এই প্রস্তাব যৎকালে প্রথম প্রচারিত হয়, তৎকালে আমার এই দৃঢ় সংস্কার ছিল যে এতদ্দেশীয় লোকে, পুস্তকের নাম শ্রবণ ও উদ্দেশ্য অবধারণ মাত্রেই, অবজ্ঞা ও অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করিবেন, আস্থা বা আগ্রহ পূর্ব্বক গ্রহণ ও পাঠ করিবেন না; সুতরাং পুস্তকের সঙ্কলন বিষয়ে যে পরিশ্রম করিয়াছি সে সমুদায় নিতান্ত ব্যর্থ হইবেক। কিন্তু, সৌভাগ্যক্রমে, পুস্তক প্রচারিত হইবামাত্র, লোকে এরূপ আগ্রহ প্রদর্শন পূর্ব্বক গ্রহণ করিতে আরম্ভ করিলেন যে, এক সপ্তাহের অধিক কাল মধ্যেই, প্রথম মুদ্রিত দুই সহস্র পুস্তক নিঃশেষে পর্য্যবসিত হইয়া গেল। তদ্দর্শনে উৎসাহান্বিত হইয়া, আমি আরও তিন সহস্র মুদ্রিত করি। তাহারও অধিকাংশই, অনধিক দিবসে, বিশেষ ব্যগ্রতা প্রদর্শন পূর্ব্বক পরিগৃহীত হয়। যখন এরূপ গুরুতর আগ্রহ সহকারে সর্ব্বত্র পরিগৃহীত হইয়াছে, তখন এই প্রস্তাবের সঙ্কলন বিষয়ে যে পরিশ্রম করিয়াছিলাম, আমার সেই পরিশ্রম সম্পূর্ণ সফল হইয়াছে, সন্দেহ নাই।’’

‘বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিৎ কিনা তদ্বিষয়ক প্রস্তাব’-এর (দ্বিতীয় পুস্তক, অক্টোবর ১৮৫৫) সূচনায় বিদ্যাসাগরের উচ্ছ্বাস এ ভাবেই ব্যক্ত হয়েছিল। এর চোদ্দো মাসের মধ্যেই আইন অনুমোদন ও প্রথম বিধবা বিবাহের অনুষ্ঠান— ৭ ডিসেম্বর ১৮৫৬-য়। আইনসিদ্ধ হওয়ায় বিধবার বিবাহে আর বাধা রইল না, বিভিন্ন জায়গা থেকে আসতে থাকে বিধবা বিবাহের খবর। অমৃতবাজার-এর মতো হিন্দু ধর্মের প্রতি নিষ্ঠ পত্রিকাও সোৎসাহে এমন সব বিবাহের খবর ছাপতে কসুর করেনি— ‘২৪ শে কার্ত্তিক রবিবার রাত্রি প্রায় সাড়ে আটটার সময় শ্রীযুক্ত বাবু ব্রজসুন্দর মিত্র মহাশয়ের ঢাকাস্থ বাসাবাটীতে একটী বিধবা বিবাহ হইয়া গিয়াছে। বরের নাম শ্রীযুক্ত নবকুমার বিশ্বাস, বয়স প্রায় ২৬ বৎসর। পাত্রীর নাম শ্রীমতী ভুবনময়ী দেবী, বয়স প্রায় ২০ বৎসর। ১৫/১৬ বয়ঃক্রমের সময় ইনি বিধবা হন।’ (১৯ নভেম্বর ১৮৬৮)

মাঝে মাঝে আবার বিজ্ঞাপনও প্রচারিত হয়েছে অমৃতবাজার পত্রিকাতেই, এই কায়দায়: ‘রাঢ়ী শ্রেণী অতি প্রধান ব্রাহ্মণ বংশীয় একটি বিধবা কন্যা বিবাহ করিতে সম্মত আছেন। বয়ঃক্রম ১৭ বৎসর, পরমা সুন্দরী লেখাপড়া অল্প জানেন। ৮ বৎসর বয়ঃক্রম কালে বিধবা হয়েন ও কন্যার কর্ত্তৃপক্ষেরা সম্মত আছেন।’ (১৮ নভেম্বর ১৮৬৯)

‘বিধবা সধবা করা পথ প্রদর্শক’ শ্রীশচন্দ্রকে স্ত্রীর মৃত্যুর পর রীতিমতো প্রায়শ্চিত্ত করেই জাতে উঠতে হয়েছিল

সন্দেহ নেই বিদ্যাসাগরের উদ্যোগ সর্বত্র সাড়া ফেলেছিল। প্রথম বিধবা বিবাহ বিষয়ক পুস্তকের দ্বিতীয় বারের বিজ্ঞাপনে (১ আশ্বিন, সংবৎ ১৯১৪) বিদ্যাসাগর মশাই লিখছেন, যে উদ্দেশে এই পুস্তকের প্রচার ‘তাহা একপ্রকার সফল হইয়াছে, বলিতে হইবেক’ কারণ যাঁরা ‘বিদ্বেষহীন ও পক্ষপাতশূন্য হৃদয়ে’ আদ্যোপান্ত পাঠ করেছেন, বিধবা বিবাহের শাস্ত্রীয়তা নিয়ে তাঁদের অনেকেরই সংশয়চ্ছেদন হয়েছে। ‘তৃতীয় বারের বিজ্ঞাপন’-এ (১৫ জ্যৈষ্ঠ, সংবৎ ১৯১৯) লিখেছেন, দ্বিতীয় বারের মুদ্রিত সব বই-ই শেষ, তাই ‘পুনরায় মুদ্রিত হইল’।

করুণাসাগরের এই আত্মতৃপ্তি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সামগ্রিক ভাবে বঙ্গবিধবারা বিবাহের সুযোগ কত দূর পেলেন, বিদ্যাসাগরের জন্মের দ্বিশতবর্ষে সেই আলোচনাও আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একটি বিশেষ শ্রেণির মধ্যে এর সীমাবদ্ধ থাকার কথা সে কালের কাগজে বার বার এসেছে। ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ (১৯ অগস্ট ১৮৭৬) স্পষ্টই লিখেছিল, নতুন আইনে বিধবা বিবাহের উদ্দেশ্য সাধিত হচ্ছে না। তন্তুবায়, নাপিত, ধোপা প্রভৃতিদের মধ্যে লোকসংখ্যা কমছে। ‘বিধবা বিবাহানুরাগী নব্য সম্প্রদায় উচ্চ শ্রেণীর মধ্যে বিধবাবিবাহ প্রচলন করিতে এত দিন যত আয়াস স্বীকার ও অর্থ ব্যয় করিয়াছেন, যদি শিল্প ও শ্রমজীবী লোকের হিতার্থে সেই প্রকার আয়াস স্বীকার ও অর্থ ব্যয় করিতেন’ তা হলে কাজের কাজ হত। উচ্চশ্রেণিতে এই ব্যয় আসলে ‘মরুভূমে জলসিঞ্চনের’ মতো। যে অমৃতবাজার পত্রিকা বিধবা বিবাহের এত খবর বা বিজ্ঞাপন ছেপেছে, তারাই আবার লিখেছে (১১ মার্চ ১৮৬৯), অনুসন্ধান করলেই জানা যাবে যে ‘কুকাণ্ডের হেতু বিধবারা’ এবং ‘লাম্পট্য দোষ এত প্রচলিত হইবার প্রধান কারণ বিধবা দিগের বিবাহ না দেওয়ায়... কত প্রধান লোকে বাধ্য হইয়া আপনার কন্যা, কি ভগ্নির উপপতি আপনি যোগাইতেছেন— তবু, সমাজের ভয়ে বিধবাবিবাহ দিতে পারেন না।’ শেষে সংযোজন— বহু ব্রাহ্মণ-প্রধান গ্রাম স্ত্রীলোক শূন্য। বিধবা বিবাহ প্রচলন ছাড়া তাদের আর উপায় নেই। তা চালু হলে কনের বাজার সস্তা হবে ও ‘তাঁহাদের বংশ রক্ষার উপায় হইবে।’

আসলে ওই ‘সমাজভয়’টি কাটিয়ে ওঠা তো সহজ ছিল না। ‘সুরধুনী কাব্য’য় উল্লিখিত ‘বিধবা সধবা করা পথ প্রদর্শক’ শ্রীশচন্দ্রকে স্ত্রীর মৃত্যুর পর রীতিমতো প্রায়শ্চিত্ত করেই জাতে উঠতে হয়েছিল। মেদিনীপুরে কেদারনাথ দাসের ‘প্রযত্নে’ ও উৎসাহে হৃদয়নাথ দাসের ছোট ভাইয়ের সঙ্গে যে বিধবার বিবাহ হয়েছিল, ‘সোমপ্রকাশ’ (১৪ মার্চ ১৮৬৪) লিখেছে, পরে তা একেবারেই ‘নির্ব্বাণ প্রাপ্ত’ হয়েছিল। কেদারনাথ ক’দিন পরই প্রায়শ্চিত্ত করে ঘোষণা করেন যে তিনি ভাইয়ের আবার বিয়ে দেবেন এবং ওই বিধবাকে তাঁরা ‘ত্যাগ’ দিলেন। দুঃখের কথা, বিধবাটির ভাইও সপরিবারে প্রায়শ্চিত্ত করে সভামধ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে, ‘আমি ভগিনীকে একেবারে ত্যাগ করিলাম।’ এই তো অবস্থা! আর বাঙালি বিধবারা এর অসারতা অনেক আগেই বুঝে গিয়েছিলেন। সে কালের প্রহসনগুলোয় তাঁদের সেই অনুভূতির অজস্র নমুনা পাই। ‘বেশ্যা বিবরণ নাটক’-এ (১২৭৬ বঙ্গাব্দ) লেখক তাই তো সুধামুখীর মুখ দিয়ে বলালেন— ‘জবন কূলেতে জন্ম গ্রহণ করিব। স্বামীহীন হলে পুনর্বিবাহ করিব। হিন্দু কূলে জন্ম আর নাহিক লইব। হিন্দু কূলে মনুষ্য নাহিক এক জন।...’ এই অমৃতবাজার পত্রিকাই (২০ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৮) ‘কুলকামিনীগণ কি নিমিত্ত কুৎসিত বেশ্যাবৃত্তি’ গ্রহণ করে তার কারণ অনুসন্ধানার্থে প্রায় ২০০ বেশ্যার ‘পরিচয়’ নিয়ে গুটিকয়েক ছেপেছিল। বিচিত্র তাঁদের অভিজ্ঞতা। স্বামীর মৃত্যুর পর ইচ্ছা বাগদীকে তাঁর শাশুড়ি এক বেশ্যার কাছে বেচে দেন। বিধু, গয়া, আহ্লাদী বা স্বর্ণ-র মতো মেয়েরা ‘লাইনে’ আসেন স্রেফ স্বামী হারিয়ে, খাওয়া-পরার জন্য। বামা বা হরমণি গোয়ালার মতো মেয়েরা আবার বিধবা হয়ে কারও প্রেমে পড়েন, যারা তাদের কুলটা করে। আর গতি না থাকায় শেষে বেশ্যাবৃত্তি। ব্রহ্ম কৈবর্ত্ত বলেই ফেলেন— ‘বিধবার যন্ত্রণা সহ্য করিতে না পারিয়া কুলে’ কলঙ্ক দেন। সবাই তাঁকে পরিত্যাগ করায় অগত্যা এই পেশায় নামা। লক্ষ্মী নাপিত স্বীকারই করেন ‘এয়েছিলাম হইয়াছিল ভাল, কারণ বিধবার কষ্ট সহ্য চেয়ে বেশ্যা হওয়া ভাল।’ সত্যিই বেশ্যা হয়ে তাঁরা বোধহয় সুখে ছিলেন। ওই ‘বেশ্যা বিবরণ নাটক’-এই সুধামুখী বলছেন— ‘হইয়ে বিধবা দুক্ষে কত দিন গেল।। বেশ্যা হইয়ে কিঞ্চিৎ সুখ হয়ে ছিল।’

