সারা দুনিয়া জুড়ে যাঁর নাম, কিংবদন্তিতুল্য সেই মানুষটির ছবি সম্বন্ধে কিছু বলতে যাওয়া আমার পক্ষে ধৃষ্টতাই হবে। সে চেষ্টা আমি করব না। যে দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে, আজ সন্ধ্যায় প্রথমেই স্বীকার করে নেওয়া উচিত যে, আমি তার যোগ্য নই।

‘হঠাৎ-আলোর ঝলকানি লেগে ঝলমল করে চিত্ত’— লিখে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। ‘পথের পাঁচালী’ যখন পর্দায় এল, আমাদের মনের অবস্থাও তাই। উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার রায় তো বটেই, সত্যজিৎ রায়ের মতো তুলনামূলক ভাবে একটু কম চেনা শিল্পীর নামও তখন ছড়াচ্ছে— সেই সময়কার সিগনেট প্রেস থেকে প্রকাশিত নানা বইয়ের প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে। শোনা গেল ইনি নাকি ডি জে কিমার নামে এক বিখ্যাত বিজ্ঞাপন-সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর আঁকা বিজ্ঞাপনের ছবি একেবারেই ব্যতিক্রমী। সেগুলির সুখ্যাতি কম নয়।

বলা দরকার, শ্রীসত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগেই ‘পথের পাঁচালী’র সঙ্গে আমার খানিকটা চেনাজানা হয়ে গিয়েছিল। কেমন ভাবে, সেটাই আগে বলি।

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

১৯৫৫ সালের সামান্য কিছু আগে ছায়াছবির জগতে আমি ঢুকে পড়ি, একটা নামী প্রযোজনা সংস্থার অবৈতনিক শিক্ষানবিশ হয়ে। ওঁদের ছবির সম্পাদনা হত টালিগঞ্জের কুদঘাট লাগোয়া একটা জায়গা থেকে। নাম, বেঙ্গল ফিল্ম ল্যাবরেটরি। তখনকার কুদঘাট আজকের কুদঘাট নয়। টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপো থেকে পৌঁছবার কোনও যানবাহন ছিল না। এবড়োখেবড়ো সরু রাস্তা, মাঝে মাঝে ডোবা অথবা উলুবনের এলোমেলো ভগ্নাংশ, দূরে দু-একটা খোড়ো চালা। দিনের বেলায় দু’পাশের গাছ থেকে পাখির ডাক শুনতে শুনতে দিব্যি হেঁটে পৌঁছে যেতাম, কিন্তু সন্ধে হলেই অন্য চেহারা। রাস্তা জনহীন, মাঝে মাঝে নাকি চুরি বা ছিনতাই হত!

এমনই এক সন্ধ্যা-পেরনো রাতে ‘পথের পাঁচালী’র সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। ব্যাপারটা বলি।

তখন আমরা যে ছবির সঙ্গে যুক্ত, তার এডিটিং-এর কাজ চলছে বেঙ্গল ফিল্ম ল্যাবরেটরিতে। অন্যান্য দিনগুলোতেও সন্ধের আগেই কাজ গুটিয়ে আমরা চলে আসতাম নিরাপত্তার কারণে। কিন্তু সে দিন হল কী, জটিল একটা দৃশ্যের সম্পাদনা করতে করতে রাত প্রায় আটটা বেজে গেল। ডিরেক্টর সাহেব— এমনিতে খুবই ভদ্র আর সজ্জন মানুষ— হঠাৎ ঘড়ির দিকে চেয়ে বলে উঠলেন, ‘‘আরেব্বাপরে! সরি! চট করে গুটিয়ে ফেলে আজকের কাজ শেষ করে দিন, কাল আবার সকাল আটটা থেকে বসা যাবে।’’ এই না বলে তিনি তো তাঁর ক্রাইসলার গাড়ি চেপে বাড়িমুখো হলেন, এ দিকে আমাদের সব কাজ গুটিয়ে নিতে প্রায় আরও ঘণ্টাখানেক লেগে গেল।

‘পথের পাঁচালী’র জন্য সত্যজিতের স্কেচ

আগেই বলেছি, জায়গাটা নির্জন। চার দিকে ঝাঁ-ঝাঁ করে ঝিঁঝিঁর শব্দ, আর থেকে থেকে দূরে টালিগঞ্জের গল্ফ কোর্সের দিক থেকে এক পাল শেয়ালের হুক্কাহুয়া। অদ্ভুত একটা ভয়-ভয় করতে লাগল। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, এই রাতে আর বাড়ি নয়, বরং এডিটিং রুমেই কোনও রকমে রাত কাটিয়ে দেওয়া যাক। আশেপাশে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। একমাত্র রামবাবু নামে এক ভদ্রলোক আলুর দম বানাতেন। কোয়ার্টার পাউন্ড পাউরুটির সঙ্গে তা-ই খেয়ে পেট ভরালাম এক-এক জন।

কিন্তু শোব কোথায়? দুলাল দত্ত, আমাদের সম্পাদক, বলে উঠলেন, ‘‘কেন? এডিটিং রুমের মেঝের ওপর চাদর পেতে।’’

‘‘আর বালিশ?’’

