জীবন মশায় নামটা হয়তো অনেক পাঠকেরই পরিচিত। অনেকেই হয়তো এও স্বীকার করবেন যে জীবন মশায়ের চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যের একটি অবিস্মরণীয় চরিত্র। কিন্তু এ সব আলোচনার সময় বেশির ভাগ পাঠকের মানসচক্ষে মশায়ের যে ছবিটি ভেসে উঠবে, সেটি খুব সম্ভবত ধুতি-চাদর পরিহিত বিকাশ রায়ের মূর্তি। যাঁরা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাসটি পড়েননি তাঁরা তো বটেই, যাঁরা পড়েছেন তাঁরাও অনেক সময়ই ‘আরোগ্য নিকেতন’ উপন্যাসের মশায় আর বিজয় বসুর ছায়াছবি ‘আরোগ্য নিকেতন’-এর মশায়কে গুলিয়ে ফেলেন। আর তাই তো বীরভূমের রাঙা মাটি দিয়ে গড়া মশায়ের চরিত্রটি চলচ্চিত্রের আলোয় দেখতে হয়ে ওঠে বিকাশ রায়ের মতো।

উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরকালে যে একটি চরিত্র নবকলেবর ধারণ করবে তা বলাই বাহুল্য। তবু জীবন মশায়ের ক্ষেত্রে এই রূপান্তর ছিল অনল্প এবং অর্থপূর্ণ। তারাশঙ্করের লেখা চিরকালই বাস্তব অভিজ্ঞতা-আশ্রিত। রবীন্দ্রনাথও তাঁর লেখার মধ্যে গ্রামবাংলার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার স্পষ্ট স্বাদের কথা বলেছিলেন। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতানির্ভর বলেই তাঁর চরিত্রগুলি রক্ত-মাংসের মানুষের মতোই বহুমাত্রিক, প্রায়শই অন্তর্বিরোধী এবং স্থান-কাল অনুবন্ধী। এমন চরিত্রকে রূপান্তর করা মানেই তাকে প্রায় আমূল পরিবর্তন করা। জীবন মশায়ের চরিত্রের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছিল।

তারাশঙ্করবাবুর উপন্যাসে রাঢ় বাংলার গ্রামগুলিতে চিকিৎসাক্ষেত্রে নানান অন্তর্দ্বন্দ্ব আর জটিলতার যে ইতিহাসটি ছিল, বিজয়বাবুর হাতে তা হয়ে ওঠে প্রাচীন আয়ুর্বেদের বিরুদ্ধে নব্য চিকিৎসাব্যবস্থার জেহাদের গল্প। তার উপর আবার প্রলেপিত হয়েছিল একটি অসবর্ণ প্রেমের গল্প। মশায়ের খ্রিস্টান পুত্রবধূ এবং তাঁর গর্ভজাত মশায়ের নাতি, নব্য ভাবাপন্ন প্রদ্যুৎ ডাক্তার— এ সবই বিজয়বাবুর সৃষ্টি। তারাশঙ্করবাবুর গল্পে এ সবের কোনও প্রত্যক্ষ শেকড় নেই। উপন্যাসে প্রদ্যুৎ ডাক্তার হল মশায়ের কলেজজীবনের প্রেমিকার নাতজামাই। বিজয়বাবু যে কেন এই উপগল্পটি এত পরিবর্তন করলেন, তা জানা নেই। তবে জীবন মশায়কে প্রেমে আত্মহারা আধুনিক কলেজ-ছাত্র রূপে অবতরণ করালে যে তাঁকে ঐতিহ্যের প্রতিমূর্তি রূপে তুলে ধরা মুশকিল হত, তা তো স্বতঃসিদ্ধ।

আরও পড়ুন: প্রোফেসর শঙ্কুরও আগে

বিজয়বাবুর হাতের এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলিই আখ্যানটিকে করে তুলেছে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক সোজাসাপটা লড়াইয়ের গল্প। অতীত আর বর্তমান দুটিকেই পরিষ্কার করে এক-একটি চরিত্রের মধ্যে এঁকে ফেললেন তিনি। চিকিৎসা ব্যবস্থা, প্রেম, আধুনিকতা, ঐতিহ্য ইত্যাদি যেখানে যেখানে অন্তর্দ্বন্দ্ব বা দ্বিমাত্রিকতার আভাস ছিল, বিজয়বাবু সে সব অনুবর্তন করে সব কিছুকে একটা পরিষ্কার ছকে বেঁধে ফেললেন। যা ছিল আবছা, আলো-আঁধারি, তাকে করে দিলেন সাদা-কালো। আজকালকার নতুন ভাষায় বলতে গেলে বিজয়বাবু আখ্যানটির মেরুকরণ করলেন।

জীবন মশায়ের মতো চরিত্রগুলির আকর যে সব ঐতিহাসিক ব্যক্তি ও ঘটনার ভিতর তারাশঙ্করবাবু খুঁজে পেয়েছিলেন, তাঁদের পরিচয়গুলি একেবারেই চাপা পড়ে গেল বিজয়বাবুর মেরুকরণের তলায়। ছায়াছবির রুপোলি পর্দার আড়ালে হারিয়ে গেল তারাশঙ্করের চেনা সেই সমস্ত লোকজন, যাদের প্রতিকৃতিগুলি ফুটে উঠেছিল ‘আরোগ্য নিকেতন’ উপন্যাসের চরিত্রায়ণের মধ্যে।

সেই সব হারিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক মানুষ ওতপ্রোত জড়িত ছিলেন কবিরাজি চিকিৎসার অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত ঔপনিবেশিক বাংলায় এক বৃহৎ সামাজিক ও রাজনৈতিক মতভেদের ইতিহাসের সঙ্গে। সেই মতভেদের ভিত্তি ছিল মূর্ত কবিরাজি চিকিৎসার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা আর বিমূর্ত আয়ুর্বেদ চিকিৎসার এক অলীক ধারণার মধ্যেকার ফারাকটিতে।

বিজয়বাবুর জীবন মশায় ছিলেন শাস্ত্রীয় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার প্রতিমূর্তি স্বরূপ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন মশায় কিন্তু মোটেই তা ছিলেন না। উপন্যাসের জীবন মশায় নিজেই এক কালে অ্যালোপ্যাথি শিখেছিলেন। তিনি বা তাঁর পূর্বপুরুষরা কখনই অবিমিশ্র আয়ুর্বেদের ধ্বজাধারী ছিলেন না। বরং, মশায়ের চিকিৎসা পদ্ধতিটিকে বর্ণনা করতে গিয়ে তারাশঙ্করবাবু বলেছেন, সেটি ছিল একটি ট্রাইসাইকেলের স্বরূপ। তিনটি চাকার উপর স্থাপিত। একটি চাকা ছিল চরক-সুশ্রুতের সংস্কৃত শাস্ত্র, আর একটি ছিল অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা এবং তৃতীয়টি ছিল নানান ওঝা, গুনিন, ফকিরদের কাছে প্রাপ্ত অব্যর্থ সব মুষ্টিযোগ।

আরও পড়ুন: মাতৃসঙ্গীত গেয়েছেন তানসেন থেকে নজরুল

তারাশঙ্করবাবুর জীবন মশায়কে চিনতে গেলে তাই আগে চিনে নিতে হবে সেই সব নানান প্রান্তিক চরিত্রকেও, যাদের কাছে মশায় বংশ পেয়েছিল তাদের ট্রাইসাইকেলের তৃতীয় চাকাটি। এদের মধ্যে ছিলেন গোষ্ঠ কর্মকার, রঘুবীর ভারতী ছাড়াও নানান সন্ন্যাসী, বেদে, ওস্তাদ গুনিনরা। তিন পুরুষ ধরে এই সব প্রান্তিক মানুষের কাছ থেকেই বিদ্যা আহরণ করেছিলেন দেবীপুরের মশায় কবিরাজরা। গোষ্ঠ কর্মকারের বিদ্যা জীবন মশায় শিখতে পারেননি তাঁর নিজের শিক্ষাগুরু, রঙ্গলাল ডাক্তারের আপত্তির কারণে। কিন্তু তাও গোষ্ঠের ওষুধের উপর জীবন মশায়ের ভরসা ছিল অগাধ। পালাজ্বরের রোগীদের তিনি নিজেই পাঠিয়ে দিতেন গোষ্ঠের কাছে।