তবে সুখের এই পথ তো আবার সকলে ধরতে পারেননি। পাছে ‘কলঙ্ক’ লাগে তাই অনেকে আবার আত্মহননের মাধ্যমে চিরশান্তির পথটি বেছে নেন। মনে পড়ছে কুসুমকুমারী নামের সেই মেয়েটির কথা, লম্বা এক চিঠি লিখে আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করেন। ১৮ বছরের এই বিধবাটি লিখছেন, ‘‘অধিকদিন আর বাঁচিয়া থাকিলে পাছে আবার জীবনে কলঙ্ক হয়, এই লজ্জায় আমি আত্মহত্যা করিলাম।’’ হাজার টাকার দুটো কোম্পানির কাগজ রেখে যান বোন কদমের জন্য, ভাইয়ের স্ত্রীকে গলার চিক। বাড়ি ইত্যাদি দেন মা’কে। নিজের পারলৌকিক কাজের খরচও রেখে যান কুসুম। ‘সুলভ সমাচার’ (১৯ অক্টোবর ১৮৭৫) লিখেছিল— ‘‘যাঁহারা বিধবা বিবাহের বিরোধী তাঁহারা কুসুমকুমারীর পত্রখানি পড়িয়া বুঝিতে পারিবেন যে, বিধবাদিগের কি ভয়ানক যন্ত্রণা।’’

স্বর্ণকুমারী, সরলা বা অবলাদের আমরা স্মরণ করি। কুসুমদের কণ্ঠস্বর অশ্রুতই রয়ে গেল। বিদ্যাসাগর কিন্তু অগণিত বিধবার যন্ত্রণায় কাতর হয়েই এই কাজে উদ্যোগী হয়েছিলেন। বিধবা বিবাহ বিষয়ক প্রথম পুস্তকের ভূমিকায় লিখেছিলেন— ‘বিধবাবিবাহের প্রথা প্রচলিত হইলে, অসহ্য বৈধব্যযন্ত্রণা, ব্যভিচার দোষ ও ভ্রূণহত্যাপাপের নিবারণ ও তিনকুলের কলঙ্ক নিরাকরণ হইতে পারে। যাবৎ এই শুভকরী প্রথা প্রচলিত না হইবেক, তাবৎ ব্যভিচার দোষের ও ভ্রূণহত্যাপাপের স্রোত, কলঙ্কের প্রবাহ ও বৈধব্যযন্ত্রণার অনল উত্তরোত্তর প্রবল হইতেই থাকিবেক।’