‘‘তুলোর বালিশ আর কোথায় পাবেন? বরং ফিল্ম রাখবার বড় বড় ক্যান আছে, সেগুলোকে বালিশ ভেবেই কাজ চালিয়ে নেওয়া যাক। একটা তো রাত।’’

ছোট্ট ঘরটায় সেই ব্যবস্থাই হল। কিন্তু ঘুম আসবে কেমন করে? যা মশার উপদ্রব!

এই করতে করতে রাত একটা-দেড়টা বেজে গেল। ঘুম আসে না। অন্ধকার ঘরে চটাস-পটাস করে মশা মারবার চেষ্টা করছি। কিন্তু দেখা গেল, মশারা মানুষের চেয়ে অনেক বেশি চালাক।

হঠাৎ দুলাল, মানে দুলাল দত্ত বলে উঠলেন, ‘‘ধুত! ঘুমটুম হবে না। বরং একটা কাজ করবেন?’’

জানতে চাইলাম, কী কাজ?

দুলাল বললেন, ‘‘ইদানীং এখানকারই অন্য একটা ঘরে অন্য একটা ছবির এডিটিং করছি আমি মাঝে মাঝে। ডিরেক্টর একেবারে নতুন। কিন্তু কী সমস্ত শট, কী সব কম্পোজ়িশন। দেখলে থ’ হয়ে যাবেন। দেখবেন না কি এক-আধটা রিল?’’

আমরা একটু কিন্তু-কিন্তু করছিলাম। পরিচালক মশাইয়ের অনুমতি ছাড়া দেখা কি ঠিক? আবার দুলালের উচ্ছ্বাস দেখে লোভও সামলানো মুশকিল হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলাম।

তখনকার দিনে ‘মুভিওয়ালা’ নামে এক ধরনের যন্ত্রে এডিটিং হত। ছবির রিল দেখতে দেখতে আমাদের মুখের হাঁ ক্রমশ চওড়া হতে লাগল। এমনও হয়? এমনও হতে পারে? পুরনো ধ্যান-ধারণার অনেক কিছু হুড়মুড় করে ভেঙে গেল। পাশাপাশি অনেক নতুন নতুন জানালা খুলে গেল মনের মধ্যে।

আচ্ছন্নের মতো জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘‘কী ছবি এটা? ডিরেক্টরের নামই বা কী?’’ দুলাল জানালেন, ‘‘ডিরেক্টর হচ্ছেন সত্যজিৎ রায় নামে এক ভদ্রলোক, ছবির নাম ‘পথের পাঁচালী’।’’

কয়েক মাস পরে, এক দিন সকাল সকাল স্টুডিয়োর কাজ সেরে বাড়ি যাব বলে ট্রাম ধরেছি টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপো থেকে। এসপ্ল্যানেড থেকে ট্রাম পাল্টে শ্যামবাজার যেতে হবে। রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের মোড় পেরোচ্ছি, হঠাৎ বাঁ দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো আটকে গেল। বিশাল একটা হোর্ডিং। বিশাল মানে বি-শা-ল। সাদা জালির ওপর সাদা-কালোয় আঁকা দুটো বাচ্চা ছেলেমেয়ের ছবি। কাশবনের ভেতর দিয়ে ছুটছে। আরও দূর দিয়ে চলে যাচ্ছে কালো ধোঁয়া ওড়ানো রেলগাড়ি, ওপরে এক কোণে লেখা ‘পথের পাঁচালী’। ভাল করে দেখবার আগেই হুশ করে বেরিয়ে গেল ট্রাম। আরও বেশ খানিকটা এগিয়ে, সেন্ট পল’স ক্যাথিড্রালের উল্টো দিকে দেখি, আরও একখানা ব্যানার পড়েছে ওই একই ছবির। ডিজ়াইনও একই ধাঁচের। সাদা গ্রাউন্ডের ওপর সাদা-কালোয় আঁকা ছবি। এমনই তার আকর্ষণ যে, দেখলুম বেশ কিছু পথচলতি লোক থমকে দাঁড়িয়ে গেছে সামনে। হাঁ করে দেখছে।

নির্দেশনা: ‘পথের পাঁচালী’র শুটিংয়ে অপু-দুর্গার সঙ্গে সত্যজিৎ রায়।

এর পর ১৯৫৫— আমার তিন নম্বর গল্পের সূত্রপাত। উত্তর কলকাতার দেশবন্ধু পার্কের কাছাকাছি থাকতাম তখন। পার্কের ঠিক উল্টো দিকেই একটা আটপৌরে চায়ের দোকানে তখন আমাদের আড্ডা। আড্ডাধারীদের অনেকেই পরবর্তী কালে নানা দেশে নাম করেছেন বা করেছিলেন। শৈলেন্দ্র মুখোপাধ্যায় ফিজ়িয়োলজিতে খ্যাতি অর্জন করে হ্যালিফ্যাক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। দেবু সরকার দিল্লিতে সাংবাদিকতায় নাম করেন। সুনীল মৈত্র সিপিএম-এর পলিটব্যুরোর সভ্য নির্বাচিত হন। বাকিরাও যথেষ্ট গুণী, কিন্তু এ গল্পের পক্ষে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক নয়।

