বাড়িটা প্রায় ফাঁকা। মধ্য শীতের হাড় কাঁপানো সকাল। সুলতার মেয়ে সুজাতা আর শিশিরের ছেলে সুবীর যে যার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে দৈনন্দির রুজিরুটির চক্করে। তাদের দশ বছরের ছেলে সৌরভ এবং তেরো বছরের মেয়ে শিবানীও এখন স্কুলে। 

বিধবা সুলতা এত বছর ধরে একাই নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন এই বিদেশে। তবে সম্প্রতি পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। মাস চার হল সুবীরের বিপত্নীক পিতা, সুলতার বেয়াইমশাই, শিশির চৌধুরী তাঁর ছোট ছেলের আশ্রয়ে এসে উঠেছেন পাকাপাকি। ভারত ছেড়ে বিদেশভূমিতে এই প্রথম তাঁর পদার্পণ। ছেলের বাড়িতে আসা অবধি তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ সঙ্কুচিত, শঙ্কিত এবং সংশয়ে ভরা ছিল। যেন সাংঘাতিক একটা অপরাধ করেছেন। সহসা তাঁর এখানে চলে আসাটা ছেলের সংসারে যেন বড়সড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। 

স্বামীকে হারাবার পরে সুলতা যখন প্রথম তাঁর এক মাত্র কন্যার সংসারে এসে ওঠেন, তখন তাঁর মনোভাবটিও এ রকমই ছিল। সেই সময়ে একান্ত একাকিত্ব সুলতাকেও অবসাদের সমুদ্রে নিক্ষেপ করে হাবুডুবু খাইয়েছিল। তাই, সুলতা অন্তর থেকে টের পান শিশিরের মনের মাঝে নিরন্তর ঘটে চলা আশঙ্কা আর অনিশ্চয়তার ভাবনাস্রোত। শিশির আসায় ওঁর নিঃসঙ্গ জীবনে যে একটি সঙ্গী হয়েছে, সুলতা মনে করেন সেটাও তাঁর মস্ত লাভ। 

‘‘শিশিরবাবু, চলে আসুন। গরম চা আর টোস্ট তৈরি। দেরি করবেন না,’’ খাবার ঘর থেকে হাঁকলেন সুলতা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে, হাসিমুখে খাবার ঘরে উপস্থিত হলেন শিশির। খাবার টেবিলে গল্প করতে করতে মাখন আর জ্যাম লাগানো টোস্ট, ডিমের পোচ আর গরম চা সহযোগে প্রাতরাশ সারলেন। 

তার পর এঁটো কাপ-প্লেটগুলো রান্নাঘরের সিংকে গরম জলে ধুয়ে ডিশওয়াশারে লোড করলেন সুলতা। ইতিমধ্যে শিশির ইলেকট্রিক জগ থেকে ফুটন্ত গরম জল ঢেলে হট ওয়াটার ব্যাগটা ভরে, টুকটুকে লাল রঙের উলে বোনা ছোট্ট একটা শালে জড়িয়ে সুলতার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এই নিন।’’

সুলতার মুখে আলো করা একটা হাসির ঝিলিক খেলে গেল। তাড়াতাড়ি ব্যাগখানাকে কুক্ষিগত করে বললেন, “আজ এই সাংঘাতিক ঝড়জলে আর বেরবেন না, শিশিরবাবু। তার চেয়ে নিজের ঘরে বসে টিভি দেখুন বা বই পড়ুন। এই সে দিনই তো লাইব্রেরি থেকে কতগুলো বই নিয়ে এলেন দেখলাম,’’ বলতে বলতে শিশিরের হাতে তিনিও তুলে দিলেন, মস্ত একটা থর্মস্‌ ফ্লাস্ক। রোজ সকালে বেরবার আগে শিশির এবং তাঁর বন্ধুদের জন্য ফ্লাস্কে করে চায়ের জোগান দেন সুলতা। হাসিমুখে শিশির বললেন, “কথাটা আপনি একেবারে ঠিক বলেছেন বেয়ান। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই যে আমাদের এই শহরে চার-পাঁচ মাস ব্যাপী শীতকালটা যে সারাক্ষণই প্রায় কালবৈশাখীর তাণ্ডব আর শ্রাবণের বর্ষণ। তাদের ভয়ে ঘরের মধ্যে মুখ লুকিয়ে বসে থাকা কি সাজে? তা ছাড়া, আজীবন এই দুটো পায়ের উপর পথ চলে কাটিয়েছি। এখন এই দুটিকে কী করে রিটায়ার করাই বলুন তো?”

সুলতা হেসে ফেলেন। বুঝতে পারেন প্রতিদিন সকালে একবার বাইরে বেরিয়ে হাওয়া থেকে দুই ফুসফুস ভরে টাটকা অক্সিজেন শুষে না নিলে এবং নিজের পা’দুটোকেও সচল রাখার গুরুদায়িত্ব পালন করতে না পারলে শিশিরের মানসিক বিষণ্ণতা সারা দিনে কাটবে না। কিন্তু সেই সকালে ওঁর মুখে “আমাদের এই শহর” কথাগুলোই সুলতাকে বিস্মিত করল। মনে মনে খুশিও হলেন এই ভেবে যে এই ক’মাসের মধ্যেই বিদেশি এই শহরটাকে শিশির তাঁর নিজের জায়গা বলে মনে করছেন!

শিশিরের এই শহরটাকে ‘আমাদের শহর’ বলে মেনে নেওয়ার পিছনে একটা যুক্তিও আছে বইকি! প্রতিদিন হাঁটতে হাঁটতে তিনি প্রায় মাইল দেড়েক দূরে একটা পার্কে চলে যান। সেখানে তাঁর আলাপ হয়েছে আট-দশজন অবসরপ্রাপ্ত, সমবয়সি মানুষের সঙ্গে। নানা দেশ, জাতি ও ধর্মের মানুষ এঁরা, কিন্তু আদতে এঁরা প্রত্যেকেই কারও বাবা, কারও শ্বশুর, কারও ঠাকুরদা বা কারও দাদু।

সুতরাং পরস্পরের মৌখিক ভাষার প্রতিবন্ধকে সহজেই অতিক্রম করে, ভাঙা ভাঙা ইংরেজির মাধ্যমে বন্ধুত্ব গড়ে নিতে এঁদের দেরি হয়নি।

শুধু গল্প নয়, প্রতিদিন একজোট হওয়ার পরে একটা ছোটখাট পিকনিকও হয়ে যায়। প্রায় প্রত্যেকেই সঙ্গে করে আনেন তাঁদের বাড়িতে তৈরি বিভিন্ন রকমের স্ন্যাক্স। শিশিরের ফ্লাস্কে আনা চা সহযোগে সে সব খেয়ে ফেলেন সকলেই। ভুলে যান, একপ্রস্ত প্রাতরাশ করে সকলেই বেরিয়েছেন! শীতকালের শিলাবৃষ্টি অথবা হিমশীতল ঝোড়ো হাওয়া কিচ্ছুটি করতে পারে না। ওই সব দুর্যোগের দিনগুলোয় ওঁরা ঢুকে পড়েন পার্কে অবস্থিত বিনোদন সেন্টারে। সেখানকার সেন্ট্রাল হিটিংয়ের উষ্ণতায় বসে পরম আরামে ওঁরা চা পান করেন। খেতে খেতে গল্পে মেতে ওঠেন সকলে। আর সেই সব গল্পে ছায়া ফেলে ওঁদের দেশ, জাতি, ধর্মবোধ আর অভিজ্ঞতার নানা বৈচিত্র।

এক বছর আগে, স্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর পরে শিশিরবাবু কলকাতায় তাঁর নিজের বাড়িতে অত্যন্ত অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। সুবীরের দাদা শোভন ও তার স্ত্রী রেবা ছেলেমেয়েকে নিয়ে তখনই শিশিরের বাড়িতে চলে এসেছিল, নিজেদের তিন কামরার ফ্ল্যাটখানা ভাড়া দিয়ে। খুব খুশি হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই শিশির খেয়াল করলেন যে তাঁর অত বছরের পাতা সংসারে তিনিই যেন অনাহূত। সংসারের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ চলে গেল ছেলে আর বৌমার হাতে। নিয়ন্ত্রণটা অবশ্য সংসার পরিচালনার ব্যাপারে। অথচ আর্থিক দায়দায়িত্ব সবটাই তখনও পড়ে রইল শিশিরের ঘাড়ে। কৃতী, মস্ত চাকুরে তাঁর ছেলে আর রোজগেরে বৌমা তাঁর বাড়িতে উঠে আসার পরই নিজেদের ওয়ালেটে পাকাপাকি জিপ তুলে নিশ্চিন্ত হয়েছিল। তাদের শখ-শৌখিনতা, থাকা-খাওয়া, দুই নাতি-নাতনির স্কুল এবং আনুষঙ্গিক সব খরচপত্র জুগিয়ে চলেছিলেন চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিশির নিজের জমানো খাজানা থেকে। এই পরিস্থিতিতেও মোটে ক্ষুণ্ণ হতেন না তিনি। কারণ তাঁর একাকী জীবনে নাতি-নাতনির সঙ্গটা ছিল পরম প্রাপ্তি। কিন্তু যখন মনেপ্রাণে অনুভব করলেন দিনের পর দিন তাঁর নিজের সংসারেই তিনি সব চেয়ে বেশি উপেক্ষিত, অবহেলিত এক তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক এবং বাড়ির পরিচারকের সঙ্গে এক পঙ্‌ক্তিতে নেমে আসতে তাঁর খুব বেশি দেরি নেই, তখনই মনস্থির করে ফেললেন ছোট ছেলে সুবীরের বিদেশে পাতা সংসারে চলে যাবেন।

তার পর অবিলম্বে চলেও এলেন তিনি এক দিন ছোট ছেলের কাছে।

 

******

ভালই কাটছিল দিনগুলো। পার্কের বন্ধুদের সঙ্গে নিত্য আড্ডা, বাড়িতে বেয়ানের সঙ্গে নানা গল্প, নাতি-নাতনির সঙ্গে সখ্য এবং ছেলে আর তার বৌয়ের কাছ থেকে সম্ভ্রম, ভালবাসা, সব কিছুই পেয়েছিলেন শিশির।

কিন্তু এর মধ্যেই এক দিন বাধল বিপর্যয়। বিকেলে নিজের ঘরে বসে জপ করছিলেন শিশির, হঠাৎ বাড়ির অপর প্রান্ত থেকে উঠে এল তীব্র কোলাহল। তিনি ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে বাড়ির ভিতরে লম্বা করিডরে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে সুলতাও দ্রুতপায়ে ব্যস্তসমস্ত হয়ে এসে পড়লেন। ফিসফিস করে বললেন, “ওখানে যে সুজাতার ঘরে ধুন্ধুমার যুদ্ধ লেগে গিয়েছে।’’

‘‘কেন?” শিশিরের বুক ধড়াস করে উঠল।

‘‘আপনার নাতি আর নাতনি কোত্থেকে এক জোড়া কুকুর ছানা নিয়ে এসেছে বাবা-মাকে না জানিয়ে। আমার জামাই খুব খেপে গিয়েছে।

‘‘আর বৌমা?’’ 

‘‘নাঃ! সে নীরব। ব্যাপারখানার পিছনে ওরও প্রশ্রয় আছে বোধহয়।’’

শিশিরের মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল। প্রায় টলতে টলতে ঘরে ফিরে এলেন তিনি। এতখানি বয়সে, এ যাবৎ তাঁর নিজের বাড়িতে তো নয়ই এমনকি নিকট আত্মীয়-স্বজনের কারও বাড়িতে কুকুর-বেড়াল পুষতে তিনি দেখেননি। অতি শৈশব থেকে তাঁর মনে গড়ে উঠেছিল কুকুরদের প্রতি প্রবল ঘৃণা ও আতঙ্ক।

ঘরে ফিরে এসে আবার তিনি জপে বসতে চেষ্টা করলেন, পারলেন না। বন্ধ চোখের সামনে ভেসে এল তাঁর প্রতিবেশীদের বিমল নামে ছোট্ট ছেলেটার মুখখানা, কুকুরের কামড়ে যার সারা দেহ বিষিয়ে মৃত্যু হয়েছিল কয়েক বছর আগে।

কেন? শিশির মনে মনে বললেন, বেশ তো সুখে-শান্তিতে, স্বস্তিতে কেটে যাচ্ছিল এই পরিবারের সকলের দিন। তা হলে কেন বিপর্যয় বয়ে এল হঠাৎ!

পরের কয়েকটা দিন অসম্ভব উদ্বেগে কাটল শিশিরের। বাইরে হাঁটতে যাওয়া ছাড়া তিনি ঘর থেকে বেরোনোই ছেড়ে দিলেন। তা সত্ত্বেও এক দিন কোন ফাঁকে নাতি সৌরভ একটা কুকুরছানাকে এনে তাঁর বিছানায় বসিয়ে দিয়েছিল। শিশির হাঁ-হাঁ করে, এক ঝটকায় ছানাটাকে বিছানা থেকে মাটিতে ছুড়ে দিয়ে চেঁচিয়ে বলেছিলেন, “ছ্যা, ছ্যা। তোমার মাকে বলো আমার বিছানার চাদর এখুনি পাল্টে দিতে।’’

