মানুষই নাম দিয়েছে ‘ঈশ্বরের নিজের দেশ’। কেরলের প্রকৃতিকে ঈশ্বর যেন সাজিয়েছেন নিজের আনন্দে। পাহাড় থেকে নেমে নদী এখানে আপন খেয়ালে প্রবাহিত হয়। মানুষও ঘর বাঁধে, ক্রমে শুরু করে ধ্বংসের খেলা। গাছ কাটে, পাহাড়ে খাদান করে। নদী থেকে তোলে বালি, যত্রতত্র তৈরি করে ঘরবাড়ি। ফল— ভূমি ধস। তার সঙ্গে এ বারের প্রবল বর্ষা। দুয়ে মিলে ভয়াবহ বন্যা এল কেরলে।

এই রাজ্যেরই কোঝিকোড় দিয়ে বয়ে গেছে ইরুভাঞ্জিপুজ্জা নদী, মিশেছে চালিয়ার নদীর সঙ্গে। ক’দিন আগে, ৯ ও ১৪ আগস্ট নদীবিজ্ঞানীরা দেখলেন, ধস নেমেছে নদীর বুকে! সরলরেখার মতো দেখতে নদীটা হঠাৎ দু’ধারায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছে! আর নতুন নিচু অঞ্চলের প্লাবনপথ পেয়ে নদী মেতে উঠেছে বন্যায়। পাল্টে গিয়েছে নদীর শরীর।                     

নদীর এ হেন রূপান্তর ধরা পড়েছিল কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্বের অধ্যাপক এস এ শ্চুম-এর চোখেও। সকালে হাঁটা তাঁর বরাবরের অভ্যেস। নদীর পাড়ের রাস্তাটা তাঁর বড় প্রিয়। সে দিন হাঁটতে হাঁটতে দেখলেন, রাস্তার উল্টো দিকে, নদীর অন্য পাড়ে এক দল মানুষ মাটি কেটে চলেছে পাড়ের পাশ দিয়েই। আমল দিলেন না শ্চুম। তাঁর মাথায় তখন কলেজের পড়ানো, নিজের লেখালেখি নিয়ে চিন্তা।

বর্ষা এল। নদী ভরে উঠল কানায় কানায়। ছাতা মাথায় দিয়ে শ্চুম চললেন কলেজের পথে, নদীর পাড়ের রাস্তা ধরে। আজ নদীটার দিকে অনেক ক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। অ্যানাব্রাঞ্চিং চ্যানেল-পেলিও চ্যানেল-ড্রেনেজ ডেনসিটি, শব্দগুলো বিড়বিড় করলেন। তার পর পা বাড়ালেন কলেজের দিকে।

বর্ষা শেষে পাড়ের সেই রাস্তা ধরে কলেজ যাওয়ার পথে এক দিন হঠাৎ শ্চুমের চোখে পড়ল নদীর অদ্ভুত পরিবর্তন। অনেক দিন আগে বেশ কিছু মানুষ নদীর পাড়ে যেখানটায় মাটি কাটছিল, সেখানেই নদীটা অনেকটা বাঁক নিয়ে সরে গেছে। রাস্তার পাড় বরাবর জেগে উঠেছে চর। আগের নদীটার সঙ্গে এই নদীর মিল নেই। বিষয়টা নাড়া দিল শ্চুমকে। মাথায় ভিড় করে এল অনেক প্রশ্ন। শুরু হল পড়াশোনা, গবেষণা।

১৯৭৭ সালে শ্চুম প্রকাশ করলেন তাঁর তত্ত্ব— ‘রিভার মেটামরফসিস’ বা ‘নদীর রূপান্তর’। নদীও তার রূপ বদল করে। এই পরিবর্তন করতে প্রকৃতি কখনও নদীকে প্ররোচিত করে। কখনও বা মানুষের করা কাজ, ‘আনথ্রপজেনিক অ্যাক্টিভিটি’ নদীকে বাধ্য করে রূপান্তরিত হতে। এই রূপান্তর নদীর পুরো শরীর জুড়ে হয়, এমনটা নয়। হয়তো কিছুটা অংশে।

নদীর এই রূপান্তর বহু বার ঘটেছে বাংলাতে, এমনকি শ্চুমের ‘নদীর রূপান্তর’ তত্ত্ব প্রকাশেরও বহু আগে। বাংলার মেঠো মানুষেরা গালভরা কোনও নাম দিতে পারেনি। তাই তাদের ভাবনাগুলো ছড়িয়ে পড়তে পারেনি পৃথিবী জুড়ে।

সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি, কৃষ্ণনগরের উপকণ্ঠে জলঙ্গী নদী থেকে বেরিয়ে একটা নদী কৃষ্ণনগরের পশ্চিম দিয়ে দক্ষিণ অভিমুখে প্রবাহিত হয়ে যাত্রাপুর গ্রামের কাছে দ্বিধারায় ভাগ হয়। একটি ধারা জয়পুর, জালালখালি, ধর্মদা, বাতকুল্লা গ্রাম হয়ে মামজোয়ান গ্রামের কাছে গিয়ে দক্ষিণবাহিনী হয়। অন্য ধারাটি যাত্রাপুর বেতনা প্রভৃতি গ্রামের মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়ে কিছুটা দক্ষিণে বাঁক নিয়ে মামজোয়ানের কাছে আগের ধারার সঙ্গে মিলিত হয়। এই যুগ্ম নদীস্রোত হরধামের উত্তর দিয়ে চাকদহের কাছে গঙ্গার (ভাগীরথী) সঙ্গে মিলিত হত। এই নদীটার নাম হল অঞ্জনা।

কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ি ছিল অঞ্জনার ধারে। অঞ্জনা থেকে পরিখা কেটে চারধারে বেড় দেওয়া হয়েছিল রাজবাড়ির সুরক্ষার জন্য। কিন্তু আনন্দে বয়ে চলা নদীর জীবনে অভিশাপ হয়ে দাঁড়াল এক যবন সেনাপতি। রাজা রুদ্ররায়ের রাজত্বকালে (১৬৮৩-৯৪) সেই যবন সেনাপতি নৌকা নিয়ে খিড়কির ঘাটে উপস্থিত হয়। প্রহরীরা তাকে নৌকা লাগাতে নিষেধ করে, কিন্তু যবনেরা তাতে কর্ণপাত করে না। এই নিয়েই বিবাদ, পরে যুদ্ধ। এর পরেই রাজা রুদ্ররায় অঞ্জনার উৎসমুখকে জলঙ্গী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

তার পর অনেকটা সময় চলে গেছে। রুদ্ররায়ের প্রপৌত্র রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সিংহাসনে অভিষিক্ত (১৭২৮-১৭৮২) হলেন। হরধাম থেকে শিবপুরে প্রায়ই যেতেন গঙ্গাস্নানে। শিবপুরের কাছেই ছিল গঙ্গা। তাই কৃষ্ণচন্দ্র স্নানের সুবিধার্থে হরধাম থেকে শিবপুর পর্যন্ত গঙ্গা (বা ভাগীরথী) থেকে একটা খাল কেটে অঞ্জনার সঙ্গে জুড়ে দেন। ফলে সৃষ্টি হয় তিনটে মোহনা। অঞ্জনার মোহনার রূপ পাল্টে যায়। রূপান্তর ঘটে নদীর নীচের দিকের অংশে।

এরই মধ্যে মহারাষ্ট্র থেকে বর্গিদের আক্রমণ শুরু হয়েছে। বর্গিদের হাত থেকে রাজধানী বাঁচাতে রাজা ঠিক করলেন, রাজধানী স্থানান্তরিত করতে হবে। কৃষ্ণনগর থেকে ছয় ক্রোশ দূরে ইছামতী নদীর কাছে একটি জায়গায় চলে গেল রাজধানী। জায়গাটা ছিল ঘন অরণ্যময়, জলবেষ্টিত। রাজা জায়গাটা বনশূন্য করে নগর স্থাপন করেন। দেওয়ান রঘুনন্দন বিচক্ষণ ব্যক্তি, ভাবছিলেন প্রাকৃতিক উপায়েও কী ভাবে নবনির্মিত নগরের সুরক্ষা প্রদান করা যায়। তাঁর পরামর্শ মতো রাজা নতুন নগরকে ঘিরে কঙ্কণের মতো পরিখা নির্মাণ করালেন। নতুন নগরে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রাজপ্রাসাদ ও শিবমন্দির স্থাপন করেন। শিবঠাকুরের আবাস হিসাবে নতুন রাজধানীর নাম হল শিবনিবাস। আর কঙ্কণের আকারে শিবনিবাস নগরকে ঘিরে থাকা জলস্রোতের নাম হল কঙ্কণা নদী।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্র পূর্ব দিকে একশো হাত পরিমাণ একটি খাল কেটে কঙ্কণা নদীকে ইছামতীর সঙ্গে জুড়ে দেন। আর পশ্চিমে প্রায় তিন মাইল আর একটি খাল কেটে হাঁসখালির উত্তর দিকে অঞ্জনা নদীর সঙ্গে মিলিয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে ইছামতীর জল পেয়ে শিবনিবাস থেকে চাকদহের গঙ্গা (ভাগীরথী) পর্যন্ত জলধারা পুষ্ট হয়ে ওঠে। এই নতুন জলধারার নাম হয় চূর্ণী। অঞ্জনা নদী তার ঊর্ধ্বাংশের পরিবর্তন ঘটিয়ে নব কলেবর তৈরি করে। নতুন নামে পরিচিত হয় তার শরীরের এক অংশ।