চায়ের দোকানটার নিতান্ত হাঁড়ির হাল, একটা সাইনবোর্ড পর্যন্ত নেই। ভেতরে শুধু কয়েকটা মাত্র বেঞ্চ। সেখানেই রোজ সকাল-সন্ধ্যায় মনের সুখে আমাদের গুলতানি চলত। ‘দাস ক্যাপিটাল’ থেকে শুরু করে নেতাজির বিয়ে হয়েছে না হয়নি— এ সবই ছিল উত্তপ্ত আলোচনার বিষয়। দোকানের মালিক ফণীবাবু আমাদের বিশেষ স্নেহের চোখে দেখতেন। চার কাপ চা আট ভাগ করে খেতে খেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা, তাতেও কোনও আপত্তি করতেন না।

সুনীল যেমন আমাদের মধ্যে তুখোড় তক্কোবাজ হিসেবে সবাইকে তুড়ি মেরে বেড়াত, তেমনই ঠিক উল্টো স্বভাবের ছিল সুব্রত দাশগুপ্ত নামে আমাদের এক বন্ধু। অসম্ভব কম কথা বলত সে। অথচ ভীষণ সমঝদার। ধরা যাক কোনও একটা ব্যাপারে বাকি বন্ধুরা হয়তো খুবই উচ্ছ্বসিত বা উত্তেজিত, সুব্রত সেখানে একেবারে উল্টো— ধীর, স্থির, ঠান্ডা। আমরা তাকে বলতাম ‘আন্ডারস্টেটমেন্ট-এর রাজা।’ অর্থাৎ কোনও জিনিস সম্বন্ধে যতটুকু না বললে তার প্রতি অবিচার করা হয়, সুব্রত নির্ঘাত তার থেকে অনেক কমিয়ে বলবে। আমরা ঠাট্টা করে বলতাম, তাজমহল দেখলেও সুব্রত বলবে, ‘‘বিল্ডিংটা নেহাত মন্দ নয়।’’

সে দিন সন্ধ্যায় আমরা সবাই যথারীতি আড্ডা জমিয়েছি, কিন্তু সুব্রতর দেখা নেই। কী হল, কী হল, শরীর-টরীর খারাপ হল না কি— যখন ভাবছি আমরা, এমন সময় সুব্রতর প্রবেশ। ধীর স্থির শান্ত— আজ যেন একটু বেশিই গম্ভীর। বেঞ্চের এক পাশে এসে বসে পড়ল। কোনও কথা নেই মুখে। চার দিক থেকে প্রশ্নবাণ বর্ষিত হতে লাগল ওর ওপর। ব্যাপার কী? আজ এত দেরি কেন?

‘‘কী হয়েছে? শরীর খারাপ? বাড়িতে কারও অসুখবিসুখ?’’ সুব্রত শুধু মাথা নেড়ে জানাল, না। তবে? ‘‘ওই। একটা ছবি।’’ বলেই সুব্রত চুপ। ‘‘কী ছবি?’’ সুব্রত আমাদের প্রশ্নকে পাত্তা দেয় না। চুপ করে বসেই থাকে। শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রবল চাপাচাপিতে বলল, ‘‘সুকুমার রায়...আবোলতাবোল...তাঁর ছেলে, ‘পথের পাঁচালী’ নাম, ম্যাটিনিতে দেখে এলাম। একদম চলবে না, বুঝলে? কিন্তু খুব একটা বাজে নয়, বেশ ভালই।’’

‘‘বেশ ভালই!’’ সুব্রত বলছে এ কথা! আমরা যেন অবাক হতেও ভুলে গেলাম। ‘‘ভাবছি আরও এক বার দেখব ছবিটা।’’ সুব্রত জানাল। আমাদের তখন ধাঁধা লেগে গেছে। সুব্রতর মতো ছেলে একই ছবি দু-দু’বার দেখবে? মানে কী? যাই হোক, তৎক্ষণাৎ জল্পনা শুরু হয়ে গেল কার পকেটে কত পয়সা আছে। শৈলেন্দ্র বলল, ‘‘হয়ে যাবে। চলো আজ নাইট শো’তেই দেখে ফেলি।’’ বলা বাহুল্য, সুব্রতও সঙ্গ ছাড়ল না।

গভীর রাতে লাস্ট শো দেখে বেরিয়ে হাঁটছি আমরা। কারও মুখে কোনও কথা নেই। মনের মধ্যে অনেক কথা, কিন্তু মুখ দিয়ে একটা কথাও বলতে ইচ্ছে করছে না। শুধু ফুটপাতে আমাদের চপ্পলের ঘষটানির শব্দ।

দেশবন্ধু পার্কে এসে কৃষ্ণচূড়া গাছটার তলায় বসলাম সবাই। শহর তখন ঘুমোতে যাবে। দূরের রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিট দিয়ে কদাচিৎ দু-একটা গাড়ি হুশ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষণ পর কে এক জন বলে উঠল, ‘‘এ ছবিটা চলবে না একেবারেই, কী বলো তোমরা?’’ সবাই একমত হলাম। আমি বললাম, ‘‘চলা না-চলা পাবলিকের ব্যাপার। এ যা ছবি, কোনও নাচ নেই, গান নেই, চেনা আর্টিস্টও নেই। কী হয় দেখো!’’ কিন্তু একটা ব্যাপারে সবাই একমত হলাম, ছবি উঠে যাওয়ার আগেই এ ছবিটার জন্য একটা কিছু করা দরকার আমাদের।

এর পরের প্ল্যানটা দিল আমাদের সুনীল। কাছেই ছিল আর এক বন্ধুর বাড়ি। রাতে বাড়ির লোকজনদের জাগিয়ে আমরা হইহল্লা জুড়ে দিলাম। পুরনো খবরের কাগজ চাই, আলতার শিশি চাই। কয়েকটা বাঁশের বাতা আর দরমা চাই।

পর দিন সকালে দেশবন্ধু পার্কের গেট থেকে বেরোল আমাদের বারো জনের ছোট্ট একটা মিছিল। কোনও স্লোগান নেই, চিৎকার নেই, সবার হাতেই আলতায় লেখা এক একটা পোস্টার। ‘পথের পাঁচালী দেখুন’, ‘পথের পাঁচালী দেখা আমাদের কর্তব্য’।

আমরা হাঁটছি। সবাই আমাদের চেয়ে দেখছে। বলতে বাধা নেই, লজ্জা-লজ্জাও করছে একটু। এমন দর্শনীয় হয়ে পথ চলার অভিজ্ঞতা তো আগে হয়নি কখনও।

মিছিল যখন সার্কুলার রোড পেরিয়ে ফড়েপুকুরে ঢুকল, হঠাৎ আশপাশ থেকে আরও দু-তিন জন আমাদের লাইনে ঢুকে পড়ল। বোঝা গেল, এরাও ঘটনাচক্রে গত কাল ছবিটা দেখে ফেলেছে। কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে আরও কয়েকজন, শিকদার বাগানের মোড় থেকে আরও কয়েক জন। সংখ্যাটা বাড়ছে তো বাড়ছেই। হাতিবাগানের মোড়ে এসে দেখা গেল সবসুদ্ধু প্রায় পঞ্চাশ জনেরও বেশি লোক হয়ে গিয়েছে।

সুনীল আমাদের বারো জনকে এক পাশে সরিয়ে এনে বলল, ‘‘ব্যস, মিশন সাকসেসফুল। এ বার পোস্টারগুলো ওদের হাতে ধরিয়ে দাও। আমরা বরং এসো একটু চা খাই।’’

পথের ধারে একটা রেস্তরাঁয় বসে চা খাচ্ছি, কিছু ক্ষণ পরে দেখি মিছিলটা আবার ফিরে আসছে। গুনে দেখলাম, মাথার সংখ্যা সত্তর ছাড়িয়ে গিয়েছে।

এই হচ্ছে গল্প। গল্প নয়, সত্যিকারের ঘটনা।

পরে যখন সত্যজিৎবাবুর সঙ্গে আলাপ হয়েছে, বেশ ভালই আলাপ, মনে হয়েছে বলেই ফেলি, আপনি আমাদের গর্বিত করেছেন, সারা জগতে দেশের নাম ছড়িয়েছেন, আমাদের দিয়েছেন, শিখিয়েছেন অনেক কিছু। কিন্তু আমরাও, সামান্য সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব— আপনাকে দিয়েছি। পথে নেমে শোভাযাত্রা করেছি, পূর্ণেন্দু পত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে সভার আয়োজন করেছেন, আরও অনেকেই ‘পথের পাঁচালী’ আন্দোলনের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে জুড়ে গিয়েছেন।

সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ আসলে এক আন্দোলনের নাম।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘পথের পাঁচালী’র সঙ্গে এই যে হঠাৎ ‘আন্দোলন’ কথাটা জুড়ে দিলাম, এর মানেটা কী? আমার মতে ‘আন্দোলন’ হল তা-ই, যা একটা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে অথবা আনতে চেষ্টা করে। ‘পথের পাঁচালী’ আমাদের আগেকার ছবি তৈরির সব ধ্যান-ধারণাকে বদলে দিয়ে একটা নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে, নতুন একটা সংজ্ঞা নির্মাণ করেছে। বাংলা ছায়াছবিতে গুণী পরিচালকের অভাব ঘটেনি আগেও, কিন্তু তাঁদের সব ছবির উন্নতি, যাকে বলে কোয়ান্টিটেটিভ বদল। ‘পথের পাঁচালী’ যা ঘটাল তা হচ্ছে একেবারে ‘গুণগত’ অর্থাৎ কোয়ালিটেটিভ বদল। ব্যাপারটাকে যদি এমন ভাবে বলি তা হলে বোধহয় বোঝার সুবিধে হবে— ধরা যাক, বড় এক টুকরো বরফ। তার তাপমাত্রা হয়তো -২০০০ সেন্টিগ্রেড। এখন সেই বরফকে একটা গামলায় রেখে যদি একটা উনুনের ওপর বসিয়ে দেওয়া যায়, তবে কী হবে? আগুনের তাতে তাপমাত্রা ক্রমশ বদলাতে থাকবে। -২০০০ থেকে, -১৮০০, তার পর -১৫০০, তার পর -১৪০০— কিন্তু বরফ বরফই থাকবে। তাপমানের হেরফের যেটা হচ্ছে তা হচ্ছে পরিমাণগত। এই ভাবে কমতে কমতে যত ক্ষণ না তাপমান শূন্য ডিগ্রিতে নামে, ততক্ষণ বরফ বরফই। তার শুধু পরিমাণগত বদল ঘটছে। কিন্তু যেই মুহূর্তে তাপমান শূন্য ডিগ্রি ছাড়িয়ে ১ ডিগ্রিতে পৌঁছে গেল, অমনি বরফ আর বরফ রইল না। হয়ে গেল গুণগত পার্থক্য, বরফের বদলে জল। গুণগত বদল। মূল ব্যাপারটা সেই একই, রসায়ন বিদ্যার সেই H2O, কিন্তু চেহারা বদলে গিয়েছে আমূল। একেই বলে বৈপ্লবিক বদল। আবার জল গরম করতে করতে যেই না ১০০০ তে পৌঁছল, সঙ্গে সঙ্গে আরও একটা বৈপ্লবিক বদল। মানে গুণগত বদল। তার আগে পর্যন্ত জলের তাপমান যে ধাপে ধাপে বাড়ছিল, সমস্তই কোয়ালিটেটিভ, অর্থাৎ জল জলই আছে, শুধু তা ক্রমাগত গরম হয়ে চলেছে। কিন্তু ১০০০ তে পৌঁছনো মাত্র জলকে আর জল বলে চেনার উপায় নেই। হয়ে যাচ্ছে বাষ্প। অর্থাৎ আমূল বদল। আমাদের ছায়াছবির ক্ষেত্রে ‘পথের পাঁচালী’র ভূমিকাও তাই। গুণগত পরিবর্তন। তাই আমি জেনে-বুঝেই ‘আন্দোলন’ শব্দটা ব্যবহার করলাম। জানি না, আপনারা একমত হবেন কি না।

যাই হোক, এর কয়েক বছর পরে আমি নিজেও সরাসরি ছবি বানাবার কাজে জড়িয়ে পড়ি। এ দিকে সত্যজিৎবাবুও ছবির পর ছবি বানিয়ে চলেছেন। কী করে আজ মনে নেই, এক দিন ওঁর সঙ্গে আলাপও হয়ে গেল। সম্ভবত ইন্ডিয়া ফিল্ম ল্যাবরেটরির দোতলায় সারি সারি এডিটিং রুমের সামনের বারান্দায়। পাশাপাশি ঘরে কাজ করতাম আমরা। আমি ২ নম্বরে আর উনি ৩ নম্বরে। অন্যান্য ঘরগুলিতে কখনও মৃণাল সেন, কখনও ঋত্বিক ঘটক, কখনও বা রাজেন তরফদার কাজ করতেন। কাজ করতেন অজয় কর-ও।

তখনকার দিনে এডিটিং রুমে ধূমপান করা একেবারেই নিষিদ্ধ ছিল। কারণ কিছু কিছু ফিল্ম ছিল নাইট্রেট ভিত্তিক, চূড়ান্ত রকমের দাহ্য পদার্থ। তাই সিগারেট খাওয়ার তাগিদে সকলে চলে আসতেন সামনের বারান্দায়। ওখানেই সত্যজিৎবাবুর সঙ্গে থেকে থেকেই নানা রকম গল্পগুজব। এক দিন কী একটা কথা প্রসঙ্গে হঠাৎ উনি মন্তব্য করলেন, ‘‘একটা জিনিস লক্ষ করেছ তরুণ? আজকাল ফিল্মে কেউ গুছিয়ে গপ্পোটা বলতে পারছে না?’’ চমকে উঠলাম শুনে। কারণ তত দিনে এক দল বোদ্ধা সমালোচকের সৌজন্যে ‘ছবিতে গল্প বলতে হবে’, এই ধারণাটা শুধুমাত্র বস্তাপচা নয়, প্রায় উপহাসের বস্তু হয়ে উঠছিল। নন-ন্যারেটিভ সিনেমার প্রবক্তারা, যাঁদের সঙ্গে হাতে-কলমে ছবি-বানিয়েদের কোনও সম্পর্কই প্রায় নেই, তাঁরা ইতিমধ্যেই রব তুলতে শুরু করেছেন, ‘ছায়াছবি হবে বিশুদ্ধ ছবি। গল্পটল্প এ সব একদম সাবেকি ধারণা। দেখছ না সত্যজিৎ রায়কে, কী রকম একটার পর একটা ছবির মাধ্যমে উদাহরণ তৈরি করে যাচ্ছেন।’

এর জবাবে যদি বলা হত, ‘কেন? উনিও তো বিভূতিভূষণ, প্রভাত মুখোপাধ্যায়, পরশুরাম এঁদের নিয়ে কাজ করেছেন,’ সঙ্গে সঙ্গে জবাব আসত, ‘কিন্তু ওঁর ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখো। কোথায় বিভূতিভূষণ, কোথায় প্রভাত মুখোপাধ্যায়, খোলনলচে পালটে একেবারে অন্য রকম করে নিয়েছেন। গল্পটল্পের ফাঁদে আটকা পড়ে যাবার মতো মেকার উনি নন। গুলি মারো গল্পে, সিনেমা বানাও। বিশুদ্ধ সিনেমা— যেমনটি বানিয়ে চলেছেন সত্যজিৎ রায়।’

মজার কথা এই যে, যাঁকে মডেল করে ওঁরা এ সব বলছেন, সেই সত্যজিৎ রায়ই আক্ষেপ করে বলছেন, ‘‘আজকাল ফিল্মে কেউ গুছিয়ে গপ্পোটা বলতে পারছে না।’’ এর মানেটা কী? মানেটা এই যে, উনি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করতেন যে ছায়াছবিতে একটা গল্প থাকা নিতান্ত জরুরি।

প্রস্তুতি: বেনারসে গঙ্গার ঘাটে ‘অপরাজিত’-র শুটিং।

খেয়াল রাখতে হবে, যে সময় উনি এই কথাগুলি বলেছিলেন তখনও পর্যন্ত উনি রবীন্দ্রনাথ কি শংকর, কি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প নিয়ে কোনও ছবি করেননি। উপেন্দ্রকিশোরকে নিয়েও না।
পরে অবশ্য উনি নিজের লেখা নিয়েও ছবি করেছেন। কিন্তু তখন তো উনি অসম্ভব জনপ্রিয় আর প্রতিষ্ঠিত গল্পকার।

তার মানে আমরা যারা ওঁর পরে ফিল্ম বানাতে চেষ্টা করেছি, তারা প্রথম পাঠ হিসেবে ওঁর কাছ থেকে কী শিখলাম? শিখলাম এই যে, ছায়াছবি বানাতে হলে একটা গল্প বলা চাই-ই চাই, ওটা না হলে চলবেই না।

এর পরে এই শেখার ফিরিস্তি ক্রমশ লম্বা হতে শুরু করল। সবটুকু হয়তো নিতে পারিনি, কিন্তু যেটুকু পেরেছি, তা-ই একটু গুছিয়ে বলার চেষ্টা করি।

এক নম্বর হল: মানুষের চোখ আর ক্যামেরার চোখ, তাদের ফারাক। আমরা জানি, দুটোর মাধ্যমেই ছবি দেখতে পাই আমরা, কিন্তু ভাবলে বোঝা যাবে, দুটোর মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য। মানুষের চোখ যা আছে সেটাই দেখে, তার বাইরে অথবা অন্তরে ঢুকতে পারে না। ক্যামেরার চোখ তা পারে। হাজারও ভিজ়ুয়ালের মধ্যে থেকে যে কোনও একটাকে বেছে নিয়ে, তার সাহায্যে ছবিতে একটা অন্য রকমের ব্যঞ্জনা এনে দিতে পারে। যে সব বিষয়কে আমরা চোখে দেখেও নিতান্ত অবহেলায় পাশ কাটিয়ে যাই, ক্যামেরা চোখে হয়তো সেটাই মহার্ঘ। আর তাৎপর্যময়।

এর ভূরি ভূরি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ইচ্ছে করেই দেব না। কারণ তা হলে আমার বক্তব্যের কলেবর বড্ড বেড়ে যেতে পারে।

ধরা যাক, ‘পথের পাঁচালী’-তে সেই ডোবাটার দৃশ্য। কতগুলো জলের পোকা নকশা কেটে কেটে খেলে বেড়াচ্ছে। এমন তো কতই কাটে। খেয়াল করি কি আমরা? কিন্তু ক্যামেরার চোখ যখন আমাদের বাধ্য করে, আশেপাশের হাজারও জিনিসের মধ্যে শুধু ওইটুকুতেই আমাদের মনোযোগ সীমাবদ্ধ রাখতে, তখন ছবি তার এক নতুন ভাষা খুঁজে পায়। আমরা বুঝতে পারি আর শিখতে পারি, একটি শব্দও খরচা না করে ছবিকে দিয়ে কথা বলাতে হয় কী ভাবে।

আবার ধরা যাক, ‘অপরাজিত’র প্রথম শট-টা। একটা চলন্ত ট্রেনের কামরা দিয়ে বাইরের দৃশ্য। ঝমঝম শব্দ। একটা ব্রিজের ভারী ভারী গার্ডারগুলো চোখের সামনে দিয়ে সরে সরে যাচ্ছে। নীচে একটা নদী। নদী পেরিয়ে যে দিকে ক্যামেরা চলছে, সেই জনপদটিতে প্রচুর ঘাটের সারি আর মন্দিরের চূড়া। একটি বাক্যও ব্যয় না করে ক্যামেরা বলে দেয়, কেউ বা কারা রেলগাড়িতে চেপে বাইরে থেকে বেনারসের দিকে চলছে। অদূরেই সেই শহর। শটটির স্থায়িত্ব কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু গল্পের মুখবন্ধ ওরই মধ্যে রচনা হয়ে যায়— প্রচুর তথ্যসমেত। এই যে অল্প পরিসরে অনেক কথা বলে ফেলা— সার্থক শিল্পসৃষ্টির এ-ও কিন্তু একটা শর্ত। ক্যামেরার চোখ দিয়ে দেখা হয়েছে বলেই এই ক্ষেত্রে তা সম্ভব হল।

