বছর তিনেক আগের কথা। ইস্তানবুলের পেরা প্যালেস হোটেলে চলছে ‘ব্ল্যাক উইক ফেস্টিভ্যাল’। সেই পেরা প্যালেস, যার ৪০১ নম্বর ঘরে নাকি আগাথা ক্রিস্টি লিখেছিলেন ‘মার্ডার অন দি ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’। ‘নাকি’ বললাম, কারণ আগাথা ক্রিস্টির এই উপন্যাস কখন ও কোথায় লেখা হয়েছিল সে নিয়েই একটা আস্ত রহস্য উপন্যাস লিখে ফেলা যায়। তবে বহু বিশেষজ্ঞের ধারণা, কনস্ট্যান্টিনোপলের এই হোটেলেই লুকিয়ে রহস্যের চাবি। রহস্য-লিখিয়েদের সম্মেলনের জন্য যে এই হোটেল বেছে নেওয়া হবে, আশ্চর্য কী! বক্তার আসনে তুর্কি রহস্য-সাহিত্যের জনপ্রিয় লেখক আহমেত উমিত জানালেন, তুরস্কে বসে রহস্য-সাহিত্য, সাইকোথ্রিলার লেখা খুবই ঝঞ্ঝাটের। কারণ পশ্চিমি দুনিয়ায় সাইকোপ্যাথের ছড়াছড়ি হলেও তুরস্কে তার দেখা পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। ফলে একুশ শতকেও তুর্কি পাঠক গোয়েন্দা এবং বিকৃতমনস্ক খুনির বেড়াল-ইঁদুর খেলায় সামিল হতে পারেন না। বহু পাঠকের কাছেই এহেন পটভূমিকা খুব বাস্তবোচিত নয়।

উমিত ভুল বলেননি। তুরস্ক বা ইস্তানবুলের ইতিহাসে সিরিয়াল কিলারের দেখা প্রায় মেলেই না। দৈনন্দিন অপরাধের নিরিখে ইস্তানবুল বিশ্বের নিরাপদতম শহরগুলির একটি। কিন্তু খুন তো শুধু বিকৃতকাম কি অর্থনৈতিক লালসা চরিতার্থ করার জন্যই হয় না। খুন হয় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রেও। আর এই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পালা গুনতে বসলে ইস্তানবুল টেক্কা দিতে পারে যে কোনও শহরকে।      

পেরা প্যালেস থেকে মিনিট কুড়ি গাড়িতে গেলে অধুনা সুলতানআহমেত নামের যে ঐতিহাসিক জায়গাটি, সেখানেই আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে সুন্দরী স্ত্রী থিওফানোর ষড়যন্ত্রে খুন হয়েছিলেন তদানীন্তন বাইজেন্টাইন সম্রাট দ্বিতীয় নিকিফোরাস। সে হত্যায় পরকীয়ার গন্ধ থাকলেও আদতে তা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। থিওফানো চেয়েছিলেন তাঁর প্রথম পক্ষের সন্তানকে রাজার আসনে বসাতে। এই সুলতানআহমেতের প্রাসাদেই ঘটেছে অসংখ্য গুম খুন। অটোমানরা ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক সুলতান মসনদে বসেছেন ভাই-বেরাদরদের গুপ্তঘাতকদের হাতে খুন করিয়ে। একই বংশের মানুষের রক্ত আক্ষরিক অর্থেই ঝরলে পাছে অভিশাপ লাগে, তাই ঘাতকদের নির্দেশ দেওয়া হত রেশমি স্কার্ফের ফাঁসে শ্বাসরোধ করে মারতে। প্রথম মুরাত, দ্বিতীয় সেলিম, তৃতীয় মেহমেত— যে কোনও নাম ও সংখ্যা বেছে নিন, প্রত্যেকটিই জড়িয়ে কোনও না কোনও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে।

একবিংশ শতকেও ইস্তানবুলে ঘটে চলেছে একের পর এক রাজনৈতিক হত্যা। আজ থেকে এগারো বছর আগের ঘটনা। পেরা প্যালেস থেকে রওনা দিলে উত্তর দিকে মিনিট দশেক লাগে সিসলি পৌঁছতে। সেখানেই প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হন ‘আগোস’ সংবাদপত্রের সম্পাদক রান্ত ডিঙ্ক। ইস্তানবুলের গুটিকতক বুদ্ধিজীবী যারা তুর্কি সরকারকে বারবার বলে আসছেন বিশ শতকের গোড়ায় ঘটে যাওয়া আর্মেনিয়ান গণহত্যার দায়ভার নিতে, তাঁদের অন্যতম ছিলেন রান্ত। রান্তের মৃত্যুতে আর্মেনিয়ান বংশোদ্ভূত তুর্কিদের আন্দোলনটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে। গুলি যে চালিয়েছিল, সেই টিনএজার ও তার দুই সহযোগী ধরা পড়েছিল বটে, কিন্তু আজ অবধি জানা যায়নি ষড়যন্ত্রের মূল হোতা কারা। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ক্রম-আগ্রাসন রান্তের সহকর্মীদের প্রতিবাদী গলাগুলোও দমিয়ে দিতে থাকল। রান্ত ডিঙ্কের খুন এবং পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়া তুরস্কের ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যপদ পাওয়ার সম্ভাবনা বহুলাংশে কমিয়ে দেয়।

তুর্কি সাংবাদিকদের নিরাপত্তার ঘাটতি নিয়ে পশ্চিমি দেশগুলি বহু বছর ধরেই ক্ষোভ জানাচ্ছে। বিপদের আশঙ্কা যে শুধু দেশের রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে তা নয়, বিপদ আসতে পারে বিদেশি শক্তির হাত ধরেও। বছর দুই আগে সাংবাদিক মুরাদ শিশানি নেমেছিলেন এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের উদ্ঘাটনে। ২০১১-২০১৫, চার বছরে প্রায় বারো জন রুশ শরণার্থী খুন হন ইস্তানবুলে। প্রত্যেকেই চেচেন, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে চেচেন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে চেচনিয়া পরাজিত হলেও বহু চেচেন রাশিয়া থেকে পালিয়ে অন্য দেশে আন্ডারগ্রাউন্ড গেরিলা সংগঠনে নাম লেখান। ইস্তানবুলে আসা চেচেন শরণার্থীদের মধ্যে বেশ কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড গেরিলা আছেন। মুরাদের তদন্তে উঠে আসে, রাশিয়ার সিক্রেট সার্ভিস ইস্তানবুল এসে বছরের পর বছর ধরে এ রকম চেচেনদের খুন করে গেছে। যাঁরা খুন হয়েছেন, তাঁদের নামে সরাসরি অভিযোগ উঠেছে রাশিয়ায় সন্ত্রাসবাদ চালানোর। যেহেতু বেশ কিছু চেচেন পরে সিরিয়ায় আইসিসের হয়ে লড়তে শুরু করেন, কখনও ধুয়ো তোলা হয়েছে: সন্দেহজনক আইসিস উগ্রপন্থীদের সরিয়ে দিতেই এই অপারেশন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল মারপ্যাঁচে পড়ে বিচার পাননি নিহতদের পরিবার, যাঁদের বক্তব্য, প্রিয়জনেরা খুন হয়েছেন স্রেফ রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে। ‘আতঙ্কবাদী’ তকমা লাগানো হয়েছে পৃথিবীর চোখে ধুলো দিতে। 

এই নিয়ে হইচই কমতে না কমতেই খবরে তাজিকিস্তানের ব্যবসায়ী উমরালি কুভাতভ। ইস্তানবুলেরই আর এক পরিচিত তাজিক অভিবাসীর বাড়িতে তিনি নিমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন, স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে। ডিনার টেবিলেই অসুস্থ হয়ে পড়ে গোটা পরিবার। কথাও বলতে পারছিলেন না কেউ। সেই অবস্থাতেই সবাইকে টেনে বার করেন উমরালি। রাস্তায় বেরোতেই তাঁকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করে মারে আততায়ী। যেন ফ্রেডরিক ফরসাইথ বা জন ল্য কার-এর বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা দৃশ্য। দুর্নীতিগ্রস্ত তাজিক সরকারের কঠোর সমালোচনার মুখ ছিলেন উমরালি। বহু হেনস্থা সহ্য করেছেন। দেশছাড়া হতে হয়েছে, হারাতে হয়েছে ব্যবসা, সম্পত্তি। তাজিক সরকারের অনুরোধে আরব আমিরশাহি ও তুরস্কের সরকার গ্রেফতারও করেছে তাঁকে। কিন্তু উমরালি ভাবতে পারেননি, ইস্তানবুলে গুপ্তঘাতকের হাতে প্রাণ হারাতে হবে তাঁকে। নিমন্ত্রণকর্তা জেলে গেলেও আসল অপরাধীদের কেশাগ্র স্পর্শ করা যায়নি। উমরালি খুন হন ২০১৫-তে। অপরাধের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জনসমক্ষে আসতে কেটে যায় তিন বছর। 

২০১৮-তেই ইস্তানবুলের আর এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে বিশ্ব রাজনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য পালাবদল ঘটে যেতে চলেছে। ইস্তানবুলে সৌদি আরবের দূতাবাসে খুন হয়েছেন সাংবাদিক জামাল খাশোগি। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, খোদ সৌদি রাজপরিবার জড়িয়ে এই অপরাধের সঙ্গে। জামাল খাশোগি কট্টর সমালোচক ছিলেন না, সৌদি আরবের বহু বিতর্কিত কূটনীতিকে তিনি সমর্থনই করেছেন। কিন্তু সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন ক্ষমতার ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠার পর থেকেই খাশোগি মুখ খুলেছিলেন। জানিয়েছিলেন, সলমনের হাত ধরে সৌদি আরবকে ভবিষ্যতের দিশা দেখতে হলে তা সুখের হবে না। আপাত-উদারমনস্ক সলমনের উদার নীতিগুলি নিয়েও সমালোচনা করতে ছাড়েননি। কাতারকে একঘরে করা, ইয়েমেনের যুদ্ধ চালানো, লেবাননের প্রধানমন্ত্রীকে অপহরণ করা, সৌদির বাকি রাজপুরুষদের গৃহবন্দি করে রাখা— বহু ঘটনার উদাহরণ টেনে বলেছিলেন, সলমনের মুখ সম্ভবত মুখোশ। জামালের অভিযোগকে যথার্থতা দিতেই যেন ইস্তানবুলের সৌদি আরব দূতাবাসে অপেক্ষা করছিল ঘাতকরা। দরকারি কাগজপত্র হাতে তুলে দেওয়ার অছিলায় ডেকে পাঠানো হয়, ঢোকা মাত্রই জনা পনেরো শুরু করে নৃশংস অত্যাচার। তুরস্কের সংবাদপত্রগুলির দেওয়া খবর অনুযায়ী, জামালকে প্রথমে শ্বাসরুদ্ধ করা হয়, পরে তাঁর দেহটি খণ্ডখণ্ড করে গলিয়ে ফেলা হয় অ্যাসিডে।

জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ডের খবর সামনে আসায় স্তম্ভিত সারা বিশ্ব। আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স ক্রমশই চাপ বাড়াচ্ছে সৌদি আরবের ওপর— প্রকৃত অপরাধী চিহ্নিত করা হোক। যারা শুধু হুকুম তামিল করেছে তাদের নাম নয়, ফাঁস করা হোক সেই হুকুম যে বা যারা দিয়েছে তাদের নামও। চাপ বাড়াচ্ছে তুরস্কও, যদিও তুরস্কের রাষ্ট্রপতি জানিয়েছেন তিনি বিশ্বাস করেন না বিন সলমন এ রকম ঘৃণ্য কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। এরদোয়ানের সুর শোনা গেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের গলাতেও। 

ইস্তানবুলই কেন? কী বৈশিষ্ট্য এই শহরের, যার জেরে বারবার এই সুপ্রাচীন শহরটিকে সাক্ষী থাকতে হয় নৃশংস সব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের? ভৌগোলিক অবস্থান একটি বড় কারণ। ইস্তানবুল ইউরোপ ও এশিয়ার মিলনস্থল, এ শহর থেকে জলপথে আফ্রিকায় যাওয়াও বহু ইউরোপীয় শহরের থেকে সোজা। তিন মহাদেশের সঙ্গেই নৈকট্য ভূ-রাজনীতিতে এই শহরের মর্যাদা বাড়িয়েছে। তাই দুই বিশ্বযুদ্ধের বহু আগে থেকেই এখানে গুপ্তচরদের আনাগোনা। এরকুল পোয়রো, জেমস বন্ড, ইথান হান্ট বা জেসন বোর্ন-এর মতো কাল্পনিক গোয়েন্দা ও গুপ্তচররাই শুধু এ শহরে দাপিয়ে বেড়াননি। শহরের অজস্র কাফের নিভৃত অন্তরালে বসে গোপন মিটিং সেরেছেন ব্রিটিশ ডাবল এজেন্ট কিম ফিলবি। চল্লিশের শেষে সিআইএ এবং এমআই-সিক্স’এর বহু এজেন্ট রাশিয়া এবং আলবানিয়ায় ধরা পড়ে। শোনা যায়, ইস্তানবুলে বসে খবর ফাঁস করেছিলেন ফিলবিই। বহু বছর পরে বিশ্বাসঘাতকতার দায় নিয়ে যিনি শেষ জীবন কাটাবেন মস্কোতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে তুরস্ক মিত্রশক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে লড়েছে, ফলে শহর জুড়ে চলেছে ব্রিটিশ, মার্কিন বা ফরাসি গুপ্তচরদের আনাগোনা। ঠিক একই সময়ে ইস্তানবুলে ঘাঁটি গেড়েছে সোভিয়েট সিক্রেট সার্ভিস। জর্জিয়া বা আজারবাইজানের মতো সোভিয়েট অঞ্চলগুলির সঙ্গে ইস্তানবুলের ভৌগোলিক নৈকট্য কাজটা আরও সুবিধে করে দিয়েছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ইন্টেলিজেন্স বিভাগে কাজ করার দরুন ইয়ান ফ্লেমিং জানতেন, ইস্তানবুলে সোভিয়েট গুপ্তচরদের প্রভাব কতটা, তাই বারেবারেই জেমস বন্ড থ্রিলারগুলিতে ব্রিটেন-আমেরিকা ও সোভিয়েট ইউনিয়নের সংঘাতের পটভূমিকা গড়ে উঠেছে এখানেই।  

ইস্তানবুলে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক হিংসাকে বুঝতে হলে চোখ বোলানো দরকার তার রাজনৈতিক ইতিহাসেও। তুর্কি গণতন্ত্রের সূচনাও দেখেছে এ শহর, আবার শেষ ষাট বছরে অন্তত বার পাঁচেক সেনা অভ্যুত্থানও দেখেছে। এ সেই শহর, যেখানে ইসলামিক শাসক অটোমানরাও যেমন রাজত্ব চালিয়েছেন, তেমনই ক্ষমতা বিস্তার করেছেন প্রবল ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ কামাল আতাতুর্ক। ইস্তানবুলের ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিহাস অবশ্য আজকের নয়। রোমান এবং গ্রিক ইতিহাসের মর্যাদা দিয়ে এ শহরে কলোনি গড়ে উঠেছে অর্থোডক্স খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের। পাশের দেশ সিরিয়া এবং ইরাকেও যখন সিরিয়ান খ্রিস্টানরা বিপদে পড়েছেন, 

তাঁরা আশ্রয় খুঁজেছেন ইস্তানবুলেই। এমনকী, হিটলারের অভ্যুত্থানের অনেক আগেই এ শহর স্থান দিয়েছে ইহুদিদের। ফলে এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকা থেকে বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম এবং রাজনৈতিক আদর্শের মানুষ বারেবারেই ঠাঁই খুজেছেন এ শহরে। যখনই তাঁদের ধর্ম বা রাজনীতি বিপন্ন হয়েছে, এই শহরকে দ্বিতীয় বাসভূমি করে তুলতে দ্বিধাবোধ করেননি তাঁরা। 

আর নতুন বাসভূমির সঙ্গে সঙ্গেই গড়ে উঠেছে বহু আন্ডারগ্রাউন্ড মুভমেন্টও। এই মুহূর্তে যেমন অতি সন্তর্পণে চিনের সংখ্যালঘু মুসলিম উইগুরদের একটি গোপন আন্দোলন গড়ে উঠছে ইস্তানবুলকে কেন্দ্র করে। চিনের সঙ্গে বাণিজ্যের খাতিরে যে আন্দোলনকে প্রকাশ্যে আসতে দিতে চান না তুর্কি শাসকরা। ইস্তানবুলে বসবাসকারী চেচেন বা তাজিকদের আন্দোলন পূর্ণমাত্রায় রাজনৈতিক, কিন্তু উইগুরদের আন্দোলন সাংস্কৃতিকও বটে— তাঁদের ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক আচারগুলি যাতে না হারিয়ে যায় চৈনিক সংস্কৃতির আগ্রাসনে। 

যত বেশি আন্দোলন, তত বেশি গুপ্তচর। গুপ্তঘাতকও তত। এই অধিকাংশ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে সমূলে উৎপাটিত করতে বিভিন্ন দেশের ঠেঙাড়ে বাহিনীর নিরন্তর যাতায়াত এ শহরে। অধিকাংশ সময়েই তারা আসে সাধারণ মানুষের বেশ ধরে, সংশ্লিষ্ট দেশটির দূতাবাসের সঙ্গে কোনও যোগসূত্র না রেখেই। যথাযথ সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে তাই মামলা ধামাচাপা পড়ে যায়, কাঠগড়ায় উঠতে হয় না কোনও নেতা বা কূটনীতিককেই। তুরস্কের রাজনৈতিক অবস্থান এ সব ক্ষেত্রে আরও গোলযোগ বাড়িয়ে রেখেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুরস্ক ছিল জার্মানির দোসর, তার পরে নিরপেক্ষ অবস্থান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে আবার তুরস্ক লড়েছে মিত্রশক্তির পক্ষে, জার্মানির বিরুদ্ধে। আবার ইদানীং কালে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। ট্রাম্পের পক্ষপাতমূলক বাণিজ্যনীতির জবাব দিতে আড়ালে-আবডালে সমঝোতা চলছে চিনের সঙ্গেও। পশ্চিম এশিয়ায় কর্তৃত্ব কায়েমের লড়াইয়ে যে সৌদি আরবের সঙ্গে টক্কর চলছে তুরস্কের, তাদের সঙ্গে সমঝোতাও করে নিতে হচ্ছে সিরিয়া থেকে আসাদকে হঠানোর লক্ষ্যে। সবার সঙ্গেই এই ওপর-ওপর বন্ধুত্বের একটা বড় মূল্য চোকাতে হচ্ছে ইস্তানবুলকে। যত ক্ষণ অবধি না আগুনের আঁচ নিজেদের গায়ে লাগছে, ‘বন্ধু’দের দৌরাত্ম্য মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই। 

জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ডও হয়তো একই ভাবে জনসাধারণের অগোচরেই থেকে যেত। কিন্তু খাশোগির বাগদত্তা হাতিজে জেঙ্গিজ নিজে তুর্কি। শুরুর আলোড়নটা উঠেছিল তাঁর জন্যই। হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ বেরোতে শুরু করার পর বোঝা গেল, পাঁচ হাজার বছরের পুরনো শহরটির জন্যও এই নৃশংসতা প্রায় অকল্পনীয়। সৌদি রাজপরিবারের যে সদস্যই এ হত্যার আদেশ দিয়ে থাকুন না কেন, ক্ষমতার দম্ভ চূড়ান্ত পর্যায়ে না পৌঁছলে এহেন অপরাধ ঘটানো সম্ভব নয়। ইস্তানবুলের পুলিশ শহরের শেষ প্রান্তে ইয়ালোভা জঙ্গলে তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছে খাশোগির দেহাংশ। টিভির পর্দায় দেখা গিয়েছে, জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে পোড়-খাওয়া সাংবাদিকরাও অল্প কেঁপে উঠছেন। মুখে অবশ্য বলছেন, শীতের হাওয়া ঢুকতে শুরু করেছে কি না! সে কথা শুনলে নরওয়ের নোবেলজয়ী সাহিত্যিক নুট হামসুন হাসতেন। ইস্তানবুলে ঘুরতে এসে হামসুন লিখেছিলেন ‘হুইস্পার্স ইন দ্য ল্যান্ড অব ডেথ’। পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস আচম্বিতে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর কথা বলে না, তাঁদের কথা শোনার জন্য রয়ে গেছে ওই হাওয়া, আর আমাদের কল্পনা। নোবেলজয়ী ওরহান পামুকের শহরে এর থেকে বড় ট্র্যাজেডি আর কীই বা হতে পারে!