বছর পাঁচেক আগের একটা দুপুর হঠাৎ সব পাল্টে দিল। পুজো কিংবা নববর্ষের ঠিক আগে সেটা। বচ্ছরকার রুটিন গৃহ সাফাই-অভিযানে সল্টলেকের বাড়িটার দোতলায় লফ্‌টে উঠে পুরনো জিনিস ঝাড়াই-বাছাই করছিলেন দেবায়ন সেন। বাতিল জিনিসের ভিড়ে আর একটু হলে চালান হচ্ছিল সেই গোলাকার চাকতিটিও। মলিন কভার-বন্দি কবেকার লংপ্লেয়িং রেকর্ডের গায়ে মায়ের গত জন্মের ছবি। 

মায়ের ছবিই তো! ‘‘এমন টকটকে লালরঙা ওয়েস্টার্ন ড্রেসে মাকে কখনও দেখিনি আগে! রূপা নামটাও বড় হরফে লেখা পাশে।’’ সঙ্গে আর একটি স্পর্ধিত শব্দবন্ধ ডিস্কো জ্যাজ়। অ্যালবামটির সুর-স্রষ্টা আশিস খান। কিংবদন্তি সরোদ-শিল্পী উস্তাদ আলি আকবর খানের পুত্র। দেবায়ন রেকর্ডখানা হাতে মায়ের দিকে অবাক চোখে তাকান!  

এমন অ্যালবাম তুমি রেকর্ড করেছিলে, আমায় বলনি পর্যন্ত... 

আমারই কী ছাই মনে ছিল না কি!

মানে কী? এত বড় কাণ্ড…

বিয়ের আগের গোপন চিঠি বেরিয়ে পড়ার মতোই হালকা রক্তিমাভা ছুঁয়ে যায় মধ্য ষাটের রূপা বিশ্বাসকে। পর ক্ষণেই চোয়াল শক্ত। 

তুই ও-সব ফেলে দে... কী হবেই বা মনে রেখে! 

কিন্তু তত ক্ষণে খুলে গিয়েছে অতীতের সিন্দুক। মা যে গান গায়, তা  অজানা ছিল না তরুণ তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী দেবায়নের। শিয়রে ঘুমপাড়ানি মামুলি সুর বা ছাদে বাগান করার ফাঁকে মায়ের একান্তে গুনগুনটুকু কোন ছেলেই বা বাড়তি গুরুত্ব দেয়! টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার বাবার আপিসের ফাংশনে মা কদাচিৎ কী গাইছেন, পুঁচকেবেলার ঝাপসা স্মৃতিতেও ধুলোর পরত জমেছিল বহুদিন। এর বাইরে বড়দের আড্ডায় দু-একটা গজ়ল বা বাংলা আধুনিক! কিংবা সাবেক হারমোনিয়ামটা টেনে মায়ের গলা সাধা! আর পাঁচটা গানবাজনাপ্রবণ আটপৌরে বাঙালি গৃহিনীর যা হয় আর কী! 

মায়ের এই সুরচর্চাটুকুর আড়ালে জীবনের কোন বিস্মৃত চোর-কুঠুরির ন্যাপথালিনের গন্ধ লেগে আছে, তা আবিষ্কার করার কথা দেবায়ন অন্তত স্বপ্নেও ভাবেননি। 

বাড়িতে রেকর্ডপ্লেয়ার নেই। মায়ের পুরনো টেপ রেকর্ডারের সঙ্গী পরিত্যক্ত ক্যাসেটের ভিড়ে নামপরিচয়হীন একটা ক্যাসেট হাতড়ে বেরোল ছেলের তাড়নায়। আরও কিছুদিন বাদে! যা চালাতেই জেগে উঠছে এক তরুণী কণ্ঠের সোনালি দুঃখ…

ডিস্কো জ্যাজ় শব্দটা তখনও খায় না মাথায় দেয় জানেন না হতভম্ব দেবায়ন। ডিস্কো দিওয়ানে-খ্যাত নাজ়িয়া হাসান উন্মাদনা তো একেলে যুবার জন্মেরও আগের কাহিনি। মা শুধু বলেছিলেন, সেটা নাজ়িয়ার যুগ! আমার গানগুলো চলেনি তেমন...

কিন্তু কবে, কোথায়, কী ভাবে প্রশ্নগুলো ছেলেকে তাড়া করছে। মা তো এই নিয়ে দশটা কথা বললে দয়া করে দু-একটার জবাব দেয়। কাকে জিজ্ঞেস করবে? হঠাৎ ফুসফুসের ক্যানসার ধরা পড়ার পরে বাবা উদয়ন সেনও তত দিনে ধরাছোঁয়ার সীমানা পেরিয়ে গিয়েছেন।  

মায়ের রেকর্ডখানায় সাকুল্যে তিনখানা গান। কোমরে দোলা লাগানো ছন্দে ক্লাবডান্সের মেজাজ। কিন্তু প্রধানত বাংলা লিরিক। নিখাদ ভাল ছেলে গৃহগতপ্রাণ দেবায়নকে ‘মামা’জ় বয়’ বলাই যায়। কালে-ভদ্রে সেক্টর ফাইভের নিশি-নিলয় দেখেছেন। মা মানে তো গোটা স্কুলজীবন জুড়ে বিজ্ঞান বিষয়ের হোমওয়র্কের কড়া পাহারাদার। একদা বাগুইআটির স্কুলে বায়োলজির শিক্ষিকা রূপা এখনও বাড়িতে ছাত্র পড়ান। ফ্রেম-বন্দি সুতোর নকশা থেকে ছাদের বনসাই সতেজ হয় তাঁর আদরের ছোঁয়ায়। মা এমন গান গাইতে পারেন দেবায়ন কখনও ভাবেনইনি। 

দীর্ঘ জ্যাজ়ধর্মী মিউজ়িকের উপরে ভেসে থাকে অমোঘ তরুণী স্বর। আদুরে ন্যাকামির মিশেলে তাতে মূর্ত শনিবারের রাতপাখিদের আসর। গানের কথা সোজাসাপটা, ‘আজ শনিবার, নাচবে চলো আজ’ কিংবা ‘মজা, ভারী মজা…ডিস্কো নাচতে’! 

মৃত্যুর হিমঘর থেকে উঠে এসে সে গান কখনও দুনিয়া কাঁপাবে তা রূপা বিশ্বাসেরও কল্পনার বাইরে ছিল। 

১৯৮২-র পুজোয় এক ঢাল কালো চুল, দিঘল চোখের এক কন্যের কাছে চাপা পড়ে গিয়েছিল সেই কণ্ঠ। সদ্য আবির্ভূত পাকিস্তানি পপ-তারকা নাজ়িয়া হাসান তখন গোটা উপমহাদেশের হৃৎস্পন্দন। কলেজ স্ট্রিটের মেগাফোন কোম্পানি হারের আগেই হেরে বসেছিল নাজ়িয়ার কাছে। রেকর্ড করার এক বছরেরও বাদে নানা টালবাহানার পরে তেমন প্রচার ছাড়াই প্রকাশিত হয় সেই অ্যালবাম। তখনকার জনবিরল সল্টলেকে তাঁর বাড়িতে বসে রূপা পুজোয় শুনেওছিলেন, পাশের প্যান্ডেলে নিজের গান বাজছে। নিচু তারে বাঁধা স্বভাবগত মর্যাদাবোধ, আত্মপ্রচারে তত উৎসাহ পায়নি। নাজ়িয়ার ‘দিল বোলে বুম বুম’-এর মদির হাতছানির পাশে ক্রমেই ফিকে হয়ে গিয়েছিল বাঙালিনির কণ্ঠ। 

তবু এত বছর বাদে এক অন্য মাকে আবিষ্কারের ঘোর কাটতে চায় না দেবায়নের চোখে। পুরনো অ্যালবামের সুরভির খোঁজে অধুনা বিস্মৃতপ্রায় সে-দিনের রেকর্ডিং কোম্পানিতে বার কয়েক হানা দিয়েছেন পুত্র। বিশেষ লাভ হয়নি। কয়েক মাস আগে এক রাতে ‘রূপা ডিস্কো জ্যাজ়’ লিখে গুগ্‌লে খোঁজ করতেই দেবায়ন যা দেখলেন, তাতে চক্ষু চড়কগাছ! চার দশক আগে যা বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে গিয়েছিল, সেই বিস্মৃত গান ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে উঠে এসেছে। মায়ের সেই রেকর্ড নতুন করে রিলিজ় হচ্ছে ইউরোপে-আমেরিকায়। 

এখানেই শেষ নয়, নাকউঁচু সব ওয়েবসাইটের সঙ্গীত-সমালোচক, ব্লগাররাও উদ্বেল, রেকর্ড কভারে কে সেই টিংটিঙে ‘সুখি রোটি’ সুন্দরী? যাঁর ঝরঝরে গলার মাদকতায় কোমরে দোলা লাগে, সেই ‘হিডেন জুয়েল’ বা গোপন রত্নটি কি এখনও বেঁচে আছেন? দেবায়ন, তাঁর ছোট মামা চন্দনের দুই মেয়ে বিলেত-প্রবাসী অ্যানেকা রিমি বিশ্বাস, সানচিয়া রিমা বিশ্বাসরাও অতঃপর সেই নেট-উন্মাদনায় ভাসলেন! ‘রূপা’কে নিয়ে জনৈক ব্লগার নেট রেবের জল্পনার নীচে অ্যানেকা ফুট কাটেন, রূপাকে কি এখনও খুঁজছেন? রূপা বেঁচে কি না, জেনে কী করবেন মশাই? 

পরের গল্প, শুধুই সামনে তাকানোর! রূপার খোঁজে সঙ্গীত-রসিকেরা নতুন করে হামলে পড়েছেন। সল্টলেকের রাস্তায় মুখোমুখি পথচলতি আগন্তুক তাঁকে না-ই চিনুক, সে-দিনের তরুণী কণ্ঠের টানে বিদগ্ধ ব্লগার-বিলিতি কাগজের প্রতিবেদকেরা ‘ভিডিয়ো কল’ করতে চাইছেন। ‘আজ শনিবার’ গানটা না কি ইউটিউবে দশ লক্ষ বার বেজেছে। রূপার ঘরের লোকেরাও জেনে উঠতে পারেননি, ২০১২-য় ‘মিস লাভলি’ বলে একটি হিন্দি ছবিতেও পুরনো গানগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল। শিল্পী নিজে কখনও নাইটক্লাব-ডিস্কোথেকের ত্রিসীমানায় ঘেঁষেননি। অচিন দেশের ডিজে-রা নাইটক্লাবে সেই গান বাজাচ্ছেন। 

বাঙালির এক ‘হারানো’ নাজ়িয়া হাসানের জন্য আক্ষেপটাও এই ভাবে ঘনিয়ে উঠছে। 

নাজ়িয়ার মতোই রূপার গানের রেকর্ডিংয়ের সলতে-পাকানোও সাত সাগরের পারে। বিলেতের পার্টিতে চিত্রপরিচালক ফিরোজ় খানের সঙ্গে নাজ়িয়ার আলাপ একটি ইতিহাসের মুহূর্ত। ‘কুরবানি’ ছবিতে জ়িনত আমনের লিপে নাজ়িয়ার ‘আপ জ্যায়সে কোই’ একটি অধ্যায়ের ঘোষণা করল। এ দেশের মিউজ়িক ইন্ডাস্ট্রিতে সে গানের একই গোত্রের পূর্বসূরি থাক না থাক, ছন্দে-ছন্দে তালে-তালে ক্লাব ডান্সের গানের আঙ্গিক আশ্চর্য উজ্জ্বল ভাবে নিজেকে মেলে ধরল।  