আর একটা উদাহরণ ধরা যাক।

দুর্গা মারা গিয়েছে। হরিহর গ্রামের বাইরে। অনেক দিন হল। সর্বজয়া বসে আছে গালে হাত দিয়ে। চোখ দুটো তার বাইরের সুদূরে নাকি অন্তরের গভীরে— ভেবে থই পাওয়া যায় না। এমন সময় হঠাৎ বাইরে থেকে হরিহরের গলা শুনতে পেয়ে সর্বজয়া একটু নড়ে ওঠে। নড়া মানে, তার হাতের শাঁখাটা কব্জির কাছ থেকে সামান্য একটু নীচে নেমে যায়। বাবার আদরের মেয়ের মৃত্যুসংবাদ এ বার তাঁকে দিতে হবে— অত্যন্ত কঠিন আর জটিল এই মানসিক অবস্থাটা বোঝাবার জন্য ক্যামেরার চোখ বেছে নেয় শুধুমাত্র ওই শাঁখাটার সামান্য একটু স্থানচ্যুতিকে। যা বলার, ওতেই সব বলা হয়ে যায়।

এ রকম উদাহরণের শেষ নেই। একটার পর একটা তুলে ধরতে গেলে প্রচুর সময়ের দরকার হবে। তার দরকারও নেই। কারণ, যতটুকু শেখার তা আমরা শিখে নিয়েছি: মানুষের চোখ আর ক্যামেরার চোখে বিস্তর ফারাক। কোনও তুলনাই হয় না।

এ বার আসি শব্দপ্রয়োগের প্রসঙ্গে। সেখানে শেখার মতো কী কী আছে? একটা উদাহরণ দেব। মোটে একটাই। তার আগে ছোট্ট একটা কথা বলে নিই। কোনও একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কত রকম শব্দ আমাদের কানে আসে। ঘরের মধ্যে বসে থাকি অথবা রাস্তা দিয়ে হাঁটি— শব্দের শেষ নেই। ঘরে থাকলে কী কী হতে পারে? আশপাশের বাড়ি থেকে নানা রকম কথাবার্তা, মাথার ওপর পাখা ঘোরার খটখট শব্দ, পাশের গলিতে ‘বাসন নেবে গো’— বলে কারও ডাক, শিশুর কান্না, হারমোনিয়ামে কোনও কিশোরীর গলা সাধা— মিলিয়ে মিশিয়ে আরও কত রকমের শব্দ আসতে পারে। তেমনই আবার পথে বেরোলে ট্রামের ঘরঘর, বাসের হর্ন, মিছিলের স্লোগান, শবযাত্রার ‘বল হরি হরি বোল’, পথের পাশের হকারদের ডাকাডাকি— সবই জগাখিচুড়ি হয়ে মিলেমিশে একটা প্যাটার্ন তৈরি করে। বাস্তব জীবনে এর কোনওটার হাত থেকেই আমাদের নিষ্কৃতি নেই। কিন্তু সত্যজিৎবাবু আমাদের কী শেখালেন? শেখালেন যে, জীবনের বাস্তব আর শিল্পের বাস্তব এক জিনিস নয়। সেখানে, ছায়াছবির ক্ষেত্রে, গ্রহণ-বর্জনের একটা মস্ত ভূমিকা আছে। হাজারটা শব্দের মধ্যে থেকে একটি কি দুটি শব্দই তার দরকার। অতএব, সেই একটি-দুটি শব্দই ব্যবহৃত হবে, এর বেশি নয়। প্রয়োজনবোধে সেই শব্দ, যেটা আমরা সচরাচর কানে শুনি, তার থেকে অনেক বেশি জোরালো, অর্থাৎ অ্যামপ্লিফায়েড অবস্থায় প্রয়োগ হতে পারে।

‘পথের পাঁচালী’ থেকেই দুটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যেতে পারে। মনে করে দেখুন, ইন্দির ঠাকরুণের মৃত্যুর দৃশ্য। বাঁশবাগানে তাঁর শরীরটা মাটিতে লুটিয়ে। কিশোরী দুর্গা আর কিশোর অপু এর আগে মৃত্যু দেখেনি। ওদের মনোভাব বোঝাতে আমরা কী ধরনের শব্দের ব্যবহার লক্ষ করি? শুধুমাত্র হাওয়ার আওয়াজ, তার সঙ্গে বাঁশে বাঁশ ঘষা লেগে একটা কট কট কট কট শব্দ। তাও আবার অ্যামপ্লিফায়েড হয়ে। এর বাইরে যদি কোনও শব্দ থেকেও থাকত অপু-দুর্গার মনের ভাব বোঝানোর পক্ষে, সেগুলির কোনও কার্যকরী ভূমিকা নেই। অতএব নির্মম ভাবে বাতিল।

আর একটি উদাহরণ, যদিও তার বিশদে যাব না। কাশবনের দৃশ্যটা। টেলিগ্রাফের খুঁটিতে কান লাগিয়ে অপু-দুর্গার শব্দ শোনা। একই ব্যাপার। আশেপাশে হয়তো আরও অনেক শব্দই ছিল। কিন্তু ওদের বিস্ময় আর রোমাঞ্চের কেন্দ্রে শুধুমাত্র ওই একটাই। সুতরাং আর সব শব্দ বাতিল।

এ বার আসি শিল্প নির্দেশনা বা আর্ট ডিরেকশন নিয়ে। কী কী শিক্ষণীয় আছে ওঁর ছবি থেকে? আর্ট ডিরেকশন ব্যাপারটাই বা কী?

এখানে সবাই জানেন, তবু আরও এক বার বলছি, একটা ছবি তৈরি হয়ে যাওয়ার পরে তার বাইরের অবয়বটা ঠিক কেমন দেখানো উচিত— তার আগাম পরিকল্পনা আর সেই অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। সেটা সেটের চেহারা হতে পারে, আসবাব থেকে শুরু করে খুঁটিনাটি নিত্য প্রয়োজনীয় সংসারের উপকরণ হতে পারে, চরিত্রের পোশাক-পরিচ্ছদও হতে পারে। অন্তর্দৃশ্য বা ইন্ডোর সেট থাকলে তার জন্য এক রকমের ব্যবস্থা, আবার লোকেশনে যদি কাজ করতে হয়, তার জন্য অন্য রকম। আগে এ সব নিয়ে অত খুঁতখুঁতানি ছিল না। বাড়িকে কোনও রকমে বাড়ির মতো, ঘরকে ঘরের মতো, ইন্ডোর-এ তৈরি রাস্তার ধারে একটা ডাস্টবিন অথবা ল্যাম্পপোস্টের ব্যবস্থা করলেই কাজ চলে যেত। সত্যজিৎ রায় এসে আমাদের শেখালেন, ওই রকম দায়সারা গোছের কাজ চালানো নয়, শিল্প-নির্দেশনার শিকড়কে চারিয়ে দেওয়া উচিত আরও অনেক গভীরে, যাতে শিল্প নির্দেশনা নিজেই ছবির একটা চরিত্র হয়ে উঠতে পারে। প্রথমেই চাই পর্যবেক্ষণ, তার পর সেই অনুযায়ী নীল নকশা বানানো, তার পর সেই নকশাকে অবলম্বন করে ধীরে ধীরে, ধাপে ধাপে, নিখুঁত ভাবে এগিয়ে চলা। গোদা চালের, মোটা দাগের আয়োজন নয়। চাই ডিটেলস, ডিটেলস এবং ডিটেলস। এই ডিটেলস-ই যে ছবির প্রাণ, সত্যজিৎবাবুর আগে আর কেউ তা এত স্পষ্ট করে আমাদের বোঝাননি।

এক বার বংশীচন্দ্র গুপ্ত একটা মজার জিনিস বলেছিলেন। ‘পথের পাঁচালী’তে নিশ্চিন্দিপুরে হরিহরের বাড়ির সেই সদর দরজাটাকে ওই রকম নড়বড়ে আর পুরনো চেহারা দেওয়ার জন্য তাঁকে কী কী করতে হয়েছিল। সঙ্গতিহীন অথচ সংসারী মানুষের বাস— সেই বাড়ির দরজা। পোড়ো বাড়ির মতো দেখতে হলে চলবে না— অথচ বাড়ির বাসিন্দাদের অভাবের ছাপ স্পষ্ট থাকা চাই। সত্যজিৎবাবুর সঙ্গে কথা বলে বংশী মাপসই, সস্তা কাঠের একটা দরজা কিনে ফেললেন। তার পর জ্বলন্ত কয়লার একটা চুল্লি বানিয়ে তার ভিতরে ঢুকিয়ে দিলেন। পুড়তে পুড়তে দরজাটা যখন আধো-অঙ্গার হয়ে গিয়েছে, তখন সেটাকে সোডার জলে চুবিয়ে তারের ব্রাশ দিয়ে ঘষে ঘষে যেমনটি চাই ঠিক তেমন চেহারায় নিয়ে এলেন।

এ তো গেল সামান্য একটা দরজার কথা। বাকি সব গৃহসজ্জা, যেমন— হাঁড়ি-কলসি, পিতলের বাটি, উঠোনে কাপড়চোপড় মেলার দড়ি, বেড়ালছানাগুলোর বসবাসের জন্য একটা ফেলে-দেওয়া মাটির জালা, পাত্রপাত্রীদের পোশাক-পরিচ্ছদ, নিত্যব্যবহারে তাদের জীর্ণ দশা থেকে শুরু করে তাকের ওপর গোপনে রাখা একটা নারকোলের মালা পর্যন্ত।

এ সবই শিল্প নির্দেশনার আওতায় পড়ে। এর তালিকা এতই দীর্ঘ যে বলতে গেলে অনেক সময় নেবে।

 

(২৭ এপ্রিল ২০১৯ শিশির মঞ্চে সত্যজিৎ রায় সোসাইটি আয়োজিত ‘দ্য পেঙ্গুইন সত্যজিৎ রায় মেমোরিয়াল লেকচার’)