বিকেল পাঁচটায় অফিস ছুটি হয় তাঁর। কিন্তু তাঁর বাড়ির লোক জানে, কাজ গুছিয়ে বাড়ির দিকে গুটিগুটি পা বাড়াতে তপনবাবুর ছ’টা বেজে যায়। বিকেল পাঁচটা থেকে ছ’টা— এই এক  ঘণ্টা হল তাঁর জানালা। সংসারের ফাইফরমাশ সামলে নাকে-মুখে দুটো ভাত কোনও রকমে ডাল-তরকারি দিয়ে গুঁজে রোজ অফিসে লেট মার্ক বাঁচান তিনি। তার পর সারাদিন ফাইল ঠেলা। বেসরকারি অ্যাকাউন্টেন্সি ফার্ম। অবস্থা মন্দ নয়। যদিও ছোকরা মালিক তাঁর মতো পঞ্চাশোর্ধ্বদের ‘যত্তসব ওল্ড হ্যাগার্ডস’  দৃষ্টিতে দেখেন, তবু মাথার উপর তার বাপ আছেন। বুড়ো মালিক অভিজ্ঞতার দাম দিতে জানেন। তাই এখনও তপনবাবুর হাতে হ্যারিকেন হয়নি। তবু... বড়র পিরিতি যে বালির বাঁধের মতো, সে-কথা বিচক্ষণ তপনবাবু ভাল করেই জানেন। তা ছাড়া বৃদ্ধ মালিক যে আরও আট-ন’বছর একই রকম থাকবেন, বছর দুয়েক পরই ছেলের হাতে সব কিছু ছেড়ে দিয়ে কাশীবাসী হবেন না, সে কথা কি জোর দিয়ে বলা যায়! 

বলতে গেলে তাঁর ঘরে-বাইরে সর্বক্ষণই টেনশন। বাড়িতে তাঁর দুই সন্তান— বড়টি মেয়ে, ছোটটি ছেলে। মেয়ের এ বার ক্লাস টেন হল। ছেলের সিক্স। সঙ্গে মুখরা গিন্নি। সম্প্রতি তিনি ঘ্যানঘ্যান শুরু করেছেন, মেয়ে নাকি গানের মাস্টারের সঙ্গে লটরপটর শুরু করেছে। কপালে জুটেওছে বটে এক জন! গানের মাস্টার ছোকরাটাকে দু’চোখে দেখতে পারেন না তপনবাবু। গান শেখানোর সময় ছোঁক-ছোঁক করা ব্যাটার স্বভাব। দেখলেই মনে হয়, হারামজাদাটা সরগমের সা-রে পেরিয়ে গা-তে পৌঁছনোর আগেই ছাত্রীর গায়ে হাত দেওয়ার সুযোগ খোঁজে। ঝিমলি, মানে তাঁর মেয়ের গানের মাস্টারকে তিনি অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে ‘রাধিকা’ সিনেমা হলের সামনে হাসাহাসি করতে দেখেছেন। অন্তত দু’দিন তো বটেই। 

ছেলে ফাইভ থেকে সিক্সে উঠতেই ল্যাজে গোবরে হয়ে গিয়েছে। সিক্সের হাফ ইয়ার্লিতেও অঙ্কে বারো পেয়েছে! সিক্স থেকে সেভেনে ওঠার সময় যে কী করবে, ঈশ্বরই জানেন। স্কুলের হেডমাস্টার আবার ডোনেশন-খোর। অ্যানুয়ালে ফেল করলে ডেকে পাঠাবে। তার পর মধু-মাখানো গলায় স্কুলের কঠিন আর্থিক পরিস্থিতি, সরকারি অনুদানের আকালের গল্প শোনাবে। তার পর শোনাবে স্কুলের পিছনের জমিতে যে নেতাজি মঞ্চ তৈরির কাজ চলছে, মাত্র লাখখানেক টাকার অভাবে সেটা আটকে আছে, এখন তপনবাবুর মতো সহৃদয় অভিভাবকরা যদি এগিয়ে না আসেন, অন্তত হাজার বিশেকও যদি... এই হল কনসিডারেশনে ক্লাসে তোলা। সবাই জানে স্কুলের পিছনে নির্মীয়মাণ নেতাজি মঞ্চ হেডমাস্টার অক্ষয়ধন বড়ালের কুমিরছানা। ওটা দেখিয়েই তিনি ফেল-করাদের শুষে ডোনেশন নিয়ে ক্লাসে তোলেন এবং তাঁর নিজের বাড়ি দোতলা থেকে তিনতলা হয়, ঘরে-ঘরে ঠান্ডা মেশিন বসে। নেতাজি মঞ্চ যেখানকার সেখানেই থেকে যায়। মনে-মনে ছোটনের স্কুলের এই হেডমাস্টারকে তপনবাবু ‘শকুন’ বলে ডাকেন।   