রূপার গানের রেকর্ডিং এর কিছু দিনের মধ্যে আচমকাই, কানাডার ক্যালগেরিতে প্রবাসী দাদার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে! ভবিষ্যতের গ্র্যামিজয়ী, সরোদ-শিল্পী আশিস খান রূপার দাদা তিলককুমার বিশ্বাসের বন্ধু, প্রতিবেশী। আশিসকে রূপা ভাইফোঁটা দিতেন। তিনিই প্রধান পুরুষ কলকাতার মেয়ের ডিস্কো গান রেকর্ডিংয়ের নেপথ্যে।

দেবায়ন ভাবেন, মা যে কোনও দিন কানাডায় বড় মামার কাছে বেড়াতে গিয়েছিলেন সেটাই তো জানা ছিল না! রূপার বিয়েরও আগের গল্প। স্বাধীনতা-উত্তর দেশের রাশভারী ম্যাজিস্ট্রেটের কন্যার ডিস্কো গানের রেকর্ডিং নিতান্তই সাধারণ ঘটনা ছিল না সেই ’৮০-র দশকে। বাড়িতে গানের খোলা হাওয়া বইলেও বাবার চাকরিসূত্রে মফস্সলের স্কুল-কলেজে পড়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, ক্লাব-পার্টি সংসর্গ বা খুচরো প্রেমও অধরাই ছিল রূপার জীবনে। ছোট থেকে নিয়ম করে মা সবিতা বিশ্বাস, পরে লালবাগের উস্তাদ আলি মির্জ়ার কাছে রেওয়াজ করেছেন। কলকাতায় সুধীন দাশগুপ্তের কাছে গান শিখলেও ডিস্কো গানটানের জগৎ নিয়ে ধারণাই ছিল না। পরে বরের অফিসের অনুষ্ঠানে গাইলেও পাছে স্বামীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়, ‘ডিস্কো’ গাইবার সাহস হয়নি রূপার।  

১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বরে কানাডায় আশিস খানের সান্নিধ্যে তবু অন্য কিছু ঘটছিল। রূপা যে আকাশবাণী কলকাতায় একটু-আধটু গান করেন, গর্বিত দাদার কল্যাণে সে খবর আগেই চাউর হয়ে যায়। ফলে, পৌঁছনোর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ক্যালগেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের বরিস রুবিকেন হলে গোটা সন্ধ্যা সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে গাইতে হল। প্রধানত, গীত-গজ়লের কনসার্ট। উদ্যোক্তা ছিল স্থানীয় পাকিস্তান স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন। টিকিট কেটে গান শুনতে আসা উপমহাদেশের হাজারখানেক প্রবাসী দর্শকের ভিড়ে আশিস খান ও তাঁর ভাই তবলা-শিল্পী প্রাণেশও হাজির ছিলেন। 

দাদার বাড়িতে এর পরে ঘন-ঘন গানবাজনার চাঁদের হাট! সরোদ-তবলায় আশিস-প্রাণেশের সঙ্গে গলা মেলাতেন রূপা। গিটারসঙ্গী আশিসের ছাত্র ডন পোপও। যিনি এক বছরের মধ্যে আশিসের ফিউশন সঙ্গীতের দলের সঙ্গে ভারত-সফরে আসেন! এক সঙ্গে স্থানীয় টিভি-তে অনুষ্ঠানের পরেই আশিস আর্জি জানালেন, রূপার ‘ভয়েসটা পাওয়ারফুল’! কাজে লাগাতে চাই! গান রেকর্ড করাব।

‘‘আমিও তখন শিল্পী হব বলে উৎসাহে ফুটছি! এক ফোঁটা ভয় করেনি আমার।’’— ২০১৯-এর ছিমছাম ড্রয়িংরুমে বসে গল্প বলেন রূপা। আশিস খানকে অবশ্য রূপার বাবা রথীন্দ্রকুমার বিশ্বাসের কাছে অনুমতি নিতে হয়েছিল। 

‘‘তখন আমি শুনে শুনেই সব গান তুলতে পারি! আমার গুরু সুধীন দাশগুপ্তও আমায় নোটেশন দিতেন না। পরে বুঝি, আমি শুনে-শুনে তুলতে পারি বলেই উনি চাইতেন না, সেই স্বতঃস্ফূর্ততা মার খাক!’’ 

ক্যালগেরিতে রূপার দাদার বাড়িতে রূপার সামনেই পর পর গানে সুর বসানো হয়েছিল। আশিসের স্ত্রী সরোজ গানের কথা জোগালেন! ‘‘আর আমি পটাপট তুলে ফেললাম।’’— রূপার কণ্ঠে উত্তেজনা। 

স্টুডিয়োয় রেকর্ডিংয়ের সময়েও অবশ্য রূপা জানতেন না ঠিক কী হতে চলেছে। ট্র্যাকে একটু সরোদের আভাস, তবলা আর গিটার। মিক্সিং পরে ঘটেছিল। ডিস্কো ঘরানাতেও প্রাচ্য-পাশ্চাত্যকে মেলাতে চেয়েছিলেন আশিস। ডিস্কোসুলভ সিন্থেসাইজ়ারের মোচড়, ড্রামসের কাঁপুনি তো থাকেই! সরোদের জমিতে গিটারের সংলাপ বা তবলার উঁকিঝুঁকি  আলাদা মাত্রা জোড়ে। রেকর্ডিংয়ের পৃষ্ঠপোষক রূপার দাদারাই। ‘‘কোন কথাটা কী ভাবে বলতে হবে আশিসদা আমার উপরেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমি নিজেই বুঝে নিই, কোথায় কতটুকু ন্যাকামি করতে হবে!’’— মুখ টিপে হাসেন রূপা। 

রেকর্ডিং হওয়ার পরে চটজলদি অ্যালবামের কভার ফটোর জন্য পোশাকও কিনতে হল। ‘‘কানাডার মেয়েদের তুলনায় আমি তো ছোট্টখাট্টো। জানেন (হাসি) দোকানের কিড্‌স সেকশনে আমার ড্রেসটা পাওয়া গেল!’’ রূপার হাঁটু অবধি লাল পোশাকের সেই ছবিটাই পরে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে। 

‘‘কয়েক বছর হল, মা ওটা কাকে দিয়ে দিয়েছে।’’— দেবায়নের গলায় অভিমান। 

মাকে ‘আবিষ্কারে’র পরের যুদ্ধটা অবশ্য অত সহজে ছাড়তে রাজি নন পুত্র। জার্মান সংস্থা ‘ওভিউলার’ সবার আগে গান তিনটি ইউ টিউবে ছড়িয়ে দিয়েছিল। ডিস্কো ঘরানার চরম মোক্ষ বা হোলি গ্রেল-তকমা পাওয়া অ্যালবামটি রিলিজ় করতে আরও অনেকেই তোড়জোড় করছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিল্পীর দাবিটুকু পুত্র ঘোষণা করেছেন। একটি অ্যাপে রূপার গানের সঙ্গে অন্য কারও ছবির বিভ্রান্তি দূর করতেও নামতে হয়েছে। দেবায়নের তৎপরতায় আমেরিকার মর্যাদাসম্পন্ন নিউমেরো গ্রুপের সঙ্গেও নতুন চুক্তি হয়েছে।  এই প্রথম গানের জন্য সামান্য কিছু অগ্রিম টাকা এসেছে কণ্ঠশিল্পীর অ্যাকাউন্টে। 

তবে নব্য ডিস্কো জ্যাজ় তারকা বাঙালিনিকে নিয়ে এখনও হতাশ তাঁর পুত্র। মার্চের শেষে নিউমেরো গ্রুপের রিলিজ়ের দু’ঘণ্টায় হাজারটা এলপি ‘সোল্ড আউট’! ‘‘রাতবিরেতে নেট সার্চ করে দেখে আমি উত্তেজনায় কাঁপছি, কিন্তু মায়ের থোড়াই কেয়ার! ডাকলেও ভোঁসভোঁসিয়ে ঘুমোচ্ছে।’’

হঠাৎ যশের ঠেলায় রূপা সত্যিই লোভের অশালীন স্পর্শে দাগ লাগাতে রাজি নন। ‘‘যা পাচ্ছি তা তো ভালবাসার ইন্টারেস্ট! তবে যা ছেড়ে গিয়েছি, আমি সেই অতীতের ছায়া হয়ে থাকতে রাজি নই!’’ 

কানাডায় রেকর্ডিংয়ের এক বছর বাদে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ডিস্কো জ্যাজ় অ্যালবাম নাজ়িয়া-ঝড়ে মাথা তুলতে পারেনি। এর মধ্যেই গুরু সুধীন দাশগুপ্তের প্রয়াণ! শিল্পী রূপার ডানা মেলার আর একটা সম্ভাবনাও মুখ থুবড়ে পড়ল। আশিস খানের সঙ্গে রেকর্ডিংয়ের সহ-শিল্পী গিটারিস্ট ডন পোপ, জন জনস্টনেরা কলকাতার বাড়িতে এসে থেকে গিয়েছেন। পারভিন সুলতানা থেকে শুরু করে নামী-দামি বহু শিল্পীর সঙ্গেই যোগাযোগ ছিল। তবু রূপার গান-চর্চা আর কোনও বৃহত্তর দিগন্ত খুঁজে পায়নি। সম্বন্ধ করে বিয়ে, সন্তান, সংসার এক অন্য পৃথিবী! ২০১৯-এর রূপা হাসেন, ‘‘যা পেয়েছি, সেটাও কম কিছু নয়! জীবন আমায় সত্যিই ভরিয়ে রেখেছে।’’

এর পাশে নাজ়িয়া হাসানের ট্র্যাজিক জীবন এক দমকা ঝোড়ো হাওয়া। কে বলবে, তিনি নেই আজ ১৭ বছর। গানের দুনিয়ায় করাচি-কন্যের জেটগতির উড়ান, অসুখী দাম্পত্য, ক্যানসারের ধাক্কায় স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলেই নিভে যাওয়া মাত্র মধ্য-তিরিশে। এই উপমহাদেশে যৌবনের চিরবেদনার সুরটি হয়ে তবু বেঁচে আছেন নাজ়িয়া। জীবনের দেওয়া-নেওয়া, কেড়ে নেওয়া-ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যালেন্স শিটে কোথায় যেন নাজ়িয়া এবং রূপার অঙ্ক মিলে গিয়েছে। 

নাজ়িয়ার অকালে থমকে যাওয়া জীবন, প্রতিভার মস্ত অপূর্ণতার সামনে সান্ত্বনা খোঁজা বেয়াড়া ঠাট্টার মতো বেঁধে। ইন্টারনেটের জমানায় শেষ বিচারে রূপার স্বীকৃতি হয়তো ধরনের পোয়েটিক জাস্টিস! দেবায়নের সঙ্গে জোট বেঁধে রূপার দুই ভাইঝি অ্যানেকা, সানচিয়ারাই তাঁর ইনস্টাগ্রাম-ফেসবুক সামলাচ্ছেন। বিস্মৃত শিল্পীর খোঁজে মেসেজ করলেই তাঁদের রাশভারী জবাব: হ্যাঁ, রূপা বলছি, আমার ম্যানেজার আপনার সঙ্গে কথা বলে নেবেন। 

মায়ের তরুণীবেলার স্ক্র্যাপবুক, ছবির অ্যালবাম গুছিয়ে সেই স্টারগিরির জনসংযোগ এখন ‘ম্যানেজার’ দেবায়নের দায়িত্ব। অগস্টে দ্বিতীয় দফায় রূপার অ্যালবাম প্রকাশ করছে নিউমেরো। সল্টলেকের বাড়িতে পুত্রের ফের নির্ঘুম রাত কাটানোর কাউন্টডাউন!