ও দিকে আহ্লাদি কুকুরছানাটা, যার নাম ঝুমকি, হঠাৎ মাটিতে পড়ে গিয়ে ভয়ে, ব্যথায় কেঁউকেঁউ করছিল। শিশির ক্ষিপ্তস্বরে বলে উঠেছিলেন, “গেট দ্য হেল আউট অব হিয়ার উইথ দ্যাট রেচেড ডগ।’’

ঝুমকিকে কোলে তুলে নিয়ে একছুটে সৌরভ বেরিয়ে গিয়েছিল।

মাসখানেক চরম অস্থিরতায় কাটল শিশিরের। দেখেশুনে সুলতা এক দিন মেয়েকে বললেন, “দেখ, বেয়াই কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না ঝুমকি-রুমকিকে। অবশ্য ভিতু রুমকিটা তাঁকে দূর থেকে দেখেই সরে পড়ে। কিন্তু আমি বলি কী...’’

‘‘কী বলো তুমি?” সুজাতা ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল।

‘‘কুকুর দুটোকে বিদেয় করে দে। কি দরকার খামোকা বেয়াইমশায়ের জীবনটাকে অতিষ্ঠ করার?’’

‘‘দেখা যাক।’’ সুজাতা বলেছিল।

তার পর হঠাৎ এক দিন বিকেলে শিশিরের ঘরে ঢুকে এল দুই নাতি-নাতনি, সৌরভ আর শিবানী। থমথমে মুখ এবং গভীর বিষণ্ণ তাদের চোখ।

‘‘কী ব্যাপার?” 

‘‘বাবা আর মা নেক্সট উইকেন্ডে ঝুমকি-রুমকিকে শেল্টারে দিয়ে আসবে। থ্যাংকস আ লট ফর দিস, দাদু।’’

শিশিরের মনে সোয়াস্তির ছায়া নেমে এল। এই বাড়ি আর ক’দিনের মধ্যে কুকুরমুক্ত হবে খবরটা পেয়ে তিনি ভারী খুশি।

তার পর এল সেই দিনটা, যে দিনের অভিজ্ঞতা তাঁর আজীবন গড়ে ওঠা মানসিকতা এবং বিশ্বাসের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিল।

গ্রীষ্মের এক ভারী মনোরম সকালে তিনি বেরিয়েছিলেন। তার পর পার্কের বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে খোশমেজাজে বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছিলেন তিনি। বাড়ির কাছাকাছি এসে দেখলেন, ছাদ খোলা টুকটুকে লাল রঙের একটা গাড়ি মন্থরগতিতে এঁকেবেঁকে চলেছে ছোট ছোট দুটো কুকুরের পিছনে ধাওয়া করে। গাড়ির চালক একটি কিশোর এবং তার পাশে বসে তারই সমবয়সি এক জন। মাঝে মাঝে গাড়ির গতি একটু একটু বাড়িয়ে দিচ্ছে চালক, আর কুকুর দুটো প্রাণভয়ে মরিয়া হয়ে ছুটছে। তাদের সেই সন্ত্রস্ত দৌড় দেখে ছেলেদুটো পরম উল্লাসে হা-হা করে হাসছে। হঠাৎ চমকে উঠলেন শিশির। রুমকি আর ঝুমকি না? ঠিক তাই। কী করে বেরিয়ে পড়ল ওরা? কুকুর-দুটো তিরবেগে ছুটতে ছুটতে এগিয়ে আসছিল শিশিরের দিকে, কিন্তু হঠাৎ তাদের এক জন যেন খুব ক্লান্ত হয়ে মাঝরাস্তায় বসে পড়ল। আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে। 

তক্ষুনি বিকট আওয়াজ করে গাড়িটা হুড়মুড়িয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল ক্লান্ত, অনবরত হাঁপাতে থাকা, প্রাণভিক্ষাপ্রার্থী সেই কুকুরটার উপর। আর চক্ষের পলকে ঝুমকি ছিটকে এসে পড়ল শিশিরের পায়ের কাছে। অন্য কুকুরটাকে নির্মম ভাবে চাপা দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে গাড়িটা অদৃশ্য হয়ে গেল দৃষ্টিপথ থেকে। রাস্তায় পড়ে রইল রুমকির রক্তাক্ত, নিশ্চল ছোট্ট দেহটা। চোখের সামনে এ রকম হত্যাকাণ্ড দেখে কয়েক মিনিট স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন শিশির। তার পর সম্পূর্ণ নির্দ্বিধায় রুম্‌কিকে কোলে  তুলে নিয়ে বাড়ির দিকে অগ্রসর হলেন। ঝুমকিও চলল তাঁর পিছন পিছন।

বেয়াইয়ের বিপর্যস্ত চেহারা, রক্তে ভেজা জামাকাপড় এবং দু’হাতে চেপে ধরা রুমকিকে দেখে সুলতা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তার পরই ছুটে গিয়ে পাড়ার ভেট-ক্লিনিকে ফোন করে ডাক্তারকে তখনই এক বার ওঁদের বাড়ি চলে আসতে অনুরোধ করলেন।

 

******

চৌধুরী বাড়ির বিশাল ব্যাকইয়ার্ডে রুমকিকে সমাধিস্থ করা হল। তার পরের উইকএন্ডে ঝুমকিকে অ্যানিম্যাল শেল্টারে দিয়ে আসার কথা কারও মনে হল না। ঝুমকি-রুমকি এক সঙ্গে এই বাড়িতে এসেছিল। সারাক্ষণ একে অপরের ছায়া হয়েই ঘুরে বেড়াত। তাই রুমকির যাওয়ার পর নিঃসঙ্গ ঝুমকির কথা যেন সকলে ভুলে গেল। অবশ্য এক ফাঁকে সুলতা এসে শিশিরকে বলে গেলেন যে আরও সাত দিন পরের উইকএন্ডে ঝুমকিকে এ বাড়ি থেকে বিদেয় করা হবে।

সে দিন সকালবেলা বাড়ি থেকে বেরোতে গিয়ে ঝুমকিকে দেখে থমকে দাঁড়ালেন শিশির। ব্যাকইয়ার্ডের কোণে, রুমকিকে যেখানে গোর দেওয়া হয়েছিল, সেখানেই চুপ করে বসেছিল সে। এগিয়ে গেলেন শিশির। অনড়, অবিচলিত ঝুমকি শুধু তার সজল দুই চোখ মেলে একদৃষ্টিতে তাঁর দিকে চেয়ে রইল। এই প্রথম শিশিরের মনে হল, তিনি ঝুমকির মতো সুন্দর কুকুর কোনও দিন দেখেননি। সৌরভ বলেছিল, ঝুমকির ব্রিড নাকি টয় স্প্যানিয়েল। অনেকে নাকি প্যাপিঁও বলে, কারণ এদের খাড়া কানদুটো শরীরের অনুপাতে শুধু অনেকখানি বড়ই নয়, প্রজাপতির দুই পাখনার মতো মেলা থাকে সর্বদা। ধবধবে সাদা দেহে রেশমের লোমের ওপর কালো আর খয়েরি বুটি।

শিশিরের হঠাৎ মনে পড়ে গেল ষোড়শ লুইয়ের অস্ট্রিয়ান রানি মেরি আঁতোয়ানেতের আদরের টয় স্প্যানিয়েল কুকুর ‘কোকো’র কথা। মেরি যখন বধ্যভূমিতে উপনীত, কোকো নাকি লুকিয়ে ছিল তাঁর পোশাকের তলায়। 

“ইউ আর আ সার্ভাইভার, আর ইউ নট?” বলতে বলতে, ঝোঁকের মাথায় সম্পূর্ণ আত্মবিস্মৃত হয়েই তিনি দু’হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিলেন ঝুমকিকে।

 

******

অবশেষে সাত দিন পরের শনিবারটা চলে এল। তখন সকাল এগারোটা। ঝুমকিকে খুঁজতে খুঁজতে শিবানী দাদামশায়ের ঘরে গিয়ে দেখল, আয়েশে সে শুয়ে আছে বিছানায়, আর শিশির ব্রাশ দিয়ে ওর লোম আঁচড়ে দিচ্ছেন। ভারী অবাক হল শিবানী। তা দেখে শিশির প্রশ্ন করলেন, ‘‘কী ব্যাপার?” 

‘‘আমরা এ বার বাবার সঙ্গে ঝুমকিকে অ্যানিমাল শেল্টারে রাখতে যাব। তাই ওকে নিয়ে যেতে এসেছি। হাউ স্ট্রেঞ্জ! ও তোমার বিছানায় শুয়ে আছে!” বিছানা থেকে ঝুমকিকে তুলতে তুলতে বলল শিবানী।

‘‘কী যে বলিস তোরা,” শিশির কিঞ্চিৎ লজ্জিত মুখে বললেন, “কোথাও যাবে না আমাদের ঝুমকিরানি। বাড়ির মেয়ে বাড়িতেই থাকবে আমাদের সবার সঙ্গে।”