নতুন অনুসন্ধিৎসা। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ‘অভিযান’ ছবির শুটিং দেখতে যাওয়া এ ক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করে থাকতে পারে। শান্তিনিকেতন থেকে চলে এলেন কলকাতায়। ১৯৬০ সালে যোগ দিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে, তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে। এক দিকে শ্রেণিপাঠ, অন্য দিকে মন্দির সন্ধান— যেন দৌড় শুরু হল ডেভিডের। নিকটজনেরা জানেন, ক্লান্তিহীন তাঁর মুখে তখন একটাই কথা, ‘‘কাজ, অনেক কাজ, হাতে সময় কম।’’ শ্রেণিপাঠে কোনও খামতি না রেখে তিনি ছুটে বেড়াতেন কখনও মেদিনীপুর, কখনও বাঁকুড়া, কখনও বা বীরভূম। একটু লম্বা ছুটি তাঁকে নিশ্চিত টেনে নিয়ে যাবে ওড়িশা, ঢাকা বা পূর্ব-পাকিস্তানের কোনও প্রান্তসীমায়। খুঁজে বার করবেন কোনও বিরল দোচালা বা টেরাকোটার কোনও হারানো সম্পদ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়াতেন, দিনরাত ব্যস্ত থাকতেন ক্লাস লেসন অথবা মন্দিরকলার চর্চা নিয়ে। সঙ্গে ছিল পত্রপত্রিকায় গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখা। ঠিক থাকত না খাওয়াদাওয়ার। শরীরে সেই ছাপ পড়ছিল। কেমন ছিল তাঁর পড়ানো? প্রবীণ অধ্যাপক সুহৃদকুমার ভৌমিকের কথায়, ‘‘স্যরের ক্লাস ছিল একটা অভিজ্ঞতা। প্রতিটি বিষয়ে আলাদা লেসন প্ল্যান তৈরি করে আনতেন। সেগুলি ধরে ধরে আমাদের বোঝাতেন। তারপর চলত নানা জিজ্ঞাসার মীমাংসা। আমাদের নির্ভুল ইংরেজি লিখতে শেখানোও নিজের দায়িত্ব বলে মনে করতেন।’’ যাদবপুরে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে ডেভিড স্যরের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন সুহৃদবাবু। এই তরুণ সাহেব প্রফেসর শুরুর দিন থেকেই আপন করে নিয়েছিলেন তাঁর আন্তরিকতায়। ‘‘আমাকে কেন তাঁর ভাল লেগে গেল জানি না, সঙ্গী করে নিলেন। তাঁর সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলাম গ্রামবাংলার পথে পথে। আজ মনে হয়, ভাগ্যিস তিনি ডাক দিয়েছিলেন!’’ সুহৃদবাবুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল শীতের অবসন্ন বিকেলে। তাঁর গলায় হাহাকার: ‘‘স্যরের অকালে চলে যাওয়া এ দেশের সাংস্কৃতিক জগতে এক বিরাট ক্ষতি। ৪৭ বছর পরও তা পূরণ হল না।’’ কত দিন তাঁরা একসঙ্গে বেরিয়ে পড়েছেন গাঁ-গঞ্জের পথে! ডেভিড স্যরের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ সম্পর্কের আলো ছড়িয়ে আছে তাঁকে লেখা অজস্র চিঠিতে। ডেভিডের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়, পি লাল, বুদ্ধদেব বসুদের সম্পর্কের ভাস্কর্যময় কথন এখনও সজীব সুহৃদের কাছে। ডেভিডকে নিয়ে রচনা সঙ্কলন প্রকাশ করেছেন তিনি। পি লালও রাইটার্স ওয়ার্কশপ থেকে প্রকাশ করেছিলেন ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’। অমিয় দেবের মতে, ফাদার আঁতোয়ান বা ফাদার ফাঁল-র মতো ডেভিডও ছিলেন ভারতীয় তুলনামূলক সাহিত্যের এক নির্মাতা।  

সত্যজিৎ রায়ের একাধিক ছবির ইংরেজি সাবটাইটল ডেভিডেরই করা। অখণ্ড বাংলার মন্দিরের প্রায় ২০ হাজার ছবি তুলেছিলেন ম্যাককাচ্চন, যা আজ লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজ়িয়মে সংরক্ষিত। লিখেছেন নানা পত্রপত্রিকায়, বাংলার মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী ও টেরাকোটা ভাস্কর্য নিয়ে। মন্দির সংরক্ষণে সরব হয়েছেন, অপটু হাতে সংস্কারের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন সংবাদপত্রে। মন্দিরের আলোচনার পাশাপাশি ‘তুলনামূলক ধর্ম ও সহনশীলতার মনোভাব’ শিরোনামে তাঁর একটি রচনা আজ ৫২ বছর পরেও সমান প্রাসঙ্গিক। কাজ করেছেন বাংলার পটশিল্প নিয়েও, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে সাজিয়ে দিয়েছিলেন পটের এক চমৎকার প্রদর্শনী (১৯৭০)। দিনরাত কাজ করে বই লেখার উপকরণ গুছিয়ে তুললেন, যে বই সমসময় ও পরবর্তী প্রজন্মকে বাংলার মন্দির চর্চায় পথ দেখাবে। শেষ পর্যন্ত এশিয়াটিক সোসাইটি তাঁর ‘লেট মিডিভ্যাল টেম্পলস অব বেঙ্গল’ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়।

‘বাঁকুড়ার মন্দির’ বইয়ের লেখক অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রথম আলাপের সময় ডেভিড নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন ‘আমি ডেভিডবাবু’। দু’জনের সম্পর্ক পৌঁছেছিল পারিবারিক স্তরে, অমিয়বাবুর স্ত্রীর বানানো অল্প মিষ্টি দেওয়া পায়েস খুব ভালবাসতেন ডেভিড, ওঁরা তার নাম দিয়েছিলেন ‘ডেভিডভোগ’। অমিয়বাবু লিখেছেন,  ‘১৯৭০-এর শেষ দিকে বছরখানেকের ছুটিতে দেশে যাবার আগের কয়েক সপ্তাহ সে-পুস্তকের পাণ্ডুলিপি সম্পূর্ণ করবার কাজে তাকে অমানুষিক পরিশ্রম করতে দেখেছি। বৃষ্টিবাদলে কয়েকদিন গৃহবন্দি থেকে সে সময়ে একবার ডেভিডের বাড়ি গিয়ে দেখি তার ঘর সম্পূর্ণ লণ্ডভণ্ড। ফুটো ছাদের এত অসংখ্য স্থান দিয়ে জল পড়ছে যে তার রাশি রাশি বই, কাগজপত্র, পুরাকীর্তির সংগ্রহ ছত্রখান করে সরিয়ে ফেলতে হয়েছে চারিদিকে। আর তারই মাঝখানে, একটু নিরাপদ জায়গায় এক সুটকেসের ওপর ড্রয়িং কাগজ বিছিয়ে সে নিবিষ্টচিত্তে একের পর এক মন্দিরের ভিত্তিচিত্র এঁকে চলেছে— তার প্রস্তাবিত বইয়ের জন্য।’ ‘দেশ’ পত্রিকায় (৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২) প্রকাশিত ওই লেখা আরও জানাচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেভিডকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে। নিজের সাইকেলটি দূরে নিয়ে যেতে পারতেন না বলে সেখানে দোকান থেকে ভাড়া নিতেন। এর জন্য কখনও ঘড়ির মতো ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও বাঁধা দিতে হত তাঁকে। ‘দ্রুততর যানবাহনের অভাবে, সীমিত সময়ের মধ্যে সে যে উত্তরকালের জন্য সর্বাধিক সংখ্যক মন্দিরের বিশদ তথ্য সংগ্রহ করতে পারল না, শুধু এ–ই ছিল তার আক্ষেপ,’ লিখেছেন অমিয়কুমার।

ডেভিডের সমকালে বাংলার মন্দিরের বিভিন্ন দিক নিয়ে অনেকেই গবেষণা শুরু করেন। পূর্ববর্তী গবেষকদের মধ্যে পঞ্চানন রায়, মানিকলাল সিংহ এবং সমসময়ের অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাপদ সাঁতরা, হিতেশরঞ্জন সান্যাল, দীপকরঞ্জন দাশ প্রমুখের সঙ্গে ডেভিডের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ডেভিড এঁদের সঙ্গে সারা বাংলা ঘুরেছেন, ছবি ও তথ্য বিনিময় করেছেন। তাঁর চিঠিপত্র ও নানা লেখায় তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে। যাঁর কাছে যেটুকু তথ্য পেয়েছেন, সবিনয়ে তা স্বীকার করতে কোথাও দ্বিধা করেননি ডেভিড। মৃত্যুকালে নিজের ক্যামেরাটা দিয়ে গিয়েছিলেন তারাপদ সাঁতরাকে। 

‘লেট মিডিভ্যাল টেম্পলস অব বেঙ্গল’ বই হিসেবে দেখে যেতে পারেননি ডেভিড। বইয়ের প্রেস কপি জমা দিয়ে তিনি বিলেত যান। ফিরে এসে গেলেন ওড়িশা আর মধ্যপ্রদেশের মন্দির দেখতে। ওড়িশা থেকে অসুস্থ হয়ে ফিরলেন কলকাতায়। মাত্র তিন দিনের অসুখ কেড়ে নিল ভারতপ্রেমী এই মন্দির-গবেষককে। ১১ জানুয়ারি থেকে পোলিয়োয় ক্রমশ অসাড় হতে থাকে তাঁর শরীর। ১২ জানুয়ারি ১৯৭২, রাত ১১টা নাগাদ সব শেষ। ভবানীপুর সমাধিক্ষেত্রে মাত্র ৪১ বছরের এই সাহেবের নশ্বর দেহ যখন আশ্রয় নিচ্ছে নীরব যাপনের, তখন চারপাশে অন্নদাশঙ্কর রায়, বুদ্ধদেব বসু,  অমিয় দেব, সত্যজিৎ রায়-সহ অসংখ্য বন্ধুজন আর ছাত্রছাত্রী। টেরাকোটার মন্দির ছিল তাঁর আকর্ষণের কেন্দ্র, পরে তাঁর সমাধিটিও টেরাকোটা অলঙ্করণে সেজে ওঠে সত্যজিৎ রায়ের উদ্যোগে, বন্ধুদের আন্তরিকতায়। 

ডেভিড চলে গেলেন, বাংলায় রইল তাঁর কাজ। এ দেশের প্রত্যন্ত কোনও প্রান্তে আজও হয়তো অবহেলায় পড়ে আছে কোনও একলা মন্দির, তরুণ কোনও গবেষকের অপেক্ষায়, ডেভিডের মতো যিনি নির্দ্বিধায় লিখতে পারবেন, ‘পূর্ব ও পশ্চিম উভয় বাংলাতেই এখনও শিল্প ও টেরাকোটা অলঙ্কারের এমন কতকগুলি উল্লেখনীয় মন্দিরের নমুনা আছে যা ধ্বংসপ্রায় হলেও এখনও মেরামতের অযোগ্য হয়ে পড়েনি। এই মন্দিরগুলি প্রধানত মুঘল যুগের; সেগুলিতে পোড়ামাটির যে অলঙ্করণ আছে তা পূর্বেকার মুসলিম ঐতিহ্যেরই বিস্তৃতি বা প্রসারণ।’