• রাজশ্রী বসু অধিকারী
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ধারাবাহিক উপন্যাস: পর্ব ২৫

পরিক্রমণ

illustration
ছবি: রৌদ্র মিত্র

Advertisement

পূর্বানুবৃত্তি: অফিসের গেটের উল্টো দিকে তিয়াষা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অভিরূপকে। মনে মনে দারুণ খুশি হয় সে। অভিরূপকে সে নিয়ে আসে নিজের ফ্ল্যাটে। কফি খেতে খেতে গল্প করে দু’জনে। কিন্তু গল্প ক্রমশ অন্য দিকে বাঁক নেয়। দু’জনের প্রতি দু’জনের দুর্বলতা ভেঙে পড়ে শরীরেও। কিন্তু সেই আবেগঘন মুহূর্তে আচমকা ফ্ল্যাটে এসে পড়ে পিয়াস। তাদের দু’জনকে ওই অবস্থায় দেখে রাগে ভেঙে পড়ে সে। তীব্র ভাষায় অপমান করে অভিরূপকে। মেনে নিতে পারে না তিয়াষা। 

জীবনে কখন কোন মুহূর্ত আসবে তা কেউ আগে থেকে জানে না। জানে না তাই নিজেকে সামলানোর কোনও প্রস্তুতিও থাকে না। শুধু সমর্পণ, শুধু স্রোতে ভাসা মন নিয়ে আরও কোটি কোটি মেয়ের মতো অনিশ্চিতের পথে ব্যাগ কাঁধে আর সুটকেস হাতে সিঁড়িতে পা রাখে তিয়াষা। অভিরূপ অপেক্ষা করছে নীচে।

১৫

খুব হাসিমুখে সবাইকে সন্দেশ অফার করছিল অভিরূপ। অরুণ ইতিমধ্যে তিনটে জাম্বো সাইজ কড়াপাক খেয়ে ফেলে আবার হাত বাড়িয়েছে তিয়াষার সামনে। তিয়াষা ভ্রুকুটি করে মাথা নাড়ে, ‘‘উহু...আর নয়, অরুণদা আপনার সুগার আছে আমি জানি। এ বারে বৌদি আমায় জেলে পাঠাবেন।’’

আজ আর অরুণের প্রতি তিয়াষার অন্তরঙ্গতায় অভিরূপের মুখে ফুটে ওঠেনি কোনও আহত বিস্ময়। সে খুশিমনে চোখ পাকায় তিয়াষার দিকে। “আরে কী হল, ডাক্তারকে জ্ঞান দিচ্ছ? দাও... দাও অরুণকে ভাল মতো দাও, বরাবরই ও সন্দেশের খুব ভক্ত। তা ছাড়া ও না থাকলে কিছুই হত না।’’ 

আজ অভিরূপের কথা, হাসি সব কিছু থেকেই ফুটে বার হচ্ছে ওর মনের নির্ভার অবস্থান। কেউ ভাবতেও পারবে না এই মানুষটাই গত এক মাস চিন্তায় চোখের তলায় কালি ফেলে ঘুরে বেড়িয়েছে। তিয়াষা অনেক বুঝিয়ে বলেকয়ে কখনও সখনও ওকে হাসপাতালে পাঠাতে পারলেও একাগ্র ঋষির মতো সেই ধ্যানমগ্ন চিকিৎসকের মূর্তি খুঁজে পায়নি ওর মধ্যে। সব সময় যেন দুশ্চিন্তায় কুঁচকেই থেকেছে কপাল। ঠোঁটের কোণে জীবনের প্রতি তীব্র বিরাগ বিতৃষ্ণা। সে দিন অভিরূপের এক কথায় পিয়াসের ফ্ল্যাট ছেড়ে নেমে এসেছিল তিয়াষা। অভিরূপ ওকে এনে তুলেছিল ওর দমদমের ফ্ল্যাটে, যেটা ফাঁকাই পড়ে থাকে। অত দূর থেকে তিয়াষার পক্ষে অফিস যাতায়াত করাটা বেশ কঠিন ছিল। মেট্রোটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। কিন্তু মেট্রো তিয়াষার একদম পছন্দ নয়। মেট্রোতে উঠলেই দমবন্ধ লাগে ওর। তাই সে মেট্রো অ্যাভয়েড করেই চলে। তবু, অভিরূপের কথায়, ওকে কাছে পাওয়ার জন্য সে সব অসুবিধে তুচ্ছ করেছে অনায়াসে। 

পিয়াসের জন্য খারাপ লাগা ছিল। কিন্তু এই খারাপ লাগাটাকে ঢেকে রেখেছিল ওর উপর তীব্র রাগ। সে দিন সন্ধেয় ওর বিশ্রী আচরণ, অভিরূপের প্রতি আঙুল তুলে অপমানজনক কথাগুলো বার বার মনে করে বুকের তলা থেকে উঁকি মারতে চাওয়া মায়াটাকে গলা টিপে রেখেছিল। অভিরূপকে দেখেও কম অবাক হয়নি তিয়াষা। মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যেই মনস্থির করে ফিরে এসে আবার তিয়াষাকে নিয়ে ফেরা, এটা থেকেই বোঝা যায় পিয়াসের ব্যবহারকে কতখানি গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছিল সে। কিন্তু এখানে এই ফ্ল্যাটে ঢোকার পর থেকেই আর এক বারও পিয়াস সংক্রান্ত একটাও শব্দ উচ্চারণ করেনি সে। তিয়াষা যদিও বা কিছু বলতে গিয়েছে, অভিরূপ থামিয়ে দিয়েছে তাকে। যেন ও রকম কোনও ঘটনাই ঘটেনি কখনও। যেন প্রথম দিন থেকে এটাই ঠিক ছিল যে তিয়াষা অভিরূপের সঙ্গে এই দমদমের ফ্ল্যাটে এক সঙ্গে থাকবে। এর বাইরে তাদের আর কোনও পৃথিবী তার ছিল না কখনও, কোনও দিনও। 

কিন্তু এটাকে কি ঠিক লিভ টুগেদার বলা যায়? অভিরূপ আসে যায়, নিজের ইচ্ছে মতো, সুবিধে মতো। আজ পর্যন্ত কোনও রাতে থাকেনি। সারা দিন থাকলেও, রাতে ফিরে গিয়েছে সল্টলেকের বাড়িতে, সে অনেক রাত হলেও। তিয়াষার মনে প্রশ্নের মেঘ ভেসে আসলেও তা আবার ভেসেই চলে গিয়েছে। ইন ফ্যাক্ট এ সব নিয়ে ভাবার মতো সময় বা মানসিকতা ছিলই না এর মধ্যে। গত ক’দিন ধরে তো শুধুই আজকের দিনটার জন্য প্রতীক্ষা ছিল। আজই অভিরূপের অ্যান্টিসিপেটরি বেলের হিয়ারিং ছিল। তিয়াষার পরিচিত উকিলবাবু যদিও আগে থেকেই ভরসা দিয়ে রেখেছিলেন, তবু চিন্তা যায় না অর্ডার না হওয়া পর্যন্ত। অরুণ সাহাও প্রথম থেকেই এসে হাজির অ্যাসোসিয়েশনের তিন-চার জন সদস্য নিয়ে। ওরা একটা এফিডেভিটও করে জমা দিয়েছে, যাতে অভিরূপের এফিশিয়েন্সি সম্বন্ধে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে পরিষ্কার ভাবে। প্রথমে পিপি-র কাছে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তো বাইরের কোনও তথ্য নেবেন না। শেষে ওরই বুদ্ধিতে আই ও শতপথীকে দিয়ে ওটা কেস ডায়েরিতে ইনক্লুড করানো হল। এত সব কিছুর পরে অবশেষে কিছু ক্ষণ আগেই অর্ডার বেরিয়েছে। কোর্ট অভিরূপকে তার সামাজিক প্রতিষ্ঠা, এত দিনের কাজের ধারা ও সমাজে তার অবদান ইত্যাদি বিবেচনা করে দশ হাজার টাকার বন্ডে জামিন দিয়েছেন। স্বাভাবিক ভাবেই অর্ডার পাশ হয়ে যাওয়ার পরে আনন্দের বান ডেকে গিয়েছে অপেক্ষমাণ সকলের মধ্যে। এমনকি সুগার থাকলেও তিনখানা সন্দেশ খেয়ে আরও একটার জন্য ঝুলোঝুলি করেই চলেছে ডাক্তার অরুণ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে দীর্ঘ দিন ওর জিভ মিষ্টি 

চেখে দেখেনি। 

অরুণের ক্রমাগত বায়না, অনুনয়, উপরোধ অনুরোধ আরও একটা সন্দেশের জন্য, তিয়াষার নিষেধ আর অভিরূপের ইয়ার্কি— সব মিলিয়ে সবার মনের মধ্যে চেপে বসে থাকা অশান্তির কালো মেঘ উড়ে চলে গিয়েছিল এক নিমেষে। জোর করেই আরও একটা মিষ্টি খপ করে তুলে নিয়ে মুখে পুরে দিয়েই হইহই করে চেঁচিয়ে ওঠে অরুণ, “হ্যালো...হ্যালো...আরে, কী কাণ্ড! সুমন... ডক্টর সুমন সেন! অ্যাই... অ্যাই... সু ম অ অ ন ... এই দিকে... এই দিকে... হ্যালো... হ্যালো।’’ সোজা হেঁটে যাওয়া এক ভদ্রলোকের দিকে প্রবল ভাবে হাত নেড়ে নেড়ে ডাকতে থাকে অরুণ।

“কী বলছ? কোথায় সুমন? ও তো এখানে থাকে না! বহু দিন হল মেদিনীপুরে,’’ অভিরূপ বলে।

“হ্যাঁ তাতে কী? ওই তো যাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছ না? দাঁড়াও ডেকে আনি,’’ ছুটে চলে যায় অরুণ।

“আরে? সুমন? তুমি এই কোর্টে চক্কর কাটছ? এমন ব্যস্ত উইক ডে-তে? জঙ্গলমহলের পেশেন্টদের ছেড়ে তুমি এখানে কী করছ?’’

মেয়ের হাত ধরে পাশেই দাঁড়িয়ে রাকা। তার সঙ্গে চোখাচোখি করে হাসে সুমন। জড়িয়ে ধরে অভিরূপ আর অরুণকে, “আর কখনও যাতে এখানে আসতে না হয় সেই ব্যবস্থা করে ফেললাম। কিন্তু তোমরা? তোমরা দুই তারকা এখানে কেন?’’

‘‘আমার ব্যাপারে কিছু পড়োনি খবরের কাগজে?’’ অভিরূপ বলে। সুমন চকিত চিন্তা করে বলে, “হ্যাঁ...হ্যাঁ দেখেছি তো। তুমি আমাদের নাইন্টি টু ব্যাচের মোস্ট প্রেশাস জুয়েল ছিলে। টিভি নিউজ় যা বলেছে তা আমি মরে গেলেও বিশ্বাস করব না।’’

“ঠিকই তো! আমিও সেটাই বলছি ওকে। কিছু ডাক্তার মন্দ, অসৎ তো বটেই। কিন্তু সব্বাই খারাপ নয়। আমরা সবাই জানপ্রাণ লড়িয়ে সততার সঙ্গে কাজ করি। আমাদের পিছনে লেগে কেউ জিততে পারবে না। আজ বেল হয়ে গেল মুখার্জির।’’  অরুণের কথায় খুশি ছড়িয়ে পড়ে সুমনের মুখেও।

“কিন্তু তুমি এখানে কেন? তোমার আবার কী হল?’’ অভিরূপ তাকায় সুমনের দিকে, পাশে দাঁড়ানো রাকা এবং পিয়ার দিকেও। রাকা উজ্জ্বল চোখে তাকায় সুমনের দিকে। 

“মিট মাই ওয়াইফ, রাকা সেন,’’ সুমন বলে। রাকা মিষ্টি হেসে চোখ পাকায়, “নট টিল নাও, টু বি রিনিউড... আবার!”

“হয়ে যাবে, এতটা হয়েছে যখন, ওটুকুও বাদ থাকবে না,’’ সুমনের গলায় আত্মবিশ্বাস আর খুশি। 

অরুণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। অভিরূপ দু’দিকে হাত মেলে কাঁধ ঝাঁকায়, “আরে কী সব সাইন ল্যাংগোয়েজ চলছে, আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। ম্যাডাম রাকা, আপনি তো একটু খুলে বলুন।’’

তিয়াষা অবাক চোখে দেখছিল অভিরূপকে। কলেজের বন্ধুদের পেয়ে যেন কঠিন বাস্তবমুখী মানুষটার মধ্যে থেকে এক অন্য অভিরূপ বেরিয়ে এসেছে। মনে মনে ভাবে তিয়াষা, অভিরূপের সঙ্গে বিয়েটা হয়ে যাক, এক সঙ্গে থাকতে শুরু করি, তার পর আমি আর ওর ভিতরকার এই প্রাণচঞ্চল উচ্ছল মানুষটাকে হারিয়ে যেতে দেব না।

 হ্যাঁ, এ ভাবেই ওর সমস্ত ভাবনাচিন্তা আবর্তিত হয়ে চলেছে আজকাল। অভিরূপকে ছাড়া আর নিজের জীবনের একটা দিনও কল্পনায় আসছে না। এই সারা শরীর মন আকুল করা আর্তির একমাত্র সমাধান আর কী হতে পারে, বিয়ে ছাড়া! তাই মনে মনে নিজেকে অভিরূপের স্ত্রী ভাবতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে তিয়াষা। এই ঝামেলাগুলো মিটে গেলেই রেজিস্ট্রিটা করে ফেলতে হবে। চুমকি তো টাকা পেলেই খুশি, অভিরূপের কাছে যা শুনেছে তাতে চুমকির নিশ্চয়ই ডিভোর্স দিতে কোনও আপত্তি হবে না। অভিরূপও নিশ্চয়ই এলোমেলো জীবনটাকে গুছিয়ে নিতে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি টাকা খরচ করতে কোনও কার্পণ্য করবে না। শুধু মনে মনে ভেবে রাখা কথাগুলো এক বার আলোচনা করে দিন-তারিখ ঠিক করে নিতে হবে। এবং সেটা আজই। আজ যখন আপাত বিপদ থেকে মুক্তি পেয়ে গিয়েছে অভিরূপ, আজই তবে প্ল্যানিংটা সেরে নিতে হবে। নিমেষে কর্তব্যকর্ম ঠিক করে বাস্তবে ফিরে এসে সামনে তাকায় তিয়াষা। সুমন সেন তখন দু’হাতে রাকা এবং পিয়ার কাঁধ জড়িয়ে রেখে নিজের জীবনের পিছনপাতাটা মেলে ধরছে বন্ধুদের কাছে।

“রাকাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজের ভুলে। দেখলাম মেয়েটাকেও রাখতে পারছি না। উত্তাল সমুদ্রে হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করলাম। ঝড়ে ভাঙা ডিঙি নৌকায় সর্বস্বান্ত হতে বসা একলা নাবিকের মতো। মেয়ের কাস্টডি চেয়ে মামলা করেছিলাম। নিজের ভুল বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে একটুও দেরি করিনি। ছুটে গিয়েছি রাকার কাছে। আজ মামলাটা তুলে নিলাম। আগামী মাসের পাঁচ তারিখ আমাদের রেজিস্ট্রিটাও হয়ে যাবে।’’

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন
বাছাই খবর

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন