• কানাইলাল ঘোষ
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ধারাবাহিক উপন্যাস, পর্ব ২৫

মায়া প্রপঞ্চময়

Painting

পূর্বানুবৃত্তি: বান্দোয়ান মোড়ে দোকানপাট চালায় এমন কিছু যুবক উন্মত্ত জনতার হাত থেকে বাঁচায় বোসস্যরকে। সেই রাতেই তাঁর অফিস থেকে ট্রাকের ক্লিনার ছেলেটিকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে চড়াও হয় সন্দীপ শেঠের দলবল। নতি স্বীকার না করে নিজের শর্তে কাগজে সইসাবুদ করিয়ে ছেলেটিকে ছাড়েন বোসস্যর। তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বন্ধ হয় না। তিন জন বিট অফিসারের কাজকর্ম খুঁটিয়ে দেখে সবাইকে এক সপ্তাহের মধ্যে যাবতীয় ভুলভ্রান্তি শুধরে নেওয়ার নির্দেশ দিলেন বোসস্যর।

 

বোসস্যর কথা শেষ করার আগেই লোহারবাবু দৌড়ে সেই কাজটা করে স্যরকে দেখান আর বলেন, ‘‘কিচ্ছু ভাববেন না স্যর, আমরা আছি কী করতে? যা মনে হবে আমাকে বলবেন, দেখবেন প্রদীপের দৈত্যের মতো চোখের নিমেষে করে দোব। আপনার বলে-দেওয়া কাজগুলো পুরোদমে চলছে, হয়তো ছ’ দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে,’’ তার পর কান-এঁটো-করা তেলতেলে হাসি হাসতে থাকেন। 

স্যরের রোজ সকালে চারটে রুটি খেয়ে বেরনো, তার পর সারা দুপুর রোদে রোদে ঘুরে প্রায় সন্ধে বেলায় ফিরে এসে ঠান্ডা হয়ে-যাওয়া কড়কড়ে ভাত জলের মতো ডাল দিয়ে মেখে খাওয়া। উনি নিজেই খুঁজেপেতে একটা বাচ্চা মেয়েকে পেয়েছেন, যে রান্না শিখছে আর ওঁকে তার হাত-পাকানোর টার্গেট বানিয়েছে। তাতেই উনি সন্তুষ্ট, তবে অত্যধিক গরমে আর রোদে ঘুরে মাঝে-মাঝেই নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়েছে। অফিসে সবার সামনেই এক দিন যখন নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এল, ওরা সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। স্যর নাকে রুমাল চেপে উঠে গেলেন জলের ঝাপটা দিতে, ফিরে এসে বললেন, ‘‘ও তেমন কিছু নয়, ঠান্ডা জল দিয়ে এলাম। ঠিক হয়ে যাবে।’’

সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন মনে হল দুয়ারিবাবুকে। প্রথমে তো ডাক্তার আনার জন্য পীড়াপীড়ি, তার পর সিদ্ধান্ত নিলেন, ‘‘এ ভাবে নিজের শরীরটা শেষ করবেন না স্যর, আপনার ঘরে একদম হাওয়া ঢোকে না, তার উপরে হ্যাজাকের চড়া আলো আর তাপে মাথা ঝুঁকিয়ে কাজ করেন মাঝরাত পর্যন্ত... না না, এ ভাবে চলতে পারে না বেশি দিন, আপনার মতো মানুষ রোগে পড়ে থাকলে আমার সহ্য হবে না। আমার কোয়ার্টারের সঙ্গেই তো অফিস রুম, ওটা উত্তর-দক্ষিণে খোলা। কী বলব স্যর, হু-হু করে হাওয়া আসে। আজ থেকেই আপনি আমার অফিসে বসে রাতে কাজ করবেন, আমিও থাকব সঙ্গে, ঠান্ডা মাথায় অ্যাকাউন্টের জট ছাড়িয়ে সিধে করতে দু’দিন লাগবে। ঠিক আছে?’’

