সিনেমার জগৎ সম্পর্কে আমার বরাবরই একটা কৌতূহল, একটা ভাললাগা ছিল। খুব ইচ্ছে ছিল, শুটিং কেমন করে হয়, দেখব। আমি তখন শঙ্কর দাশগুপ্তের গ্রুপে নাটক করি। সে অর্থে থিয়েটারে অভিনয় না করলেও, শঙ্করদার সঙ্গে যে হেতু আমাদের পারিবারিক একটা সম্পর্ক ছিল, তাই ওঁর একটা-দুটো নাটকে আমি অভিনয় করেছিলাম। তবে গ্রুপ থিয়েটার বলতে যা বোঝায়, সেটা কখনওই করিনি। আমি নাচ শিখতাম। তনুশ্রীদির স্কুলের ছাত্রী ছিলাম। তার ওপর আমার নিজের নাচের স্কুলও ছিল। এখনও সেটা আছে। নাটক করতাম খানিকটা শখে। নাচটা পারতাম আর ডায়ালগগুলো বলে দিতাম বলে সুবিধেই হত।

সেটা ১৯৯৬ সাল। ‘বীজ’ বলে আমাদের একটা নাটকের রিহার্সাল চলছে। সবে উচ্চ মাধ্যমিক দিয়েছি। রেজাল্ট বেরোয়নি। ওপর তলায় আমাদের নাটকের রিহার্সাল চলছে, আর নীচে অভিনেতা শঙ্কর চক্রবর্তীদের কোনও একটা অনুষ্ঠানের মহড়া হচ্ছে। শঙ্কর চক্রবর্তী এক সময় ওপরে উঠে আসেন শঙ্করদা (দাশগুপ্ত)-র সঙ্গে কোনও একটা বিষয়ে কথা বলবেন বলে। সেই সময় আমার অভিনয় দেখে শঙ্করদাকে উনি বলেন, জগাদা (জগন্নাথ গুহ) একটা চরিত্রের জন্য একটি মেয়েকে খুঁজছেন। কাল একে পাঠাবেন একটু? পরের দিনই শঙ্করদা একটা চিঠি লিখে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন।

আমি তো অতশত জানি না। আমি শুটিং দেখব বলে গেছি। এত দিনের ইচ্ছে! সে দিন আবার তুমুল বৃষ্টি। আমি ভিজে চুপ্পুস। জগাদার সঙ্গে দেখা করলে উনি বললেন, আগে জামাকাপড়টা বদলে এসো। নিউমোনিয়া হয়ে গেলে তো তোমার বাড়ির লোক আমাদেরই পেটাবে। ওঁর স্ত্রীর আমাকে দারুণ পছন্দ হয়ে গেল। উনি আমাকে একটা স্ক্রিন টেস্ট দিতে বললেন। সেই সময় জগাদা আমাকে একটা কথা বলেছিলেন, তুমি ক্যামেরার দিকে দেখবে না। ক্যামেরা তোমার চাকর। ক্যামেরার দায়িত্ব তোমাকে ধরা। এখন বুঝতে পারি, এই কথাটা উনি বলেছিলেন, যাতে আনকোরা আমি ক্যামেরা নিয়ে কনশাস না হয়ে পড়ি। এখনও আমি টেকনিকালি খুব একটা ভাল না। অভিনয়টা অসম্ভব মন দিয়ে করতে পারি। কিন্তু কোন অ্যাংগ‌্ল-এ তাকালে কী হবে, এটা আমি খুব একটা বুঝি না।

যাই হোক, স্ক্রিন টেস্ট দেওয়ার পরই জানতে পারলাম, এটা একটা সিরিয়াল, এবং কাল থেকে আমার শুটিং। সেই আমার প্রথম শুরু, ‘মনোরমা কেবিন’। তার পর ‘তৃষ্ণা’ আর ‘কুয়াশা যখন’। এই তিনটে মেগা-র কাজের পাশাপাশি আমি আবার ‘গেস্টহাউস’ নামে একটা টেলি-উইকলিও করছিলাম। এই সময় আর্ট ডিরেক্টর গৌতম বসু তাঁর ‘এবং তুমি আর আমি’ ছবির জন্য আমায় নায়িকার রোলে সিলেক্ট করেন। আমি প্রথমে অতটা আগ্রহ দেখাইনি। গৌতম বসুই আমাকে রাজি করান। তিনি বলেছিলেন, দেবীর চরিত্রে অন্য কাউকে মানাবে না।

‘এবং তুমি আর আমি’-র শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। কারণ, সেখানে আমার বরও গিয়েছিল ওদের টেকনিকাল গ্রুপের সঙ্গে। তখনও আমাদের বিয়ে হয়নি। কিন্তু চূড়ান্ত প্রেম চলছে। এ দিকে আমার সঙ্গে আমার মা-ও গিয়েছেন। মা’কে ইউনিটের লোকেরা প্রচুর ভুলভাল বোঝাচ্ছে, যা হয় আর কী! আর মা শুটিংয়ের ফাঁকে সময় পেলেই আমাকে ধরে পিটিয়ে দিচ্ছে। মা সাংঘাতিক কড়া। কেউ যদি মা’কে বোঝায়, ওই দেখুন আপনার মেয়ে ও-দিকে গেছে, ব্যস, আমি গেলাম, কি গেলাম না, মা ধরে খানিক পিটিয়ে দিল। আমিও মার খেতে খেতেই শুটিং চালিয়ে যাচ্ছি।

শুটিংটা হয়েছিল গরুমারা ফরেস্টে। আমার সেই প্রথম পাহাড়ে যাওয়া। চমৎকার একটা লোকেশনে শুটিংটা হয়েছিল। আমরা একটা ফরেস্ট বাংলোয় ছিলাম। আমার অভিনয়টাও এত ভাল হয়েছিল যে, আমাকে অনেকেই বলেছিলেন, তুমি যদি গেঁজিয়ে না যাও, তা হলে লম্বা রেসের ঘোড়া হবে। অভিনেতাদের মধ্যে ছিলাম আমি আর কুশল চক্রবর্তী। কিন্তু ছবিটা তখন মুক্তি পেল না। যদি সেই সময়ই মুক্তি পেত, আমার মনে হয় ওটা সুপারহিট হত। এর পর আমি স্বপন সাহার একটা ছবি করি ‘শিমুল পারুল’ বলে। ‘এবং তুমি আর আমি’ করতে করতেই আমি এই ছবিটার শুটিংও করছিলাম। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে, ‘শিমুল পারুল’ই আমার প্রথম ছবি। আর ‘এবং তুমি আর আমি’ মুক্তি পেল ‘শিমুল পারুল’, ‘ঘরের লক্ষ্মী’, হরদা’র ‘রণক্ষেত্র’রও পরে। 

‘শিমুল পারুল’-এ আমার নির্বাচনটাও ছিল অদ্ভুত। ‘তৃষ্ণা’তে আমি অনামিকা সাহার মেয়ে হতাম। চেহারাটাও তখন বেশ রোগাসোগাই ছিল। তো, অনামিকাদি এক দিন এনটিওয়ান স্টুডিয়োতে আমাকে নিয়ে গিয়েছেন ওঁরই কোনও দরকারে। সে সময় বুম্বাদা একটা ছবি পরিচালনা করছিলেন। আমাকে অনামিকা সাহার সঙ্গে দেখে উনি বলেন, ‘কী ব্যাপার, তুমি আজকাল মেম সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ!’ তার পর উনি প্রস্তাব দেন, ওঁর ছবিতে আমাকে নেওয়ার জন্য। আসলে বুম্বাদার এক জন হিরোইন দরকার ছিল। তার পর বুম্বাদার বাড়িতে আমার একটা লুক টেস্ট হয়, পোর্টফোলিয়ো তোলা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে কোলাবরেশনে ছবিটা তৈরি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আমার সেখানে কাজ করা হয়নি।

তবে, স্বপন সাহা আমাকে তাঁর ‘শিমুল পারুল’ ছবির জন্য ডাকেন। স্বপনদা তখন প্রচুর ছবি করতেন। অনামিকাদি আমাকে স্বপনদার কাছে নিয়ে যান। সে-ও প্রায় পরের দিন থেকেই শুটিং শুরু হয়ে গেল। আসলে, তখন তো এত হ্যাপা ছিল না। শুটিংটা অনেক সহজে হত।

তা ছাড়া স্বপনদা খুব সরল মানুষ ছিলেন তো, তাই যা-ই করতাম, খুব প্রশংসা করতেন। ফলতায় শুটিং হয়েছিল। টানা অনেক দিন ধরে, চড়চড়ে রোদের মধ্যে। আমি একেবারে রোদে পুড়ে কালো কাকের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। পার্লারে যেতে হয়েছিল সেই কালো রং তোলার জন্য। খাটো শাড়ি পরে আমি সে ছবিতে নৌকোও চালিয়েছি মাঝ গঙ্গায়। এখন তো নৌকোয় দাঁড়াতে বললে আমি বোধহয় পড়েই যাব। অথচ ওই সময় কিছু গানের দৃশ্যে আমি এক নৌকো থেকে লাফিয়ে অন্য নৌকোয় গিয়ে নেচেছি। ভাবলে নিজেরই কেমন অবাক লাগে। তার ওপর আমি আবার সাঁতারও জানতাম না। অথচ গ্রামের মেয়ের চরিত্র। অনেক দৃশ্য ছিল, যেখানে আমি গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়ছি আর সাঁতরে সাঁতরে আমার প্রেমিকের কাছে যাচ্ছি। এই দৃশ্য তোলার সময় আমার কোমরে একটা দড়ি বেঁধে রাখা হত। যেই একটু ছটফট করতাম, অমনি টেনে তুলে নেওয়া হত।

এই ছবিতে আমার বাবার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন মনোজ মিত্র। একটা দৃশ্য ছিল যেখানে উনি আমাকে লাঠি দিয়ে মারছেন। উনি সত্যিই এমন জোরে মেরেছিলেন যে, আমার গায়ে কালশিটে পড়ে গিয়েছিল। মেক-আপ করে ম্যানেজ করা যাচ্ছিল না। উনি এত ভাল অভিনয় করেছিলেন এবং চরিত্রের সঙ্গে এত মিশে গিয়েছিলেন যে, মারগুলো আর অভিনয়ে আটকে থাকেনি। 

‘শিমুল পারুল’ খুব একটা চলেনি। এমন কিছু আহামরি গল্পও ছিল না সেটা। তবে মজার কথা হল, টিভি-তে এখন ওটা দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না যে নায়িকার চরিত্রে আমি ছিলাম।          

adhyaaparajita@gmail.com