আমি চব্বিশ ইনটু সাত, অন ডিউটি। ঝড়, জল, রোদ, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব। যে কোনও পরিস্থিতিতে তাই গেট পাস হাতের মুঠোয়। হরিদারও পরম ভরসার। বলে, ‘‘তুই একটা চাবুক ছেলে।’’ কে জানে। হয়তো সত্যি।   

আজ সকাল থেকেই ঝমঝম শ্রাবণ আকাশ। বেলা যত বাড়ছে, ঝড় আর বৃষ্টি দু’টোই পাল্লা দিল এক সঙ্গে। কয়েকটা গাছের কোমর ভেঙে মটমট পড়ে গেল চোখের সামনে। উন্মত্ত আক্রোশে আকাশ ফুঁসছে। জনজীবন প্রায় স্তব্ধ। শুধু আমাদের এই ‘টেস্টি কর্নার’-এ বিপরীত ছবি। একের পর এক ফোন, ‘খাবার ডেলিভারি চাই, এখনই।’ এই ধোঁয়াধার বৃষ্টি আর ঝড়ের সেলিব্রেশনটুকু করবে বলে মানুষ মেতে উঠেছে।  

হরিদা তেতে আগুন। হেঁড়ে গলায় চেঁচাচ্ছে, ‘‘আরে, ডেলিভরি বয় কম আজ দোকানে। দিনটা কী পড়েছে দেখছেন না?’’

ও পাশ থেকে নরম কোনও অনুযোগ এসেছে বোধহয়। নইলে হরিদা এমন হেঁকে উঠত না। এ এক অদ্ভুত লোক। নরম কথায় গরম দেখাবে আর গরমে নরম। আমার মিতাটাও নরম, একটু বেশিই। অল্পতেই ডাগর চোখ দু’টো জলভরা দিঘি। আমি সব সহ্য করতে পারি, শুধু ওর ওই এক-এক ফোঁটা কান্না, আমার শরীরের যেন এক-এক ফোঁটা রক্তক্ষরণ। অস্থির অস্থির লাগে। 

‘‘কি রে বিশু, পারবি যেতে?’’ হরিদা শুধোচ্ছে, এ বার গলায় আখের রস। তার মানে খদ্দেরের ফায়ারিং খেয়েছে।   

আওয়াজ না করে হাত তুলে সম্মতি জানাই। এই টেস্টি কর্নারের নাম এখন হুহু করে ছড়াচ্ছে। সব হরিদার জন্য। এক ঘর রাঁধে। শুধু রান্নায় কেন, সব কিছুতেই গুরুদেব লোক। চেহারায় রোগা পটকা, কিন্তু মনটা লোহায় বাঁধানো। ও না থাকলে মিতার সঙ্গে আমার বিয়েটাই হত না। এক দিন পিঠ চাপড়ে বলেছিল, ‘‘এত ভালবাসিস মিতাকে, শুধু ওই একটা ঘটনার জন্য... মেয়েটার কী দোষ বল তো? টিউশনি পড়িয়ে ওই শর্টকাট রাস্তায় আসতে গিয়ে কয়েকটা জন্তুর কবলে পড়ল...’’ 

আমি সঙ্গে সঙ্গে খিমচে ধরেছিলাম ওর পিঠের জামা, ‘‘ব্যস, আর না চুপ।’’

হরিদা তবু থামেনি, ‘‘কেন চুপ? শুনতেই হবে তোকে। তুই হলি নোঙর, আর মিতা সাদা পাল তোলা নৌকা। তুই না থাকলে নৌকাটা ভেসে যাবে রে।’’ ফ্যাকাসে হেসে বলেছিলাম, ‘‘সাদা পালটা আর এখন সাদা নেই গো।’’ 

‘‘মলিন হয়েছে বলছিস? ওরে, সূর্যও এক সময় নিভন্ত হয়, ওই তেজিয়ান আলোকেও মলিন লাগে।’’

 

ঝড়ের তাণ্ডবে জায়গায় জায়গায় পথ বন্ধ। এর মধ্যেও চার-পাঁচটা অর্ডার পৌঁছে দিয়েছি। বাকি দু’টো, সল্টলেকে। ভয় ও দিকটাতেই, একটু বেশিই গাছ গড়ানোর জায়গা। ভাবতেই ভাবতেই দেখি আড়াআড়ি পড়ে আছে দুটো দেবদারু। হয়তো অনেক ক্ষণ ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করেছিল। আহা রে!