স্যর কিছু বলার আগেই লোহারবাবু গলা চড়িয়ে হাঁকতে থাকে, ‘‘ঠিক আছে মানে? বিলকুল বরাব্বর আছে, আপোনের ত অ্যাকটো দামি ল্যাম্পো আছে না, দারুণ আলো দ্যায়, ঠান্ডা অথচ খুব জোরালো বট্যেক? স্যরের খুব সুবিধ্যা হব্যে উঠা লিলে!’’ এমনিতে দু’জনের সম্পর্ক আদায়-কাঁচকলায়, কিন্তু এই ব্যাপারটায় লোহারবাবু আগ বাড়িয়ে সাপোর্ট করায় বেন্দার কেমন খটকা লাগে। স্যর নিমরাজি হয়ে ঘরে চলে যাওয়ার পর ওদের দু’জনের পরস্পরের দিকে তাকিয়ে চোখ মটকানোটাও ওর মোটেই ভাল লাগে না। তবে ও আর কী করতে পারে, নিচু তলার কর্মচারী, তার উপর আবার স্যর ওকেও বাকিদের দলে ফেলে দিয়েছেন!

সন্ধেবেলায় মধুদার সঙ্গে লোহারবাবুকে গুজগুজ করতে দেখে ফাঁক পেয়ে ও চেপে ধরল, জানতেই হবে কী খিচুড়ি পাকাচ্ছে সবাই মিলে। একে তো লোকটাকে একটা আলো জ্বালিয়ে পর্যন্ত কেউ সাহায্য করে না— নিজেই হ্যাজাক, হ্যারিকেন জ্বালিয়ে নেয়, নিজেই গেট টেনে তালা লাগায় রাতে, তার পর সিন্দুকে-রাখা কয়েক লাখ সরকারি টাকা পাহারা দিতে বিছানার দু’পাশে দুটো লোডেড বন্দুক নিয়ে শোয়। এর পর আর কী করার থাকতে পারে? মধুদা শুধু ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে মৌনব্রত পালন করে শেষে সংক্ষেপে বলে, ‘‘আজকালের মইধ্যে যা ঘটার ঘটব্যেক রে, বেন্দা! তু-ও চুপ মেরে যা, ভালমানুষদের দিন নাই রে, তু তো অভিমন্যু-বধ দেখে কেঁদ্যে ভাসায়েঁ দিস, আর-একটা পালা দেইখত্যে পাবি তুরন্ত।’’

কিছু একটা খারাপ ঘটনা ঘটতে চলেছে আন্দাজ করে দুশ্চিন্তায় ভুগতে থাকে বেন্দা, কিন্তু মুখ ফুটে কাউকে কিছুই বলতে পারে না। একে তো নতুন চাকরি বলে অন্যদের কাছে ও হ্যাটার পাত্র, তার উপর সর্বদা স্যরের সঙ্গে থাকে বলে বাকিদের চক্ষুশূল! এ দিকে আবার স্যরও ওকে বিশ্বাস করছেন না, ফলে বেন্দার অবস্থা এখন না ঘরকা-না ঘাটকা। তাই ও নিজের অল্প বুদ্ধি দিয়ে ঠিক করে যে, আজ রাতে ও স্যরের উপরেই নজর রাখবে। জানে ওর খুব বেশি কিছু করার নেই, তবু যদি বড় কিছু বিপদ ঘটে স্যরের, কিছু তো করার চেষ্টা করতে পারবে সাধ্য মতো। সুতরাং সন্ধের মধ্যেই খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে বেন্দা সবার চোখ এড়িয়ে রেঞ্জ অফিসের আশপাশেই ঘুরঘুর করতে লাগল।

সন্ধে থেকেই হাওয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়ে চূড়ান্ত গুমোট হয়ে আছে। বৃষ্টি হওয়ার আগের লক্ষণ, কিন্তু বৃষ্টিও হচ্ছে না, গাছের একটা পাতাও নড়ছে না। বেন্দার মনের অবস্থাও তথৈবচ। সব ছেড়েছুড়ে বাড়িও যেতে পারছে না, কারও মুখোমুখিও হতে পারছে না। একটা পাতকুয়োকে মাঝখানে রেখে পশ্চিম দিকে রেঞ্জ অফিস আর স্যরের কোয়ার্টার, উত্তর দিকে দুয়ারিবাবুর কোয়ার্টার আর অফিস, যার দক্ষিণ দিক অনেকটা খোলা। বিটবাবুর অফিসের পাশে একটা ভাঙা পাঁচিল, সেটার পিছনে বেন্দা লুকিয়ে আছে। মশা তাড়াতে সারা গায়ে কেরোসিন তেল মেখেছে, গন্ধে নিজেরই মাথা ঘুরছে। ও দিকে আবার সাপের ভয়, তবে বুদ্ধি করে বিকেলবেলা জায়গাটা একটু সাফ করে স্যরের ঘর থেকেই একটু কার্বলিক অ্যাসিড ঝেড়ে এনে তিন-চারটে নারকেল মালায় ঢেলে এখানে-ওখানে দিয়ে রেখেছে। ওটার ঝাঁঝালো গন্ধে নাকি সাপ আসে না। সত্যি-মিথ্যে বোঝা যাবে আজকে। হাতে একটা খেঁটে লাঠি রেখেছে মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যে।

