খোলা আকাশের নীচে, নিম আর কেঁদ গাছের তলায় বসে আছেন হাতিঠাকুর। গলায় গাঁদার মালা, কপাল থেকে শুঁড় অবধি সিঁদুর লেপা। একুশ বছর আগে যে হাতিঠাকুর বরাশুলির জঙ্গলে দেহ রেখেছিলেন, দেখতে ঠিক তেমনটি। প্রচলিত লোকবিশ্বাস ও বন্যপ্রাণের প্রতি অসীম ভালবাসার বন্ধনে গত প্রায় দু’দশকে হাতিঠাকুর হয়ে উঠেছেন এখানকার কুড়ি-বাইশটি গ্রামের সর্বজনীন দেবতা। তার কোনও মন্ত্র নেই, নেই বিশেষ আচার। বেদির উপর লেখা: ‘নিজের পূজা নিজে করুন’। 

ঝাড়গ্রাম জেলার প্রত্যন্ত বরাশুলি গ্রাম বিখ্যাত হয়ে উঠেছে হাতিঠাকুরের কল্যাণে। জঙ্গলমহলে ক্রমশ বাড়ছে হাতি ও মানুষের সংঘাত। কয়েকশো হাতির দল দলমা ছেড়ে ঘাঁটি গেড়েছে ঝাড়গ্রামের বনাঞ্চলে। তাদের কেউ কেউ ‘স্থায়ী বাসিন্দা’ হয়ে সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। প্রতি মরশুমে কৃষকদের ফসল ও সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ দিতে কালঘাম ছুটছে বন দফতরের। ঘটছে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনাও। এত কিছুর পরেও জঙ্গলমহলের বাসিন্দারা জঙ্গলের হাতিকে দেবতা হিসেবে মানেন। হাতিঠাকুরের দাপটে রাতের ঘুম ছুটে যায় বাসিন্দাদের, ফসল বাঁচাতে রাতপাহারা দিতে হয়। ব্যতিক্রম বরাশুলি। গ্রামবাসীর বিশ্বাস, হাতিঠাকুর গ্রামের রক্ষক। তাই জঙ্গলে ঘেরা গ্রামে হাতি ঢুকে পড়লেও ক্ষতি করে না কোনও।
কলকাতা থেকে ঝাড়গ্রামগামী জাতীয় সড়ক মুম্বই রোডের বালিভাসা চক থেকে কিলোমিটার পাঁচেক দূরে বরাশুলি গ্রাম। গ্রামে যাওয়ার রাস্তা বলতে কিছু নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজ সেনাদের তৈরি কংক্রিটের রানওয়ে দিয়ে কিছুটা যাওয়ার পরে মিলবে সরু রাস্তা। সেই রাস্তা উজিয়ে গ্রামে ঢোকার মুখেই হাতিঠাকুরের ঠিকানা। ঝাড়গ্রাম ব্লকের দুধকুণ্ডি পঞ্চায়েতের এই গ্রাম ঘন শালজঙ্গলে ঘেরা। গ্রাম-লাগোয়া জঙ্গলে সারা বছরই তিন-চারটি স্থানীয় হাতি ঘোরাফেরা করে। দলমার পরিযায়ী হাতির দলও যাতায়াত করে এই এলাকার জঙ্গল দিয়ে। 

১৯৯৮-এর ৩১ অক্টোবর বরাশুলির জঙ্গলে দু’টি পুরুষ হাতির মধ্যে ধুন্ধুমার লড়াই হয়েছিল। প্রায় আঠারো ঘণ্টা লড়াইয়ের পরে একটি পুরুষ হাতির মৃত্যু হয়। হাতির মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন হয়েছিলেন বরাশুলির বাসিন্দারা। তার পরেই গ্রামের বাসিন্দা, সেচ দফতরের চতুর্থ শ্রেণির কর্মী পরমেশ্বর মাহাতো ও আরও ক’জন ঠিক করেন, হাতির স্মৃতিতে মূর্তি তৈরি করা হবে। বরাশুলিতে ৫০টি পরিবারের বাস, চাষাবাদই প্রধান পেশা। গরিব গ্রামে এহেন ‘আদিখ্যেতা’ নিয়ে ঠাট্টা করতে ছাড়েননি অনেকেই। হাতিঠাকুরের থানে বসে পরমেশ্বর জানালেন, ‘‘প্রথমে গুটিকয় গ্রামবাসী ছাড়া কেউ এগিয়ে আসেননি। নিজের উদ্যোগেই মূর্তি বানানোর সিদ্ধান্ত নিই।’’

২০০১ সালে হাতি দিঘির সামনে বসে  হাতিঠাকুরের মূর্তি। পরমেশ্বর ধারদেনা করে, এগারো হাজার টাকা খরচে সিমেন্টের মূর্তিটি তৈরি করান। মূর্তিটি বানিয়েছেন খেমাশুলি গ্রামের শিল্পী মহাদেব রানা। প্রথম তিন বছর পরমেশ্বরের উদ্যোগেই হয় বার্ষিক হাতি মেলা। পরে এগিয়ে আসেন গ্রামবাসীরাও। তৈরি হয় হাতি মেলা কমিটি। এখন সেই কমিটিতে মিহির, দিল্লেশ্বর, সুভাষ মাহাতোর মতো গ্রামের অনেকেই রয়েছেন। স্থানীয় সগড়ভাঙা, হরিয়াধরা, বারডাঙা, গহিরা, ইন্দখাড়া, দুধকুণ্ডি, বাদিনা, বালিভাসা, কলসিভাহা, চৌকিচটি, বলদমারার মতো গ্রামগুলির মানুষ যে কোনও শুভ কাজে হাতিঠাকুরের থানে পুজো দেন। দূরদূরান্ত থেকেও আসেন মানুষজন। হাতি দিঘিতে প্রায়ই জল খেতে আসে বন্য হাতিরা। ওই জলাশয়টি সংস্কার করে দিয়েছে বন দফতর। তাদের উদ্যোগে হাতি দিঘির চারপাশে তৈরি হয়েছে বসবার জন্য কংক্রিটের চেয়ার, মাছ ধরার জায়গা, স্নানের ঘাট। বরাশুলিতে মাঝেমধ্যে পর্যটকরাও আসেন, ভাল রাস্তা না থাকায় যাতায়াতে সমস্যা হয়। হাতির থানে পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। নেই শৌচাগারও। 

যে কোনও শুভ কাজে এলাকার মানুষ হাতিঠাকুরের পুজো দেন। ‘‘হাতিঠাকুরের মৃত্যুর পর থেকে এলাকায় তিনি দেবতা হয়ে রয়েছেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। আমাদের গ্রামকে রক্ষা করছেন তিনি,’’ বলেন পরমেশ্বর। হরিয়াধরা গ্রামের বধূ সোমাশ্রী মাহাতো এসেছিলেন হাতির থানে। জানালেন, ফসলের ক্ষয়ক্ষতি যাতে না হয়, হাতির দলের সামনে পড়ে যাতে প্রাণ না যায়, সেই প্রার্থনাই জানিয়েছেন। হাতিঠাকুরকে সাক্ষী রেখে বিয়ের অনুষ্ঠানও হয়। মানিকপাড়া কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী, বলদমারা গ্রামের রঞ্জনা মাহাতো জানালেন, পরীক্ষার আগে হাতিঠাকুরের থানে নারকেল ফাটিয়ে ভোগ দিয়ে যান তিনি।
২০০১ সাল থেকে হাতিঠাকুরের বার্ষিক পুজোটি করছেন কলসিভাঙা গ্রামের রঞ্জিত তিওয়ারি। পুজো হয় প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর। ওই দিনেই বরাশুলি লাগোয়া জঙ্গলে দেহ রেখেছিলেন হাতিঠাকুর। মনস্কামনা পূরণে যে কোনও দিন হাতি ঠাকুরের থানে পুজো দেওয়া যায়। মন্ত্র, পুরোহিতের প্রয়োজন নেই। বাতাসা, ধূপ, সিঁদুর, নারকেল ও কলা সামনে রেখে করজোড়ে প্রার্থনার পরে নারকেল ফাটিয়ে দিলেই পুজো শেষ। কোনও মন্ত্র নেই। বার্ষিক পুজোর দিনে হাতি মেলাকে কেন্দ্র করে হয় ফুটবল প্রতিযোগিতা, যাত্রা, ঝুমুরগান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মেলা কমিটির সম্পাদক, বিশেষ পুজোর দিনটিতে হাতির থানে নাকি জঙ্গল থেকে বুনো হাতি বেরিয়ে আসবেই। কোনও ক্ষতি করে না। দিঘিতে জল খেয়ে ফিরে যায় বনে। 

ঝাড়গ্রামের প্রবীণ লোকসংস্কৃতি গবেষক সুব্রত মুখোপাধ্যায় জানান, জঙ্গলমহলের প্রতিটি গ্রামের ‘গরাম থান’-এ (দেবস্থান) পোড়া মাটির তৈরি হাতি-ঘোড়ার ছোট ছোট ‘ছলন’ (মূর্তি) থাকে। গরাম থানের গ্রামদেবতাকে গ্রামের সব শক্তির উৎস ও বিঘ্নবিনাশক হিসেবে মনে করা হয়। আবহমান কাল থেকে চলে আসছে এই লোকবিশ্বাস। সুব্রতবাবু জানালেন, হাতির বিশাল আকৃতি ও অসীম শক্তির কারণে প্রাচীন কাল থেকেই তার উপর দেবত্ব আরোপিত হয়েছে। হাতির নামে জঙ্গলমহলে আছে অজস্র গ্রাম— হাতিবাড়ি, হাতিধরা, হাতিলোট, হাতিগেড়িয়া, হাতিপাতা। মানুষের বিশ্বাস, দেবস্থানে হাতি থাকলে গ্রামের কারও কোনও ক্ষতি হবে না। সুব্রতবাবু বলেন, ‘‘হাতির দল ফসলের ক্ষতি করে, ঘর ভাঙে, হাতির সামনে পড়ে মানুষের প্রাণ যায়। কিন্তু হাতির মৃত্যু হলে দলে দলে মানুষ সিঁদুর মাখিয়ে ধূপ জ্বেলে তাকে প্রণাম করেন।’’ 

গত জুলাইয়ে ঝাড়গ্রাম জেলার বিনপুরের সাতবাঁকি গ্রামের ধানজমি দিয়ে যাওয়ার সময়ে বিদ্যুতের হাইটেনশন তারের স্পর্শে একটি দাঁতাল-সহ তিনটি হাতির মৃত্যু হয়। মৃত হাতিদের দেখতে ঝাড়গ্রাম তো বটেই, পড়শি ঝাড়খণ্ড রাজ্য থেকেও দলে দলে মানুষ এসেছিলেন। হাতিদের দেহে ফুল-সিঁদুর দিয়ে প্রণাম করেছিলেন অজস্র মানুষ। মৃত হাতির লোমও সংগ্রহ করেছিলেন কেউ কেউ। হাতির লোম বাড়িতে থাকলে নাকি কোনও অনিষ্ট হয় না। পরে ময়না তদন্তে জানা যায়, দু’টি স্ত্রী হাতি অন্তসত্ত্বা ছিল। বন দফতরের হিসেব অনুযায়ী, মৃত্যু হয়েছিল পাঁচটি হাতির। যে চাষিদের জমিতে হাতিদের দেহ পড়েছিল, তাঁরা অশৌচ পালন করেছিলেন, রীতিমতো শ্রাদ্ধও করেছিলেন। অনুষ্ঠানে পাত পেড়ে সবাইকে খিচুড়ি খাওয়ানো হয়েছিল। হয়েছিল হাতির স্মরণসভাও। পঞ্চায়েতের উপপ্রধান দুর্গাপ্রসাদ মাণ্ডি জানালেন, সাতবাঁকিতে পাঁচটি হাতির মূর্তি তৈরির জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন গ্রামবাসী। 

দলমায় হাতিদের থাকার পরিবেশ নেই। অথচ বছর বছর হাতি বাড়ছে। নতুন প্রজন্মের হাতিরা ঝাড়গ্রামের বনাঞ্চলকেই নিজেদের ডেরা ভাবছে, ধান ও আনাজের খেতের ফসলে পেট ভরাচ্ছে। হুলা পার্টির তাড়া খেয়ে ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার জঙ্গলের মধ্যে ঘুরছে হাতির দল। গৃহস্থের ঘর ভেঙে ধান-চাল সাবাড় করছে, স্কুলের ভাঁড়ারের দরজা ভেঙে খেয়ে নিচ্ছে মিড-ডে মিলের চাল। ঝাড়গ্রামের পথে পণ্যবাহী গাড়ি থামিয়ে হাতির খাবার আদায় করাও প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেসিডেন্ট হয়ে স্থানীয় জঙ্গলে থেকে যাচ্ছে ছোট ছোট দল। এলাকা থেকে হাতি তাড়ানোর দাবিতে প্রায়ই ঘেরাও, বিক্ষোভ, পথ অবরোধ হয়। কিন্তু সেই হাতিই রেলে কাটা পড়লে, তড়িদাহত বা অসুস্থ হয়ে মারা গেলে শোকে ভেঙে পড়েন এলাকাবাসী। এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য!