শীতের পড়ন্ত বিকেল, সূর্য পাটে যেতে বসেছে। পশ্চিম দিকে একটা বাঁশঝাড় আছে, বাঁশঝাড়ের পরে এঁদো ডোবা। ঝুপসি জায়গাটা দুপুরের পর থেকেই নিঝুম, আধো অন্ধকার। ডোবার ও ধারে বিস্তীর্ণ চাষের জমি পেরিয়ে, দিগন্তের একটু আগে সূর্য পরিপূর্ণ একটা ডিমের কুসুমের মতো ঝুলে রয়েছে। একটু পরেই গলে গিয়ে ধরিত্রীর গায়ে মিলিয়ে যাবে। কুয়াশার হালকা চাদরে চরাচর ঢেকে রয়েছে। 

“বৌমা, ও বৌমা,” বুড়ি পিসশাশুড়ির খনখনে স্বর বাড়ি কাঁপিয়ে দিল। বলি অ বৌমা...মরলা না কি? উফ এই কোমর নিয়ে খুঁজবটা কোথায়! আর পারি না বাপু। কী যে লক্ষ্মীছাড়া কালনাগিনী বৌ এনেছে সনাতন, হাড়মাস একেবারে কালি করে রেখে দিলে গা!”

চাঁপা ঘরে বসে পায়ে নেল পলিশ লাগাচ্ছিল। সারা দিন বুড়ির চৌকিদারি এড়িয়ে চলা মুশকিল, শুধু দুপুরটুকু তার নিজের জন্য রাখা থাকে। বুড়ি খেয়ে উঠে পশ্চিমের ঘরে বিছানায় গা মোড়ামুড়ি করে, আর পরি যায় স্কুলে। ওর ফিরতে ফিরতে সাড়ে চারটে হয়। এইটুকু সময় তো ওর নিজের। ওই সময়টা ও রূপচর্চা করে, ছোটখাটো সেলাই ফোঁড়াই-রিফু করে, টিভি দেখে, বা ইচ্ছে করলে পাড়ার মেয়ে-বৌদের সঙ্গে একটু গল্পগুজব-হাসি ঠাট্টা করে। কখনও হয়তো সিনেমার পত্রিকাগুলো উল্টেপাল্টে ছবি দেখে অলস দুপুর কাটিয়ে দেয়। দুপুর বিকেলের দিকে ঢলে গেলে আবার সংসারের জোয়ালে কাঁধ লাগায়। 

“বলি ও বৌমা...ছাতে আচারের বয়ামগুলো রাখা আছে, নামাবে কখন?’’

“আনব যখন সময় হবে। মরে তো যাচ্ছি না।’’

“ওমা কী কথার ছিরি দেখ, আমি উঠোনেই রোদ জারাতে দিয়েছিলাম। তুই তো ছাতে গিয়ে দিয়ে এলি, কেন তোর এত উসখুসানি আমি জানি না ভেবেছিস? দাঁড়া, আজ আসুক সনাতন বাড়ি...”

“অ বুড়ি তোমার কাঠি করা স্বভাব আমার জানা আছে, তুমি মনে মনে কী চাও আমি ভালই বুঝি...আমার পিছনে লাগতে এলে তোমার এ বাড়ি থাকা আমি ছুটিয়ে দেব বলে রাখলুম!”

“ও মা, আস্পদ্দা দেখ মাগির!”

এই এ কথায়, ও কথায় দুজনের তুমুল ঝগড়া লেগে গেল। শীতের সন্ধে আরও ঘন হয়ে নেমে এল উঠোনের উপর। 

একটা ছোট মফস্‌সল নাবাবিপাড়া। সনাতন মণ্ডলের একটা ইলেকট্রিকের দোকান আছে স্টেশনের কাছে। লাইনের এ পার ও পার দু’পারেই ওর প্রচুর পসার। মানুষটা খাটিয়ে বলে নাম আছে। আর লোকে বলে সনাতন মিস্ত্রির কথার দাম ষোলো আনা। চাষির ছেলে, পেটে ক্লাস এইটের বিদ্যে নিয়ে বাবা মারা যাওয়ার পরে দোকানটা শুরু করেছিল। আট-দশ বছরের মধ্যেই ব্যবসা জমে উঠলে সুদাস আর রফিক নামে দুটো ছেলে রাখতে হয়েছে। নিজেদের যে জমিজায়গা ছিল, সে জমি সনাতন আরও বাড়িয়েছে পরে। ইতিমধ্যে এক দিনের জ্বরে হঠাৎ করে মা চলে গেল। সংসারে তখন শুধু একমাত্র বিধবা পিসি অন্নদা। পিসির তাড়নায় সনাতন বিয়ে করে মাধবীকে ঘরে নিয়ে আসে। এর পর সব কিছু ভালই চলছিল। কিন্তু সুখ কারও জীবনে চিরস্থায়ী হয় না। এক মেয়ের জন্ম দিয়ে তিন বছরের মাথায় মাধবী জন্ডিসে ভুগে মারা গেল। সনাতন ওর চিকিৎসার কোনও ত্রুটি রাখেনি, কিন্তু বাঁচাতে পারল না। তার পর থেকে ওর সংসারটা কেমন ছন্নছাড়া, অগোছালো হয়ে পড়ে। সবই আছে, কিন্তু বাঁধুনিটাই নেই যেন। ঘরে পিসি আর মেয়ে পরি, আর ও দিকে সনাতনের মাথায় দিন-দিন বেড়ে ওঠা দোকানের কাজের চাপ। এই মেয়েই ছিল সনাতনের জীবনের সব। পিসি বুড়ি মানুষ, সব দিক সামলাতে পারে না। শাসন আর দেখাশোনার অভাবে যদি মেয়ে মানুষ না হয় তা হলে এত কিছু কার জন্য? অগত্যা আবার পিসির চাপেই বিয়ে করে চাঁপাকে ঘরে আনে। 

ছোটবেলায় মা-বাপ হারিয়ে চাঁপা দাদাদের সংসারে প্রতিপালিত। খড়িবাটি গ্রামের নকুল সরকার ওর বড়দা, তার কাছেই চাঁপার বড় হয়ে ওঠা। বড়বৌদি মানুষ খারাপ না, একটু বোকাসোকা ছিল, তাই চাঁপার পক্ষে বৌদিকে ডিঙিয়ে চলা কোনও সমস্যাই ছিল না। ফোর পাশ করতে করতেই স্কুল ছেড়ে দিয়েছিল। ছোট থেকে লাগামছাড়া, শাসনহীন হওয়াতে চাঁপার মধ্যে উলুকঝুলুক ভাব একটু বেশিই ছিল। স্কার্ট ছেড়ে শাড়ি ধরার আগে থেকেই বাড়ির পাশ দিয়ে ছেলেছোকরার আনাগোনা আর সাইকেলের ঘণ্টির উৎপাত খুব ছিল। গাঢ় বাদামি ত্বকে যৌবন উপচে পড়লে চাঁপার কুণ্ঠা আর শাসনের আড়গুলো ভাঙতে থাকে। বাড়ির চারদিকে একটা ফিসফাস গুঞ্জন সব সময়। চাঁপাকেও বলে কিছু লাভ হত না। ওর মদমত্ত যৌবন। যৌবনের জ্বালা কুক্কুরি বোঝে। বেগতিক দেখে চাঁপা সতেরো পেরোতেই দাদারা বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল। বাপ মা মরা বোন, ঘাড়ের বোঝা। যত অল্প আয়াসে ঘাড় থেকে নামে তার চেষ্টায় দাদারা সুলুকসন্ধান করল। কিন্তু মোটামুটি খেয়েপরে থাকতে পারবে বোন, এমন পরিবারের ছেলে পেতে হলেও গাঁটের কড়ির খরচের ধাক্কা ভালই। তার ওপর চাঁপার চোখে মুখে চটক থাকলেও গায়ের রং চাপা হওয়ায় গাঁটের কড়ি না খসালে মেয়ে পার করা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়াল। সে সময় বড় বৌদি মলিনার মাধ্যমে সনাতনের সম্বন্ধটা এল। মলিনার মাসতুতো দাদার শালা হল সনাতন। হোক দোজবর আর বয়সটা একটু বেশি, কিন্তু এমন খাটিয়ে আর সংসারী ছেলে কোথায় পাওয়া যাবে? কোনও নেশাভাঙ নেই, তার উপর  এই বাজারে একটা পয়সাও দাবি নেই, এমন ছেলে কেউ হাতছাড়া করে?

ফাল্গুনের এক শুভদিন দেখে চার হাত এক করে দেওয়া হল। বিদায় নেওয়ার সময় চাঁপা মনে মনে জানল, দাদারা পায়ে দড়ি আর গলায় কলসি বেঁধে জলে ফেলে দিল। বিয়ে বা সংসার নিয়ে যত স্বপ্ন বুনেছিল, সেগুলো যেন ছেঁড়া জালের মতো পড়ে থাকল।

******

তুলসীতলায় প্রদীপ দেখিয়ে শাঁখ বাজাল চাঁপা। সন্ধে নেমে এসেছে। পরি কুয়োতলায় হাতমুখ ধুচ্ছে। এখুনি ওর মাস্টার আসবে। পরির সঙ্গে চাঁপার সম্পর্কটা ছাড়া-ছাড়া নয় আবার মাখো-মাখোও নয়। ফুলশয্যার রাতে অল্প কথার মানুষ সনাতন একটা কথাই বলেছিল, ‘‘দেখো, আমি পষ্ট কথা কইতে পছন্দ করি। পরি আমার একমাত্র মেয়ে, ওর জন্যই আমার বিয়ে করা। ওর অযত্ন যেন কখনও না হয় এটুকু তুমি দেখবে। ও সুখী হলে আমিও সুখী, আর আমার কিছু চাইবার নেই।” চাঁপা বুঝে গেল, এ বাড়িতে জায়গা করতে হলে ওকে আগে মাতৃত্বের পরীক্ষায় পাশ দিতে হবে। আজ দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর এ বাড়িতে পার করে এল, তবুও পরি কখনও ওকে ওর মায়ের স্থানে বসাতে পারেনি। আর চাঁপাও কেন জানি না ওকে নিজের মেয়ে বলে ভাবতে পারল না। ওদের দুজনকে পাশাপাশি দেখলে দুই বোনই মনে হয়। বরঞ্চ দুজনের মধ্যে যে একটা অন্তঃসলিলা রেষারেষির ভাব রয়েছে, সে কথা সনাতনও টের পায়। তাই হয়তো আজও চাঁপা সনাতনের মনের কাছে পৌঁছতে পারেনি। দুজনের সম্পর্কের মধ্যে কোথাও যেন একটা খোঁচ বেঁধে সব সময়। 

সন্ধেয় দোকান বন্ধ করে সুদাস বাড়ি যাওয়ার সময় বলে গেল, সনাতন কলকাতায় গিয়েছে মালপত্র কিনতে। ফিরতে রাত হবে। এই সুদাস ছেলেটি সনাতনের খুব বিশ্বাসী। কিন্তু চাঁপা দেখেছে, ওর চোখমুখ দেখলে ওর মধ্যে যে একটা আগ্রাসী খিদে আছে তা বোঝা যায়। উঠোনের আলো-আঁধারিতে ওর চোখের মণিদুটো চকচক করে উঠল শ্বাপদের মতো। মনে হয় ও কথা বলে মুখ দিয়ে নয়, চোখ দিয়ে। সুদাস এলে চাঁপার কেমন একটা গা শিরশিরে ভাল লাগা হয়। শাড়ির আঁচলটা আঁট করে জড়িয়ে নেয় সারা শরীরে, যাতে উঁচু-নিচু খাঁজগুলো স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। সুদাস শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে চেটে তার স্বাদ গ্রহণ করে। 

বিকেল হতেই চাঁপা চাদর মুড়ি দিল। শীতটা এ বছর জব্বর পড়েছে। রান্নাঘরে চা করতে করতে চাঁপা দেখতে পেল, বাইরের ঘরে অমিত মাস্টার এসেছে পরিকে পড়াতে। সপ্তাহে তিন দিন আসে মাস্টার, ইংরেজি, অঙ্ক আর বিজ্ঞান পড়ায়। পরি এখন ক্লাস সেভেন। সনাতনের ইচ্ছে মেয়েকে পড়াশোনা করানো। অন্তত কলেজ পাশ করুক, তার পর কোনও চাকরি করা ভাল ছেলে দেখে শহরে বিয়ে দিয়ে দেবে। এই গ্রামগঞ্জে রাখার কোনও ইচ্ছে ওর নেই। অমিত স্যরের কাছে পরি দু’বছর হল পড়ছে। ছেলেটা এমনিতে বিনয়ী, চোখ নামিয়ে নরম স্বরে কথা বলে। কিন্তু মাঝে মাঝে দু’একটা এমন কথা বলে যে চাঁপা বুঝতে পারে না তার অর্থ কী! চা বা জল দিতে এসে আঙুল ছোঁয়াছুঁয়ি হয়েছে কয়েক বার। চাঁপার শরীর-মনে বিদ্যুৎ খেলে গিয়েছে সে ছোঁয়ায়। কারেন্ট চলে গেলে লণ্ঠন দিতে আসার অবসরে মৃদু শরীর ছুঁয়েছে একে অপরের। আজকাল অমিত অনেক কথা বলে। পড়ার ফাঁকে পরিকে এ দিক-ও দিক পাঠিয়ে কত বার বলেছে, অমিত, ‘‘তোমার কাছে পেতে চাই বৌদি।”

“ধ্যাত! পরির বাবা জানতে পারলে আমায় দু’টুকরো করে ফেলবে।”

“রাতে ঘুম আসতে চায় না, সারা রাত তোমার কথাই ভাবি।”

“বিয়ে করে নিন।”

“এ জীবনে হবে না।”

“বাবাঃ... এত?’’ চাঁপা মুচকি হাসল। 

“হুম... জানেন আপনার পাশে সনাতনদাকে মানায় না যেন। ”

চাঁপা অন্যমনস্ক ভাবে উত্তর দিল, ‘‘তা হবে, কিন্তু উনি আমার ইহকাল পরকাল...”

“আপনার সাহস নেই তাই এ সব বলছেন।”

চাঁপা কোনও উত্তর না দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। 

এক দিন এই রকমই আলো চলে গেলে অন্ধকার ঘরে অমিত চাঁপার হাতে একটা গোলাপি কাগজের টুকরো গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘‘কাল নুন শোয়ে সিনেমাহলে চলে আসবে। আমি অপেক্ষা করব।”

এর আগে আর এক বার দুপুরের ট্রেনে নৈহাটি গিয়েছিল। পর্দা-ঢাকা কেবিনে বসে চিলি চিকেন, চাউমিন খেয়ে নুন শোয়ে সিনেমা দেখে বাড়ি ফিরেছে। কেউ জানতে পারেনি। খাঁচার ফাঁক দিয়ে আকাশটা দেখতে চায় খাঁচার পাখি। যদি কেউ দরজাটা একটু আলগা করে দেয় তবে বাইরে বেরিয়ে আকাশ দেখাটা মন্দ কি? বহু দূর নীল আকাশ হাতছানি দিয়ে ডাকে, ইচ্ছে করে উড়ে গিয়ে ডানায় নীল মেঘ মেখে আসতে। খাঁচায় আছে দানাপানি আর ঘরের আরামের নিশ্চিন্ততা, তাই তো দিনের শেষে ডানা মুড়ে আবার খাঁচাতেই ফিরতে হয়। 

******

এ বার অমিত বড্ড প্রগল্‌ভ হয়ে উঠেছে। অন্ধকার সিনেমা হলে ব্যালকনির কোনার দিকে টিকিট। দুপুরবেলায় দর্শক গুটিকয়েক। সবাই প্রায় ওদের মতো জোড়ায় জোড়ায় এসেছে। প্রথম থেকেই অমিত আজ অতিরিক্ত চঞ্চল। দুটো হাত আর দশটা আঙুল চাঁপার শরীরে অনবরত খেলা করে যাচ্ছে। চাঁপা আজ খুব অস্বস্তি বোধ করছে, খোলা জায়গায় কে কোথায় দেখে ফেলবে কে জানে! আগের বার তো অমিত এমনটা করেনি। পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে বসে সিনেমা দেখেছিল। এ বার যেন অমিত বড্ড সাহসী হয়ে উঠছে, নিজেকে সামলে রাখতে পারছে না। না কি সামলে রাখতে চাইছে না? পুরো হামলে পড়েছে গায়ের ওপর। চাঁপা এ বার একটু ভয় ভয় পাচ্ছে। মনে মনে নিজেকেও দোষ দিচ্ছে, এতটা হঠকারি না হওয়াই উচিত ছিল। সনাতন খুব রাগী মানুষ। যদি এক বার কানে যায়, তার পরিণতি কী হবে ভাবতেই চাঁপা শিউরে উঠল। অমিত এক বার ফিসফিস করে বলল, ‘‘সিনেমা শেষে তোমায় এক জনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।”

“কে?”

‘‘আমার এক বৌদির সঙ্গে।”

“আচ্ছা।’’

“কিন্তু তুমি এমন দূরে দূরে কেন, আরাম করে বসো দিকিনি।”

“না অমিত, আমার আর ভাল লাগছে না। চলো আমরা বেরোই।”

“ছবি তো সবে শুরু হল, এখনই বেরোবে?”

হল থেকে বেরিয়েই চাঁপার বড্ড বাড়ির জন্য মন কেমন করতে লাগল। এখন হেমন্তের শেষ। কার্তিকপুজো কাল বাদে পরশু। কার্তিকপুজোর দিন বাড়িতে বড় করে নবান্ন উৎসব পালন করা হয়। সনাতনের পরিবারে হল বারো মাসে তেরো পার্বণ। দূরদূরান্ত থেকে আত্মীয়-কুটুমরা আসে। চাঁপার বাপের বাড়ি থেকে, ননদদের বাড়ি থেকে সবাই আসে ছেলেপুলে নিয়ে। সনাতন দু’দিন দোকান বন্ধ রাখে। নতুন চাল, নারকোল, মিছরি কিনে ভাঁড়ার বোঝাই করা হয় আগে থেকে। পরশু পুজো। আজ রাত থেকেই চাঁপাকে জোগাড়ে বসতে হবে শুদ্ধ বস্ত্রে, শুদ্ধ মনে। পাড়া-প্রতিবেশীদের মেয়ে-বৌও সঙ্গে সঙ্গে হাত লাগায়। নতুন ধান-চালের গন্ধ, ধূপধুনোর গন্ধে বাড়িতে এক অপার্থিব পারিপার্শ্বিক তৈরি হয়। 

কিন্তু এ দিকে অমিত কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? রিকশা একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। 

“কার বাড়ি?” চাঁপা জিজ্ঞেস করল। 

“আমার দাদা-বৌদির সঙ্গে আলাপ করাব বললাম না?”

দরজায় মস্ত তালা ঝোলানো, অমিত পকেট থেকে চাবি বার করে তালা খুলতে গেলে চাঁপা ওর হাত চেপে ধরল, ‘‘তুমি বললে দাদা বৌদি, কোথায় তারা? ফাঁকা বাড়িতে তুমি...না, অমিত। আমি বাড়ি যাব।”

‘‘নখরা কোরো না তো! রং দেখিয়ে এখন ঢং করা। ছেনালিপনা হচ্ছে!” হিসহিসিয়ে বলে অমিত। 

“তুমি না যাও আমি যাচ্ছি...”

বলে দৌড় দেয় চাঁপা। স্টেশনের পথ চেনে না সে। চলতে চলতে মুখে আঁচল গুঁজে ডুকরে ওঠে কান্না সামলাল চাঁপা। 

******

চাঁপা শাড়ি কুচিয়ে আলনায় রাখছিল। ঘরে আলো-আঁধারি। সন্ধে থেকে কারেন্ট নেই, ঘরের কোণে একটা লণ্ঠন মিটমিট করে জ্বলছে। সনাতন কাজ থেকে ফিরে গায়ের ফতুয়াটা খুলে আলনায় রাখল। তার পর আলতো করে চাঁপার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘‘এ বার নবান্নের সময় আত্মীয়-কুটুমরা এসে তোমার যত্নআত্তি পেয়ে খুব খুশি। তারা সব ধন্য-ধন্য করছে। আজ বড়দি ফোন করেছিল। মেজদি বড়দি বলেছে, বাবা মা চলে যাওয়ার পর বহু দিন পরে বাপের বাড়ি গিয়ে এমন শান্তি পেলাম।”

চাঁপা খুশি হয়ে লাজুক হাসি হাসল। বলল, ‘‘তোমার কাছ থেকে একটা জিনিস চাইব। দেবে?”

সনাতন স্মিতস্বরে বলল, ‘‘কী চাই বলো।”

“চলো না গো, আমরা দু’দিন গিয়ে কোথা থেকে ঘুরে আসি। ”

“কোথায় যাবে?”

“চলো দিঘা থেকে ঘুরে আসি। দু’দিন কাজ থেকে ছুটি নাও।”

“পরি আর পিসি, ওরা... ওরা কোথায় থাকবে?”

“ও মা, আমরা যাব আর ওরা কোথায় থাকবে কী গো! কী যে বলো না! আমরা পুরো পরিবার মিলে যাব গো! আমি আর পরি কিন্তু সমুদ্রে খুব স্নান করব বলে রাখলাম। বারণ করতে পারবে না।”

চাঁপার ভ্রুভঙ্গি দেখে সনাতন হেসে ফেলল। আর চাঁপা মুচকি হেসে সনাতনের বুকে মুখ রাখল। 

সনাতন জানালা দিয়ে বাইরে ঘন অন্ধকারে জোনাকির ঝিকিমিকি দেখতে দেখতে ভাবল, তারাগুলো কি সব বাঁশডোবার উপরে খসে পড়ল?