মিতারও গাছগাছালি বড় প্রিয়। যে দিন মুড একেবারে তুঙ্গে, একটা খেলায় পায় তাকে। স্বপ্ন-স্বপ্ন খেলা। মিতা বলে, ‘‘চলো, স্টার্ট।’’ 

আমি ওর দিকে আরও একটু ঘন হয়ে বসতে বসতে বলি, ‘‘লেডিজ ফার্স্ট।’’  

‘‘ঠিক আছে।’’ মিতা চোখ বুজে ফেলে, ‘‘আমাদের ঘরটা মনে আছে তো, একেবারে হিমালয়ের চূড়ায়। আর ঘরের নীচে একটা বন, ওক আর ম্যাপলের, পাশে রডোডেনড্রন সারি সারি।’’ 

ও সব গাছগাছালির নাম খুব বেশি শুনিনি, ভূগোলের দৌড় মাধ্যমিকেই শেষ, কিন্তু বৌটা তো মাস্টারনি। কত বিষয়ে কত কী জানে। ওকে বুকের কাছে টেনে বলি, ‘‘বাহ্‌, বেশ এগোচ্ছে স্বপ্নটা। আচ্ছা, ঘরের কাছাকাছি কোনও ঝরনা 

থাকবে না?’’ 

মিতা অন্যমনস্ক হয়, ‘‘থাকবে মশাই থাকবে। আচ্ছা শোনো, আমায় কখনও কোনও ঝরনার কাছে নিয়ে যাবে? ঝরনার গান শুনব। কেমন হয় সুরটা? খুব মিষ্টি?’’   

ঘোরটা কেটে গেল। কানে তখনই একটা সুর ঝাপটা মারল। কর্কশ রিংটোনে কেঁপে উঠলাম। ধরতেই ও পাশে কাস্টমারের ধমকি, ‘‘কী ব্যাপারে, ডিনার কি মাঝরাতে সারব?’’ কণ্ঠে আগুন।

নরম করে বলি, ‘‘কী করব স্যর? রাস্তায় এক কোমর জল, বাইক চলছে না। হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে নিতে হচ্ছে।’’

‘‘মেলা ভাটাস না ভাই। মুডটা এখনও ভাল আছে। আজ আমাদের ফার্স্ট লাভ অ্যানিভারসরি, রাত আটটায় সেলিব্রেশন। তার মধ্যে খাবার না ঢুকলে কেস খাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকিস।’’   

চট করে মোবাইলের ঘড়ি দেখে নিই, আটটা বাজতে সাত। রাস্তার যা হাল, সাত কেন সতেরো মিনিটেও পৌঁছব না। চারপাশে ভুতুড়ে অন্ধকার, লাইটপোস্টের তার ছিঁড়ে ঝুলছে।  অসহায় লাগল, সাত-পাঁচ চিন্তা মাথায় ছোবল বসাচ্ছে। তার মধ্যেও শব্দগুলো কেন যে মাথায় ঘাই মারল? লাভ অ্যানিভারসরি, প্রেম বার্ষিকী। আচ্ছা, আমার আর মিতার প্রেম কত বছরে পড়ল? হিসেব গুলিয়ে যাচ্ছে। ওটা কি জন্ম জন্মান্তরের প্রেম? 

আবার মোবাইল বাজছে। বুকে ধুকপুকানি। ঘড়ি বলছে মাত্র তিন মিনিট হাতে। ঝড়বাদলের রাত না থাকলে এই তিন মিনিটকে হেলায় হারিয়ে দিতাম। বাইকটা লজঝড়ে, তবু এখনও বাধ্যের। যদিও হরিদা বার বার সাবধান করে। বলে, ‘‘ডেলিভরি বয়দের পথ দুর্ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলছে জানিস।’’ 

‘‘কী করব বলো? সবাই তো হরিদার মতো মালিক পায় না,’’  আমি ওর পিঠে কৃতজ্ঞতার হাত রাখি। ‘‘ওই যে অন-লাইনের ডেলিভরি বয় যারা, এক মিনিট দেরির জন্য লেট ফাইন গুনতে হয়, জানো? ক’টা টাকা মাইনে পায়? তার থেকেও যদি কাটা পড়ে...অগত্যা প্রাণ হাতে করেই দৌড়ে চলে। তাই মাঝে মধ্যেই স্পিড লিমিট ভেঙে দুর্ঘটনার শিকার।’’     

 

মোবাইলটা আবার বাজছে। কী করি? না ধরে তো উপায়ও নেই। মনে মনে উত্তর প্রস্তুত করি। কিন্তু কানে দিতেই ও পাশে একটা কচি গলা, ‘‘আঙ্কেল, কত দূরে? আমার ফ্রেন্ডসদের কিন্তু ভীষণ খিদে পেয়েছে।’’  

প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও পরে বুঝলাম, এ আমার লাস্ট কাস্টমার। কিন্তু গলাটা এমন মিষ্টি, আদুরে আদুরে। ফিক করে হেসে বলি, ‘‘এই তো এসে পড়েছি মামণি। তা 

শুধু ফ্রেন্ডসদেরই, তোমার খিদে পায়নি তো?’’

‘‘না, আমারও খুব। তাড়াতাড়ি  এস...’’ মেয়েটি ফোন ছেড়ে দেয়। 

কী মনে হতে, গায়ের রেনকোটটা খুলে ফেলি, খাবারের ব্যাগটা ওই রেনকোটে মুড়ে আবার বাইক হাঁটাতে শুরু করলাম। কয়েক পা যেতে না যেতেই শরীর ভিজে সপসপে। তা হোক, যদি খাবারগুলোয় কোনও ভাবে জল ঢুকে যায়! কচি মেয়েটার গলাটা কী মিহি। আচ্ছা, ঝরনার গান কী এ রকমই হয়? এত মিষ্টি? মিতার খুব মেয়ের শখ। তবে এখন নয়, বলেছে এক বছর পরে। মেয়ে হলে, ওর নাম কী রাখব? ঝরনা? না কি গান? যাহ্‌, গান কারও নাম হয়!  

একটা ওষুধের দোকানের সাইনবোর্ডে নজর গেল। ২৪বি,  আরে,  সেই রাগী কাস্টমারের বাড়ি তো ২৫ বি। যাক, পরের বাড়িটাই তবে, পৌঁছে গেলাম অবশেষে। তবে শেষ রক্ষা হল না। এখন আটটা বেজে পাঁচ। ভয়ে ভয়ে ফোন করি। বেশ খানিক পরে একটা বড় ছাতা মাথায় বারমুডা পরা মোটাসোটা এক জন এগিয়ে এল একটু টলমল পায়ে।  সামনে এসেই বাইকের চাবিটা খুলে বলে, ‘‘দেখ কেমন লাগে। এটা তোর পানিশমেন্ট।’’   

আমি হতভম্ব। পাঁচ মিনিট দেরির এত বড় শাস্তি। কাকুতি মিনতি করছি, ‘‘প্লিজ় স্যর, একটু বুঝুন।’’ এর মধ্যে আবার ফোন, ‘‘আঙ্কেল গো, কোথায়?’’ এ সময় বারমুডার ফোনে কোনও জরুরি কল এসে পড়ে, তড়িঘড়ি চাবি ফেরত দিয়ে বলে, ‘‘কাল তোর মালিকের সঙ্গে হিসেব বুঝে নেব। যা ভাগ এখন।’’   

টাকা পেলাম না। কিন্তু ছাড়া পেয়ে বাইক স্টার্ট দিলাম। এ দিকে জল বিশেষ জমেনি। গাড়ি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করেছে। কিন্তু অপমানে চোখে জ্বালা ভাব। এত স্বার্থপর মানুষ! কাচের জানলায় বৃষ্টি দেখতে দেখতে আয়েশ করে খাবার খাবে, অথচ যে ডেলিভারি বয় একশো কেজির একটা বাইক জলের উপর দিয়ে হাঁটাতে হাঁটাতে নিয়ে এসে দম ফুরিয়ে ফেলল, তার কোনও দাম নেই? এই কি আজকের পৃথিবী? 

বৃষ্টি খানিক ধরেছে, তবে এলোপাথাড়ি হাওয়ায় কনকনে ভাব। কুঁকড়ে যাচ্ছে শরীর। এ বার ঠিকানা মিলিয়ে শেষ ডেলিভারির জন্য একটা কমপ্লেক্সের মধ্যে বাইক ঢোকালাম। উচ্চবিত্ত এলাকা। সিকিয়োরিটির ঘর থেকেই ফোন গেল কাস্টমারের ফ্ল্যাটে। একটু পরেই এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে হইহই করে নেমে এল সিঁড়ি বেয়ে। সুন্দর, ফুটফুটে, পাঁচ থেকে আটের মধ্যে বয়স সবার। আমার চোখ খুঁজে চলে সেই মিষ্টি স্বরের মেয়েকে। এক জনের মাথায় গোলাপি ফিতে, সাদা গাউন পরে আগে আগে আসছে। নিশ্চয়ই ও। ধারণা অভ্রান্ত। সামনে এসে এক গাল হাসি, ‘‘এসেছ? খুব খিদে পেয়ে গিয়েছিল জানো? এ মা, তুমি তো পুরো ভিজে গেছ আঙ্কেল,’’ বলতে বলতেই একটা ছোট্ট ব্যাগের ভিতর থেকে সাবধানে কয়েকটা নোট বার করে দিল, ‘‘দামটা গুনে নিও, মা বলেছে।’’

আমি হাসি, ‘‘স্যরি মামণি। তোমাদের খাবার দিতে বড্ড দেরি করে ফেললাম।’’

‘‘ইট’স ওকে আঙ্কেল। মাকে বলব তোমায় একটা শুকনো জামা দিতে?’’