রাত ন’টা পর্যন্ত স্যর আর দুয়ারিবাবু মিলে অ্যাকাউন্ট করছে আর বেন্দা পাঁচিলের পিছনে লুকিয়ে বসে মশা তাড়াচ্ছে। এর মধ্যে তিন-চার বার দুয়ারিবাবু স্যরকে ওর বাড়ি খেয়ে যেতে পীড়াপীড়ি করেছে আর স্যর এড়িয়ে গিয়েছেন, বলেছেন, ‘‘জানেনই তো দুপুরের খাবার খেতে সন্ধে ছ’টা বেজেছে, আবার খিদে পেতে রাত এগারোটা হবে। মেয়েটা ভর সন্ধেবেলায় রান্না করে রেখে গিয়েছে, সেটা কাল পর্যন্ত থাকবে না। আমি এখানে খেলে আপনাদেরও সমস্যা, আমার খাবারটাও নষ্ট হবে। আর-একটু কাজ করে সাড়ে-ন’টার সময় আমি ঘরে যাব। সন্ধে থেকে টানা অনেকটা কাজ হয়েছে। বেশি স্ট্রেন নিলে আবার অন্য উপসর্গ শুরু হবে।’’

দু’জনের কথাই পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে বেন্দা। স্যর এখান থেকে উঠলেই ও-ও বাড়ি যেতে পাবে, ভাবতেই ভাল লাগছে ওর। তা হলে মধুদার বলা কথাগুলো ফলল না, কাল সকালে এ নিয়ে দু’কথা শোনাবে ও বুড়োটাকে। বয়েস হয়ে ভীমরতি হয়েছে! হঠাৎই বিটবাবু চনমনিয়ে উঠলেন, ‘‘দ্যাখেন দেখি, আমার ভাউচার ফর্মগুলো শেষ হয়ে গেল। আর গোটাতিনেক ভাউচার করলেই আমার অ্যাকাউন্টটা কমপ্লিট হয়ে যাবে। একটু বসুন স্যর, আমি এক্ষুনিই রেঞ্জ অফিস থেকে ব্ল্যাঙ্ক ফর্ম নিয়ে আসছি৷’’ এক্ষুনি বললেও দুয়ারিবাবু ফিরলেন প্রায় পাঁচ মিনিট পর৷ বেন্দার মনে হল হয়তো এই ফাঁকে একটা সিগারেটও খেয়ে এলেন, বিটবাবু দিনে বিশ-পঁচিশটা সিগারেট খায় আর খকখক করে কাশে। সব নেশার জিনিসই সাপ্লাই দেয় সন্দীপ শেঠ অ্যান্ড পার্টি।

দশ মিনিটও গেল না, বিটবাবু আবারও মুখ দিয়ে একটা হতাশার শব্দ করলেন, ‘‘দূর দূর, আর পারা যায় না... স্যর, আমার নোটবইয়ের পাতা শেষ হয়ে গেল, শুধু দু’টো এন্ট্রি বাকি আর এমন সময়...’’ স্যর বলেন, ‘‘ছেড়ে দিন না আজকের মতো, কাল বাকিটুকু করা যাবে।’’ প্রায় অনুনয়ের সুরে বিটবাবু বললেন, ‘‘কী যে বলেন স্যর, এত দূর এগিয়ে শেষে তীরে এসে তরী ডুববে? তাই কি হয় না কি! এত কষ্ট করে প্রায় কেষ্ট পেতে চলেছি অনেক আশা-ভরসা নিয়ে! আর আধ ঘণ্টাও লাগবে না, তার পর শান্তিই শান্তি। আপনাকে পাকা কথা দিচ্ছি।’’ দুয়ারিবাবু আবার বেরিয়ে পড়েন, স্যর এক বার ওর চলে যাওয়া লক্ষ করে এক মনে কাজ করতে থাকেন ক্যাশবইয়ে ঘাড় গুঁজে।