মূর্ত কবিরাজি চিকিৎসা চির কালই ছিল নানান ধারার সংমিশ্রিত রূপ। নানান রকমের লোকায়ত চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে যুগযুগান্ত ধরে মিশেছিল বিভিন্ন বৈদেশিক ধারা। এর মধ্যে সংস্কৃত শাস্ত্রের একটি ধারা যেমন ছিল, আবার পরবর্তী কালের ফকিরি চিকিৎসার নানান স্রোতও এসে মিশেছিল তাতে। তারও পরে আবার নানান ইউরোপীয় চিকিৎসা পদ্ধতিও দেশজ কবিরাজদের পুঁটলিবদ্ধ হয়েছিল। অবিমিশ্র শাস্ত্রীয় আয়ুর্বেদের যে এক অলীক ধারণা, তার অবতরণ হয়েছিল উনিশ শতকের শেষ দিকের নানান শহুরে তাত্ত্বিকদের কল্পিত ইতিহাসচর্চার মধ্যে। গ্রাম্য জীবনে বা চিকিৎসার প্রত্যক্ষ ইতিহাসের সঙ্গে এর বিশেষ মিল ছিল না।

বেশির ভাগ গ্রাম্য কবিরাজেরই সংস্কৃত জ্ঞান ছিল সীমিত। যে ক’জন মুষ্টিমেয় কবিরাজ সংস্কৃত শাস্ত্র অনুশীলন করতেন, তাঁদের চিকিৎসাতেও জীবন মশায়ের মতোই শাস্ত্রীয় জ্ঞানের পাশাপাশিই থাকত অকুলীন সব চিকিৎসা পদ্ধতি। বেদে, ফকির, সন্ন্যাসী, গুনিন আর ওঝাদের সঙ্গে গ্রাম্য কবিরাজদের ফারাকটা কোনও দিনই তেমন সুস্পষ্ট ছিল না। যেখানে সুস্পষ্ট ছিল তা হল সামাজিকতায় ও সামাজিক প্রতিপত্তিতে।

সংঘাত: ‘আরোগ্য নিকেতন’ ছবিতে শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় ও বিকাশ রায়

উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে তথাকথিত পুনর্জাগরণের নামে এই বিমিশ্র কবিরাজি চিকিৎসা পরিসংস্কারের দাবি উঠতে থাকে। কলকাতা ও ঢাকার নানান বিদগ্ধ কুলীন, সংস্কৃতজ্ঞ কবিরাজ দাবি করতে শুরু করেন যে চরক-সুশ্রুতের মতো প্রাচীন আয়ুর্বেদীয় পুঁথিগুলিতে যা নেই, তার কোনও ঠাঁই কবিরাজি চিকিৎসায় থাকতেই পারে না। তাঁদের মতে দেশজ, অকুলীন সমস্ত জ্ঞান বর্জন করে সংস্কৃত শাস্ত্রনির্ভরতার মধ্য দিয়েই দেশীয় চিকিৎসার পুনর্জাগরণ সাধিত করতে হবে।

দেশজ ও অশাস্ত্রীয় চিকিৎসা বর্জনের এই দাবি আবার হিন্দু ধর্মের ও বৈদ্য জাতির মহিমাকীর্তনেও সোচ্চার হয়। এই তিন দাবির সমন্বয় সব থেকে বলিষ্ঠ রূপে অবতীর্ণ হয় স্বনামধন্য কবিরাজ গণনাথ সেনের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। গণনাথ সেন ছিলেন আধুনিক যুগে আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসার প্রবাদপুরুষ। তাঁর লেখা নানান বই আজও আয়ুর্বেদীয় কলেজের ছাত্রছাত্রীরা পড়ে থাকেন। তাঁর হাতেই গড়ে ওঠে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ুর্বেদ বিভাগ। সেই সুবাদেই গণনাথ সেনের সঙ্গে পণ্ডিত মদনমোহন মালব্যের পরিচয় ঘনীভূত হয়, তাঁর মাধ্যমেই হিন্দু জাতীয়তাবাদের সংস্পর্শে আসেন তিনি। অন্য দিকে বাংলার বৈদ্য সমাজে গণনাথ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন বৈদ্য ব্রাহ্মণ আন্দোলনের। বৈদ্য জাতির গরিমা প্রকাশ ছাড়াও, এঁরা চেয়েছিলেন যে বৈদ্য জাতির সকলে ব্রাহ্মণোচিত ‘শর্মা’ পদবি গ্রহণ করবেন এবং আয়ুর্বেদের উপর তাঁদের একাধিকার স্বীকৃত হবে। ফলে কবিরাজি চিকিৎসার শাস্ত্রীয়তা এবং সংস্কৃতনির্ভর হিন্দু সত্তা সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

এই মতাদর্শের বিপক্ষে কোনও মতাদর্শ ছিল না। যা ছিল তা হল এক ধরনের ভাবাদর্শ। গণনাথ সেনের মতো কবিরাজরা থাকতেন শহরে। সেখানে তাঁদের সর্বদাই উঠতি অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হত। তার উপর আবার তাঁরা অনেকেই মেডিকেল কলেজ থেকে এলএমএস ডিগ্রিপ্রাপ্ত এবং তাই সদা সর্বদা অ্যালোপাথির মুখোমুখি। সেই প্রতিযোগিতা এবং সখ্যের মধ্যে দিয়েই তাঁরা অনুভব করেন স্বদেশি আর বিদেশি চিকিৎসার সীমা নিরুপণের তাগিদ। দেশীয় চিকিৎসার বিগত স্বর্ণযুগের ছবি আঁকার তাগিদ। ও দিকে বাংলার বহুল সংখ্যক কবিরাজ গ্রামে বাস করতেন। তাই তাঁরা ঠিক দেশি-বিদেশির সীমা নিরুপণ করার তাগিদ বোধ করতেন না। শহুরে আখড়ায় নিজেদের জাতীয় কৌলীন্য প্রমাণ করার তেমন কোনও স্পৃহাও তাঁদের ছিল না। গ্রামের মানুষের মধ্যে কৌলীন্য বিচার হয় সামাজিকতার নানা অনুষঙ্গের মাধ্যমে। পত্রিকা বার করে বা সভা-সমিতিতে প্রাচীন ভারতের জাতীয় মাহাত্ম্য কীর্তন করে তা হয় না।

অনেকটা ‘ঘরে বাইরে’র সন্দীপ আর নিখিলেশের মতো— এক জনের ছিল ওজস্বী বিমূর্ত এক মতাদর্শ, আর এক জনের ছিল প্রত্যক্ষ মূর্ত এক ভাবাদর্শ। এই মতাদর্শ আর ভাবাদর্শের বিতর্ক অবশেষে সুস্পষ্ট ভাবে স্ফুটিত হয় ১৯১৯ থেকে ১৯২৩-এর মধ্যে। তত দিনে এই দুই ধারার অনুসন্ধি হয়েছে তৎকালীন বঙ্গীয় রাজনীতির দুটি পৃথক ধারা।

এক দিকে গণনাথ সেন গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক যোগাযোগ হয়েছে বাংলায় হিন্দু জাতীয়তাবাদের কান্ডারি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। অন্য দিকে ভাবাদর্শবাদীদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উঠে এসেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও তাঁর শিষ্য সুভাষচন্দ্র বসু।

১৯১৯-এ কিশোরীমোহন চৌধুরী ও হাসান সুরাবর্দির প্রস্তাবে সম্মত হয়ে তৎকালীন বঙ্গীয় সরকার আয়ুর্বেদীয় ও ইউনানি চিকিৎসা ব্যবস্থার উৎকর্ষ সাধনের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেন। কী ভাবে এই সিদ্ধান্ত কার্যায়িত করা যায় তা নির্ধারণ করতে সরকার দুটি পৃথক কমিটি গঠন করেন। একটি আয়ুর্বেদ ও অন্যটি ইউনানি সংক্রান্ত। আয়ুর্বেদীয় কমিটিতে রাখা হয় ছ’জন কবিরাজকে। এঁদের মধ্যে এক জন বাদে সকলেই মতাদর্শবাদী গোষ্ঠীর পক্ষপাতী। এক মাত্র ব্যতিক্রম বিখ্যাত কবিরাজ শ্যামাদাস বাচস্পতি। কয়েক মাসের মধ্যেই বাচস্পতি মহাশয় কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন।
ইতিমধ্যে মহাত্মা গাঁধীর ডাকে ভারত তথা বাংলায় শুরু হয়ে যায় অসহযোগ আন্দোলন। তার সূত্র ধরেই দেশবন্ধুর অনুরোধে বাচস্পতি মহাশয় তাঁর গ্রে স্ট্রিটের বাড়িতে নতুন এক ভাবাদর্শবাদী আয়ুর্বেদীয় কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই কলেজের পাঠ্যক্রম ও যামিনীভূষণ রায় এবং গণনাথ সেন পরিচালিত আয়ুর্বেদীয় কলেজের পাঠ্যক্রমে ছিল উল্লেখযোগ্য ফারাক। যার মূলে ছিল কবিরাজি চিকিৎসার স্বরূপ সম্বন্ধে মতাদর্শের আর ভাবাদর্শের ভিন্নতা। 
অবস্থার পরিবর্তন ঘটে ১৯২৪-এর পৌরনির্বাচনের পরে। নির্বাচনে সে বার দেশবন্ধুর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস থেকে ভেঙে আসা স্বরাজ পার্টি জয় লাভ করে। সুভাষচন্দ্র পৌরসভার কার্যকর্তা মনোনীত হন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাচস্পতি মহাশয় তাঁর কলেজের জন্য পৌর অনুদানের আবেদন করে সুভাষচন্দ্রের দফতরে একটি দরখাস্ত দেন। সুভাষচন্দ্র সেই দরখাস্তটির প্রতি পৌরসভার পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করে সেটিকে পেশ করেন আয়ুর্বেদীয় কমিটির সামনে। 

যদিও কমিটিতে মতাদর্শবাদী কবিরাজদের আধিক্য ছিল এবং তাঁরা এত দিন ভাবাদর্শবাদীদের বাদ দিয়েই কাজ করছিলেন, এ বার সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। নির্বাচিত পৌরসভার প্রত্যক্ষ সমর্থনপ্রাপ্ত গোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে আর কাজ করা চলে না। তাই ১৯২১-এ তৈরি কমিটি অচল হয়ে পড়ে। শেষে সেটি ভেঙে দিয়ে নতুন একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এই পুনর্গঠিত কমিটিতে তৎকালীন আয়ুর্বেদীয় জগতের তিনটি পৃথক গোষ্ঠীকে স্থান দেয়া হয় সমান ভাবে। যামিনীভূষণ, গণনাথরা পান তিনটি আসন, কাশিমবাজারের রাজাদের দ্বারা সমর্থিত কবিরাজ রামচন্দ্র মল্লিকের গোষ্ঠী পান তিনটি আসন এবং বাচস্পতি গোষ্ঠী পান তিনটি আসন। এই শেষ তিনটি আসনের মধ্যে একটি পান বাচস্পতি মহাশয়ের সুযোগ্য পুত্র কবিরাজ বিমলানন্দ তর্কতীর্থ।

তর্কতীর্থ মশায়, গণনাথ সেনদেরই মতো যৌবনে অ্যালোপ্যাথি শিক্ষা করেছিলেন। তার কিছু কিছু পদ্ধতি তাঁর কবিরাজি চিকিৎসাতেও স্থান পেয়েছিল। তবে গণনাথবাবুর সঙ্গে তর্কতীর্থ মশায়ের ভাবনার অনেকটাই ফারাক ছিল। এই ফারাকগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল বিভিন্ন দেশজ ও লোকায়ত  দ্রব্যগুণ নিয়ে তর্কতীর্থ মশায়ের আগ্রহ। তাই তিনি অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার সকল আবিষ্কারকে সংস্কৃত শাস্ত্রগ্রন্থগুলিতে খুঁজে বার করতে সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর চিকিৎসায়, বাচস্পতি মশায়ের মতোই মতাদর্শরঞ্জিত, বিমূর্ত আয়ুর্বেদের প্রচ্ছন্ন ও শাস্ত্রীয় ধারণার চাইতে ছিল একটি মূর্ত কবিরাজি ভাবাদর্শ, যেখানে বহু ভিন্ন ধারার সমন্বয় ঘটে চলেছিল চির কালই।

এই ভাবাদর্শের ভিত্তি ছিল মূলত তিনটি পদের উপর। সংস্কৃত শাস্ত্রগ্রন্থগুলি, অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার কিছু পদ্ধতি এবং দেশজ ও লোকায়ত নানান মুষ্টিযোগ, পাচন, দ্রব্যগুণ ইত্যাদি। মানে জীবন মশায়ের ট্রাইসাইকেল। তর্কতীর্থ মশায় বৈদ্য ব্রাহ্মণ আন্দোলন থেকেও দূরে ছিলেন। দেশবন্ধু ও নেতাজির গোষ্ঠীভুক্ত হওয়ার দরুন তিনি ছিলেন ধর্ম ও জাতি বিষয়ে উদারভাবাপন্ন। যদিও নিজে এক সম্মানিত বৈদ্য বংশের সন্তান ছিলেন, তবু  কবিরাজি চিকিৎসাকে কেবল হিন্দু ধর্মের বা বৈদ্য জাতির একাধিকার ঐতিহ্য প্রতিপন্ন করার চেষ্টা তিনি করেননি। 

এই উদারপন্থী চিন্তাধারাই তর্কতীর্থ মশায়কে পরবর্তী কালে টেনে আনে সক্রিয় কংগ্রেস রাজনীতিতে। স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচনে তিনি কংগ্রেস প্রার্থী রূপে নির্বাচন লড়েন বর্ধমানের পূর্বস্থলী বিধানসভা কেন্দ্রে। পর পর তিন বার এই বিধানসভা আসন থেকে জয়ী হন। ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি বিধানসভায় পূর্বস্থলী কেন্দ্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। 
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন কংগ্রেসের সক্রিয় কর্মী। ১৯৫২ সালে তাঁকেও বিধানসভার মনোনীত সদস্য করা হয়। ১৯৬০ পর্যন্ত তিনিও ছিলেন বিধানসভার সদস্য। এই সময় তর্কতীর্থের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। সেই সুবাদেই তিনি কবিরাজি চিকিৎসার আধুনিক ইতিহাসের নানান মতবিরোধের ইতিহাসেরও আভাস পান। এই সময়েই, ১৯৫২ সালের চৈত্র মাসে প্রকাশিত হয় ‘আরোগ্য নিকেতন’ উপন্যাস। তারাশঙ্করের সঙ্গে বিমলানন্দের সেই সময়ের সখ্যের কথা জানিয়েছেন বিমলানন্দের পুত্র ব্রহ্মানন্দ গুপ্ত মশাই। ২০০৫-এর এক সাক্ষাৎকারে ব্রহ্মানন্দবাবু এও জানান, বিধানসভার সদস্য থাকাকালীন তারাশঙ্করবাবু ও বিমলানন্দবাবু অনেক সময়ই বিধানসভায় যেতেন বা আসতেন একই গাড়িতে। নানান আলোচনার মধ্যে আয়ুর্বেদ নিয়েও তাঁদের মধ্যে অনেক কথা হত। 

জীবন মশায়ের চরিত্রের মধ্যে তাই ফুটে উঠেছে বিমলানন্দের ভাবাদর্শ। তারাশঙ্করবাবু দেখিয়েছেন, মশায় বংশ মোটেই বৈদ্য জাতি উদ্ভূত নন। তাঁদের পূর্বপুরুষ ছিলেন জমিদারের সেরেস্তার কর্মী। পরবর্তী কালে তিনি এক বিখ্যাত কবিরাজের কাছে কিছুটা কবিরাজি শিক্ষা পান। তার পরে তিন পুরুষ ধরে এই বংশ ও তাদের কবিরাজি চিকিৎসাকে সমৃদ্ধ করেছিল নানান পদ্ধতি ও ওষুধ। সেই সমৃদ্ধির ইতিহাসে প্রথম যুগের অ্যালোপাথি চিকিৎসারও অবদান ছিল অনস্বীকার্য। এ ছাড়া মকবুল শেখ এবং পরান খাঁর মতো চরিত্রের মধ্যে দিয়ে তিনি হিন্দু কবিরাজদের সঙ্গে মুসলমান গ্রামবাসীদের আন্তরিক সামাজিকতার ছবিটিও— আমার ধারণা— এঁকেছেন কিছুটা উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের প্রতিপক্ষে। 
তবে জীবন মশায়ের উপর বিমলানন্দের ভাবাদর্শের প্রকৃষ্টতম প্রতিফলন ঘটেছে ওই ট্রাইসাইকেলের স্পষ্ট ধারণায়। বিমূর্ত, সংস্কৃত-আশ্রিত আয়ুর্বেদের আদর্শের জায়গায় এই উপমায় ধরা পড়েছে গ্রাম বাংলার মূর্ত ও অকুলীন কবিরাজি চিকিৎসার ভাবাদর্শ। মতাদর্শবাদীদের চোখে এই ট্রাইসাইকেলের দুটি চাকা অপাঙ্‌ক্তেয়। অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা আর দেশজ লোকায়ত চিকিৎসাগুলিকে হয় তাঁরা পুরোপুরি বর্জন করতে চেয়েছেন বা তাকে কোনও সংস্কৃত শাস্ত্রের অপভ্রংশ রূপে প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন। অ্যালোপ্যাথি বা লোকায়ত চিকিৎসার মধ্যে যে এমন কিছু থাকতে পারে যা গ্রহণযোগ্য অথচ যার ভিত্তি কোনও সংস্কৃত আকরগ্রন্থে নেই, তা তাঁরা কিছুতেই মানতে চাননি। উল্টো দিকে বিমলানন্দের মতো ভাবাদর্শবাদীরা চিরাচরিত গ্রাম্য কবিরাজি চিকিৎসার ধারায় এই দুটি পৃথক চিকিৎসাব্যবস্থা থেকেই জ্ঞান আহরণ করেছেন। জ্ঞানের কৌলীন্যের চেয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন চিকিৎসার ভাবী কার্যকারিতাকে।

‘আরোগ্য নিকেতন’ উপন্যাসে তারাশঙ্করবাবু ইঙ্গিত করেছিলেন আয়ুর্বেদ ও কবিরাজি সম্পর্কে এই মত ও ভাবের বিরোধের দিকে। এই বিতর্কের প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে আজও। তবে বিজয়বাবুর চিত্রনাট্য এ সব দ্বন্দ্বমুক্ত। বরং তাতে আয়ুর্বেদের সঙ্গে ডাক্তারি চিকিৎসার যে স্পষ্ট সংঘাত আমরা দেখেছি, তা সেই অলীক কুলীন আয়ুর্বেদেরই ধারণাশ্রিত। চলচ্চিত্রের চাকচিক্যে কোথায় হারিয়ে গেছে বীরভূমি কবিরাজ জীবন মশায়ের সেই ট্রাইসাইকেল।