বিধবাবিবাহ আইনসম্মত হওয়ার পরেও ব্যভিচার দোষ আর ভ্রূণহত্যা— কোনওটাই কমেনি। প্রশমিত হয়নি বৈধব্যযন্ত্রণার অনল। সংবাদপত্রে বিধবা বিবাহের সংবাদ যত না ছিল, তার তিনগুণ ছিল বিধবার ‘কিস্‌সা’। কখনও দু-এক লাইনে— ‘‘শুনা গেল রাজাবাড়ী স্টেশনের অন্তর্গত রাউৎভোগ গ্রামে একটি সামান্য জাতীয়া বিধবার গর্ভ হওয়াতে সমাজভয়ে উহার আত্মীয়গণ ঔষধ প্রয়োগবশতঃ তাহা নষ্ট করে।...বিধবা বিবাহ না দেওয়ার এই বিষম ফল,’’ (রঙ্গপুর দিক্‌প্রকাশ, ২৬ নভেম্বর ১৮৬৮)— এই রকম। আবার কখনও বিশদে। তেমন দুটি মর্মস্পর্শী খবর একটু দেওয়া যাক। কোন্নগরে এক বিধবা চমৎকারী গোয়ালিনী গর্ভবতী হন দেবর উমেশের কৃপায়। উমেশ তাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েও আবার ফিরে এসে প্রতিবেশী গোপীনাথের কাছে ওঠে। তার পর বিপদ বুঝে এক রাত্রে শ্মশানঘাটের কাছে উন্মুক্ত জায়গায় ফেলে রাখে বেশ কয়েক দিন। চমৎকারী একটি মৃত কন্যাসন্তান প্রসব করেন। অবস্থা ক্রমশ খারাপ হলে উমেশ তাঁকে গরুর গাড়ি, নৌকোয় চাপিয়ে নিয়ে যায় কলকাতার ইডেন হাসপাতালে। হাসপাতালের লোকেরা বলেছেন, ‘তাহাকে এমন অবস্থায় তথায় আনা হয় যে, প্রসবের পর ৪/৫ দিন তাহাকে কেহ স্পর্শ করে নাই। তখন সে অতি অপরিষ্কার অবস্থায় ছিল।’ সাক্ষীরা আরও বলেন যে, ‘পুরুষের (পড়ুন উমেশের) সম্ভবতঃ খুব ইচ্ছা ছিল যে, স্ত্রীলোকটী ‘আর না থাকে’। হাসপাতাল-কর্মী রামচন্দ্র মিত্র, যিনি সুরতহাল করেছিলেন মৃত মেয়েটির, বলছেন ‘একটী পূর্ণগর্ভা স্ত্রীকে মাঠে... এবং বারান্ডায় হাওয়ায় ফেলিয়া রাখা’ কোনও সুসভ্য দেশে হয় না।’ সত্যিই তাই। না হলে কি আর উমেশের মোটে দু’বছরের কারাদণ্ড হয়! ‘সুপ্রভাত’ পত্রিকায় ১৮৯০-এ ধারাবাহিক ভাবে এই কাহিনিটি ছাপা হয়েছিল।

আর একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে কলকাতায়। ১৮৯১-এর ১৭ এপ্রিল ‘এডুকেশন গেজেট ও সাপ্তাহিক বার্ত্তাবহ’ পত্রিকায় এ রকম একটি খবর প্রকাশিত হয়: ‘‘গিরিজাসুন্দরী নামিকা একটী বিধবা ব্রাহ্মিকার হত্যা হইয়া গিয়াছে। অম্বিকাচরণ বসু নামক এক ব্যক্তি হত্যা করা স্বীকার করিয়াছে।’’ সমকালীন অন্যান্য পত্রিকা থেকে জানা যায়, বরিশাল বানরীপাড়ার গিরিজা ১১ বছরে বিধবা হন। পরবর্তী কালে অম্বিকার প্রেমে পড়েন, ‘গর্ভ হয়, পরে ভ্রূণহত্যা করে।’ ‘নব্যভারত’ সম্পাদক, সুপ্রসিদ্ধ ব্রাহ্ম দেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরী মেয়েটিকে ‘নিষ্পাপ’ করার জন্য কলকাতায় এনে হেদুয়ায় মিস নীল-এর স্কুলে লেখাপড়া শিখতে পাঠান। বরিশাল থেকে ১১২টি চিঠি লেখে অম্বিকা। শেষে উত্তেজিত হয়ে অম্বিকা কলকাতায় এসে এক রাতে বর্তমান বিধান সরণির ওপর, সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সামনে কুপিয়ে হত্যা করে গিরিজাকে। সে দিন কেবল এক জনই এগিয়ে এসেছিলেন তাঁর রক্ষার্থে, প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর বাবা মহেশ আতর্থী। এই গিরিজাকে নিয়েই দেবীপ্রসন্ন ‘মুরলা’ উপন্যাসটি লিখেছিলেন।
প্রেমাস্পদ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে এই দুশ্চিন্তায় বিধবা মেয়েটিই কখনও কখনও ভিলেনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বীরভূমের গোনাটিয়ার কাছে গনেড়া গ্রামের একটি বিধবা প্রতিবেশী এক যুবকের প্রেমে উন্মত্ত হলেন। গোল বাধল ছেলেটির বিয়ের প্রস্তাব এলে। মেয়েটি ভাবল, এ বার তো ছেলেটি তাকে ছাড়বে। এই শঙ্কায় হবু পাত্রীটিকে এক দিন সে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ‘গৃহ মধ্যে প্রবেশ করাইয়া, বস্ত্র দ্বারা মুখ আবৃত করিয়া গলায় লাঠি দিয়া নোড়া দ্বারা মস্তক চূর্ণ করিয়া’ প্রাণ নাশ করে। দেহ লোপাটের চেষ্টা করে শেষ অবধি ধরা পড়ে বলে ‘সোমপ্রকাশ’ লিখেছিল (২১ মার্চ ১৮৬৪)। 

হাতুড়ের ওষুধে ‘গর্ভ নষ্ট’ করতে গিয়ে কত বিধবার প্রাণ গেছে বলা শক্ত। নদিয়া বিভাগের আরক্ষা দফতরের কেবল ১৮৫৯-এর প্রতিবেদনেই এমন বেশ কয়েকটি খবর দেখেছি। বয়ান একই— 'a Hindoo widow, who had intrigued and became pregnant.' তার পর লোকলজ্জায় পাশের গ্রামের এক বৃদ্ধাকে তলব, যার ওষুধে গর্ভপাত হল বটে, তবে বিধবার জীবনের বিনিময়ে। না হলে আবার ‘স্ত্রীলোকের গর্ভে পদাঘাত করিয়া তাহার গর্ভপাত’ করা হত। ‘তাহাতে সন্তানের সহিত প্রসূতীর’ মৃত্যু হত। যেমনটি হয়েছিল কুমারখালির পাংসা স্টেশনের অধীন দক্ষিণবাড়ি গ্রামের সেই বিধবাটির (‘সংবাদ প্রভাকর’, ২৯ জুলাই ১৮৬৯)। অনেক ক্ষেত্রে গর্ভধারিণীও বিধবা কন্যার ‘বেয়াদপি’ মানেননি। দশ বছরের মেয়ে প্রতিমার জন্য ৫০/৬০ বছরের পাত্র। কয়েক মাসেই বিধবা। ক্রমে প্রতিমা ‘প্রলোভনে গ্রাম্য এক যুবকের প্রণয়ে পড়িয়া পাপসাগরে ডুবিল।’ সন্তানও হল। শিশুপুত্রকে মেরে ফেলার প্রস্তাবে মেয়ে রাজি না হওয়ায় তার ‘রাক্ষসী মা সমাজের ভয়ে গলায় পা দিয়া ছেলেটিকে মারিয়া’ ফেলে। অবশেষে ‘হতভাগিনী প্রতিমা জাহ্নবীবক্ষে ডুব দিয়া সংসারের জ্বালা যন্ত্রণা দূর’ করেছিল (‘হিতকরী’, ৫ সেপ্টেম্বর ১৮৯১)। ভিলেন তো অনেক ক্ষেত্রে নিজের দাদাও হতেন। ‘দেবগণের মর্ত্যে আগমন’ বইয়ের দৃশ্যটি মনে পড়ছে। রুদ্ধদ্বার এক ঘোড়ার গাড়ি থেকে শোনা যাচ্ছে এক মহিলার কান্না। নিজের দাদার কাছে তিনি জানতে চাইছেন তাঁকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যখন জানলেন বাগানে, অবাক হলেন। দাদা বলছেন, ‘‘তোর পেটের ওটাকে নষ্ট কর্‌তে হবে। নচেৎ ছেলে হলে কি মুখ দেখাতে পার্‌বি?’’ বরুণদেব ব্রহ্মাকে বলছেন, ‘‘কোন বাবুর বিধবা ভগ্নীর গর্ভ হইয়াছে, সেইজন্য বাগানে ভ্রূণহত্যা করিতে লইয়া যাইতেছেন।’’ ব্রহ্মার উত্তর, ‘‘এ সব শুন্‌লে পাপ, দেখ্‌লেও পাপ।’’

হতভাগিনীরা এ সবই ‘অদ্দেষ্ট’ বলে মেনে নিয়েছিলেন। জানতেন, ও সব বিধবার ‘বে’ হওয়ার নয়। সাধারণ ঘরে দু-চারটে যা হচ্ছিল তারই বা পরিণতি কী ছিল? ‘হিতৈষী’-তে (১০ ডিসেম্বর ১৮৯৫) একটি খবর দেখেছিলাম— জামতাড়ার এক ব্যক্তি এক বিধবাকে বিয়ে করেই তাকে কুলির আড়কাঠির কাছে বেচে দেয়। জোর করে স্বামী ও শাশুড়ি মিলে তাকে রেলে তুলে দেয়। মেয়েটি সর্দারের আশ্বাসেও কান্না থামায়নি। শেষে শ্রীরামপুরে এসে পুলিশকে জানালে তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এমন তো কতই হয়েছিল। তাঁরা বরং দায়ী করেন ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহকে। ‘বিধবাবিরহ’ (১৮৬০) প্রহসনে বিধবা মনোহরী চরিত্রটি বলছেন, বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ নিয়ে এত উদ্যোগ করলেন, বিধবারাও আনন্দে নেচে উঠলেন। দু’দিন যেতে না যেতেই সে আন্দোলনের জোর কমে গেছে— ‘এখন সেই সাগরের (পড়ুন বিদ্যাসাগরের) ঐরূপ তেজ ও কল্লোল কিছুই নাই— এখন কেউ তাঁর রবও শুন্তে পায় না... বিধবাদিগের বিরহ আগুনে বারিপ্রদান না করে ঘৃত ঢেলে দিয়াছেন, কিনা যে কর্ম্মেতে হাত দিলেন তাহা শেষ কর্ত্তে পাল্‌লেন না কেন?’ প্রহসন বলছে যখন এই সব হচ্ছে, তখনই ‘দুষ্ট নিমকহারাম সিপাইগণ’ খেপে উঠল, ফলে সব মাঠে মারা গেল। এটা ভেবেই অনেকে সন্তুষ্ট ছিলেন। হুতোম কিন্তু এমন ইঙ্গিত করেছিলেন— বিধবাবিবাহের আইন পাস ও বিধবাবিবাহ হওয়াতেই সিপাইরা খেপে ওঠেন। বাজারে রটেছে সরকার আইনটি তুলে নিয়েছেন, ‘বিদ্যেসাগরের কর্ম্ম গিয়েচে— প্রথম বিধবাবিবাহের বর শিরীশের (শ্রীশচন্দ্র) ফাঁসি হবে।’

আরও অনেক রকম খবর উড়ত। ‘রাড়ের বিয়ে ডিস্‌মিস্‌’-এ (১৮৬৭) প্রহসনকার বলছেন, বিধবার বিবাহ প্রচলিত করতে গেলে যেমন ‘ভ্রূণহত্যার হ্রাস হইবে, তেমন স্বামী হত্যা প্রবল হইয়া উঠিবে।’ ‘চপলা চিত্ত চাপল্য’-তে (১৮৫৭) যদুগোপাল চট্টোপাধ্যায় কামিনীর স্বামীর মুখ দিয়ে বলাচ্ছেন ‘পোড়া কি এক সাগর (বিদ্যাসাগর) তার জ্বালায় মাগ্‌ নে নিশ্চিন্তি হয়ে শোবার যো নাই। যে বিধবা বের বিধি দিয়েছে। এখন আবার মেয়েগুলোর মন যুগিয়ে চল্‌তে হবে, তা না কল্লে বিষ খাইয়ে কি আর কোন রকমে মেরে ফেলে আর একটা বে কর্ব্বে।’ আসলে ‘বুড়ো ভাতার’কে ‘খেয়ে’ কমবয়সি স্বামী পাওয়ার লোভেই নাকি মেয়েরা স্বামীহত্যা করবে।

কাজের কাজ হচ্ছে না বুঝেই ‘ভারত-সংস্কারক’ (২ অক্টোবর ১৮৭৪) এক মোক্ষম কথা লিখেছিল: ‘পূর্ব্বে বিধবাদিগের প্রতি সহমরণ ব্যবস্থা ছিল। অধিকাংশ বালবিধবা পতির সঙ্গে জ্বলন্ত চিতারোহণ করিয়া চিরজীবনের ক্লেশের শান্তি করিত। সহমরণ প্রথা যতই নিষ্ঠুর হউক না কেন, ইহা বেশ্যাবৃত্তি ও ব্যভিচার পাপের প্রাদুর্ভাব কথঞ্চিৎ নিবারণ করিত সন্দেহ নাই। এখন রাজাজ্ঞায় সহমরণ প্রথা রহিত হইয়াছে। ইহাতে বিধবার সংখ্যা বৃদ্ধি হইয়াছে। অথচ তাহাদের বিবাহের রীতি প্রচলিত হইতে পারে নাই। এরূপ অবস্থা যে বেশ্যাবৃত্তির প্রশ্রয় দান করিবে তাহা বিচিত্র নহে।’

একটি কথা মনে পড়ছে। সদ্য সহমরণ প্রথা রহিত হয়েছে। জানবাজারের বাড়িতে এক রাতে রাজচন্দ্র ‘হাসিতে হাসিতে স্বীয় পত্নী’ রাসমণিকে সে খবর দিচ্ছেন। জীবনীকার হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন, শুনে নাকি ‘সুমিষ্ট হাসি হাসিয়া’ রাসমণি উত্তর দেন: ‘‘সহমরণ প্রথায় আমাদের অনেক সুবিধাও ছিল। অসুবিধাও ছিল।... বড়লাট সাহেব সহমরণ প্রথা উঠাইয়া দিলেন ভালই বটে, কিন্তু বঙ্গ বিধবাদের পরিত্রাণের অন্যবিধ উপায় রহিল না। তাহারা যে কত কলঙ্করাশিতে কলঙ্কিত হইবে বলা যায় না।’’ ভাবলে অবাক লাগে। কোথায় ‘ভারত-সংস্কারক’ পত্রিকা আর কোথায় লেখাপড়া না-জানা এক গৃহবধূ। অথচ উপলব্ধিতে কী সাদৃশ্য! ওই লেখা ছাপার আগেই সার কথাটি হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলেন প্রখর বুদ্ধির অধীশ্বরী রাজচন্দ্র-জায়া। প্রথম বিধবা বিবাহের মাস দশেক আগেই তো ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ (২২ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৬) এক বিধবার মুখে এই সংলাপ বসানো হয়েছিল: ‘যাবজ্জীবন দুঃখানলে দগ্ধ হওয়া অপেক্ষা এক দিবস দগ্ধ হইয়া প্রাণবিনাশ করা কতই ক্লেশকর বল?’ 

আসলে সমস্যা তো সেই মানসিকতাতেই আবদ্ধ। বিশ শতকের সূচনায় ‘রঙ্গালয়’ পত্রিকা (৩ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৮) লিখেছিল, ‘‘স্বর্গীয় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ন্যায় পুরুষশ্রেষ্ঠ যখন সর্ব্বস্বপণ করিয়া বাঙ্গালায় বিধবাবিবাহ চাপাইতে পারেন নাই, তখন আপাততঃ বাঙ্গালায় কাজের মত কোন কাজই হইতে পারে না।’’ বিধবাবিবাহের প্রচলনে তাঁর ভূমিকা স্মরণে রেখে সমকালে রচিত গান— ‘বেঁচে থাক বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে’ তিনি শুনেছেন, তেমনই তার ব্যঙ্গরূপটিও— ‘শুয়ে থাক বিদ্যাসাগর চিররোগী হয়ে’ ঠাকুরদাস-তনয়কে শুনতে হয়েছিল। আইন প্রণয়ন বিদ্যাসাগরের অক্ষয় কীর্তি, কিন্তু দেড়শো বছর পেরিয়ে আজও কি তেমন ভাবে বিধবার বিবাহ ‘চাপাইতে পারা গিয়াছে’?