কিন্তু এ সব তো ছিলই। নতুন করে এমন কী ঝামেলা হল যে, তপনবাবুর মুখটা বাংলার পাঁচ থেকে কোনও ভাবে চার বা ছয় হচ্ছে না? কারণ অফিসের অসিত পাল। সে কোথা থেকে খবর এনেছে, ছোকরা মালিক নাকি তার বুড়ো বাপকে এক রকম জপিয়েই নিয়েছে। সে নাকি ফার্ম ঢেলে সাজাতে চায়। টপ টু বটম ইয়ং ব্লাড ফ্লো করিয়ে দেবে একেবারে। পঁয়তাল্লিশ পেরোলেই কুলোর বাতাস, মানে ভিআরএস।

‘‘বু’লে না তপনদা, তোমার মাইনেতে দুটো নতুন ছেলে পোষা যাবে, কী?’’ সব কথার শেষে প্রশ্নচিহ্নযুক্ত ‘কী?’ বলে, চোখদুটো ঢুলুঢুলু করে, মুখখানা খানিক ক্ষণ হাঁ করে রাখা অসিত পালের স্বভাব। এ সব দেখে তপনবাবুর মনের গহীন ডুবজলে কখনও ‘অপোগণ্ড’, কখনও ‘হতচ্ছাড়া’ শব্দগুলো বুড়বুড়ি কেটে আবার কোথায় মিলিয়ে যায়।  

তপনবাবু বড় নিরীহ মানুষ। ভাল করে মুখ খারাপ করার ধকটুকুও তাঁর নেই। এক কোলিগের পাল্লায় পড়ে মদ্যপান করেছিলেন। সুবিধে হয়নি। সেই তিক্ত, কটু স্বাদের সোনালি তরল জ্বালাপোড়া হয়ে নেমেছিল, বেশি ক্ষণ থাকেওনি, বমি হয়ে উঠে এসেছিল। সে এক মহা বিব্রতকর অবস্থা! দ্বিতীয় দিন থেকেই আর সাহস হয়নি। আনন্দ-ফুর্তির অন্য রাস্তা দেখিয়েছিল আর এক কোলিগ সুখেন। ধর্মতলার মোড়টায় খানিক ক্ষণ দাঁড়ালেই রিকশা আসে। হাতে টানা রিকশা। বুড়ো রিকশাওলা নিঃসঙ্গ পুরুষ দেখলেই কাছে এসে গুনগুনিয়ে বলতে শুরু করে, ‘‘জায়েগা বাবু? ইউপিওয়ালি কলেজগার্ল, একদম গোরি চিট্টি, ফাসক্লাস... চলিয়ে বাবু, রেট ভি থোড়া কম লাগা দেঙ্গে...’’ সুখেন প্রায়ই যায়। তপনবাবুকেও ডেকেছিল। তপনবাবুর সাহসে কুলোয়নি। পাপ করতে দম লাগে। বলা বাহুল্য, নিরীহ, ছাপোষা তপনবাবুর সে দম নেই। সেই কারণেই জানালাটুকুই তাঁর শখ। আর আজ জানালা দিয়েই উড়ে যেতে 
চান তিনি। 

এই বার আসব জানালার কথায়। বিকেল পাঁচটায় ঠিক অফিস থেকে বেরিয়েই তিনি ধর্মতলার শহিদ মিনারের কাছের ছোট পার্কটায় এসে বসেন। বুঁদ হয়ে বসে সারা দিনের কথা ভাবেন, নিজের দুঃখে নিজেকেই সান্ত্বনা দেন, নিজের ভাল কাজে নিজেরই পিঠ চাপড়ে নেন... সবটাই মনে-মনে। আবার তো সন্ধেয় বাসের ভিড় ঠেঙিয়ে এক স্টপ আগে নেমে বাজার সেরে আধ কিলোমিটার ঠেঙিয়ে বাড়ি। সেখানে গিন্নির মুখঝামটা, ছেলেমেয়ের অবাধ্যতা, অশান্তির রাজ্য। কলুর বলদের মতো তাঁর জীবন এক অদৃশ্য চক্রে জুড়ে গিয়েছে। শুধু দিয়ে যাওয়া আছে, বিনিময়ে প্রাপ্য শান্তিটুকুর তিলমাত্রও নেই। সারাদিনটা যেন একটা বদ্ধ ঘর, যেমন অফিস, তেমনই বাড়ি। এক বদ্ধ ঘর থেকে অন্য বদ্ধ ঘরে যাওয়ার মাঝের এই এক ঘণ্টাই তপনবাবুর জানলা। চুপ করে থুম মেরে বসে সাতপাঁচ ভাবাটা তাঁর কাছে খুব আরামের। মনখারাপ করে বসে থেকে নিজেকেই নিজে সান্ত্বনা দেন। মন একটু হলেও হালকা হয়। খুব সমস্যা না হলে তিনি এই পার্কে বসাটা বাদ দেন না কখনও। ঘণ্টাখানেক বসে আস্তে-আস্তে দিনের আলো মরে এলে উঠে পড়েন। এখন অবশ্য শীতকাল। সন্ধে নামছে তাড়াতাড়ি। উঠতে-উঠতে সন্ধে হয়ে যায়। আজও বসে নিজের নানা দুঃখ চোখের সামনে মেলে ধরে নানা কথা ভাবছিলেন তিনি। তবে মন যেন আজ কিছুতেই হালকা হওয়ার নয়। বার বার মনে হচ্ছে, নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে কেমন হয়! কী-ই বা হবে, তিনি যদি আর না ফেরেন! আবার নানা পিছুটানও কাজ করছে। হিসেবি মন বলছে, বয়সটা গৃহত্যাগের নয়। গাছকে শিকড়সুদ্ধু তুলে অন্য মাটিতে বসানোর একটা সময় আছে। একটা সময়ের পরে তা আর হয় না। আবার বিরক্ত-বিধ্বস্ত মনটা বলছে, আর ভাল লাগে না। সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। কোনও একটা ধর্মশালায় গিয়ে জুটলেই ল্যাটা চুকে যায়। 

বেনারসের বাঙালিটোলায় তাঁর ছোটবেলার এক বন্ধু থাকেন। ওখানকার স্কুলের শিক্ষক। তার নিজস্ব দুটো টিউটোরিয়াল। ফলাও কারবার। সেখানে পড়ালেও তো নিজের রোজকার খোরাকিটা জুটে যাবে। তপনবাবু ইংরেজির ছাত্র। বি এ পাশ। অফিসে চাকরি পাওয়ার আগে ইংরেজি টিউশন পড়াতেন। ধৈর্যশীল ভাল মাস্টার হিসেবে নামও হয়েছিল, পড়াতে ভালওবাসতেন। অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, চেষ্টা করলে ফের শুরু করাটা সমস্যার হবে না। রিজ়ার্ভেশন-সহ টিকিট কাটা আছে মাসতিনেক আগেই। জমানো টাকা থেকে হাজার পাঁচেক আপাতত সঙ্গে নিয়ে নিয়েছেন তিনি। বাকিটা পরে কোথাও থেকে তুলে নেবেন। আর হ্যাঁ, বিবেকের কাছে তিনি পরিষ্কার। সংসার ভাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন না তিনি। তাঁর স্ত্রীর সে কালের পনেরো ভরির মতো গয়না আছে। নানা টানাটানি থাকলেও ভগবানের আশীর্বাদে ওগুলোয় হাত পড়েনি। স্ত্রীও যক্ষিবুড়ির মতো ওগুলো ব্যাঙ্কের ভল্টে তুলে রেখেছেন। বাপের বাড়ির পাড়ার ব্যাঙ্ক। বরং তপনবাবুকে মেয়ের বিয়ের কথা বলে ঠেলে-ঠেলে আরও ছোটখাটো গয়না গড়িয়েছেন। গত পাঁচ বছরের চেষ্টায় তপনবাবু মেয়ের জন্য ভরিদুয়েক মতো গড়াতে পেরেছেন। ‘‘সেগুলো ভাঙিয়ে খা এ বার শালারা! অনেক দিন তো তপন দাসকে শুষলি... এ বার নিজেদেরটা চালিয়ে নে!’’ মনে একটা অদ্ভুত জোর পান তপনবাবু। ছিঁচকে হারামজাদা মনটা তবু বলে, সব গয়না চলে গেলে মেয়ের বিয়ের কী হবে! জোর করে এ সব সেন্টিমেন্ট ঝেড়ে ফেলতে চান তপনবাবু, ‘‘হাঘরের বাচ্চার আবার বিয়ে! নিজে বাঁচ আগে, তার পর তো বাপের নাম!’’ মুক্তপুরুষ হতে গেলে মনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছিঁচকাঁদুনিতে পাত্তা দিলে চলে না। উত্তিষ্ঠত জাগ্রত-টাগ্রত বলে নিজেকে নিরুদ্দেশের জন্য একেবারে তৈরি করে নিলেন তিনি। প্রস্তুতি কয়েক দিন ধরেই চলছিল। আজ বুধবার, দিনটা ভাল। তাই লুকিয়ে-লুকিয়ে অফিসের ব্যাগে ঘুচড়ে-মুচড়ে দু’সেট জামাকাপড় নিয়েই বেরিয়েছেন তিনি। এখন পৌনে ছ’টা। ছ’টা বাজলেই উঠবেন। তার পর হাওড়া স্টেশন। তার পর বেনারস! জয় গুরু!           

এমন সময় হঠাৎ ঝঞ্ঝাট। টকাটং-টকাটং-টকাটং-টকাটং...টিনের ডুগডুগি বাজানোর তীব্র কর্কশ আওয়াজ। সঙ্গে চিৎকার, ‘‘আইয়ে... আইয়ে... আইয়ে... মেহেরবানোঁ, কদরদানোঁ... আজিবোগরিব খেল দেখিয়ে বাবুলোগ, মাদারি কা খেল...’’
‘‘টকাটং-টকাটং-টকাটং-টকাটং...হয়রোতংগেজ তিলসমি জাদু দেখনে কে লিয়ে আইয়ে...আইয়ে... ’’
‘‘আপদ কোথাকার! শান্তিতে একটু বসবার জো নেই কোথাও...’’ ভাবলেন তপনবাবু। 

‘‘হরেক খেল, মজাদার খেল... দিল থামকে বইঠিয়ে অউর হয়রান হো জাইয়ে...’’ লম্বা রোগাটে চেহারার লোকটা গলার শির ফুলিয়ে চেঁচাচ্ছে। গায়ের রং রোদে পুড়ে তামাটে। গায়ে বিসদৃশ ঝলমলে জোব্বা আর পাতলুন। মাথায় লাল টুপি। সে উবু হয়ে বসে তার ঝোলা থেকে সরঞ্জাম বের করে রাখছে। নানা রঙের কয়েকটা করে বল, কাঠের ডান্ডা, চাকতি, রুমাল, তাস, বুরুশ, ছাতা, প্লাস্টিকের ফুল, রঙিন পালক, আরও নানা কিছু। খুব বেশি লোক না হওয়ায় নিজের বেঞ্চে বসেই লোকটার খেলা দেখতে লাগলেন তপনবাবু। নেহাতই মামুলি সব খেলা। সাধারণ জাগলিং, বুরুশের রং বদল, ফাঁকা চোঙার মধ্যে থেকে ফুল, এই সব। দেখতে-দেখতে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেন তপনবাবু। তাই কখন খেলা শেষ হয়েছে জানেন না। চমক ভাঙল একটা প্রশ্নে... 

‘‘পরেসান আছ বাবু? আমার সব খেল দেখলে না তো?’’
তপনবাবু দেখলেন, ভেলকিওয়ালা তার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। লোকটি মাথায় বেশ লম্বা। মুখে দাড়ি-গোঁফ নেই। চোখদুটো টানা-টানা, তার উপর কাজল পরায় বাচ্চাদের মতো লাগছে। হাসিটা মলিন, কিন্তু চোখ জ্বলজ্বলে। তিনি কী উত্তর দেবেন বুঝে পেলেন না।
‘‘কুছু খেল দেখবে? বলো কী দেখতে চাও? আরে ঘাবড়াও মত... যা খেল দেখতে চাইবে, সোব পাবে,’’ বলে চলে মাদারি লোকটা। অবাক হয়ে চেয়ে থাকেন তপনবাবু। 
‘‘এত পরেসানির কী আছে বাবু? যাও, তোমাকে খেল দেখিয়ে দিলাম...’’ বলে এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে আঙুল দিয়ে তপনবাবুর কপালে, ঠিক দুটো ভুরুর মাঝখানে ছুঁয়ে গমগমে গলায় বলল, ‘‘যাও, তুমার সব ঠিক করে দিলাম, ছেলের পড়ালিখা, মেয়ের ওই বেত্তমিজ় মাস্টার... তোমার নোকরি...’’

হতভম্ব তপনবাবুর মাথা ঝিমঝিম করছে। কোনওক্রমে বলতে গেলেন, ‘‘তুমি, তুমি কী করে...’’ কিন্তু গলা থেকে কোনও আওয়াজ বেরোল না।      
হা-হা করে হেসে ওঠে মাদারি, ‘‘আরে বুরবক... হামি না জানলে কে জানবে... সবকো খেল দিখানেওয়ালা মাদারি তো হামিই আছি... তুম ঘর জাও...সব ঠিক হো জায়েগা...’’

বাসা-ফিরতি পাখির ডাকে চটকা ভাঙে তপনবাবুর। চমকে উঠে দেখেন, ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বেঞ্চে বসেই। স্বপ্ন! জিনিসপত্র খোয়া যায়নি তো! নাঃ, কাঁধের ব্যাগ,  টিফিনের ঝোলা, ট্রেনের টিকিট, প্লাস্টিকের প্যাকেটে গার্ডার দিয়ে মোড়া পাঁচ হাজার টাকা— সব ঠিকই আছে। আর সেই মাদারি!

সামনে তাকিয়ে দেখলেন। আধো অন্ধকারে সেই মাদারি কাপড় বিছিয়ে তার জিনিসপত্র গুছোচ্ছে। ঘুমিয়ে বেশ ফ্রেশ লাগছে। মাথায় স্বপ্নের রেশ এখনও অনুভব করছেন তিনি। মনটা এখন অনেক হালকা। মনে যেন আশ্চর্য এক ভরসা পাচ্ছেন তিনি। পালানোর ইচ্ছেটা আর নেই। মনে হচ্ছে, সব সত্যিই ঠিক হয়ে গেল! 

দেখলেন, পিঠে ঝোলা ফেলে উঠে দাঁড়িয়েছে মাদারি। তাকে উঠে গিয়ে কিছু খুচরো টাকা দিতে ইচ্ছে হল এক বার। পকেট থেকে হাতেও নিলেন। কিন্তু সাহস হল না। তপনবাবুর মনে হল, সবার অলক্ষ্যে মানুষের পাপ-পুণ্য, আশা-ভরসা, ভাল-মন্দ, আলো-অন্ধকার নিয়ে যে আপনমনে সারাদিন খেলছে, যার হাতে পালকের রং‌ বদলের মতো পাল্টে যায় জগতের মেঘ-বৃষ্টি-রোদ, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাজগৎ নিয়ে যার জাগলিং, সে-ও মাদারি ছাড়া কী! তপনবাবুর মনে  হল, মাদারি কখনও-কখনও আসে, কিন্তু তার কাছে যাওয়া যায় না। হাতের খুচরো হাতেই থেকে যায়। 

পিঠের ঝোলা পিঠে ফেলে মাঠ পেরচ্ছে মাদারি। মানুষের মায়া-বিভ্রম-প্রহেলিকার অনন্ত পথ পেরিয়ে সে হাঁটছে। তার ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে। পলকহীন তাকিয়ে থাকতে-থাকতে তপনবাবুর মনে হল, অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার আগে মাদারির মাথা আকাশ ছুঁয়ে যাবে। কিন্তু তিনি তা দেখতে পাবেন না। যতটুকু পেয়েছেন তা-ই বা কম কী! পলকহীন তাকিয়ে থাকতে-থাকতে কৃতজ্ঞতায় তাঁর চোখে জল এসে যায়। বাড়ি ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ান তিনি।