লেখক এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অন্যতম জীবনীকার মিহির বসুর সম্প্রতি প্রকাশিত বই— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ গুপ্তচরের কাহিনি— যে দিন হাতে এল, মনটা উদাস হয়ে গেল। কারণ এই ব্যক্তিটিকে আমি ১৯৬১ সাল থেকে চিনতাম। তাঁর কার্যকলাপের কাহিনি পড়ে বিস্মিত হইনি, কারণ সেই প্রথম পরিচয়ের সময়ই আমি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁর বিশ্বাসঘাতকতার কথা মোটের উপর জানতাম। লেখক মিহির বসু গবেষণা করে বিভিন্ন দেশের সংগ্রহশালায় রক্ষিত নথিপত্র থেকে এই বিশ্বাসভঙ্গের কাহিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ তুলে ধরেছেন। ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরী এঁকে আখ্যা দিয়েছেন গুপ্তচরদের রাজপুত্র, ‘প্রিন্স অ্যামাং স্পাইজ’। ইংরেজরা এঁর ছদ্মনাম দিয়েছিল ‘সিলভার’। নেতাজির সহযোগী হিসেবে ছদ্মনাম ছিল রহমত খান। আসল নাম ভগতরাম তলওয়ার, পেশওয়ার থেকে কাবুল পর্যন্ত নেতাজির যাত্রাসঙ্গী। বইটি আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল প্রায় ষাট বছর আগে এক দিনে, যে দিন ভগতরামের সঙ্গে উডবার্ন পার্কের বাড়িতে আমার প্রথম পরিচয় হয়।

নেতাজি সুভাষচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ রাজনীতিক সহকর্মী এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের সহযোদ্ধারা অনেকে প্রথমে আমাদের উডবার্ন পার্কের বাড়িতে ও পরে ‘বসুন্ধরা’ গৃহে অতিথি হয়ে থেকেছেন। এঁদের সকলের অভিজ্ঞতা শিশিরকুমার বসু নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো-র জন্য লিপিবদ্ধ করছিলেন। ১৯৬০-এর গোড়া থেকে এই কাজটি চলছিল। সম্প্রতি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার নেতাজি সংক্রান্ত যে সব ফাইল প্রকাশ করেছেন তাতে দেখা গিয়েছে, তদানীন্তন স্বাধীন ভারত সরকার রিসার্চ ব্যুরোর এই কার্যকলাপে শিশিরকুমার বসুর প্রতি সন্দিগ্ধ, এবং নজরদারিও রাখছেন। এর কী কারণ তা বোধগম্য নয়। কারণ কাজটা ছিল নিতান্ত অ্যাকাডেমিক, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজির অবদান সংরক্ষণ করা এই প্রচেষ্টার একমাত্র উদ্দেশ্য।

আরও পড়ুন: মৃত্যুর আগে রামায়ণ পড়তে চাইলেন মুঘল সম্রাজ্ঞী

এই সূত্রে আমার অতিথি হয়ে উডবার্ন পার্কে যিনি প্রথম এলেন তাঁর নাম ভগতরাম তলওয়ার। শিশিরকুমার আমাকে বললেন, ‘‘এক জন অতিথিকে কয়েক দিন তোমার দেখাশোনা করতে হবে। আমি জানি, ইনি আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। এঁরই কারণে রাঙাকাকাবাবুর মহানিষ্ক্রমণে আমার ভূমিকা ইংরেজ গোয়েন্দারা জেনে যায় ও আমি লাহৌর ফোর্টে বন্দি হই, পেশওয়ারে মিয়া আকবর শাহ, আবাদ খানও ধরা পড়েন। কিন্তু সে সব কথা এখন থাক। ভগতরাম পেশওয়ার থেকে কাবুল যাত্রায় ও তার পর চল্লিশ দিনের বেশি কাবুলে নেতাজির সঙ্গী ছিলেন, সে সময়ের কথা তাঁর মুখ থেকে লিপিবদ্ধ করতে চাই ঐতিহাসিক প্রয়োজনে। তিনি আমাদের অতিথি, যত্নের যেন কোনও ত্রুটি না হয়।’’

ইতিহাস: নেতাজি ভবনে ১৯৭৩ সালে সম্মেলনে আমন্ত্রিত ভগতরাম ও অন্যরা। দু’-এক জন ছাড়া তখনও কেউ তাঁর কীর্তিকলাপ সম্পর্কে বিশদে জানতেন না।

এর পর এক ছোটখাটো চেহারার ভদ্রলোক— বেশ সদালাপী, সুন্দর ব্যবহার— এসে হাজির হলেন। আমি তাঁকে মাছের ঝোল-ভাত খাওয়াতাম, আমার বালক পুত্র সুগতর সঙ্গে গল্প আর খেলা করে দিন কাটাতেন। শিশিরকুমার রাতে ওঁর সঙ্গে বসতেন, সামনে ছোট অলিভেত্তি টাইপরাইটার। ভগতরাম বলে চলেছেন, টাইপ করছেন শিশির বসু, আমি নীরব দর্শক। মনে পড়ে, ড. বসু ওকে অনেক বার জিজ্ঞেস করলেন, নেতাজি ইতালীয় দূতাবাসের সাহায্যে কাবুল ছেড়ে চলে গেলেন, তার পর আপনি কী করছিলেন। উনি ভাসা ভাসা জবাব দিতেন যে উনি ওই জনজাতি এলাকাতে বারবার যাতায়াত করতেন। ভগতরামের সঙ্গে কথা হল, তাঁর রেকর্ড করা বক্তব্য এখন প্রকাশ করা হবে না, পরে শিশিরকুমারের সঙ্গে গোমো অবধি যাত্রা, পেশওয়ারে মিয়া আকবর শাহের বক্তব্য ইত্যাদি একসঙ্গে করে প্রকাশিত হবে।

মাঝে বেশ কিছু দিন কেটে গেল। পাকিস্তান অনুমতি না দেওয়াতে অনেক চেষ্টাতেও মিয়া আকবর শাহকে ভারতে আনা সম্ভব হল না। ১৯৭৩-এ নেতাজি ভবনে নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো আয়োজিত প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশবিদেশের ঐতিহাসিকরা একত্র হলেন। আমাদের আমন্ত্রণে ভগতরামও যোগ দিলেন। শিশিরকুমার তাঁর ‘গ্রেট এসকেপ’ পেপারটি পড়লেন, ভগতরাম ‘নেতাজির সঙ্গে পঞ্চান্ন দিন’ বক্তব্যটি পেশ করলেন। জার্মানি থেকে এসেছিলেন ডিয়েটার উইটজেল, তিনি ছিলেন কাবুলে জার্মানির ভারপ্রাপ্ত এজেন্ট। বহু কাল বাদে ভগতরামকে দেখে ক্রুদ্ধ উইটজেল শিশির বসুকে বলেন, ‘‘এই লোকটিকে কেন ডেকেছেন? এর বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকা আপনার অজানা নয়।’’ সম্মেলনে চেকোস্লোভাকিয়ার ইতিহাসবিদ মিলান হাউনার উপস্থিত ছিলেন। হাউনার-ই প্রথম তাঁর বই ‘ইন্ডিয়া ইন অ্যাক্সিস স্ট্র্যাটেজি’-তে ভগতরামের গুপ্তচরবৃত্তির কথা প্রকাশ করেন। মিহির বসু তাঁর বইতে উডবার্ন পার্কের বাড়ির ডিনারে মিলান হাউনার এবং অন্যান্য দেশবিদেশের ঐতিহাসিক-পরিবৃত ভগতরামের একটি ছবি ছেপেছেন।

মিহির বসু লিখেছেন, নেতাজির জীবনী ‘লস্ট হিরো’ লেখার সময়েই তাঁর ভগতরাম সম্পর্কে সন্দেহ হয়। তিনি দেখেন, মহানিষ্ক্রমণের সকল সঙ্গী গ্রেফতার হয়ে কারাগারে নির্যাতিত অথচ ভগতরাম এক দিনের জন্যও জেলে যাননি। ভগতরাম বলেছিলেন, তিনি জনজাতি অঞ্চলে ছিলেন বলে ইংরেজরা তাঁকে ধরতে পারেনি। প্রথম এই বিশ্বাসভঙ্গে আলোকপাত করেন হাউনার। তাঁর বইয়ে তিনি ভগতরামকে বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত, ব্রিটিশ, জার্মান ও ইতালিয়ান (এবং অবশ্যই নেতাজির আন্দোলন), এই চার পক্ষের গুপ্তচর হিসেবে প্রতিপন্ন করেন। তাঁর ভাষায় ভগতরাম ‘কোয়াড্রুপল এজেন্ট’। আমি আনন্দবাজার পত্রিকায় বইটির সমালোচনা লিখি। বইটির ব্যাপ্তি বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তিতে ভারতের ভূমিকা, ভগতরামের বিশ্বাসঘাতকতার সামান্য উল্লেখ অবশ্য ডকুমেন্ট-ভিত্তিক। পুস্তক সমালোচনায় সেই সামান্য উল্লেখের কথা বলেছিলাম। আমার লেখার কথা জানতে পেরে ভগতরাম অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন, তবে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। দিল্লি গেলে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন।

মিহির বসুর বই পড়ে দেখছি, নেতাজির ইংরেজ জীবনীকার হিউটয় হাউনারকে এই বিশ্বাসভঙ্গের কথা প্রকাশ করতে নিষেধ করেছিলেন। তাঁর কথা মেনে হাউনার এত বড় চাঞ্চল্যকর আবিষ্কার মাত্র একটি লাইনে পরিবেশন করেন। ব্রিটিশ পাবলিক রেকর্ডস অফিসে জনজাতি সংক্রান্ত ফাইল দেখতে গিয়ে হাউনার ইংরেজ সরকারের কাছে ভগতরামের স্বীকারোক্তি দেখে ফেলেন। নভেম্বর ১৯৪২-এ লাহৌর পুলিশকে দেওয়া ওই স্বীকারোক্তি এই ফাইলে থাকার কথা নয়। জানতে পেরে হিউটয় রেকর্ডস অফিসকে ফাইলটি বন্ধ করে দিতে পরামর্শ দেন। কাবুলে ইতালিয়ান রাষ্ট্রদূত পিয়েত্রো কোয়ারনির হয়েও ভগতরাম কাজ করেছেন। যুদ্ধের শেষ দিকে জাপানকে ধরলে তিনি ‘কুইন্টুপল এজেন্ট’, পাঁচটি সরকারের হয়ে চরবৃত্তি করেছেন!

সুভাষচন্দ্র তাঁকে একান্ত বিশ্বাস করে নানা রকম মেসেজ পাঠিয়ে চলেছেন, আর ভগতরাম তাঁর সঙ্গে ছলনা করে চলেছেন। সবচেয়ে বোকা বানিয়েছেন জার্মানদের, নেতাজির সঙ্গী ‘রহমত খান’কে বিশ্বাস করে তাঁরা প্রচুর অর্থ তাঁকে দিচ্ছেন, ‘আয়রন ক্রস’ নামে জার্মানির সর্বোচ্চ মিলিটারি সম্মানও। কিন্তু রহমত খান জার্মানদের দেওয়া শক্তিশালী ট্রান্সমিটার নিয়ে দিল্লির বড়লাট সাহেবের বাড়ির বাগানে বসে বার্লিনের সিক্রেট সার্ভিসকে নানা ভুল তথ্য পাঠিয়ে বিভ্রান্ত করছেন। মিহির বসু লিখছেন, ভগতরাম তলওয়ার ছিলেন কমিউনিস্ট, তাঁর আনুগত্য ছিল সোভিয়েত রাশিয়ার প্রতি। নেতাজি তাঁকে বিশ্বাস করে যে সব খবর পাঠাতেন তা প্রথমেই চলে যেত রাশিয়ার হাতে। পরে ‘সিলভার’ নামধারী এজেন্ট হয়ে সেই খবর পাচার করতেন ব্রিটিশদের। এ কথা সর্বজনবিদিত যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম সমর্থন করেননি। রাশিয়ার প্রতি আনুগত্যে তাঁরা নেতাজি সম্পর্কে নানা হাস্যকর মন্তব্য করেছেন। পরবর্তী কালে ভুল স্বীকারও করেছেন। আমার মনে আছে, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর জ্যোতি বসু নেতাজির জন্মদিনে নেতাজি ভবনের অনুষ্ঠানে প্রথম যোগ দেন। বক্তৃতায় তিনি বলেন, নেতাজি সম্পর্কে মূল্যায়নে তাঁদের ভুল হয়েছিল। মিয়া আকবর শাহকে পাকিস্তান অনুমতি না দেওয়ায় কিছুতেই আমরা তাঁকে ভারতে আনতে পারিনি। দৈবচক্রে ১৯৮৩ সালে ইংল্যান্ডে তাঁর সঙ্গে দেখা, ইংল্যান্ড-প্রবাসী পুত্র জাফর শাহের কাছে এসেছিলেন। শিশিরকুমার বসু ও আমি আমাদের পুত্র, কেমব্রিজের ছাত্র সুগতকে দেখতে যাই। একেবারেই আকস্মিক যোগাযোগ। আকবর শাহ হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ইংরেজরা বিশ্বাস করবে না, ভাববে এটা আমাদের চক্রান্ত। সেই সময় ভগতরাম সম্পর্কে তাঁর সঙ্গে অনেক কথা হয়। পরে তিনি তাঁর লিখিত বয়ান নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর জন্য পাঠিয়ে দেন। আকবর শাহ আমাদের বলেন, নেতাজির পেশওয়ার থেকে কাবুল যাওয়ার সব ব্যবস্থা আমি করে ফেলেছি, এমন সময় ভগতরাম দেখা করতে আসেন। নেতাজির যাত্রাসঙ্গী হওয়ার জন্য আমাকে খুব পীড়াপীড়ি করতে থাকেন। তাঁকে নেব না বলাতে অত্যন্ত অভিমান প্রকাশ করেন। আমি একটু আশ্চর্য হলেও এ রকম বিপজ্জনক যাত্রায় তিনি যেতে চান দেখে খুশিও হয়েছিলাম, বিশেষত ভগতরাম শহিদ পরিবারের ছেলে। তাঁর দাদা হরিকিষানকে ইংরেজরা ফাঁসি দিয়েছিল। শেষে দ্বিধা কাটিয়ে ভগতরামকে সঙ্গী করলাম।

আকবর শাহ বলেন, ভগতরাম এক বারও গ্রেফতার না হওয়াতে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি নিজে ১৯৪২-এর ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার হন। বিপ্লবীদের নেটওয়ার্কও অবশ্য কম শক্তিশালী নয়। সুদূর দাক্ষিণাত্যের জেলখানা থেকে পাঠানো গোপন চিঠিতে শরৎচন্দ্র বসু শিশিরকে জানান, নেতাজির মহানিষ্ক্রমণে শিশিরের ভূমিকা ব্রিটিশ সরকার জেনে ফেলেছে। শিশিরকুমার বুঝতে পারেন, একটা বড় রকমের বিশ্বাসভঙ্গ ঘটেছে। ১৯৪২-এর অগস্ট থেকে বন্দিদশায় কখনও প্রেসিডেন্সি জেল, কখনও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কখনও উডবার্ন পার্কের বাড়িতে গৃহবন্দি হিসেবে শিশিরকুমারের দিন কেটেছে। মহানিষ্ক্রমণে তাঁর ভূমিকার জন্য গ্রেফতার করে তাঁকে লালকেল্লা ও লাহৌর ফোর্টে নিয়ে যাওয়া হয় বেশ কিছু দিন পর। পেশওয়ারে আবাদ খানের বাড়িতে নেতাজি পাঁচ দিন ছিলেন। আবাদ খান তাঁকে পাঠান আদবকায়দা শিখিয়েছিলেন। আবাদ খান লাহৌর ফোর্টে অকথ্য নির্যাতনের শিকার হন। পরে তিনি শরৎ বসুর কাছে রাগ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তিনি, শিশিরকুমার, আকবর শাহ সকলে গ্রেফতার হলেন অথচ ভগতরাম বিলাসবহুল দিন কাটিয়েছেন।

মিহির বসুর লেখা বইয়ের প্রচ্ছদে গুপ্তচর ভগতরাম ও তাঁর হ্যান্ডলার পিটার ফ্লেমিং

মিহির বসুর ‘সিলভার’ বইটি রোমাঞ্চকর থ্রিলারের মতো, তফাত হল এটি কাল্পনিক কাহিনি নয়। সিলভারের গতিবিধি বিভিন্ন দেশের ডকুমেন্টের উপর ভিত্তি করে লেখা। দেখা যাচ্ছে, মহাযুদ্ধের সময় দিল্লিতে সিলভারের হ্যান্ডলার ছিলেন ব্রিটিশ গুপ্তচর বিভাগের ডিসেপশন (ডি) ডি‌ভিশনের তরুণ অফিসার পিটার ফ্লেমিং। অক্সফোর্ড-শিক্ষিত পিটার  আবার জেমস বন্ড-এর স্রষ্টা ইয়ান ফ্লেমিং-এর দাদা।

এর আগে মিলান হাউনার এবং প্যাট্রিক ফ্রেঞ্চ এঁর সম্বন্ধে লিখেছেন। শিশিরকুমার বসু ‘গ্রেট এসকেপ’ বইটির পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন, তার পরিশিষ্ট অংশে ভগতরাম সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য অকপটে লিখেছেন। এঁদের সকলের লেখা থেকে দেখা যায়, ভগতরাম ১৯৭৬ সালে তাঁর নিজের যে আত্মকথা প্রকাশ করেন, সেখানেও তিনি অনেক অনৃতভাষণ ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য পেশ করেছেন।

মিহির বসুর বইটি পড়তে পড়তে একটা প্রশ্ন আমাকে ভাবাচ্ছে। নেতাজির সকল সহযোগী তাঁর মনোমুগ্ধকর ব্যক্তিত্বের কাছে একান্ত আত্মসমর্পণ করেছিলেন, ভগতরামের উপর সেই প্রভাব এতটুকুও পড়ল না? নেতাজির সহযোদ্ধারা সকলেই কোনও না কোনও সময়ে আমার গৃহে অতিথি হয়েছেন। সকলে বলেছেন, নেতাজির সঙ্গে কাটানো দিনগুলি তাঁদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। বহু কাল পরেও আবিদ হাসান, ধিলোঁ, লক্ষ্মী সেহগল, জানকী থেবর নেতাজির কথা বলতে গেলে চোখের জল সামলাতে পারেন না। পরবর্তী কালে যাঁরা পাকিস্তানের নাগরিক, যেমন মহম্মদ দারা, কর্নেল আরশাদ, নতুন রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্য করেছেন কিন্তু নেতাজির প্রতি তাঁদের আনুগত্য অটুট, এমনকী পরবর্তী প্রজন্মকেও প্রভাবিত করেছেন। একেবারে ঘরের কাছে দেখেছি শিশিরকুমার বসুকে; সেই কবে তরুণ শিশিরকে বলেছিলেন ‘‘আমার একটা কাজ করতে পারবে?’’ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সেই ‘কাজ’ করে গিয়েছেন। মনে পড়ে, আইএনএ-র মেহবুব আহমেদের কথা। তিনি বলেছিলেন, স্বাধীনতার পর তিনি অনেক মহৎ ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করেছেন— মহাত্মা গাঁধী, জওহরলাল নেহরু। টেলিভিশন-সাক্ষাৎকারে মেহবুব বলেন, ‘‘এক জন নেতার জন্যই আমি সহস্র বার জীবন দিতে পারি, তাঁর নাম নেতাজি সুভাষচন্দ্র।’’

নেতাজির সঙ্গে পঞ্চান্ন দিন ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে কাটাবার পর ভগতরাম কী করে ‘সিলভার’ হয়ে গেলেন! রাজনীতিক বাধ্যবাধকতার জন্যই সোভিয়েত রাশিয়ার প্রতি আনুগত্য? কিন্তু এতে রাশিয়ার তো বিশেষ লাভ হয়নি। সবচেয়ে লাভবান হয়েছে ব্রিটিশ সরকার। নেতাজির সব খবর তাঁদের কাছে পাচার করেছেন ‘সিলভার’। অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে স্বদেশের বিপ্লবীদের, আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেতাজির সংগ্রাম। ভগতরাম তলওয়ার ক্ষমার যোগ্য কি না, ইতিহাস বিচার করবে।