‘‘না গো, তোমরা খাবারগুলো নিয়ে ওপরে যাও। না হলে ঠান্ডা হয়ে গেলে ভাল লাগবে না।’’ 

আবার হইহই করে সবাই ছুটল সিঁড়ির দিকে। আমি বাইকের মুখ ঘোরালাম। ব্যস, দায়িত্ব শেষ। এ বার গন্তব্য নিজের ঘর। খিদেও পেয়েছে ভীষণ, সেই কোন সকালে মুখে দু’টো ফেলেছিলাম। গেট দিয়ে বেরিয়েই পড়েছিলাম, সিকিয়োরিটি ডাকল, ‘‘এই যে ভাই, ম্যাডাম ফোন করেছেন। আপনাকে অপেক্ষা করতে বলছেন।’’ 

সেরেছে! আবার ফ্যাকড়া! মুখ শুকিয়ে গেল। হয়তো বলবে খাবার আনতে আনতেই তো ঠান্ডা! হঠাৎ পিছনে তাকাতেই দেখি আবার সেই  ছোট্ট মেয়েটি ছুটে আসছে। সাদা গাউন সামলে হাঁপাতে হাঁপাতে কাছে এসে একটা খাবারের প্যাকেট হাতে তুলে বলে, ‘‘মা বলল, এটা তুমি নিয়ে যাও।’’

‘‘সে কী! কেন? এগুলো তোমাদের।’’ 

‘‘আমাদের অনেক আছে। এটা তুমি নাও। খাবার ভাগ করে খেলে বেশি বেশি আনন্দ হয়। মা বলেছে,’’ খুদে খুদে দাঁত বার করে মেয়েটি হাসছে। ‘‘আর শোনো, ওই ভেজা জামা এখনই পাল্টে এটা পরে ফেলো। জামাটা পরে ফেরত দিলেও চলবে, না দিলেও চলবে। এটা বাবা বলেছে।’’  

হতবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। চোখের কোলে নোনা জল জমতে শুরু করেছে, বেশ বুঝতে পারছি। কী আশ্চর্য, এই মেয়েটি আর তার পরিবার কি নতুন পৃথিবীর মানুষ? 

খাবারের প্যাকেট আর জামা এক হাতে ধরে, অন্য হাতটা অজান্তেই উঠে এল ওর মাথার উপর, ‘‘ভাল থেকো মামণি। কী নাম তোমার?’’

‘‘পেখম,’’ বলেই ও ছুট দিল নিজের ফ্ল্যাটের দিকে। 

সিকিয়োরিটির ঘরে ঢুকে পোশাক বদলালাম। শুকনো জামা গায়ে পড়তেই ভিতরে অদ্ভুত এক উষ্ণতা। আহ্‌! 

রেনকোটটাকেও চাপিয়ে নিলাম ওপরে। তার পর খাবারের প্যাকেটটাকে মাঝখানে নিয়ে সাবধানে বাইক চালাতে শুরু করলাম। যেতে যেতে আবার ফোন। রিংটোনেই বুঝলাম, মিতা। কিন্তু এখন ওই ফোন ধরার সময় নেই। খুব সাবধানে পথটা পেরোতে হবে। মূল্যবান কিছু নিয়ে চলেছি আমি মিতার জন্য।  

বৃষ্টি থেমে গিয়েছে অনেক ক্ষণ। বাদুলে মেঘও উধাও, কী আশ্চর্য, ঠেলেঠুলে একটা চাঁদও উঠেছে আকাশে। খেল দেখাল বটে আজ আকাশটা! আমরা দু’জনে এখন জানলায় বসে দেদার গল্পে মেতেছি। হাসনুহানা ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। স্বপ্ন-স্বপ্ন খেলাটাও চলেছে পুরোদমে। মিতা এক সময় চোখ বুজে বলে, ‘‘তুমি কী ভাল! আস্ত ঝরনাটাই যেন নিয়ে এলে আমার কাছে! জানো, পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি আজ ঝরনার গান। কান পাতো, তুমিও শুনবে। কী মিহি সুর! ঠিক আমাদের ঘরের পাশে। আচ্ছা, ঝরনাটার কী নাম দেব বলো তো?’’ 

আমি ফিসফিস করে বলি, ‘পেখম’।