এ বার উত্তরবঙ্গের কথায় আসা যাক। সময়টা ৬৩০ খ্রিস্টাব্দ। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ঘুরে ঘুরে দেখছেন ভারতবর্ষকে। উত্তরের পথ ধরে যাচ্ছেন, পথে পড়ল তিস্তা নদী। তিনি দেখলেন তিস্তা নদীর তিন শাখাকে। পুবে করতোয়া, মধ্যে আত্রাই বা আত্রেয়ী আর পশ্চিমে পুনর্ভবা। আত্রাই এসে মিশত গঙ্গা নদীতে।

১৫৫০ সালে জ্যাও-ডি-ব্যারোস ও কাঁতেই-দ্য-ভিনেল নামে দুজন ফরাসি পরিব্রাজক বলেন, বাংলার উত্তর থেকে দক্ষিণে একটিমাত্র বড় নদী। এর নাম ‘কাওর’। চলছে কামতা রাজ্যের ভেতর দিয়ে। এটি আসলে করতোয়া নদী। ১৭৭৯ সালে জেমস রেনেলের অঙ্কিত মানচিত্রে দেখা যায়, তিস্তা ও করতোয়া একসঙ্গে প্রথমে গঙ্গায় ও তার পরে সমুদ্রে পড়ত। ১৭৮৭ সালের বন্যার পর তিস্তার গতিপথ পাল্টে গেল। গঙ্গাকে ছেড়ে তিস্তা মিলিত হল ব্রহ্মপুত্রে। আর এই সময়েই আর একটি নদীর জন্ম হল। তার নাম ছোট রায়ডাক। কী ভাবে? তা বুঝতে গেলে ওই অঞ্চলের সেচের ইতিহাসকে বুঝতে হবে।

কোচবিহার জেলায় যে অঞ্চল দিয়ে রায়ডাক বয়ে গেছে, তা প্রধানত সমতল ভূমি। আর দক্ষিণ-পূর্বের অংশ সামান্য ঢালু। এই অঞ্চল নতুন পলি দ্বারা গঠিত। এই মাটি খুবই উর্বর আর চাষের জন্য যথেষ্ট উপযোগী। উর্বর, বন্যাপ্রবণ এই অঞ্চলে আমাদের পিতৃপুরুষেরা বন্যার জলকে ব্যবহার করেই সেচের কাজ করতেন। সেচ বিজ্ঞানী উইলিয়াম উইলকক্স সাহেব এই পদ্ধতিটিকে বলেছিলেন ‘প্লাবন সেচ’ বা ‘ওভারফ্লো ইরিগেশন’ পদ্ধতি।

উত্তরবঙ্গে নদীর জলকে ব্যবহার করার একটি প্রাচীন সেচ পদ্ধতি ছিল। তার নাম ‘জামপৈ’। সেচের জল পাওয়ার জন্য নদীর বুকে মাটি ও পাথর দিয়ে বাঁধ দেওয়া হয়। বাঁধগুলোর উচ্চতা হত কোমর সমান। আর দেখতে হত উটের পিঠের কুঁজের মতো। নদীর জলস্তর উঁচু হয়ে উঠলে সেই জল বাঁধের ঠিক উপর থেকে খাল কেটে বহু দূরের গ্রামে নিয়ে যাওয়া হত। খালের উৎসমুখটা হত বিশাল চওড়া। খাল যত দূরের দিকে যেত, তত সে সঙ্কীর্ণ হয়ে যেত। এই খালগুলোকেই বলা হত জামপৈ।

অতীত কালে এমনই এক জামপৈ কাটিয়েছিলেন আমাদেরই পিতৃপুরুষেরা, তিব্বত-ভুটান সীমান্তে চোমল হরি পর্বতের হিমবাহ থেকে নেমে আসা ওয়াং চু-তে। ভুটানের মানুষেরা নদীকে ‘চু’ বলে। পশ্চিমবঙ্গের সমতল ভূমিতে পড়ে এই নদীরই নাম হয়েছে রায়ডাক। ১৭৮৭ সালের বন্যার পর দেখা গেল, রায়ডাক নদী থেকে কাটানো এক জামপৈ আর একটা নদী হয়ে গেছে। পরবর্তী কালে এই নদীটার নাম হয় ছোট রায়ডাক। বড় রায়ডাক থেকে বেরিয়ে কিছুটা পূর্ব দিকে বেঁকে ছোট রায়ডাক নদী মিলিত হয়েছে সঙ্কোশ নদীর সঙ্গে। মানুষের সৃষ্টি করা একটা খাল প্রাকৃতিক কারণে একটা নদীর শাখা নদীতে পরিণত হয়েছে। এও নদীর রূপান্তর।

ভারত তখন ব্রিটিশদের অধীন। রাজা সুখময় রায় দেড় লক্ষ টাকা ব্যয়ে উলুবেড়িয়া থেকে পুরী পর্যন্ত নির্মাণ করালেন ওড়িশা ট্রাঙ্ক রোড। রাস্তা তৈরি হল বটে, কিন্তু পরে তার আর সংস্কার হল না। ক্রমেই তা চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে উঠল। এই অবস্থা দেখে তদানীন্তন কালেক্টর বেইলী সাহেব প্রস্তাব করলেন, একটা জলপথ নির্মাণ করা হোক। কেননা ট্রাঙ্ক রোডটি যাতায়াতের নিতান্তই অনুপযুক্ত, কৃষিজীবীরা তাদের উৎপাদিত সামগ্রী বাজারে পৌঁছে দিতে পারছে না। তা হলে আর্থিক উন্নতি হবে কী ভাবে!

এই সমস্যার সমাধানে অগ্রণী হলেন ইস্ট ইন্ডিয়া ইরিগেশন অ্যান্ড ক্যানাল কোম্পানি। জলপথে যাতায়াতের সুবাদে মাশুল আদায় করবে, এই ছিল তাদের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য। উলুবেড়িয়া থেকে সোজা পশ্চিমে খাল কেটে দামোদর নদীতে ফেলা হল। তার পর দামোদর থেকে আবার সোজা পশ্চিমে যুক্ত করা হল রূপনারায়ণে। সেখান থেকে মেদিনীপুর শহরের কাছে কাঁসাই বা কংসাবতী নদী পর্যন্ত খাল কেটে সংযুক্ত করে, নির্মাণ করা হল লক গেট।

১৮৭০ সাল নাগাদ চালু হল এই জলপথ। তাকে কেন্দ্র করে বসল বহু হাট-বাজার, গঞ্জ। এই জলপথ দিয়ে অল্প সময়ে মেদিনীপুর থেকে কলকাতা পৌঁছনোর ব্যবস্থা হল। কিন্তু বাদ সাধল প্রকৃতি। রূপনারায়ণের খামখেয়ালিপনার কাছে সাহেবদের কৃৎকৌশল আর পরিকল্পনা হার মানল। রূপনারায়ণের পূর্ব পাড়ে কাঁটাপুকুরের কাছে খালের মুখে বিরাট বড় চর পড়ল। কমল নাব্যতা। বন্ধ হল নৌ-চলাচল। ফের পাল্টে গেল নদীর রূপ, গতিপথ। আবারও ঘটল নদীর রূপান্তর।

এই রকম কত ঘটনার সাক্ষী এই বাংলা ও তার স্বভাবচঞ্চল নদনদী। খেয়ালখুশির তালে তারা মেতে থাকে। এক পাড় ভাঙে, অন্য পাড় গড়ে। কখনও নিজে পাল্টে যায়, কখনও তাকে পাল্টাতে বাধ্য করে মানুষের কাজকর্ম। কেরলের মতো বাঁধভাঙা বন্যায় কখনও সে ভাসিয়ে নিয়ে যায় জনপদ। তবু আবারও উঠে দাঁড়ায় মানুষের জীবন, বইতে থাকে নদীর মতো, নদীকে ছুঁয়েই।