তিনশো বছরের কলকাতার দিকে তাকিয়ে আছে তিন হাজারি নগর— বৃদ্ধ জেরুসালেম। তবে ষোলো বছরের এক কিশোরের চোখেই দেখছে সে। কলকাতাকে এখনও চর্মচক্ষে দেখা হয়ে ওঠেনি, তবে তার ঠাকুরদা আইজ়্যাক, কিংবা বাবা অ্যাডামের মুখে কম তো শোনেনি সে এই শহরের গাথা। এখনও পর্যন্ত ইজ়রায়েল বা ব্রিটেনে জীবন কাটলেও ছবি-ভিডিয়োতে আর ঠাকুরদার মুখে নাহুম-নিউ মার্কেটের গল্প শুনে শুনে ছেলেটা অপেক্ষা করছে, কবে সে নিজে আসবে এখানে। শিগগিরই ইজ়রায়েলি নিয়ম মেনে তিন বছরের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার কথা তার। তার আগে হয়তো আগামী বছরেই ‘নাহুম’-এর আগামীর মুখ প্রথম বার কলকাতায় পা ফেলবে।

নাতি জোশুয়া নাহুমের কথা বলার সময়ে স্নেহ ঝরছিল ঠাকুরদা আইজ়্যাক নাহুমের গলায়। ‘‘আমার ছেলে ব্যস্ত ডেন্টিস্ট। মনে হয় নাতিটাই এক দিন আসবে, ‘নাহুম’-এর হাল ধরবে।’’ ডিসেম্বর-শেষের এক দুপুরে নিউমার্কেটের ছ’কুড়ি ছুঁই-ছুঁই কেক-বিপণিতে বসে কথা বলছিলেন তিনি। মেহগনি কাঠের আসবাব, কাচের বারকোশ বা কেক-ম্যাক্রুন-মার্জিপ্যানের সুঘ্রাণেই কলকাতার কয়েক জন্মের চিহ্ন। দিন কয়েক আগে সেই কেক-কারখানার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে খানিক নাক কুঁচকেছেন পুর কর্তৃপক্ষ। তবু বচ্ছরকার পার্বণে বরাবরের মতো সেই সুরভিতে বুঁদ বাঙালি। 

কলকাতার শীতের আদ্যক্ষর বোধহয় ‘ন’! তা নলেনগুড়, নকুড় বা সকালের মাংসের সুরুয়া নিহারি হতে পারে। আর অবশ্যই নাহুম! নকুড়ের সন্দেশ হাত দিয়ে মেখে পাক দেওয়ার মতোই, নাহুমের কেকের ডিম-ময়দা-মাখনের গোলাতেও কারখানার শ্রমিকদের আঙুলের জাদু। বছরভর বিস্কুট, হাতে-গরম এগ চপ, মাছের পুর-ভরা পাটিসাপটা ভাজা প্যান্ত্রাস শীতে একটু কম মিলবে। ম্যাক্রুন, ব্রাউনি, সুগন্ধী মার্জিপ্যান-ফাজ ছাড়া এখন নাহুম মাতাচ্ছে কেক। প্লেন কেক মাদিরা, হানি লাইট প্লাম কেক ছাড়াও রাজকীয় স্পেশাল ফ্রুট কেক এবং প্লাম পুডিং। ব্র্যান্ডি ছড়িয়ে গরম করলেই এই পুডিংয়ে নীল আগুন জ্বলে উঠবে। 

ইহুদি ইতিহাস আর আজকের ভারতের বহুত্বের সংরাগ মিশে রয়েছে এই স্বাদে। হাজারিবাগ, আজ়মগড়ের হিন্দু-মুসলিম কারিগরদের হাতযশ, কলকাত্তাইয়া ঘটি-বাঙাল ম্যানেজারদের দক্ষ নজরদারি থেকে ইহুদি কর্ণধারের সূদূরদর্শিতা একাকার ‘নাহুম’-এর শরীরে। দোকানের জন্মসাল ১৯০২। নিউ মার্কেটের ফ্লাওয়ার রেঞ্জের পাশে কার্ডের দোকানের দিকটাতেও গোড়ার ক’বছর কেটেছে। কলকাতার এই কোণটুকু ইতিহাসে পড়া ব্যাবিলনের সম্রাট নেবুচাডনেজ়ারের গল্প শোনায়। তিনি জেরুসালেম আক্রমণ করার সময়েই আইজ়্যাক নাহুমের পূর্বপুরুষেরা পিতৃভূমি থেকে উৎখাত হয়েছিলেন। কয়েক হাজার বছর পুরনো, ইতিহাস-লোকগাথায় মেশা সেই অধ্যায়ই এক দিক দিয়ে শীতের কলকাতার মুকুটে কমলহিরে বসানোর রাস্তা খুলে দিয়েছিল।

৮৩ বছরের আইজ়্যাক অবশ্য সরস ভঙ্গিতে বলবেন, ‘‘আমার এখন সবে ৪৫ বছর চলছে। বাকিটা জীবনের ট্যাক্স যোগ করুন!’’ হার্টফোর্ড লেনের বাড়ি থেকে লাঠি ঠুকঠুকিয়ে নাহুমে আসার সময়ে ডিসেম্বরের কলকাতায় বৃদ্ধের গায়ে সযত্নে মোটা কোট চাপিয়ে দেন তাঁর ছায়াসঙ্গী, হাজারিবাগের মহম্মদ সাদ্দিম। সাহেবের সহচরবৃত্তি ছাড়া কয়েক প্রজন্ম ধরে ইহুদি মালিকের কারখানাতে ওতপ্রোত জড়িয়ে তিনি। 

জিশুর জন্মেরও আগে ইজ়রায়েলছাড়া জেরুসালেমের পরিবারটির অভিযাত্রা গড়পড়তা ‘সেফার্দিক ইহুদি’দের মতোই। পনেরো শতকের আগে স্পেন মুলুকে আস্তানা গাড়তেও পারেন তাঁরা, তবে দেড়শো বছর আগে তরুণ ইজ়রায়েল নাহুম কলকাতায় পদার্পণের আগে তাঁদের ঠিকানা ছিল পশ্চিম এশিয়ার বাগদাদে। আজকের বৌবাজার পাড়ায় মেরেডিথ স্ট্রিটে মিস্টার নাহুমের প্রথম ঠিকানা। কেক-কুকিপটু ‘বক্সওয়ালা’ ইজ়রায়েল সাহেব প্রৌঢ় বয়সে নিউমার্কেটে দোকান খোলেন। আইজ়্যাকের ঠাকুরদা তিনি। ইজ়রায়েলপুত্র এলিয়াস নাহুমের আমলেও বাড়ির বড়রা নিজেদের মধ্যে আরবি জবানি ধরে রেখেছিলেন। নাহুমের শোকেসেও  পশ্চিম এশিয়ার চিজ় সামোসা, বাকলাভা, ডেট বাবা, ইহুদিদের ‘সাবাথ ডে’র পথ্যি তিলখচিত খাল্লা ব্রেড। কিন্তু আইজ়্যাকরা পাঁচ ভাই, পাঁচ বোন ব্রিটিশ উপনিবেশের আদব-কায়দাতেই বড় হয়েছেন। আবার এ দেশ স্বাধীন হতে-হতে ইজ়রায়েলে হারানো শিক়ড় খোঁজার পর্বও শুরু তাঁদের হাতেই। তবু নাহুমের শরীর জুড়ে অচ্ছেদ্য কলকাতার সিলমোহর। 

লা মার্টিনিয়ার, সেন্ট জ়েভিয়ার্সের ছাত্র আইজ়্যাকের যৌবনকাল থেকে গোটা চাকরিজীবন কেটেছে বিলেতের সিএ ফার্মে। তখন নাহুম জুড়ে তাঁর তিন দাদা ডেভিড, নর্ম্যান, সলমনদের রমরমা। ব্রিটিশ বৌ, ছেলেমেয়ে নিয়ে কদাচিৎ কলকাতায় আসতেন আইজ্যাক। দাদারা তিন জনেই অকৃতদার। নর্ম্যানকে ইজ়রায়েলে সমাধিস্থ করা হয়েছিল, সলমন ও ডেভিড কলকাতার নারকেলডাঙার ইহুদি সমাধিক্ষেত্রে শায়িত। 

নর্ম্যানের সঙ্গে নাকি খাতির ছিল সুচিত্রা সেনের। ম্যাক্রুন বিস্কুট ভালবাসতেন বাঙালির স্বপ্নসুন্দরী। বিধান রায়ের বাড়িতেও তা নিয়মিত যেত। আইজ়্যাক সগর্বে বলেন, ষাটের দশকে বিশপ অব ক্যান্টারবেরি জিওফ্রি ফিশার কলকাতায় সরকারি আপ্যায়নে নাহুমের রিচ প্লাম কেক খেয়ে ঢালাও শংসাপত্র দিয়েছিলেন। অমন কেক নাকি জীবনেও খাননি! 

উষা উত্থুপ থেকে অঞ্জন দত্ত বা ডেরেক ও’ব্রায়েন, কিংবা দুনিয়া চষে বেড়ানো কলকাতার দেশান্তরী বাঙালি— সকলেই একবাক্যে যে শুকনো খটখটে আখরোট ব্রাউনির বশ্যতা স্বীকার করেন, তা নাহুমে চালু হয়েছিল আশির দশক নাগাদ। ব্রাউনি, ব্ল্যাক ফরেস্টের মতো আইটেম সাবেক কেক-বিস্কুটের দোকানে চালু করার ভাবনাটা নাকি সলমনের মস্তিষ্কপ্রসূত। তাঁর সেই সাধের সৃষ্টি হাজারিবাগের মহম্মদ জাহিদ, সামসের হায়দারদের হাতেই পোষ মানা। মাত্র ৪০ টাকায় এ জিনিস খাইয়ে কলকাতার গেরস্ত বাঙালিকে ব্রাউনির ব্যাপারে নাকউঁচু করে তোলার দোষ স্বচ্ছন্দে নাহুমের ঘাড়ে চাপানো যেতে পারে। 

বিশ্বায়ন-উত্তর বাঙালি জানে, নাহুমের পিৎজ়া কখনওই খাঁটি ইতালীয় পিৎজ়ার ধারেকাছে নয়। কিন্তু নাহুম না-থাকলে পিৎজা বস্তুটি খায় না মাথায় দেয়, সেটাই বা কলকাতায় বসে কী ভাবে জানত বাঙালি! তারকা হোটেল বা পার্ক স্ট্রিটের রেস্তোরাঁ যাঁদের কাছে অধরা, অ্যাপল পাই যখন সহজেই নেট ঘেঁটে শিখে ফেলা যেত না, তখন নাহুমের সৌজন্যে মধ্যবিত্তের হাতের মুঠোয় এসেছিল ‘মিন্সড পাই টার্ট’। গর্ভে রাম-স্নাত মাখো-মাখো কিসমিস-আপেলকুচির পুর, এই টার্টকে নিউমার্কেটে আদর করে ‘বিলিতি রসগোল্লা’ বলে ডাকা হয়। চিনি-কাজুবাদামের মিশেলে ডিমের সাদা বেক করা ম্যাক্রুনের কথা তো আগেই বলেছি। আশির দশকের ছেলেবেলায় সেই ফুলো ফুলো বিস্কুটের চাকতিতে জ্বলজ্বল করত একটা চেরির টুপি। এ কালে সেই চেরি গরহাজির! এক যুগ আগে তা নিয়ে গভীর দুঃখিত হয়েছিলাম। নাহুমের সদাব্যস্ত ম্যানেজার জগদীশ হালদার তখন সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, ‘‘আহা, ওটা চেরি নয়! রং করা করমচা!’’ 

বছরশেষের ভিড়-ঠেলাঠেলির মধ্যে নাহুমে ঢুকলে অবশ্য ছেলেবেলার চেরির জন্য শোকের ফুরসত মিলবে না। ঠাসা ভিড় গাদাগাদিতে নিউমার্কেটের প্রশস্ততম এই দোকানঘর নিতান্তই পুঁচকে মনে হয়। খানিক ‘নার্ভাস’ দেখায় আইজ়্যাক সাহেবকে। বড়দা ডেভিড ২০১৩ সালে গত হওয়ার পরে হার্টফোর্ড লেনের পৈতৃক বাড়িটায় নাহুমরা এখন বছরভর থাকেন না। কিন্তু শীতের এই সময়টায় কয়েক মাস আইজ়্যাককে কলকাতায় আসতেই হয়। নইলে জগদীশবাবুদের হাতে দায়িত্ব সঁপে অন্য সময়ে নাহুম চলে রিমোট কন্ট্রোলেই। নাহুমদের ব্যবসার দর্শন অবশ্য বরাবরই এক। আইজ়্যাকের কথায়, ‘‘তা হল, রুপোর দামে সোনার জিনিস বেচা!’’ নানা কিসিমের স্বাদের আভাসে বিশ্বায়নের জানলা খুলেছে নাহুম।

কলকাতার পাকাপাকি বাসিন্দা ডেভিড গত হওয়ার পরে এক সময়ে প্রশ্নচিহ্ন উঁকি দিয়েছিল নাহুমের ভবিষ্যৎ নিয়ে। পরের পাঁচ বছরে সেই সংশয় দূর হয়েছে। হবু মালিকের গোকুল থুড়ি জেরুসালেমে বড় হওয়ার কাহিনি এখন ঘুরপাক খায় নিউমার্কেটের বাতাসে। আইজ়্যাকরা দিব্যি আছেন ইজ়রায়েলে। ছেলে ডাক্তার, বৌমা জেরুসালেমে পুরপ্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যস্ত রাজনীতিবিদ। আইজ়্যাক বলেন, ‘‘আমার বাপ-ঠাকুরদা, দাদারা কলকাতার মাটির নীচে শুয়ে। মনের অর্ধেকটা এখানেই পড়ে থাকে!’’ 

কলকাতায় এলে গুটিকয়েক পুরনো বন্ধু, তাঁদের ছেলেপুলের সান্নিধ্যেও শান্তি পান আইজ়্যাক। শহরে ক্রমশ তলানিতে ঠেকা ইহুদি-সমাজ এখন জনা কুড়িতে ঠেকেছে। চার দশক কেটে গিয়েছে, ইহুদিদের নতুন প্রজন্ম জন্মায়নি এ শহরে। কিন্তু নিজের নাতি জোশুয়ার কথা বলতে বলতে ঠাকুরদার স্বরে উত্তেজনার ছোঁয়াচ। ‘‘কে বলতে পারে, নতুন করে আবার ইহুদিদের পুনরুত্থান দেখবে না এ শহর!’’ চিরকালের নাহুমকে ঘিরেই ফের ডানা মেলছে কলকাতার কসমোপলিটান-গরিমা, রামধনু-রঙা মানুষের স্বপ্ন।