রাজাকে যে অমান্য করে, সে বিদ্রোহী। কিন্তু রাজার শাসনকে অমান্য করার সঙ্গে রাজা হওয়ার অধিকারটাকেই যদি কেউ না মানে?

তেমন লোক বিদ্রোহীরও বাড়া, এক মুহূর্তও তাকে বাঁচিয়ে রাখা চলে না। আর তাই জন্যেই, রাজা হেরড কেন সে দিন জিসাসকে মারতে হন্যে হয়ে উঠেছিলেন, বুঝতে মোটেই কষ্ট হয় না। ত্রিশ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময় সেটা। কিছু কাল ধরেই রাজার কাছে খবর— দুই ভাই, জন আর জিসাস মিলে হাজার সমস্যা তৈরি করছেন, স্বর্গ আর মুক্তি নিয়ে কী সব নতুন ধরনের কথাবার্তা বলে লোক খেপাচ্ছেন। জনকে ইতিমধ্যে বন্দি করে মেরে ফেলেছেন হেরড। কিন্তু জিসাস নাকি আরও ‘সাংঘাতিক’, শয়ে শয়ে লোক নাকি তাঁর কথা শুনে আপ্লুত, বিশেষত মহিলারা। এমনকী হেরডের নিজের প্রাসাদের মহিলারাও এই তরুণকান্তি সুদর্শন ধর্মপ্রচারকের প্রতি মুগ্ধতায় ডুবে। এরই মধ্যে এক দিন গুপ্তচর জানাল, জিসাস হেঁটে আসছেন জেরুসালেমের দিকে।

খবর শুনে গোটা শহর জুড়ে সে কী উত্তেজনা। কেউ বলছে, উনি অন্য কেউ নন, জন দ্য ব্যাপটিস্ট মরণ থেকে আবার উঠে এসে নতুন শরীরে জিসাস নাম নিয়ে আসছেন। কেউ বলছে, না না, জিসাস একেবারে অন্য মাপের প্রফেট, দেখলেই বুঝবে। পিটার, তখনই জিসাসের সবচেয়ে বড় ভক্ত, সকলকে ডেকে ডেকে বোঝাচ্ছেন, ইনি স্বয়ং ভগবানের দূত, ‘মেসায়া’। দেখেশুনে হেরড ঝালাপালা হয়ে গেলেন। অবস্থা বোঝো, তাঁর নিজের গাড়ির চালকের স্ত্রী-ও সব ছেড়ে জিসাসের শরণ নিতে ছুটছে? তিতিবিরক্ত হেরড হুকুম দিলেন, ‘‘ধরো লোকটাকে, ধরে আনো।’’

জিসাসের কানেও পৌঁছল হুকুম। ‘‘যাও, গিয়ে তোমাদের রাজাকে বলো, আমি আসছি,’’ শান্ত, নিরুত্তাপ তাঁর উত্তর।

আরও পড়ুন: মহারাজ রান্নায় ব্যস্ত, ছাত্রেরা আলুর খোসা ছাড়ানোয়

দুই দিন ধরে অবিশ্রান্ত হেঁটে তৃতীয় দিনে তিনি পৌঁছলেন সেই জায়গায়, যেখানে পৌঁছনোটাকেই যে কোনও ইহুদি তার জীবনে চরম প্রাপ্তি বলে মনে করত— জেরুসালেম! জিসাস নিজে কতখানি সম্ভ্রমের সঙ্গে দেখতেন জায়গাটিকে, তাঁর কথাতেই স্পষ্ট। ‘‘জেরুসালেম থেকে কোনও সত্যিকারের প্রফেট নির্বাসিত হতে পারে না,’’ শহরে প্রবেশের আগে বললেন তিনি। অবশ্য শুধু এটুকুই বলেননি। একটা ‘ধ্বংস’-এর ইঙ্গিতও দিলেন সঙ্গে। ঠিকই, পবিত্রতার পীঠভূমি ওই শহর, কিন্তু মানুষের অপবিত্রতাও তো তত দিনে সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে! জেরুসালেমের অসামান্য টেম্পল, যা এক দিন ভগবানের আসন হিসেবে তৈরি করেছিলেন রাজা ডেভিডের পুত্র রাজা সলোমন, তাকে তো ইতিমধ্যেই নিকৃষ্ট ক্ষমতালোভী মানুষ নিজের শাসনক্ষেত্র হিসেবে দখল করে ফেলেছে! টেম্পল-এর এই অবনমনের মধ্যেই মানুষের অধঃপতন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলেন জিসাস। ‘দিব্যদৃষ্টি’ ছিল তাঁর, অনেক দূর সময় পর্যন্ত তিনি দেখতে পেতেন মনের চোখ দু’টি মেলে। তাই ‘ডেভিডের শহর’ বলে যার খ্যাতি তখনই হাজার বছর ছুঁই-ছুই, সেই শহরে প্রবেশের আগে শহর-মাঝে নীলাকাশ-ছোঁওয়া মহান টেম্পল-টির উদ্দেশে বললেন: ‘‘জেরুসালেম, ও জেরুসালেম, তুমি আজ তোমার প্রফেটকেও মারতে চলেছ।... দেখো, তোমার গৃহ, তোমার মন্দির তোমার জন্যে শূন্য হয়ে পড়ে আছে।’’ বাইবেল-এ লেখা আছে সেই অমোঘ বাণী: ‘‘বিহোল্ড, ইয়োর হাউস ইজ লেফট আনটু ইউ ডেসোলেট’’— যা এক দিন ছিল ঈশ্বরের নিজের, তুমি আজ তাকে দখল করেছ বলে ওই মন্দির বাইরে থেকে অটুট হলেও ভিতরে সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে গিয়েছে। 

তার পর কী হল জিসাসের, আমরা মোটামুটি জানি। আজও জেরুসালেমের মানুষ বিদেশি পর্যটকদের সম্ভ্রমভ’রে দেখান, হেরডের চেলাচামুণ্ডারা কোন পথ দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে মাউন্ট অব অলিভস-এ নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁকে, চোখ বাঁধা অবস্থায়। লোহার ছুঁচলো ক্লিপ বসানো চাবুকে বাঁধা গোটা শরীর, সে নাকি এত যন্ত্রণাময় যে অনেকেই তা সহ্য করতে না পেরে পথেই মারা যায়। তাঁর মাথার ওপর আটকে দেওয়া ব্যঙ্গবঙ্কিম চারটি শব্দ, ‘কিং অব দ্য জ্যু’জ’! অঝোর রক্তঝরা পিঠে নিজেকেই বহন করতে হচ্ছিল বিরাট ক্রুশটি। কাঠের সেই ক্রুশ যেখানে বসানো হবে, সেই মাউন্ট অলিভস শহরের সামান্য বাইরে। বড় বড় বাগান, বিরাট বিরাট পাথুরে দরজা, বিস্তীর্ণ সমাধিভূমি, এই সব পেরোতে পেরোতে পাওয়া যাবে জেরুসালেমের সেই ‘এগজিকিউশন হিল’-এর দর্শন, আন্দাজ তেত্রিশ সাল নাগাদ যেখানে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিল যিশুর শরীর।

তখনকার ইহুদি প্রথা অনুযায়ী, মৃত্যুর পর মৃতদেহ সঙ্গে সঙ্গে সমাধিস্থ করা হত না, কেবল সমাধি-গহ্বরের মধ্যে ফেলে রাখা হত। অনেক সময় ফেলে রাখা হত বছরখানেক অবধি। তার পর এক দিন হাড়গোড়গুলি এক জায়গায় করে ‘অসুয়ারি’ নামে একটি বাক্সে ভরে সমাধি দেওয়া হত। এই প্রথার দরকার ছিল বোঝার জন্য যে, সত্যিই মানুষটির মৃত্যু হয়েছে কি না, না কি সে নেহাত ‘কোমা’য় চলে গেছে, বেঁচে ওঠার সম্ভাবনা আছে। জিসাসের দেহও সেই ভাবেই রেখেছিলেন তাঁর আত্মীয়বন্ধুরা। আর তাই, ক’দিন পর তাঁর যে রেজারেকশান বা পুনর্জাগরণ হল, সেই ইস্টার-কাহিনির পিছনে কতটা বাস্তব, কতটা কল্পনা, তা চির-অজানা। কেবল এইটুকু জানা, এই জেরুসালেমেরই সমাধিস্থল থেকে মাউন্ট অব অলিভস অবধি রাস্তা দিয়ে হেঁটেছিলেন পুনর্জাগ্রত যিশু— আর তাই, গোটা বিশ্বের মধ্যে খ্রিস্টধর্মের প্রধান নির্ভর কিন্তু এই জায়গাটাই। স্বাভাবিক। জিসাস নিজেই তো বলেছিলেন, মৃত্যুর পর তিনি যখন আবার বেঁচে উঠবেন, তখনই হবে তাঁর পরমত্বের প্রাপ্তি। আর, সেই প্রাপ্তি ঘটতে পারে একটিই স্থানে—  জেরুসালেমে!

প্রাচীন: জেরুসালেমের ডেভিড’স টাওয়ার, ১৯৩৮। গেটি ইমেজেস

আশ্চর্য নয়, ইহুদি ঐতিহ্যময় এই শহর থেকেই অতঃপর শুরু খ্রিস্টধর্মের জয়যাত্রা। ইহুদি শাসকদের পতন ঘটিয়ে, পেগান বা উপজাতীয় উপদ্রব পেরিয়ে, একে একে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য আর রোমান সাম্রাজ্যের বদান্যতায় ঘটল এই ‘অঘটন’। পরের কয়েক শতাব্দী জুড়ে চলল সেই মহাপরাক্রম। জিসাস ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার মাত্র চার দশক পরই ৭০ খ্রিস্টাব্দে সে কী সাংঘাতিক কাণ্ড: রোমানদের উদ্‌ভ্রান্ত প্রতাপের চোটে চুরমার হয়ে গেল জেরুসালেম, রোমান রাজপুত্র টাইটাস ভয়ঙ্কর আঘাত হানলেন শহরের উপর। লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে কেটে টুকরো করে, পুড়িয়ে খাক করে, জ্যান্ত শরীর টেনে ছিঁড়ে ফেলে প্রকাশিত হল পরাক্রম। ভেঙে দেওয়া হল মহাগরিমায় মাথা উঁচিয়ে থাকা সেই অতিজাগতিক টেম্পলকে। রোমানরা জানত, ইহুদি ধর্মের কত গুরুতর প্রতীক ওই টেম্পল। ওটা বিনষ্ট করার অর্থই তো ইহুদি ধর্মের মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলা।

একটা কথা মনে রাখতে হবে। টাইটাস যে টেম্পলটি সে দিন ভাঙলেন, সেটা কিন্তু আদি টেম্পল নয়। আদি টেম্পল ভাঙা হয়েছিল আরও আগেই, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে। খ্রিস্টের জন্মের প্রায় হাজার বছর আগে ‘ফার্স্ট টেম্পল’ তৈরি হয়েছিল কিংবদন্তি রাজা ডেভিড ও তাঁর পুত্র সলোমনের হাতে। কিং সলোমনের কথা আমরা জানি। এও জানি যে সলোমনের বাবা ডেভিড হলেন বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট-এর সবচেয়ে রঙিন ও সবচেয়ে শক্তিমান চরিত্র। প্রাচীন শহরটির মধ্যে জায়ন ও টেম্পল মাউন্ট নামে যে দু’টি রহস্যময় পাহাড়, যেখানে নাকি সেই কবে থেকেই দৈবী শক্তির ভরকেন্দ্র, সেখানে দুর্গ তৈরি করেছিলেন ডেভিড। আর তার পর থেকেই জেরুসালেমের পাহাড়ি প্রাসাদ-ঘেরা মধ্যস্থলটির নাম হয়ে গিয়েছিল সিটি অব ডেভিড। আজ তিন হাজারেরও বেশি বছর ধরে লক্ষ কোটি মানুষের ধর্মবিশ্বাসে গভীর প্রোথিত এই ভাবনা যে সিটি অব ডেভিড-এই ‘ইয়াওয়ে’ বা সর্বশক্তিমান ‘গড’-এর বসবাস। জেরুসালেমকে প্রাণ দিয়ে রক্ষা করতে হবে, রাজা ডেভিড যে বলেছেন, এখানেই ‘ইয়াওয়ে’ তাঁর ‘বাড়ি’ খুঁজে পেয়েছেন। 

ডেভিডের সেই ফার্স্ট টেম্পল অনেক আগেই ব্যাবিলনের সম্রাট নেবুচাদনেজারের হাতে খণ্ডবিখণ্ড হয়েছিল। তবে বেশি দিনের জন্য শূন্য থাকেনি দেবতাগৃহ। ওই ষষ্ঠ শতকেই পারসিক সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট এসে কানান অর্থাৎ আজকের প্যালেস্তাইন-ইজরায়েল অঞ্চলে আক্রমণ শানালেন, বিপুল বিজয়ের পর আদেশ দিলেন, ‘‘মন্দির নতুন করে তৈরি করো।’’ তৈরি হল ‘সেকেন্ড টেম্পল’, পরবর্তী সম্রাট প্রথম দারিয়ুসের তত্ত্বাবধানে। পারসিকরা বুঝেছিলেন, যে ধর্মের কথাই বলুক না এই টেম্পল, এর তুল্য পবিত্র স্থান দুনিয়াময় আর নেই।

মজার ব্যাপার, ঠিক একই ঘটনা ঘটল আরও পাঁচশো বছর পরও। ৭০ খ্রিস্টাব্দে ‘সেকেন্ড টেম্পল’কেও যখন ভেঙে ফেললেন রোমান রাজপুত্র টাইটাস, উত্তরাধিকারীরা বুঝলেন, এই টেম্পল মোটেই ভগ্ন অবস্থায় রাখা যাবে না, তাতে ঘোর অমঙ্গলের সম্ভাবনা। নিজেরাই আবার সারিয়ে নিয়ে চালু করলেন টেম্পলটিকে। সিটি অব ডেভিডকে তাঁরা উপেক্ষা করবেন কোন প্রাণে? তত দিনে যে কোন্ এক অজানা আধ্যাত্মিকতায় ইহুদি পবিত্র স্থানগুলি খ্রিস্টানদের কাছেও মহাপবিত্র হয়ে গিয়েছে। জেরুসালেম তাঁদের কাছেও ধর্মপ্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধে কি পণ্ডিতরা বলেন ‘দ্য হিস্টরি অব জেরুসালেম ইজ দ্য হিস্টরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’?

সুতরাং খ্রিস্টীয় সাম্রাজ্যের চোখের মণির মতো বিকশিত হতে লাগল পবিত্র জেরুসালেম,  যত দিন না ঘটল আর এক ঐতিহাসিক ঘটনা— সপ্তম শতাব্দীর এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে আরবের এক অসামান্য প্রচারকের বার্তা নিয়ে তাঁর স্বজন-ভক্তরা এসে দাঁড়ালেন ওই শহরের সদর-ফটকের বাইরে। সে ঘটনা যখন ঘটল, ওই মহাপ্রচারক অবশ্য আর জীবিত নেই, ৬৩২ সালে তাঁর জীবনাবসান ঘটেছে। ঠিক জানা যায় না কোন বছর কোন সময়ে, তবে তাঁর প্রয়াণের পর-পরই তাঁর ‘ধর্ম’ এসে ভাসিয়ে দিল জেরুসালেমকে।

মহম্মদ ইবন আবদাল্লা তাঁর আশ্চর্য অভিজ্ঞতার মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন ৬১০ খ্রিস্টাব্দের রামাদান মাসে। তিনি জানতেন না এই একটি ঘটনায় কতখানি পাল্টে যাবে পৃথিবী। তিনি শুধু চেয়েছিলেন, সংঘর্ষে নিমজ্জিত, বিদ্বেষ-অধ্যুষিত, জনজাতি-দ্বন্দ্বে বিদীর্ণ ভূমিটিতে সাম্য-মৈত্রীর ভাবধারা ছড়িয়ে দিতে। হিব্রু প্রফেট বা খ্রিস্টীয় প্রচারকদের মতো তিনিও একই কথা বললেন, এমন একটা সমাজ তৈরি করতে যেখানে সমাজের দীন দরিদ্র অসহায় মানুষও সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে বাঁচতে পারে। জাতি, জনজাতি, গোষ্ঠী— ছোট ছোট অকারণ পরিচয়-চিহ্ন যাতে মানুষকে না বেঁধে ফেলতে পারে। সকলে যাতে ‘উম্মা’ বা একটা বড় সমাজের মধ্যে স্থান পায়। একমাত্র তবেই সম্ভব একতার নির্মাণ। প্রথমে কোনও বিশেষ স্থানের সঙ্গে ধর্মকে সংযুক্ত করতেও অনিচ্ছুক ছিলেন মহম্মদ। ক্রমে অবশ্য বুঝলেন, এত মানুষকে একটি ধর্মবোধের তলে আনতে কিছু চিহ্ন বা প্রতীক জরুরি। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পবিত্রভূমিও হয়তো দরকার। তখনই মক্কা ও মদিনার সঙ্গে তৃতীয় পবিত্রভূমির কথা বললেন তিনি— জেরুসালেম।

জেরুসালেম? আবারও?

আবারও। মহম্মদ জানতেন, স্থানীয় মানসিকতায় ওই শহরের কী অপরিসীম গুরুত্ব। পবিত্রতার এক আশ্চর্য বোধ ওই শহরের কোণে কোণে গাঁথা। ওখানেই তো ক্লাসিকাল ও পেগানদের সঙ্গে টক্কর দিতে শুরু করেছিল বিকল্প মধ্য এশীয় সংস্কৃতি। ওখানেই তো ভিত গেড়েছিল পারসিক সাম্রাজ্য। এই টক্করের মধ্যে দিয়েই তো তৈরি হয়েছিল ‘আহল আল-কিতাব’-এর প্রধান আশ্রয়বাক্যগুলি। তাই, ক্রমে যখন ইসলাম ধর্মের আশ্রয় নিচ্ছেন দলে দলে মানুষ, সেই সময়ই সিটি অব টেম্পল হয়ে উঠল ইসলামেরও পবিত্র স্থান। ডেভিড ও সলোমন যেখানে প্রার্থনা করেছেন, তা তাঁদেরও প্রার্থনার জায়গা হল। সলোমনের মহান টেম্পল তাঁদের চোখেও পরম শ্রদ্ধার, তাই টেম্পল মাউন্টেই তৈরি হল আল-আক্‌স মসজিদ, মুসলিম ধর্মজীবনে যার গুরুত্ব মক্কার কাবা’র পরই। জিসাস-ও যুক্ত হলেন তাঁদের প্রফেট তালিকায়। মুসলিমরা জিসাসকে দেখতেন অপার শ্রদ্ধার চোখে, শুধু বিশ্বাস করতেন না যে তিনি নিজে ঈশ্বর। ক্রমে প্রচারিত হল, মহম্মদ নিজেই গিয়েছিলেন জেরুসালেমে। দেবদূত গেব্রিয়েল এসে তাঁকে উড়িয়ে নিয়ে টেম্পল মাউন্টের উপর নামিয়েছিলেন। আর তাই, টেম্পলের যে ‘ডিভাইন থ্রোন’-এর কাছে একের পর এক প্রফেট এত কাল ধরে পবিত্র প্রচার করে এসেছেন— আ্যাডাম, জিসাস, জন দ্য ব্যাপটিস্ট, জোসেফ, মোজেস এবং এব্রাহাম— মহম্মদও সেখানেই পেলেন তাঁর ‘ফাইনাল রেভেলেশন’ বা চরম দর্শন। নতুন ধর্মের উদ্গাতারা বুঝেছিলেন একটি দরকারি কথা: প্রাচীন পবিত্রতার সঙ্গে সংযোগ ছিন্ন করে নতুন পবিত্রতা তৈরি করা যায় না। ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুনের ‘সম্মিলন’ তৈরি করতে হয়। সেই সম্মিলনের রাস্তা দেখাতে জেরুসালেম-এর বিকল্প নেই।

ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুনের মিলন: কথাটা বলতে সহজ, বুঝতে কঠিন। এই কঠিন কাজে জেরুসালেম অনেক সাহায্য করতে পারে আমাদের। তিন-তিনটি ধর্মের বিকাশ এই একটি স্থানে, তিন-তিনটি ধর্মের প্রফেটরা পবিত্র বলে মেনেছিলেন এই শহরের টেম্পল মসজিদ টাওয়ার প্রাসাদ পথঘাটকে। ইতিহাস এখানে কথা বলেছিল নানা মুখে। ধর্ম নানা রঙে রাঙিয়েছিল মানবজীবনকে।
আর মনে করিয়েছিল, যুগে যুগে সব ধর্মই বিচ্যুতিপ্রবণ মানুষকে অন্যায় থেকে ন্যায়ের দিকে এগিয়ে দিতে চেয়েছে। জেরুসালেমে তাই শুধু বৈচিত্রের বার্তা নেই, মানুষে মানুষে সম্মিলনের বার্তা আছে।

আমরা, আধুনিক মানুষেরা, সংঘর্ষের ইতিহাস ভালবাসি। সম্মিলনের ইতিহাস আমাদের কাছে ‘আন-ইন্টারেস্টিং’। তাই আমরা ভুলে যাই, বিশ্বের প্রধান তিনটি ধর্ম জেরুসালেম থেকে উৎসারিত হওয়ার অর্থ— বিশ্বসভ্যতায় স্থিতি ও সাম্যের তিনটি সবচেয়ে বড় ডাক এসেছিল জেরুসালেমেই।  জেরুসালেম বলতে আজ যতই রক্ত-ধ্বংস, হিংসা-প্রতিহিংসা বুঝি, ইজরায়েল না প্যালেস্তাইন, কার রাজধানী এই শহর তা নিয়ে যতই মারপিট করি, সত্যিটা হল, জেরুসালেম বিশ্ব-ইতিহাসের় রাজধানী, তিন-তিনটি ধর্ম-দুনিয়ার হৃদয়পুর!