উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যে চুক্তি হয়, তাকে এ লাইনে বলে— ‘সূর্য চুক্তি’। সোজা কথা, রাত থেকে শুরু করে সূর্যের আলো ফোটা পর্যন্ত গান-বাজনা করে যেতে হবে। এক বার অর্কেস্ট্রা চলছে। ভোর হয়ে আসছে। দর্শক-শ্রোতা (উদ্যোক্তা সহ) সবাই অল্পবিস্তর ‘বিপিনবাবুর কারণসুধা’য় আচ্ছন্ন। কেউ কেউ ত্রিপলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কেউ বা শুধু হাতটা শুয়ে শুয়ে উপরে তুলে নাচাচ্ছে আর জানান দিচ্ছে, তারা এখনও ‘আউট’ হয়নি। স্টেজ ছাড়ার প্ল্যান করছেন শিল্পীরা, তখনই বেশ পরিপাটি ঘুম দিয়ে এক ভদ্রলোক ব্রাশ করতে করতে স্টেজের একেবারে সামনে— দাদা, ‘দেখা না হায় রে, সোচা না হায় রে’-টা হয়ে গেছে? সবাই অবাক। ‘হয়ে গেছে’ বলার পর তাঁর দাবি, আরও এক বার হোক। অর্কেস্ট্রার ম্যানেজার বললেন, সকাল হয়ে গেছে, সূর্যও উঠে গেছে। যারা প্রাণপণ ঘুম দিচ্ছিল ত্রিপলে, তারাই এ বার লাফিয়ে উঠে বলল— ‘দাদা যখন বলেছে, আবার হবে।’ তার পরের ঘটনাটা এক মাত্র মহাভারতের যুদ্ধেই হয়েছিল বোধহয়। ত্রিপলটাকে ধরে যেখান থেকে ভোরের আলোটুকু আসছিল সেটাকেও ঘিরে ফেলে তারা। আরও প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর অর্কেস্ট্রা পার্টির মুক্তি।

নামতে না-দেওয়া খুব চেনা রোগ। এক বার যদি জনপ্রিয় হিন্দি গানের সঙ্গে নাচতে নাচতে নেশা ধরে যায়, (বা নেশার ঘোরে নাচ পেয়ে বসে), তা হলে ‘ঘুরে ফিরে’, ‘চালিয়ে যাও’ চিল্লিয়ে, বাঁশ ভেঙে স্টেজের কাছে চলে এসে, নাছোড় জনতা ডিমান্ড জানায়। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে তাদের মারপিটের ফাঁকেই বারে বারে গায়িকার প্রতি অনুনয়-কাম-আদেশ: ‘ম্যাডাম, দো ঘুঁট-টা আবার হোক!’ এক জন উদ্যোক্তা চিৎকার করে বলেন, ‘আপনি বরং জনগণ-টা ধরুন। সব শান্ত হয়ে যাবে।’

গাঁ-গঞ্জে পুজোর সময় লেগে থাকা এই সব অর্কেস্ট্রার (বা ‘মাচা-প্রোগ্রামের’) তারকারা সারা বছর কেউ মুদিখানা চালান, কেউ এলআইসি এজেন্ট, কারও কি-বোর্ড শেখানোর স্কুল। এক মাঝবয়সি দম্পতিকে অর্কেস্ট্রা লাইনে সবাই দাদা-বউদি নামেই চেনে। এঁদের একটা ছোট্ট ভাতের হোটেল আছে। রান্না করা, ক্যাশ মেলানো— সেখানেই সকাল থেকে রাত। পাশে চিলতে একটা ঘর। সেখানে বর্ষাকাল থেকে কি–বোর্ডে রেওয়াজ দেন ভদ্রলোক। পুজো এলেই, একসঙ্গে বেরিয়ে পড়া।

এক বার, চার–পাঁচ জন অতি উৎসাহী অজস্র দশ টাকার নোট আর বেশ বাছাই করা পচা ডিম জড়ো করেছে। প্রোগ্রাম ভাল লাগলে টাকা ওড়াবে, আর খারাপ লাগলে... প্রোগ্রাম শুরু হয়নি তখনও, সাউন্ড চেক-এর সময়ই তারা নাচতে শুরু করল। কিছুতেই থামছে না। যখন গান হচ্ছে না, তখনও তারা নেচে যাচ্ছে। গান শোনার থেকে তাদের অদ্ভুতদর্শন নাচ দেখার জন্য একটা ভিড় জমে গেছে। উদ্যোক্তারা বাধ্য হয়ে জোর করে তাদের সরিয়ে নিয়ে গেলেন। অনেক ক্ষণ আর দেখা যায়নি। প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার পর দেখা গেল, পুজো মণ্ডপের পিছনে জেনারেটর চলছে, আর তার শব্দে ঠিক একই ভাবে তারা নেচে চলেছে। জেনারেটরের সামনে, হাওয়ায় অনেকগুলো দশ টাকা উড়ছে।

অর্কেস্ট্রা পার্টি অনেক সময়ই ‘সন’ ভাষায় কথা বলে। ‘সন্ধ্যা’ ভাষার মতোই। যারা বলবে তারাই শুধু বুঝবে। ফর্মুলা খুবই সোজা। এই ‘কোড ল্যাংগোয়েজ’-এর নিয়ম হল— শব্দের আগে একটা ‘স’ আর শেষে একটা ‘ন’ বসিয়ে নিতে হবে। আর দ্রুত বলার ফলে অন্য কেউ বুঝে উঠতেও পারবে না। ‘জমাটি গান চাইছে পাবলিক’ এটা নিজেদের মধ্যে বলার সময় বলতে হবে— ‘সজমাটিন সগানন সচাইছেন সপাবলিকন।’ কোথায় জমাতে হবে, কোথায় থামতে হবে, কোথায় উদ্যোক্তাদের ভাবগতিক সুবিধের ঠেকছে না, এই ‘সন’ ভাষায় কথা-চালাচালি করে শিল্পীরা দিব্যি সবার সামনেই আড়াল খুঁজে নেন। এক বার এই রকম ভাষায় আলোচনা চলছে, কী করে স্টেজে কম গান গেয়ে বেশি সময় কাটানো যাবে, হঠাৎ এক উদ্যোক্তা বলে উঠলেন, ‘সচালাকিন সখাটবেন সনান!’ মানে, ‘চালাকি খাটবে না!’ তিনিও এ ভাষাটা জানেন! অর্কেস্ট্রা পার্টি অবাক। উদ্যোক্তা বললেন, তিনি নিজেও এক কালে অর্কেস্ট্রা টিমে ছিলেন।

প্রোগ্রাম চলাকালীন পছন্দের বিভিন্ন গানের রিকোয়েস্ট জানিয়ে অনেক চিরকুট আসতে থাকে। ম্যানেজারের কাছে জমা হয়। সে বার স্টেজে গাইছেন মিস মোনা (এটা অর্কেস্ট্রার সময় তাঁর নাম হয়), একটা বেশ বড় খাম এল— তাতে একটা কার্ড। ম্যানেজার দেখে রেখে দিয়েছিলেন। পরে, খুলে দেখে, কৌতূহলে নাম্বারটায় ফোন করেছিলেন গায়িকা। কথা হল। যেখানেই তাঁর গান থাকে সেখানেই নাকি হাজির হয়ে যায় ছেলেটি। পর পর তিন দিন প্রোগ্রাম থাকলেও বাসে-ট্রেনে ঠিক হাজির হয়ে যায়। তার পর এক দিন সামনাসামনি দেখা। বোঝা গেল, ফোনে বলা সব কথাই একেবারে মিথ্যে। বড়লোক বাবার ছেলেটি গায়িকাকে রাত কাটানোর প্রস্তাব দেয় গান গাওয়ার থেকেও পাঁচ গুণ বেশি টাকায়।

অর্কেস্ট্রার লিড সিংগার যে-মেয়েটি সদ্য কলেজ পেরিয়েছে, তাকে বাড়ি থেকে বলে দেওয়া হয়েছে— আর বেশি দিন এ সব চলবে না। মানে এ বার গান-বাজনা শুধুই ঘরের কোণে, হারমোনিয়ামে। পাত্রপক্ষকে পছন্দ করাতে যেটুকু লাগে আর কী! মেয়েটির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। গান ছেড়ে, অর্কেস্ট্রার টিম ছেড়ে তার পক্ষে থাকা অসম্ভব। তার ওপরে, আগে বন্ধু আর পরে প্রেমিক হয়ে যাওয়া গিটারিস্ট যে ওখানেই! সব রিহার্সাল, গ্রামগঞ্জের শো-গুলো জানে ওদের প্রেমের কথা।

অন্য কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবতেও পারে না সে— এ কথা  বাড়িতে জানিয়ে দেওয়ার পর আরও কড়াকড়ি হয়ে গেল। এ বার প্রোগ্রামে যাওয়াও বন্ধ! সামনে পুজো এগিয়ে আসছে। এক দিন লুকিয়ে রিহার্সালে এসে খুব কান্নাকাটি করল মেয়েটি। প্রেমিক গিটারিস্টও কথা দিল, খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নেবে।

অর্কেস্ট্রার ম্যানেজার মেয়েটির বাড়ি গিয়ে বললেন— এটাই শেষ বার। পুজোটা যে ভাবেই হোক উতরে দিতে হবে। অনেকগুলো শো আছে, মেয়েটি না গাইলে বিরাট লোকসান হয়ে যাবে, এই মেয়েটির গান শুনতেই তো কত লোক কত দূর থেকে আসে বনবাদাড় ঠেঙিয়ে! অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে বাড়িতে রাজি করানো গেল।

মেয়েটিও যেন এক্সট্রা ভাল গাইছে সে বার। বেশ কয়েকটা প্রোগ্রামও হিট। উত্তরবঙ্গের দিকে একটি গ্রামে শো শেষ হওয়ার আগে ম্যানেজার হঠাৎ ঘোষণা করলেন— ‘কেউ চলে যাবেন না, আমাদের তরফ থেকে সামান্য মিষ্টিমুখের আয়োজন করা হয়েছে।’

তখনও গিটার বাজছে, গল্পের কেন্দ্রে থাকা মেয়েটির গলায় ‘বাহোঁ মে চলে আ’। আস্তে আস্তে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন ম্যারেজ রেজিস্ট্রি অফিসার। অর্কেস্ট্রা টিম আর অনেক শ্রোতাকে সাক্ষী রেখে স্টেজেই মালাবদল করে নিল ওরা।

একই গ্রামে একাধিক বার শো করেছে এমন এক দলের কাছ থেকে শোনা গল্প। শো শেষ করে এক বার ফেরার সময়, গ্রামের এক চায়ের দোকানে চা–বিস্কুট খাইয়ে কিছুতেই টাকা নিতে চায়নি অল্পবয়সি এক মহিলা। তখন সে সন্তানসম্ভবা ছিল। টাকা না নিয়ে, গায়ক-গায়িকা-বাজনদারদের সবাইকে ভাল করে খাওয়ালে, যে-সন্তান আসছে, তার মঙ্গল হবে। তখন ভোর। সারা রাত প্রোগ্রাম করে অর্কেস্ট্রা পার্টি ক্লান্ত, তবু অনেক বার বলে বলে ক’টা গান শুনেছিল সে। গলাও মিলিয়েছিল একটু-আধটু।

বছর তিনেক পর একটা জায়গায় প্রোগ্রাম, সেই গ্রামটার ওপর দিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চা-তেষ্টাও পেয়েছে।  অর্কেস্ট্রার অনেকেরই পুরনো কথা মনে পড়ে যায়। গ্রামে ঢোকার মুখে সেই চায়ের দোকানটা কিছুতেই খুঁজে না পেয়ে একে-তাকে জিজ্ঞেস করায়, এক জন জানায়— ওইখানে মেয়েটির বর এখন সেলুন খুলেছে। বাচ্চা হতে গিয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শ্বশুরবাড়ির লোকজন মেয়েটিকে বেধড়ক মারে— পরে মেয়েটি নিজেই সুইসাইড করে। আর সেলুনের মালিক আবার বিয়ে করেছে।

দুর্গাপুজো হলেও জায়গাটা আসলে চণ্ডীতলা। মহালয়ার অমাবস্যা থেকে কালীপুজোর অমাবস্যা পর্যন্ত কোনও না কোনও অনুষ্ঠান চলেই। মণ্ডপ আর শ্মশান খুব কাছাকাছি। সে বার সেখানেই অর্কেস্ট্রার আয়োজন হয়েছে। কলকাতার টিম। স্বাভাবিক ভাবেই আশেপাশের গ্রাম থেকে ভিড় জমেছে বেশ। প্রোগ্রামে আসার আগে সব পুরুষমানুষই দিঘির কাছ থেকে এক বার ঘুরে আসছে। ওখানে চোলাইয়ের ঠেক। অনেক মহিলাও প্রবল ঝগড়া করছে স্বামীর সঙ্গে, এখন থেকেই শুরু করে দিয়েছে বলে। কোনও পুরুষ অবাক হয়ে বলছে, ‘বা রে! আজ যে অরকেস্টা!’

গান শুরু হয়েছে কি হয়নি, একসঙ্গে অনেক ধুলো উড়ে গেল। লাফিয়ে উঠে নাচছে আট থেকে আশি। বাঁশ দিয়ে ঘেরা অন্য দিকে মহিলারাও। আচমকাই শ্মশানের দিকে এগিয়ে আসা একটা ভিড়, আর আলতো কানে আসছে— ‘বল্লো হরি ... হরি বোল ...’

ভদ্রতার খাতিরেই ম্যানেজার গান থামাতে বললেন। বাজনার আওয়াজ থামতেই এ বার স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে হরি বোল। সঙ্গে খোল-করতাল। শবযাত্রা।

জনা তিরিশেক দর্শক এ সবের মধ্যেও গান থামল কেন তাই নিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে। কেউ গোল হয়ে ঘুরে নেচে পড়ে যাচ্ছে, আবার উঠছে। বাচ্চারা তাকে দেখে হাততালি দিচ্ছে। শবযাত্রা একেবারে সামনাসামনি আসার পর এক জন আচমকাই বলে উঠল— ‘ধুত্তোর ওই ফাংশনটাই ভাল হচ্ছে... এরা ফাঁকি দিয়ে পয়সা নেবে... চল চল... ’ মুহূর্তের মধ্যে একটা বড় জটলা শ্মশানের দিকে খোল-করতালের সঙ্গে টলতে টলতে নাচতে নাচতে চলে গেল।

 

banerjeeriksundar@gmail.com