শোনা যায় ম্যাক্সিম গোর্কিকে কোনও এক পত্রিকা-সম্পাদক অনুরোধ করেছিলেন তাঁর আত্মজীবনী লেখার জন্য। গোর্কি নাকি সেই অনুরোধ রেখেছিলেন এবং মাত্র এই ক’টি লাইন লিখে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন: ‘১৮৬৮ – জন্ম, নিঝনি নোভোগোরোদ-এ। ১৮৭৮ – জনৈক মুচির সহকারী। ১৮৭৯ – এক শিল্পীর কাছে অ্যাপ্রেন্টিস। সেখানে দেবদেবীর ছবি আঁকত। ১৮৮০ – ভোলগা নদীর স্টিমারের কেবিন-বয় (স্টিমারের রাঁধুনির কাছে পড়তে শেখে)। ১৮৮৩ – একটা বিস্কুট ফ্যাক্টরির কর্মী। ১৮৮৪ – মুটের কাজ। ১৮৮৫ – আত্মহত্যার চেষ্টা। ১৮৮৯ – রেলকর্মী। ১৮৯০ – অ্যাডভোকেটের ক্লার্ক (এখানে লিখতে শিখেছে)। ১৮৯১ – লবণ-কলের মেশিন-চালক; শেষের দিকে ভ্যাগাবন্ড। ১৮৯২ – প্রথম গল্প রচনা: মকর চুদ্রা (Makar Chudra) এবং খ্যাতি ও বিত্ত।’ বিষয়টা বেশ মজার সন্দেহ নেই। কিন্তু এর পিছনে একটা তিক্তরসের আভাস পাওয়া যায় না?

তাই হয়তো আলেক্সি মাক্সিমোভিচ পেশকভ নাম পালটে তিনি হয়ে গেলেন ম্যাক্সিম গোর্কি এবং আজও পর্যন্ত রয়েও গেলেন তা-ই। রুশ শব্দ ‘ম্যাক্সিম’-এর অর্থ তেতো। প্রসঙ্গত বলি, পূর্বকথিত সম্পাদক মশাই কবে কখন তাঁকে আত্মজীবনী লিখতে অনুরোধ করেছিলেন, জানা নেই। মনে হয় ১৯২৩ সালের আগে। কারণ ১৯১৩ সালে শুরু করে দশটি বছরের শেষে গোর্কি তাঁর তিন খণ্ডের আত্মজীবনী রচনা সম্পূর্ণ করেন। আর তাই নিয়ে তিন পর্বের একটি অসামান্য ছবি নির্মাণ করেছিলেন বিখ্যাত রুশ চলচ্চিত্রকার মার্ক দনস্কয়— ‘চাইল্ডহুড অব গোর্কি’ (১৯৩৮), ‘মাই অ্যাপ্রেন্টিসশিপ’ (১৯৩৯) এবং ‘মাই ইউনিভার্সিটিজ’ (১৯৪০)। অনেকে এই চলচ্চিত্রত্রয়কে শ্রেষ্ঠ জীবনীচিত্র বলে স্বীকৃতিও দিয়েছেন।

আমাদের কৈশোরে ‘আইভান হো’, ‘রবিনসন ক্রুসো’, ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’ প্রভৃতি বিদেশি সাহিত্য ছিল প্রধান আকর্ষণ। সেগুলো পড়ে আমাদের অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মন দারুণ আনন্দ পেত। তার বাইরে আবার অন্য এক ধরনের বই আমাদের কিশোর মনকে নাড়া দিত, ভাবাত— যেমন, আমেরিকার ক্রীতদাসদের নিয়ে লেখা হ্যারিয়েট স্টো-র ‘আংকল টম’স কেবিন’, বা ম্যাক্সিম গোর্কির উপন্যাস ‘মা’। ইতিহাস বা রাজনীতি সম্পর্কে অ-আ-ক-খ জ্ঞান না থাকলেও একটি পরাধীন দেশের কিশোর হিসেবে কেন জানি না এই বইগুলো পড়ে কষ্ট পেতাম, ভিতরে একটা ক্রোধ জন্ম নিত। শোনা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন নাকি এই হ্যারিয়েটকে দেখে এক বার বলেছিলেন, তুমিই বোধহয় সেই ছোট্ট মেয়ে যে একখানা বই লিখে যুদ্ধ বাধিয়ে বসে আছ। লিংকন আমেরিকার গৃহযুদ্ধের কথা বলতে চেয়েছিলেন। আর আমরা তো জানি দুই খণ্ডে লেখা ‘মা’ কী ভাবে বিপ্লবের আগমনি বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিল সারা রাশিয়ায়। আমাদের উৎপল দত্ত এ‌ই উপন্যাসের একটি অংশকে নিয়ে লিখেছিলেন ‘মে দিবস’ নাটক। গোর্কি সাক্ষী ছিলেন ১৯০২ সালের মে দিবসে সরমোভো-র শ্রমিকদের মিছিলের উপর পুলিশের নির্মম আক্রমণ কিংবা ১৯০৫ সালের ৯ জানুয়ারি পিটার্সবুর্গের উইন্টার প্যালেসের সামনে শ্রমিক-মিছিলের উপর জার-পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণের ঘটনার। একটা সময়ে এই ‘মে দিবস’ নাটকটি বাংলায় বহুল-অভিনীত ছিল। অন্য দিকে, বহু দিন পর তাঁর একটি সাক্ষাৎকারে উৎপল দত্ত বলছেন: ‘একেবারে সঠিক মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী চিন্তা প্রয়োগ করলে আমার মনে হয়, ম্যাক্সিম গোর্কি নাট্যকার হিসেবে শ্রমিকশ্রেণির নাট্যকার নন। জীবনে কোনও দিন তাঁর নাটকে শ্রমিকশ্রেণির কথা ফোটেনি। তাঁর নাটকে— ধরুন ‘নীচের মহল’-এ, ‘লোয়ার ডেপথ্‌স্‌’-এ যারা এসেছে— ভিখিরি, চোর, ডাকাত, গুন্ডা— এরা বেকার। এরা মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে লুম্পেন প্রলেতারিয়েত মাত্র— এবং একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক শ্রেণি। ‘এনিমিজ’-এ যখন তিনি শ্রমিকশ্রেণি আনেন তখনও আনেন— মানে কী বলব, এক্কেবারে রোমান্টিসাইজ করে— যেটা পাতিবুর্জোয়া রোমান্টিসিজম্‌! শ্রমিকশ্রেণির মুখপাত্র হিসেবে ম্যাক্সিম গর্কি ব্যর্থ— নাট্যকার ম্যাক্সিম গর্কি। ঔপন্যাসিক ম্যাক্সিম গর্কি, ‘মা’ উপন্যাসের লেখক ম্যাক্সিম গর্কি নিশ্চয়ই শ্রমিকশ্রেণির কথা বলেছেন।’

গোর্কি সম্পর্কে উৎপল দত্তের এই রায় নিয়ে আমরা কথা বলতে চাই না। তবে আমরা লক্ষ করব যে তিনি নাটককার গোর্কির সঙ্গে তুলনা টেনেছেন নাটককার ব্রেখট-এর এবং আবারও রায় দিয়েছেন যে, ‘বের্টোল্ট ব্রেখট সত্যিকারের শ্রমিক শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করেছেন’। কথাটার মধ্যে হয়তো বা সত্যতা আছে। তাই হয়তো ব্রেখট বেছে নিলেন গোর্কির ‘মা’কে, এবং নিজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং রীতিতে তার পুনর্নির্মাণ করলেন নাট্যরূপে। এ রকম তিনি একাধিক বার করেছেন, যেমন শেক্সপিয়ারের ‘কোরিওলেনাস’ নিয়ে— যে নাটকটা কলকাতায় মঞ্চস্থ করেছিলেন তরুণ বয়সের সুমন মুখোপাধ্যায়। আসলে ব্রেখট ‘মা’-কে নিয়ে করেছিলেনটা কী? জার শাসনের স্বৈরতান্ত্রিক নিপীড়ন-উৎপীড়ন সবই ছিল উপন্যাসটিতে। ছিল শ্রমিকদের মর্যাদাবোধ অধিকারবোধের অভাব। গোর্কি ছিলেন অনুভূতিশীল এক সাহিত্যস্রষ্টা, যিনি বলশেভিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ। ছিল তাঁর তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ শক্তি এবং প্রকাশক্ষমতা। অভিজ্ঞতা ছিল শ্রমিকজীবন সম্পর্কে, উপলব্ধি করতেন পাভেল ও তার শ্রমিক সহযোদ্ধাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, বিস্ময় ও শ্রদ্ধার সঙ্গে তুলে ধরেছেন ভীতসন্ত্রস্ত অতি-সাধারণ এক মা’র উত্তরণের ব্যক্তিগত প্রয়াস। কিন্তু মার্ক্সবাদী তত্ত্ব, কৌশল বা প্রয়োগরীতি আয়ত্ত করে কী ভাবে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে হবে এক জন শ্রমিককে, যা তাকে চালিত করবে শৃঙ্খলমুক্তির কঠিন পথে— সে রকম কোনও হদিশ ছিল না সেই উপন্যাসে। ঘটনা, তথ্য, চরিত্র যা ছিল মূল উপন্যাসে একটি বিশেষ বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তা নতুন ভাবে বিন্যন্ত করলেন ব্রেখট, তাঁর একান্ত নিজস্ব রীতিতে বেশ কয়েকটি গান রচনা করলেন, যা ছিল তাঁর লেহ্‌রস্টুক বা শিক্ষামূলক নাট্যধারার বৈশিষ্ট্য। যার পরিচয় আমরা পাই ‘সমাধান’ (ডী মাশনামে) বা ‘ব্যতিক্রম’ (একসেপশন অ্যান্ড দ্য রুল) নাটকদু’টিতে। এখানে উল্লেখ করতে হয় ‘মা’-র ব্রেখট-কৃত নাট্যরূপের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন চিত্তরঞ্জন ঘোষ এবং তার গানগুলির অনুবাদ শঙ্খ ঘোষের। অরুণ মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় নাটকটি দেখেওছিলাম এক সময়। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয়, (১) চা-বাগানের পটভূমিতে নির্মিত একটি ছবিতে উৎপল দত্ত এক সংগ্রামী ভারতীয় ‘মা’-কে খুঁজে পেয়েছিলেন, যদিও চলচ্চিত্র হিসেবে একেবারেই উতরোয়নি সেটি; (২) উপন্যাস অবলম্বনে রচিত বাংলা ‘মা’ নাটকে মা’র চরিত্রে অভিনয় করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন শৌভিক সাংস্কৃতিক চক্র-এর নির্দেশক-অভিনেতা গৌতম মুখোপাধ্যায়।

মাতৃরূপেণ: পুদভকিন পরিচালিত ‘মাদার’ (১৯২৬) ছবির দৃশ্য

মাঝে মাঝে মনে হয়, উৎপল দত্ত নামক মানুষটি যেন ছিলেন বৈপরীত্যের প্রতিমূর্তি। নাটককার গোর্কির পূর্বোক্ত মূল্যায়ন সত্ত্বেও, আমাদের সকলেরই জানা যে, তাঁর নাট্যদল লিটল থিয়েটার গ্রুপ উমানাথ ভট্টাচার্য অনূদিত ‘লোয়ার ডেপথস’ নাটকের রূপান্তর ‘নীচের মহল’ সাফল্যের সঙ্গে  অভিনয় করেছিলেন বহু রজনী এবং সেই প্রযোজনা নিয়ে রাশিয়া সফরও করে এসেছিলেন— নিউক্যাসলে কয়লা নিয়ে যাওয়ার মতোই ব্যাপার! ১৯৮৭-তে নাটকটি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলছেন: পুঁজিবাদের যখন পচন শুরু হয়েছে এবং দিগ্বিদিকে তার দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, তখন তার সাংস্কৃতিক বহিঃপ্রকাশ ঘটছে ব্যক্তিতান্ত্রিকতায়, ব্যক্তিকে মহৎ করে দেখানোয়— ক্রমশ অপরাধ এবং দুর্বৃত্তায়নকে মহান প্রতিপন্ন করে সেই সংস্কৃতি এক সংকীর্ণতার কানাগলিতে পৌঁছে যাচ্ছে। পুঁজিবাদী জগতের সাহিত্য বা চলচ্চিত্র প্রতিদিন জন্ম দিচ্ছে অপরাধজগতের ‘হিরো’দের, তাদের অপরাধকে ‘মহান ট্রাজিডি’ হিসেবে তুলে ধরে। ‘নীচের মহল’ পুঁজিবাদী সমাজের সেই নরক, যে নরক সৃষ্টি করে অপরাধীদের। তাঁর মতে এ ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ করি একটি দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া— একটা মানুষকে বেকারত্বের আবর্জনাস্তূপে নিক্ষেপ করো, তাকে লুম্পেন করে তোলো, তার মুখের ওপর সমস্ত দরজা বন্ধ করে দাও, একটামাত্র পথই হাটখোলা রাখো— নেশাভাঙ এবং নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পথ। ‘নীচের মহল’-এ আঁকা হয়েছে একটি রূপক ছবি— পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অমানবিকতা, বা মুখ্যত মানবতা-বিরোধিতার ছবি। আবার একটা সময় আমরা দেখতে পাই তর্কবাগীশ বাঙালি জপেনদা তাঁর সৃষ্টিকর্তাকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলছেন: ‘গর্কির বিপ্লবী রোমান্টিসিজমের তত্ত্বটা পড়েছিস? যাহা বাস্তবে ঘটে কেবল তাহাই নাটকের বিষয় নহে— যাহা ঘটিবে, ঘটা উচিত তাহাও বাস্তব। সুতরাং তাহা নাটকের বিষয়। গর্কি একে বলেন বাস্তবের সম্প্রসারণ।’ বাংলার রাজনৈতিক থিয়েটারের প্রবক্তা কি গোর্কির মূল্যায়নে কিঞ্চিৎ দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন?

এখানে ‘লোয়ার ডেপথস’ বা ‘নীচের মহল’ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। আমার ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির দিনগুলিতে কিছু অসাধারণ ছবি দেখার সুযোগ ঘটেছিল। তার মধ্যে একটি ছিল কিংবদন্তি ফরাসি পরিচালক জাঁ রেনোয়া-র ‘লে বা ফঁ’ (১৯৩৬)। অন্যটি আকিরা কুরোসাওয়া-র ‘দনজোকো’ (১৯৫৭)। দু’টোই গোর্কির ‘লোয়ার ডেপথস’ অবলম্বনে নির্মিত। রেনোয়া রুশ পটভূমিতেই রেখেছেন তাঁর কাহিনিকে। কারণ হয়তোবা ইউরোপে তখন ফ্যাসিবাদের অভ্যুত্থান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি। কিন্তু অনেক সমালোচক বলেছেন, ঠিক সেই কারণেই এবং বিন্যাসের দিক থেকে মূল নাট্যকাহিনি থেকে অনেকটা সরে আসার ফলে গোর্কির কুলিশ-কর্কশ বাস্তবতা এই ছবিতে অনুপস্থিত। তবে আমরা জানি যে রেনোয়া ইতালীয় নব্য-বাস্তবতার বাইরে এক শিল্পিত বাস্তবতা সৃষ্টি করতে চেয়েছেন তাঁর ছবিগুলিতে— পণ্ডিতরা যে বিশেষ ধারাটির নাম দিয়েছেন পোয়েটিক রিয়েলিজম। সেখানে কুরোসাওয়া হয়তো মূলের নাট্যধর্ম আত্মস্থ করে চিত্রভাষার এক নতুন মাত্রা নির্মাণ করেছিলেন। নাটকের মঞ্চ-নির্দেশের প্রথম বাক্যটি ছিল— ‘এ সেলার রিজেমব্লিং এ কেভ’। কী ভাবে শুরু হয় ছবি? ক্যামেরা একটি নাতি-উচ্চ পাহাড়ে অবস্থিত মন্দির থেকে প্যান করতে শুরু করে, ৩৬০ ডিগ্রি প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসে ওই মন্দিরেই।

প্রদক্ষিণকালে ক্যামেরা পাহাড়টির উচ্চতা অনুযায়ী অল্প ওঠানামাও করে। মন্দিরে ফিরে আসার পর ক্যামেরা একটু নিচুতে নামে, দেখা যায় একটি লোক ঢালু জায়গা দিয়ে একটি ঠেলাগাড়ি গড়িয়ে নিয়ে গিয়ে নীচে জঞ্জাল ফেলছে। অর্থাৎ এই হচ্ছে সেই নিচুতলা যেখানে শহরের জঞ্জাল জমা হয়। হ্যাঁ, এখানেই একটা চত্বরে একটা বড় মাচার ওপর খোপ খোপ করে ভাগ করে নিয়ে বাস করে সমাজের জঞ্জালবৎ কিছু মানুষ। ক্যামেরা কিন্তু তার পর আর বেরোয় না এই জায়গা ছেড়ে। ক্লোজ-আপও ব্যবহার করেন না কুরোসাওয়া। নাটকে মোট চারটি দৃশ্য। নাটকটা হাতে নিয়ে ছবিটা দেখতে গেলে বোঝা যাবে, দৃশ্যগুলি যেখানে শেষ হয়েছে, ছবিতে ঠিক সেই জায়গায়ই পরদা অন্ধকার করে দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষণ পর আবার পরবর্তী দৃশ্য পরদায় ভেসে ওঠে। এ রকম তিন বার হয়। একেবারে শেষেও অন্ধকার করা হয়। খানিক ক্ষণ নীরবতার পর ওই অন্ধকারের মধ্যেই খট করে একটা শুকনো কেঠো আওয়াজ, ছবি শেষ হল, ঠিক যেমন ‘নো-থিয়েটারের পালা শেষ হয়। আসলে ‘নো’ থিয়েটার কুরোসাওয়ার বড় প্রিয়, তাঁর বিদ্যালয় হল ‘নো’ থিয়েটারের ঐতিহ্য।

আজকের আলোচনার শেষ পর্বে গোর্কির সাহিত্য বা নাটকভিত্তিক চলচ্চিত্রের বিষয়টি নিয়ে খানিকটা আলোচনা করা হল এই কারণে যে জাঁ রেনোঁয়া, ভ্‌সেভোলোড পুদভকিন (১৯২৬-এর নির্বাক সোভিয়েট ছবি ‘মা’-র স্রষ্টা), বের্টোল্ট ব্রেখট এবং আকিরা কুরোসাওয়ার মতো বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার বা নাটককার, এবং আমাদের দেশের এক অগ্রগণ্য নাট্যস্রষ্টা গোর্কির সাহিত্যকর্মের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, বা তাঁর কাজকে কতটা ক্লাসিকের মর্যাদা দিয়েছিলেন সেটা বুঝে নেওয়ার জন্য। ব্যক্তি মানুষ হিসেবেও চমকপ্রদ ছিলেন তিনি। জারের শাসনকালে অভিনেত্রী-বান্ধবীকে নিয়ে বিদেশে আশ্রয়। ১৯১৭ সালে হিংসার মাধ্যমে ক্ষমতা দখল পছন্দ করেননি, পরে মানিয়ে নিয়েছিলেন। পার্টি-সদস্য না হয়েও আজীবন বলশেভিকদের সমর্থন এবং অর্থসাহায্য করে গিয়েছেন। সোভিয়েট কর্মকর্তাদের খবরদারি এড়াতে আবারও স্বেচ্ছা-নির্বাসনে ইতালি চলে যাওয়া। লেনিনের সঙ্গে প্রচণ্ড মতানৈক্য, লেনিনের সম্পর্কে যা-নয়-তাই সমালোচনা। কয়েক বার নাম উঠলেও নোবেল পুরস্কার পেলেন না। সাহিত্যস্রষ্টা হিসেবে প্রশংসিত এবং সমালোচিতও। সোভিয়েট রাজত্বে একের পর এক শ্রেষ্ঠ সম্মানে সম্মানিত। স্তালিনের ডাকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন, বছর কয়েক পরেই মৃত্যু — কারণ এখনও রহস্যাবৃত। কিন্তু ‘ঝড়ের পাখি’ হিসেবে স্বদেশে-বিদেশে আজও সমাদৃত, আজও প্রাসঙ্গিক তিনি।