পূর্বানুবৃত্তি: সন্ধেবেলা কালীপুর চিড়িয়াখানার ভিতরে হাঁটতে হাঁটতে অনেক চিন্তা মাথায় জড়ো হয় অনিকেতের। সে এখানকার অধিকর্তা। সাদা শাড়ি পরা এক জন বৌ ও তার বাচ্চা মেয়েকে দেখে ভয়ে চমকে উঠে অনিকেত। পরক্ষণে বুঝতে পারে, আলোআঁধারিতে এ তার চোখের ভুল। এর মধ্যে চিড়িয়াখানার বড়বাবু এসে জানায়, পোর্টের পুলিশ অফিসারের স্ত্রীর ব্যাগ ছিনতাই হয়ে গিয়েছে। 

 

ভদ্রমহিলাকে বোঝানোর পরে তার জিনিসগুলো কী করে উদ্ধার করা যায় সেই ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে অনিকেত। পুলিশকে ডেকে আন্দাজ করে ভিড়ের জায়গাগুলো দেখায়। সিসি টিভির ফুটেজ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে অনেকটা সময় যায়। ও জানে, সিসি টিভির ছবি থেকে চুরি ধরা সম্ভব নয়। তবে চেনা চোর পকেটমারদের মুখ পুলিশ চেনে। চুরি করেই তারা এলাকা ছাড়ার চেষ্টা করে, ফলে ঢোকা-বেরোনোর পথের ফুটেজে নজর দিলে পুলিশ অনেক সময় সাফল্য পেতেও পারে। চুরির জিনিস অবশেষে পাওয়া গিয়েছে। বোধহয় আইনরক্ষকের হোমমিনিস্ট্রিকে চটাতে লোকাল ভাইরা সাহস করেনি!

গাছপালার ফাঁকে আকাশের দিকে তাকিয়ে অনিকেত সোনার থালার মতো চাঁদটাকে দেখতে পায়। একই সঙ্গে কিছুটা এলোমেলো দমকা হাওয়ায় ঝরঝর করে ছাতিমফুল ওর গায়ে ঝরে পড়ে। ছাতিমফুলের তীব্র গন্ধে যেন দম বন্ধ হয়ে আসে অনিকেতের। কয়েক বছর আগের এক প্রাণঘাতী অসুখে ওর দুটো ফুসফুসই অর্ধেক জবাব দিয়েছে, তাই হয়তো এই গন্ধ যেন শ্বাসনালীতে সুচ ফোটানোর অনুভূতি জাগায়। একই সঙ্গে ওর খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিয়ে বাঁচতে ইচ্ছে করে, আবার সারাক্ষণ বুকে বয়ে বেড়ানো আত্মহননের চিন্তাও ওর মস্তিষ্ককে ছেয়ে ফেলে। 

তিরিশ বছর আগে এমনই এক শারদীয় প্রাকপূর্ণিমা সন্ধেতে এক ছাতিমগাছের ছায়ায় বিশেষ এক মুহূর্তে প্রথমে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল। বেঁচে থাকার ইচ্ছে তখন তলানিতে। কিন্তু পরক্ষণেই ভেসে উঠেছিল অসুস্থ বয়স্ক বাবা-মার মুখ। কানে বেজেছিল মায়ের কাঁপা-কাঁপা কান্নাভেজা গলা, ‘‘শেষ বয়সে তুইই তো বুড়োবুড়ির সম্বল, শেষের দিনগুলো আমাদের দেখবি তো বাবা!’’ মরা আর হয়ে ওঠেনি, তবে ঠিকঠাক বাঁচার মতো বাঁচতেও পারেনি অনিকেত। দুরারোগ্য এক মনের অসুখকে বুকে নিয়ে যেন যুগ-যুগান্তর পার করে দিয়েছে ও। যদিও সেই তীব্র মানসিক যন্ত্রণাও ক্রমশ ফিকে হয়ে এসেছে। টাইম ইজ় দ্য বেস্ট হিলার। বাবা বলতেন, ‘‘জানিস তো, ব্যাচেলর্স লিভ লাইক কিংস বাট ডাই লাইক ডগস। এখন বুঝছিস না, পরে ভুগতে হবে।’’ জীবদ্দশায় ছেলেকে সংসারী করে তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জন্য তাঁরা চেষ্টা করেছিলেন। অনিকেতও চেষ্টা করেছে অতীতের নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে। এক সময় বাবা-মা পরপারে গিয়ে শান্তি পেয়েছেন। আর অনিকেত? যতটা না সংসারী তার চেয়ে বেশি কাজ নিয়ে জড়িয়ে থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছে। 

আজকাল আয়ু যত ফুরিয়ে আসছে, ততই কথাগুলো বেশি করে মনে পড়ছে অনিকেতের। বনে জঙ্গলে অনেকগুলো বছর কাটিয়ে দেওয়ার সময় শরীরের দিকে কখনওই নজর দেয়নি সে। এখন এই পাঁচিলঘেরা ঊনপঞ্চাশ একরের চিড়িয়াখানায় বসে যাওয়ার পরে মজ্জায় মজ্জায় টের পাচ্ছে শরীরের প্রতিশোধ নেওয়া। শুধু ফুসফুসের আর হাড়ের রোগ নয়, সঙ্গী রক্তাল্পতাও জুটেছে। তা-ও তো কাজের সুবাদে সারা দিনে ওকে সাত-আট কিলোমিটার হাঁটতে হয় সকাল-বিকালে। অনিকেত পরিষ্কার বুঝতে পারছে, অবসরের পরে রোগাক্রান্ত, মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে কাটানো কতটা দুষ্কর হয়ে উঠবে 

ওর কাছে।

 আচমকা আবার একটা দমকা হাওয়ায় আরও কিছু ছাতিমফুল ঝরে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখ দিয়ে অজান্তেই প্রিয় কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার লাইনগুলো বেরিয়ে এল— ‘চাই, চাই, আজও চাই তোমারে কেবলই।’ 

 

বেশ দূরে একটা টর্চের আলো দুলতে দুলতে আসছে, কেউ ওকে খুঁজতে জোরপায়ে ওর এ দিকেই আসছে বুঝে গলাটা খাদে নামিয়ে আনে অনিকেত। গাছের ছায়ায় ঘেরা জায়গাটার প্রান্তে আসার পর লোকটার অবয়ব পরিষ্কার হতে অনিকেত চিনতে পারে, রামাশ্রয় রাম আসছে ওকেই খঁুজতে। একটা তিক্ত হাসি ফুটে ওঠে অনিকেতের মুখে। সত্যিই তো, ওর অনন্ত ক্ষতির নিমিত্তস্বরূপাকে কী নামে জপবে ও? সঠিক অর্থে সে তো নামহীনাই !

সামনে এসে রামাশ্রয় ফুঁপিয়ে ওঠে, হাঁপ-ধরা গলায় বলে, ‘‘স্যর, মনে হচ্ছে শঙ্করের এ বার যাওয়ার সময় হয়েচে। একটু যাবেন না কি শেষ সময়টায়? বাচ্ছাটা বড্ড কষ্ট পাচ্চে কয়মাস ধরে। ডাক্তারবাবুকে কবে থেকে বলছি ইনজেকশন দিয়ে ওর যন্ত্রণা শেষ করে দ্যান, তা উনি খালি আপনার কথা বলে, ‘বড়কর্তার অর্ডার নেই!’ এ বার সবচেয়ে ওপরওলার অর্ডার চলে এসেচে। শঙ্করের কষ্ট দেখতে হবেনে!’’ হঠাৎ করে অসময়ে সিংহগুলোর ডাকাডাকির কারণটা অনিকেতের কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরিবারের প্রবীণের শেষযাত্রার খবরটা বাকি সিংহ-সিংহীরা ওদের পশুচেতনা দিয়ে ধরে ফেলেছে। তাই ভরসন্ধ্যায় এত হাঁকডাক। শঙ্কর এখানকার মৃত্যুপথযাত্রী বুড়ো এশিয়ান লায়নটার নাম। রামাশ্রয়ের খুব ন্যাওটা বছর পঁচিশের সিংহটা। ওর যখন চাকরিতে সদ্য হাতেখড়ি, বাবার সঙ্গে খাঁচায় খাঁচায় ঘুরে তখনই শঙ্করের জন্ম। ক্রমে দু’জনেই বড় হয়েছে, উমার সঙ্গে জুটি বেঁধে শঙ্করের কয়েকটা ছানাপোনাও হয়েছে। রামাশ্রয়ও তিন ছেলেমেয়ের বাবা। তবু আজও ও শঙ্করকে নিজের বড়ছেলের মতোই দেখে। 

গত মাস ছয়েক ধরে সিংহটা জরা-বার্ধক্যের বিভিন্ন রোগে ভুগছে। অকারণে খাঁচার লোহার শিকে ধাক্কা দিয়ে কপাল বা নাক ফাটিয়ে ফেলে, খাওয়াদাওয়া মাঝে মাঝেই বন্ধ করে দেয়, রামাশ্রয় বাবা-বাছা বলে বিফের বদলে পর্ক, পর্কের বদলে চিকেন স্টু খাইয়ে ওর রুচি ফেরানোর চেষ্টা করে। ইদানীং কৈলাসের শরীরে এখানে-সেখানে ঘা, ডাক্তাররা বলছেন এগুলো অনেকটা বেডসোরের মতো, শেষের সূত্রপাত যে হতে চলেছে তার ইঙ্গিত। চিড়িয়াখানার নিয়মও কিন্তু অনুকম্পামৃত্যু অনুমোদন করে না। এখানে জীবজন্তুরা জন্মায় অথবা বদলাবদলির সূত্রে বা দান হিসাবে অন্য চিড়িয়াখানা থেকে আসে। আবার এখান থেকে তাদের নিষ্ক্রমণ হতে পারে দু’ভাবে। হয় অন্য জ়ু-তে বদলি কিংবা মৃত্যু! তবে মানুষদের মতোই ওদের ক্ষেত্রেও বার্ধক্যকালীন দীর্ঘমেয়াদি কষ্টভোগেও মৃত্যু ত্বরান্বিত করার প্রথা নেই। সেই কারণেই প্রতিটি চিড়িয়াখানায় যত প্রাণীকে দর্শকের কাছে হাজির করা হয় তারা ছাড়াও ব্যাকস্টেজে একটা বড় সংখ্যক প্রাণী অফ-ডিসপ্লেতে এবং পশুশালার হাসপাতালে শেষ দিনগুলো কাটায়।

এ সব চিন্তা অনিকেতের মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল। সামনে রামাশ্রয় ওর উত্তরের আশায় দাঁড়িয়ে। তাই শারীরিক ও মানসিক জড়তা কাটিয়ে অনিকেত গাছতলার বেদি থেকে উঠে দাঁড়ায়, শেষ বারের মতো একবুক ছাতিমফুলের গন্ধ বা বলা ভাল বুকভরা যন্ত্রণা শ্বাসের সঙ্গে টেনে নিয়ে বলে, ‘‘চলো, মানুষ হোক কিংবা পশু, কারও মৃত্যুদৃশ্য দেখতে ভাল লাগে না। যে যাওয়ার সে তো যাবেই। তবু আমি গেলে যদি তোমার মন শান্ত হয়...’’

কালীপুর চিড়িয়াখানার মেন গেট পার হয়ে ওরা হাসপাতালের গেট দিয়ে এলাকায় ঢোকে। ঘোরানো র‌্যাম্প দিয়ে দোতলার উপরে উঠতেই শঙ্করের অন্তিম শ্বাস টানার শব্দ অনিকেতের কানে আসে। সেই সঙ্গে গলা থেকে ঘড়ঘড়ানির আওয়াজ। শেষ সময়ে মানুষ আর পশুতে খুব বেশি ভেদ থাকে না। অনিকেতের মনে হয় যেন অনন্তকাল, বাস্তবে কিন্তু বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না, শঙ্করের পড়ে থাকা শরীরটায় কয়েক বার কাঁপুনির সঙ্গে সঙ্গে চারটে পা টানটান হয়ে গেল। 

 সামনে দাঁড়িয়ে দেবাশিস ডাক্তার। চোখ দেখে রামাশ্রয় খাঁচার শিক দু’হাতে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। অনিকেতের সঙ্গে ডাক্তারবাবুও পাক-খাওয়া ঢালু পথ বেয়ে নীচে নেমে এসে সিগারেট ধরায়, আর একটা সিগারেট অনিকেতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘‘নিন, একটা খেলে কিছু হবে না। বেচারা রামু একলা একটু কেঁদে নিক। দিনের আলো ছাড়া তো পোস্টমর্টেম হবে না। আমিও এ বার বাড়ি যাব। কাল সকালে সুকান্ত এসে ব্যবস্থা নিতে নিতে আমিও পৌঁছে যাব।’’ দেবাশিস জানে, ফুসফুসের অসুখের জন্য অনিকেতের সিগারেট খাওয়া 

বারণ, তবু লাইটার জ্বালিয়ে ওরটাও ধরিয়ে দেন, ‘‘দু’টান দিয়ে ফেলে দেবেন, আমি এগোলাম।’’ অনেকটা গাড়ি চালিয়ে যেতে হবে ওকে, হাওড়া ব্রিজ হয়ে বালি।

শঙ্করের মরণ-যন্ত্রণা অনিকেতকে নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে। উমা মারা যাওয়ার পর থেকে একা হয়ে যাওয়া শঙ্করকে দেখে ওর নিজের কথা মনে হত। এক দিন ও এ ভাবে মারা যাবে। শঙ্করের জন্য রামাশ্রয় কেঁদে ভাসাচ্ছে, ওর জন্য একটুও চোখের জল ফেলার কেউ কি থাকবে না? সিস্টেমের জাঁতাকলে সারা জীবন নিজেকে পিষে, অন্যের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজের সারা জীবন নিংড়ে দিয়ে এটুকু যোগ্যতাও কি ও অর্জন করতে পারেনি? অনেক দূরে বসে কেউ কি ওর মৃত্যুসংবাদ পেয়ে দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলবে না? অন্যদের থেকে লুকিয়ে হলেও? শরৎবাবুর দেবদাসের শেষ ক’টা লাইন আজকাল খুব মনে পড়ে, ‘‘প্রার্থনা করিও, আর যাহাই হোক, যেন তাহার মত এমন করিয়া কাহারও মৃত্যু না ঘটে। মরণে ক্ষতি নাই কিন্তু... মরিবার সময় যেন কাহারও একফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে!’ পিতৃভাষা হিন্দি বলে শের-শায়েরিতে খুব স্বচ্ছন্দ ছিল সে। হাতের আঙুলে সিগারেটের ছ্যাঁকা অনিকেতের সম্বিৎ ফেরায়, টুকরোটা ছুড়ে ফেলে ও বিড়বিড় করে, ‘‘মুঝে তো অপনো নে হি লুটা, গ্যায়রোঁ মে ক্যয়া দম থা,/ হমারি কস্তি উহাঁ ডুবি, যহাঁ পানি কম থা।’ হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে আবার ছাতিমতলার বেদিতে বসে ও। মনটা বড় অস্থির-অস্থির লাগছে! দূরে কোনও নাইটগার্ডের মোবাইলে খুব মৃদু গলায় গানের আওয়াজ আসছে, অনিকেত ধরতে পারে ওটা মানবেন্দ্রর গলা। ও-ও আস্তে গলা মেলায়, ‘‘তারা এ দীনতাটুকু দেখে না আমার/ বলে, তুমি তো আমায় ভালবেসেছ!/ শুধু আমার গোপন ব্যথা কেঁদে কেঁদে কয়।/ কেন আরো ভালবেসে যেতে পারে না হৃদয়!’ ওর অজান্তেই চোখের জল গড়িয়ে নামছে।