বেন্দার কেমন যেন লাগে বিটবাবুর শেষের কথাগুলো আর বিশেষ করে ছটফটিয়ে চলে যাওয়া, স্যরও কি ওই জন্যেই তাকিয়েছিলেন? কী মনে হতে বেন্দা পাঁচিলের ধারে ধারে বিটবাবুর বাড়ির পিছন দিকে গুঁড়ি মেরে এগোয়। সামান্য দূর যেতেই সামনে লোহারবাবুর বাড়ির সামনে বেশ কয়েক জন লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবার ঝুপ করে বসে পড়ে ও। লোকগুলোর ফিসফিস করে বলা কথাগুলো কানে আসে ওর, প্রথমে শোনে দুয়ারিবাবুর গলা, ‘‘অ্যাই, মন দিয়ে শোনো সবাই, এ বার পাখি ফাঁদে পড়ল বলে! একটু ধীরজ রাখতে হবে, বন্ধুগণ! পাশের ঘরে আমার বাচ্চাটার সঙ্গে ওর মা শুয়ে আছে। একটু চুড়ির শব্দ, একটু গলার আওয়াজ করতে বলে এসেছি মিসেসকে। আমার যেতে দেরি হচ্ছে দেখে— বুয়েছ না, কম বয়সের ছেলে, রক্ত গরম এখন! আর আমার বৌটাও তো বেশ সুন্দরী, তোমরা যাকে ইয়ে বলো, সেটাও যথেষ্ট আছে... ঠিক কি না?’’

লোহারবাবুর অধৈর্য চাষাড়ে গলা শোনা যায়, ‘‘আরে সে তো হৈল্য, কিন্তুন পাখি যদি ফাঁদে না পড়ে? ই লোকটো বড্যো ট্যাড়া টাইপ্যের বট্যে, ও যদ্যি ঘরে না-ই ঢোক্যে, তা-ইলে কী হব্যেক?’’ ওকে ধমকে থামিয়ে চাপা গলায় দুয়ারিবাবু বলে, ‘‘শুভ-শুভ বলো... তোমার খালি আগ-কাটা স্বভাব! আর যদি ও ঘরে না-ই বা ঢোকে, আমি তাল বুঝে বাইরে থেকে কুলুপ টেনে দোব আর বৌটা কাপড়-চোপড় এলোমেলো করে চিৎকার করতে থাকবে যে, লোকটা ঘরে ঢুকে ওর উপর অত্যেচার করতে যাচ্ছিল! এতগুলো লোক চেপে ধরলে ব্রহ্মা-বিষ্ণুও কাত হয়ে যায়, আর এটা তো বাচ্চা ছেলে, হেঁহ্! আমায় কি না সাত দিনের সময় বেঁধে দেয়, অ্যাত্তো সাহস! আজ ওকেই যদি না গাছে বেঁধে জলবিছুটি...’’ 

আর শুনতে পারে না বেন্দা, ওর কাছে সব কিছু জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। মধুদা বলেছিল, দুয়ারিবাবু এমন লোক যে, দরকার পড়লে ছেলে-বৌয়ের উপর দাঁও লাগিয়ে দিতে পারে! ঠিকই তো, আগে এটা মাথায় এলে বিকেলেই স্যরকে সাবধান করে দিতে পারত ও। কিছু না জেনে-বুঝে লোকটা একেবারে পাঁকের ভিতরে গেঁথে গিয়েছে! ও সাবধান করতে গেলে এতগুলো মারমুখী লোক ওকে সুদ্ধ ফাঁসিয়ে দেবে— এত রাতে ও এখানে কী করছে, এই প্রশ্ন তুলে। না আওয়াজ করে কী করে স্যরকে সাবধান করবে ও?

হঠাৎই ও খোলা জানালা দিয়ে লক্ষ করে, স্যর কান খাড়া করে কী যেন শুনছেন। তার পরই যেন হাতে-পায়ে বিদ্যুৎ খেলে গেল লোকটার, ঝট করে ল্যাম্পের দমটা কমিয়ে নিঃশব্দে চেয়ার ছেড়ে উঠে চিতাবাঘের মতো দু’লাফে খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়েই বাঁ দিকে বিশাল মোটা দু’টো ইউক্যালিপটাস গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে গেলেন উনি। তার ঠিক পর পরই সাইড থেকে বারান্দায় উঠে অফিসঘরের আলো নিভু-নিভু দেখে একগাল হেসে বিটবাবু দরজার পাল্লা-দুটো টেনে বাইরে থেকে শিকলটা তুলে দেয়। সাত-আটটা লোক, সবাই ফরেস্টেরই স্টাফ, এ বার এগিয়ে আসতে থাকে পায়ে পায়ে। ফাঁদে-পড়া বাঘকে পিটিয়ে-খুঁচিয়ে মজা পাওয়ার আনন্দ নিতে আসছে ওরা। 

আচমকাই স্যরের গলা শোনা যায়, ‘‘কী ব্যাপার শিবুবাবু, আপনি গেলেন তো নোটবই আনতে! দেখছি সঙ্গে করে আটটা মুশকো লোককে নিয়ে এলেন, আবার অকারণ ঘরের শিকল তুলে কাকে আটকালেন? হাওয়াকে না কি? আমি তো এখানে হাওয়া খাচ্ছি।’’

স্যরের গলার আওয়াজ বাইরে থেকে পেতেই বীরপুঙ্গবরা দুদ্দাড় করে অন্ধকারের দিকে ভেগে গেল এক লহমায়। শিবুবাবু থতমত খেয়ে আমতা-আমতা করে কিছু বলার চেষ্টা করে, কিন্তু স্যরের এক ধমকে চুপ করে যায়, ‘‘একটা কথাও মুখ দিয়ে যেন না বেরোয়! আপনি নীচ জানতাম, এতটা নীচে নামতে পারেন সে কল্পনা করিনি আমি। ছিঃ! টাকা-পয়সার জন্যে কোনও কাজই আপনার আটকায় না, তাই না? কাল সকালে আমি এর জবাবদিহি চাইব আপনার কাছে। তৈরি থাকবেন কিন্তু।’’ 

গটগট করে উনি নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন কোনও দিকে না তাকিয়ে। 

আনন্দে চোখে জল এসে গেল বেন্দার। খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছিল ওর সেই অবস্থাতেই। কে বলে ভগবান নেই? না হলে স্যরের মাথায় শেষ সময়ে কে বুদ্ধি দিল ঘর থেকে বেরিয়ে আসার? ওহ্‌, আর একটু হলেই তো ওঁর অপমানের একশেষ হত, কী করে অত বড় ধাক্কাটা সামলাতেন উনি? যাক বাবা, উনি ঘরে ঢুকে গেট টেনে ডবল তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। বেন্দা এ বার নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ি গিয়ে ঘুমোতে পারবে। বেন্দা যেন উড়তে উড়তে বাড়ি ফিরল আর ঘুমোলও বেলা পর্যন্ত।

পর দিন বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠে ধীরেসুস্থে রেঞ্জ অফিসে পৌঁছে দেখল, বাইরে থেকে আসা বিটবাবুরা জটলা করছে আর তাদের সামনে বীরদর্পে পায়চারি করতে করতে উল্টোপাল্টা বকে যাচ্ছেন লোহারবাবু। ওর কানে এল, ‘‘এক্ষনও চাঁদ-সুয্যি উঠছ্যে আকাশে, এ্যাতো পাপ ধম্মে সয় কক্ষনও! আম্মাদ্যের দেবতুল্যি সায়েবকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে নিজেই তো ফেঁসে গেল্যি বাবা! আমি তো তাই বলি, এত্তো ত্যালায় কেন্যে সায়েবকে লোকটা? আখের, তোর মনে-মনে অ্যাই ছ্যেলো রে শিবু?’’

স্যর অফিসঘর থেকে ধমক দেন, ‘‘আঃ লোহারবাবু, একদম নাটক করবেন না! আপনারা সব একই কাঁটাগাছের ডাল। আমি এক জনকে ধরেছিলাম, এ বার বাকিদের পালা। নিজের ভাল চান তো সময় থাকতে শুধরে যান।’’ লোহারবাবু থতমত খেয়ে চুপ করেন। বেন্দা দূরে মধুদাকে দেখে ওর কাছে গিয়ে চোখের ইশারায় বৃত্তান্ত জানতে চায়। মধুদা ওকে হাত ধরে আড়ালে টেনে নিয়ে গিয়ে বলে, ‘‘তুকে কালক্যে যাত্রাপালার কথা বল্যেছিলম না, তো সেই পালাখানই কাল রাত্তিরে ইখানে হলো বট্যেক, বুইলি বেন্দা। তব্যে শ্যাষটায় সব উল্ট্যা পড়্যে গ্যালো সায়েবের চক্করে পড়্যে!’’

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন