• কানাইলাল ঘোষ
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব ১৫)

মায়া প্রপঞ্চময়

NOVEL
ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ

Advertisement

পূর্বানুবৃত্তি: বিয়ের পর অন্নু ওর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে প্রীতের কাছে টানা বেশি দিন থাকতে পারত না। নিজের বাড়িতেই থাকত। চিঠির আদানপ্রদান ছিল মানিকের সঙ্গে। কয়েকটি চিঠি অন্নুর স্বামী প্রীত খুলে পড়েছিল। চিঠিগুলো তার মনে সন্দেহের উদ্রেক করে। প্রীতের মন থেকে সন্দেহ দূর করার জন্য অন্নু ঠিক করে, মানিককে কোনও ভাবে প্রীতের মুখোমুখি দাঁড় করাতেই হবে। মানিকের বেনারস যাওয়ার খবর পেয়ে সুযোগটা কাজে লাগায় অন্নু। প্রীতকে নিয়ে সেও আসে বেনারসে। 

হইহই করে উঠেছিল অন্নু, ‘‘না না, এ বারেই যাবে তুমি আমাদের বাড়ি।  আবার কবে দেখা হবে কি না হবে, তার ঠিক নেই। তুমি তো এমনিতেই গেছোদাদা, আজ এখানে আছ তো কাল অন্য জায়গায়। নেহাত আমি স্বপ্নে কাশী-বিশ্বনাথের দর্শনের আদেশ পেলাম, তবেই না তোমার সঙ্গে দেখা হল!’’

আলো-আঁধারির খেলায় মানিকের মুখটা ভাঙছে-চুরছে, তবুও অন্নুর মনে হল ওর ঠোঁটের কোণ যেন একটু বেঁকে উঠল, ‘‘সবাই তো আর তোমার মতো সৌভাগ্য নিয়ে জন্মায়নি যে, দেবতার স্বপ্নাদেশ পাবে। আর আমি তো মহাপাপী। তাই তো সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্রের কর্মস্থলে বসে নিজের প্রারব্ধ নিয়ে ভাবছিলাম। সেই রাজার উপর কত রকমের অত্যাচার, তাও আবার রাজার দেবতা আর ঋষির ষড়যন্ত্রে। সে হিসেবে আমার যন্ত্রণা তো অনেক কম। রাজা হরিশ্চন্দ্রের প্রারব্ধ তিনি ভোগ করেছিলেন, এখন আমি আমার প্রারব্ধের হিসেব বুঝে নিই!’’ 

মানিকের পৌরাণিক রেফারেন্স আর হেঁয়ালিপূর্ণ কথাবার্তার সঙ্গে অন্নু পরিচিত, তাও পুরোটা ধরতে পারছিল না। প্রীতের হাল তো আরও শোচনীয়। বেশি ক্ষণ এমন চললে প্রীতের সন্দেহ আবার মাথাচাড়া দেবে, তাই অন্নু তাড়াতাড়ি আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে নিল, ‘‘ও সব গল্প বাড়ি গিয়ে হবে, এখানে কেমন মড়া-পোড়ানোর গন্ধ আসছে... চলো চলো, রাত বাড়ছে, আমার আবার এ সব জায়গায় খুব ভয় করে, বাবা!’’ বেমালুম ভুলেই গেল যে, একটু আগে এখানে আসার জন্য ও নিজেই যখন পীড়াপীড়ি করছিল তখন প্রীত এই কথাগুলোই বলছিল আর ও উড়িয়ে দিচ্ছিল!

বাড়ি আসার পর অন্নুর কাজই হল প্রীত আর মানিকের মাঝে হাইফেনের মতো জুড়ে থাকা। প্রীত কখন কী জিজ্ঞেস করে বসে ওদের পুরনো সম্পর্ক সম্বন্ধে আর বাউন্ডুলেটা কী উত্তর দিয়ে বসে— তার ঠিক আছে না কি? এত দূর এগনোর পর তীরে এসে তরী ডোবাতে ও রাজি নয়। তবে আশার কথা যে মানিক কথাবার্তা প্রায় বলছেই না, কোটরাগত বড় বড় চোখদু’টোয় কেমন এক ফ্যালফেলে চাউনি। অবশ্য ও যত কম কথা বলে ততই মঙ্গল, ন্যাকা-বোকার মতো সময়টা কাটিয়ে মানিক বিদেয় হলে ও হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে। 

খালি কী যেন প্রারব্ধের কথা বলছিল ঘাটে দাঁড়িয়ে বারবার, কথাটার মানেটা কী? এক ফাঁকে বাড়িতে রাখা হিন্দি অভিধান থেকে মানেটা দেখল ও, ‘কর্মফল বা নিয়তি নির্ধারিত পরিণাম, সেটা এ জন্মের কিংবা পূর্বজন্মেরও হতে পারে’। জীবনে কিছু করতে না পেরে মানুষটা অদৃষ্ট আর কর্মফলে নেমে এসেছে পুরুষকার থেকে! মানিকের বর্তমান হুলিয়া আর পরিস্থিতির জন্য ওর করুণা হচ্ছিল। আসলে মানিক ওর বিয়ের আগে থেকেই এত বেশি নিষ্ঠুর কথা বলেছে আর ব্যবহার করেছে যে, ওর জন্য মায়া-মমতা-প্রেম সব শুকিয়ে গিয়েছে অন্নুর মন থেকে। ওর জন্যেই অন্নুর দাম্পত্যজীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোথায় যেন একটা চিনের প্রাচীর তৈরি হয়ে আছে। আজ যদি ওই রোগা কাঠামোটার মাথায় পা দিয়েও সেই পাঁচিল টপকাতে হয় তো তাই সই! 

নিজেই যতটা সম্ভব আসর জমিয়ে ডিনার আর তার পরের অনেকটা সময় কাটিয়ে দিয়ে অন্নু মানিককে ওর জন্যে নির্ধারিত গেস্টরুমে নিয়ে এল। দায়িত্বসম্পন্ন হোস্টের মতো শুনিয়েও দিল, ‘‘আমিই এত বলে-বলে তোমায় এখানে আনলাম, রাতে সুনিদ্রার ব্যাঘাত হলে সে দোষ তো আমারই হবে! ঘরে সব কিছু ঠিক আছে কি না দেখে নাও, এখানে এসির সুইচ, এই দু’টো হল ফ্যানের। ঠান্ডা লাগলে এই পাতলা লেপটা রইল, গায়ে দিও। আর কিছু চাই?’’ বলতে বলতে গলাটা কি একটু কেঁপে গিয়েছিল! না হলে মানিক অমন অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকবে কেন? 

একদৃষ্টে খানিক ক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঘাড় নেড়ে মানিক বলেছিল, ‘‘নাঃ, আর কী লাগবে! ওঃ, রাত্তিরে জলতেষ্টা পেতে পারে, একটু খাবার জল যদি দিতে পারতে! বেশি ক্ষণ থেকো না এখানে, তোমার পতিদেবতার মনে খটকা বাড়তে পারে।’’ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে অন্নু বুঝতে পারে, বাইরের খোলসের ভিতর থেকে পুরনো মানিক উঁকি দিচ্ছে। এখানে দাঁড়ালে আবার কথার ফুলঝুরি ছুটবে। নিজেকে জোর করে ঘরের বাইরে নিয়ে যেতে যেতে অন্নু বলে যায়, ‘‘দরজার বাঁ দিকে কলিং বেল আছে, বাজালেই কাজের লোক আসবে। যত খুশি জল চেয়ে নিও, গুডনাইট অ্যান্ড সুইট ড্রিমস।’’

নাঃ, শেষ বারের মতো চাওয়া তৃষ্ণার জলও নিজে হাতে মানিককে দেয়নি। কেন দিত, কোন ভরসায়? এক সময় নিজে হাতে কিছু তৈরি করে অন্যদের কাছে লুকিয়ে খাওয়াত ও মানিককে, জানত মানিক খেতে ভালবাসে। সেই মানিকই বলেছিল, ‘‘যে দিন তুমি আর নিজের তুমি থাকবে না, সে দিন থেকে তোমার ছোঁয়া জলও আমার কাছে অস্পৃশ্য। কিছু বিধিনিষেধের গণ্ডি যদি নিজেরাই তৈরি করে না নিই, তবে এই সম্পর্কের গোলকধাঁধা থেকে বেরতে পারব না। আমি পরকীয়ার পক্ষে নই। আমি যাকে চিরদিন ভালবেসে যাব, তার নাম অনামিকা ত্রিবেদী, অন্নু সিং নয়। তুমি জানো, আমার আদর্শ বজ্রসেন। উত্তীয় আমার কেউ নয়।’’

সেই রাত্রিটা অদ্ভুত ভাবে কেটেছিল ওর। একটু দূরে গেস্টরুমে শুয়ে আছে এমন এক জন, যাকে এক সময় অদেয় কিছুই ছিল না— তবে সবটাই মনে মনে— এখন সে সব অর্থেই কয়েক আলোকবর্ষ দূরের বাসিন্দা। আর ওর ঘনিষ্ঠতম যে সঙ্গী ওকে নিয়ে প্রায় পাগলামির পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে, সে ঠিক এই মুহূর্তে ওর মনের বহু যোজন তফাতে। ও যদি মানিককে একটুও চিনে থাকে তবে কোনও সন্দেহ নেই যে, আজকের রাতটা তার কাছেও চরম যন্ত্রণার। সব জেনেও সে এসেছে সত্যি, কিন্তু এতটা নগ্ন স্বার্থপরতার পরও কি মানিক ওকে মনে রাখবে? সেই জন্যেই কি সন্ধেয় গঙ্গার ঘাটে রাজা হরিশ্চন্দ্রের উল্লেখ করে ওকে ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, আজকে ওর বাড়ি না এলে ভবিষ্যতে আবার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে, কাজেই...

প্রীত যেন সত্যিই পাগল হয়ে গিয়েছিল সে রাতে। হয়তো যে সন্দেহ ওকে কুরে কুরে খাচ্ছিল বহু দিন ধরে, সেই সন্দেহ মন থেকে উবে গিয়েছিল ওর। ওর সেই কাল্পনিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে চাক্ষুষ দেখে, ও এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে, ওর অন্নু চিরদিনই ওরই ছিল, এখনও ওরই আছে। অন্নুর মতো এক জন অভিজাত রুচিশীল মেয়ে ও রকম একটা ফালতু ছোকরাকে বিন্দুমাত্র সুযোগ দেবে না, এটাই স্বতঃসিদ্ধ। অন্নুকে এক বার প্রীত কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবীর সঙ্গে কিছুটা সাময়িক উত্তেজনায়, কিছুটা এক বন্ধুর প্ররোচনায় নিরালা হোটেলে তুলেছিল। কিন্তু অন্য বন্ধুরা তাদের নিজ নিজ প্রেমিকাদের নিয়ে উদ্দেশ্যসাধনে সক্ষম হলেও অন্নুর বাধায় প্রীত বিফলমনোরথই রয়ে গিয়েছিল। তার পর থেকেই সম্পর্কের অবনতি আর মানিককে নিয়ে ওর বন্ধুদের ফিসফিসানি। পরবর্তী কালে সেই বন্ধুই বারবার প্রীতকে খবর পাঠিয়েছে, ‘‘তোর পাখি এখন অন্য আকাশে উড়ছে’’ বলে। ওই উড়ো খবরটাই ওর গোঁ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ওই মেয়েকেই বিয়ে করার সিদ্ধান্তে জেদ ধরে ও বাড়ির লোককে রাজি করায়।

পাখি ওরই আয়ত্তে ছিল এবং আছে, এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়েই সে রাতে মিলনক্লান্ত প্রীত হাঁপ ধরা গলায় বলেই ফেলেছিল, ‘‘বিষাণ জ্যায়সা বুরবক ম্যায়নে জিন্দেগি মেঁ নেহি দেখা! উয়ো উজবুগ শোচতা থা কি... খ্যয়র ছোড়ো, তুমহারা মানিক ভি এক দেখনে কা চিজ় হ্যায়, মালুম? ইস নমুনেকো লে কর বিষাণ ক্যায়া ক্যায়া খিচড়ি নেহি পাকোয়ায়া মেরে দিমাগ মে... উফ্ফ!’’ এর পরের কথা আর কানে যায়নি, অন্নুর শরীর কাঠ হয়ে গিয়েছিল। বিষাণলাল শর্মা, ওর সহপাঠী এবং ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর প্রেমিকও বটে, সেই বিষাণ কান ভারী করেছে প্রীতের! সেই বিষাণ, যে পটনায় এক অনুষ্ঠানবাড়িতে রাতের অন্ধকারে বান্ধবী-কাম-বন্ধুর প্রেমিকা অন্নুর দিকেও হাত বাড়িয়েছিল বন্ধুর অনুপস্থিতিতে স্রেফ একটা সুযোগ নেওয়ার জন্যে! তাতে ব্যর্থ এবং অপমানিত হয়ে অন্যদের তাতিয়ে নির্জন হোটেলে অন্নুদের নিয়ে রাত্রিবাসের প্ররোচনা দেওয়া আর তার পর ফিরে এসে ইউনিভার্সিটিতে রটিয়ে দেওয়া যে, বড়লোকের ছেলে ক্যাসানোভা প্রীত অন্নুকে ছিবড়ে করে ফেলে দিয়ে গিয়েছে—সে সবও তা হলে বিষাণেরই কাজ। এ সব না ঘটলে মেয়েমহলে ঠাট্টার পাত্র ‘শুকদেব’ মানিকের দিকে হয়তো অন্নুর নজরই যেত না। নিজের স্বার্থে একটা নিরীহ ছেলের ভবিষ্যৎই ও কেবল নষ্ট করেনি, আজ রাতেও ওকে এক অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে ফেলে দিয়েছে, শুধু নিজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করবে বলে। 

এখন ও স্পষ্ট বুঝতে পারছে কেন মানিক বলেছিল, বিয়ের পর মেয়েদের নিজস্বতা বজায় রাখার চেষ্টা সোনার পাথরবাটির মতো। মানিকের কথাগুলো মেল-শভিনিজ়ম বলে ব্যঙ্গ করত তখন। আজ এক জন প্রকৃত মেল-শভিনিস্টের দ্বারা বারবার নিষ্পিষ্ট হয়ে ওর দু’চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে নামে। পাশের ঘরের মানুষটা সব জেনেবুঝে আগুনের উপর দিয়ে হাঁটতে এসেছে কেবলমাত্র তার অনামিকার একটু সাহায্য হবে বলে। যাকে সে মনেপ্রাণে চেয়েছিল, সে অন্য এক জনের শয্যাসঙ্গিনীই শুধু নয়, তাকে কাছ থেকে সেটা অনুভব করতেও বাধ্য করা হচ্ছে আজকের রাতে। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে জেগে পরিতৃপ্ত প্রীতের নাকডাকার আওয়াজ শুনতে শুনতে নিজেকে ঘোর পাপী আর অপবিত্র মনে হতে থাকে অন্নুর। এ যেন এক জনের পাওনা অন্য জন এসে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে গেল, আর সেই ষড়যন্ত্রের মূল হোতা অন্নু নিজেই— এ এক অদ্ভুত প্যারাডক্স!

পরদিন সকাল আবার আর পাঁচটা দিনের মতো করেই শুরু হয়, দিনের আলো এসে রাতের চিন্তাকে মনের কোণে লুকিয়ে ফেলতে বাধ্য করে। অন্নু টের পায় এটাই ওর জীবন, এখানেই ওর ভবিষ্যৎ। মানিক ওর নয়। বাস্তবিক মানিক কারও নয়। এই ভাবেই অন্নু এক দিন ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হয়ে যাবে। শুধু যে অনুশোচনা, যে গ্লানি কাল রাতে চোখের জল হয়ে নেমেছিল, ওদের দু’জনের সম্পর্কের সেইটুকুই শুধু নিখাদ হয়ে টিকে থাকবে আমৃত্যু।

বেশ বেলাতেই সকলের ঘুম ভাঙে। অবশ্য মানিক কখন ঘুমিয়েছে বা কত ক্ষণ, সেটা আর ও জিজ্ঞেস করেনি। যখন দেখা হল, তখনও সে একই রকম উসকোখুসকো। চোখের কোলে কালি, তবে মনে হল যেন, মুখের বিষণ্ণ ভাবটা অনেক কম। ভাল করে ওর মুখের দিকে তাকাতে পারছিল না অন্নু, বারবার মনে হচ্ছিল হয়তো মানিক ওর মনের কথা পড়ে ফেলবে। ও ঠিক করে নিল যে আর কোনও কারণেই ও মানিককে ডাকবে না। সময় সব ক্ষতই নিরাময় করে, সুযোগ পেলে মানিকও এক দিন স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরবে।

ব্রেকফাস্ট করে মানিক তৈরি হল ওর ঝোলাব্যাগটা কাঁধে নিয়ে, স্নান আগেই করে নিয়েছিল। অন্নুর হঠাৎ মনে পড়ে গেল, এক বার কোথা থেকে যেন আচমকাই ইউনিভার্সিটিতে হাজির হয়েছিল মানিক বেশ ক’দিন ডুব মারার পর। মুখে না-কামানো দাড়ি, দিনদুয়েক স্নানও করা হয়নি। বাড়ি যাবে বলে ব্যাগ গুছিয়েই ডিপার্টমেন্টে যাচ্ছিল অন্নু, ব্যাগ খুলে টাওয়েল আর সাবান বার করে জোর করে ওর হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল, বলেছিল, ‘‘দাড়ির ব্যাপারে কিছু করতে পারব না, তবে এগুলো নিয়ে সামনে ছেলেদের হস্টেলে ঢুকে স্নানটা অন্তত সেরে নাও। একদম ভূতের মতো দেখাচ্ছে! তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না!’’ সেই কথা মনে পড়তে অন্নুর মুখে একটু হাসি ফুটে ওঠে।

মানিক ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল, খাপছাড়া ভাবে বলে উঠল, ‘‘সাবানটা ব্যবহার করে ফেলেছিলাম, কিন্তু টাওয়েলটা ভাল করে কেচে, আয়রন করে ফেরত দিয়েছিলাম, মনে আছে?’’ 

অন্নু অপ্রস্তুত হয়ে বলে ওঠে, ‘‘আমি কী ভাবছিলাম তুমি কী করে বুঝলে? আমার মনের সব কথাই কি বুঝতে পারো তুমি?’’ 

জোর গলায় মানিক উত্তর দেয়, ‘‘পারিই তো, পারি বলেই তো এক সময় ঠিক ভাবে না বুঝেও তোমার ভাঙা প্রেম জোড়া লাগাতে কাজে এসেছিলাম। আবার এখনও সব কিছু বুঝে তোমার চিড়-খাওয়া সম্পর্ক জুড়তে অ্যাডহেসিভের কাজ করে গেলাম। তবে আমিও তো মানুষ! অ্যানাস্থেশিয়া ছাড়া হার্ট অপারেশনে পেশেন্টের কতটা যন্ত্রণা হয়, কাল সারা রাত তার আভাস পেয়ে গিয়েছি। শরীর হয়তো আবারও এ ধকল নিতে পারবে না। এ বার আমার মুক্তি। একটাই সমস্যা। সুচিত্রা সেনের সেই হিট মুভিটা দেখেছিলে, যেটায় পাগল ভাল করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে শেষটায় নিজেই পাগল হয়ে গেল! এখানে ব্যাপারটা খানিকটা সেই রকম হয়ে গেল আর কী! গল্পে বা ছবিতে তো শেষের শেষটুকু আর দেখায় না, তাই জানা যায়নি পাগল নায়িকাকে ভাল করে তুলতে আবার কেউ এসেছিল কি না! চলি এখন, বাইরে থেকে রিকশা ধরে নেব। মিস্টার সিংকে আমার নমস্কার আর ধন্যবাদ জানিয়ো। ভাল থেকো তোমরা সবাই।’’

কিছু বলে উঠতে পারেনি অন্নু ওকে, গাড়ি করে স্টেশনে পৌঁছে দেওয়ার কথাও। মানিক চলে যাওয়ার পরেও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল অনেক ক্ষণ, চটকা ভেঙেছিল গাড়ির আওয়াজে। প্রীত ফিরল ওর পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মেরে, বেনারসে ওর ছোটবেলার কিছুটা সময় কেটেছে, আর আজকাল তো ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকায় আসাই হয়ে ওঠে না। চাবির রিং হাতে ঘোরাতে ঘোরাতে আর শিস দিতে দিতে ঘরে ঢুকতে গিয়ে অন্নুকে দেখে বলে ওঠে, ‘‘বিবিজানকো সাপ শুঁঙ্গ গ্যয়া ক্যায়া? তুমহারা উয়ো বেকার দোস্ত কো রাস্তে মে যাতে হুয়ে দেখা। খ্যের ছোড়ো... বেকার কি বাতেঁ...’’ ঘরে ঢুকে ও ফুল ভল্যুমে টিভি চালিয়ে দেয়। অন্নুর মনে পড়ে কালকে ঠিক হয়েছিল আজ ওরা কিশোরকুমারকে নিয়ে অনুষ্ঠানটা এক সঙ্গে দেখবে। আজই তেরো অক্টোবর, কিশোরকুমারের মৃত্যুদিন। এ দিকে প্রীত শুধু কিশোরের ফ্যানই নয়, কিশোরের গলা নকল করে গান গাইতেও ওস্তাদ। 

ঘরে এসে সোফায় বসতেই রাজেশ খণ্ণার চেহারা ভেসে ওঠে স্ক্রিনে, সঙ্গে কিশোরের গলা, ‘জিন্দেগি কে সফর মে গুজ়র যাতে হ্যায় জো মোকাম, ওহ ফির নেহি আতে...’ গলা মেলায় প্রীত। গলা মেলাতে ইচ্ছে হল না অন্নুর। গানের কথাগুলো অন্তর দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করে ও। 

ক্রমশ

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন