পলাশের জঙ্গল। ধু-ধু পাথুরে জমি। থেমে থেমে ডেকে উঠছে অচেনা পাখি। প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে পায়ের শব্দ। এরই মাঝে কান পাতলে শোনা যায় ঠকাং ঠক শব্দ। জঙ্গলে ঘেরা পথ ধরে এগোলেই চোখে পড়বে অজস্র কুয়ো। আড়াআড়ি বাঁশ বেঁধে ঝোলানো কপিকল। দেখে মনে হয় জল তোলা হবে। কিন্তু কোনও কুয়োতেই জল নেই। একটু অপেক্ষা করলেই দেখা যাবে, কপিকল বেয়ে উপরে উঠে আসছে ঝুড়ি ভর্তি কয়লা।

কুয়োর গা ঘেঁষে ইতিউতি দাঁড়িয়ে অনেকে। তাঁদেরই এক জন অমিয় মুচি। জানালেন, এগুলো সবই কয়লা খাদান। তবে কোনওটিই বৈধ নয়। কথা বলে জানা গেল, রানিগঞ্জ-আসানসোল এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে এমন হাজার পঞ্চাশেক অবৈধ কয়লা খনি। প্রতিদিন খনিতে কাজে নামেন তাঁর মতো কয়েক হাজার খননকর্মী। বৈধ খনিতে যে ভাবে কয়লা কাটা হয়, এখানেও সেই ভাবেই ওঁরা কয়লা কাটেন। কিন্তু নিজের ইচ্ছেয় কেউ খাদানে নামতে পারেন না। কারণ এলাকার কুখ্যাত কয়লা মাফিয়ারাই এই খাদানগুলির মালিক। যাঁদের পোশাকি নাম বড়বাবু। নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগাভাগি করে এই বড়বাবুরা খাদান চালায়। কোন খাদানে কত জন শ্রমিক কী কাজ করবে, সবটাই ঠিক করে তারা। কুয়ো খোঁড়া থেকে শুরু করে সুড়ঙ্গ বানিয়ে কয়লা কেটে উপরে তোলা ও পরিবহণ, সবই করেন শ্রমিকেরা। মজুরিও কম নয়, দিনের শেষে পাঁচশো থেকে হাজার টাকা। মাফিয়াদের রোজগার অবশ্য আকাশ ছোঁওয়া। হাজার হাজার টন চুরির কয়লা রাতের অন্ধকারে পাচার করে কোটি টাকা ঘরে তোলে বড়বাবুরা।

কাজে ঝুঁকিও বিস্তর। জানা গেল, কুয়োগুলো গড়পড়তা দেড়শো ফুট গভীর করে খোঁড়া হয়। কুয়োর দেওয়াল কেটে সুড়ঙ্গ বানিয়ে কয়লা কাটতে কাটতে আরও গভীরে চলে যান কর্মীরা। ওঁরাই জানালেন, কাজের জায়গায় পরিচয় গোপন রাখতে একে অন্যের নাম ধরে ডাকেন না। কাজের চরিত্র অনুযায়ী ওঁদের সাংকেতিক নামে ডাকা হয়। যেমন ‘মালকাট্টা’। এঁদের কাজ সুড়ঙ্গে ঢুকে গাঁইতি দিয়ে কয়লার স্তর কেটে ঝুড়িতে ভরা। মজুরি প্রতি ঝুড়ি-ভর্তি কয়লা পিছু কমবেশি ৫০ টাকা। খননস্থল থেকে ঝুড়ি-ভর্তি কয়লা সুড়ঙ্গের মুখ পর্যন্ত যাঁরা বয়ে আনেন, তাঁদের বলা হয় ‘ঝিকাপার্টি’। দূরত্বের উপরে এঁদের মজুরি নির্ভর করে। সুড়ঙ্গের মুখ থেকে কয়লার ঝুড়ি কপিকলের সাহায্যে কুয়ো থেকে যাঁরা উপরে তোলেন তাঁদের বলা হয় ‘রসাটানা’। এঁদের মজুরি প্রতি একশো ঝুড়ি পিছু ৩৫০ টাকা। প্রতিদিনের এই কাজ দেখাশোনার দায়িত্বে থাকেন ‘হাজিরাবাবু’। দিনে তিন পালিতে কাজ হয়। প্রতি পালিতে আলাদা আলাদা লোক কাজে লাগে। কাজ শুরু হয় সকাল আটটা থেকে।

কথায় কথায় জানা গেল, চুরি রুখতে প্রায়ই এ সব এলাকায় পুলিশ বা শিল্প নিরাপত্তা বাহিনী হানা দেয়। কিন্তু বিশেষ লাভ হয় না। কারণ গাছের মগডালে মজুত রয়েছে রক্ষাকবচ। তার প্রভাবেই পুলিশ বা শিল্প নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ এড়ানো সম্ভব হয়। কী সেই রক্ষাকবচ? খাদানে ঢোকার মুখে বড় গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে এক জন। ঠিক যেন ওয়াচ টাওয়ারের প্রহরা। সবাই যখন কয়লা তুলতে ব্যস্ত, তখন পুলিশ দেখলেই বহু দূর থেকে সে আওয়াজ তোলে, ‘‘সামাল রহো...ও...ও...ও!’’ ঠিক যেন আজানের ধ্বনি। যত দূর ছড়ায় সেই আওয়াজ, তত দূর বন্ধ হয়ে যায় গাঁইতির ঠকাং ঠক, কপিকলের ঘড়ঘড়। কর্মীদের মুখে মুখে খাদান থেকে খাদানে ছড়িয়ে পড়ে সাংকেতিক শব্দ ‘হিরিক’। মানে ‘পালাও, বিপদ আসছে’। তা শুনেই ছুট রসাটানা, ঝিকাপার্টি বা মালকাট্টাদের। জঙ্গলে গা-ঢাকা, সুড়ঙ্গের অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা।

এ তো হল এক ধরনের বিপদ। ওই অন্ধকার গহ্বরে প্রতি মুহূর্তে রয়েছে আরও বিপদের হাতছানি। কয়লা কাটার সময় কখনও সুড়ঙ্গের চাল থেকে খসে পড়ে কয়লার চাঁই। কর্মরত শ্রমিকটি হয়তো সেখানেই চাপা পড়েন। কখনও বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে মাটি ধসে বন্ধ হয়ে যায় সুড়ঙ্গের মুখ। কখনও আবার পাতাল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা মিথেন গ্যাসে বা জলে ভরে যায় অন্ধকার গহ্বর। তখন আর সেখান থেকে বেরিয়ে আসার উপায় থাকে না। নিঃশব্দে মৃত্যুকে মেনে নিতে হয়। তার পর লোক জানাজানি, বিক্ষোভ হয়। আত্মীয়-পরিজনেরা ছুটে আসেন। কিন্তু পাতাল থেকে মৃতদেহ টেনে তোলা যায় না। রাষ্ট্রায়ত্ত কয়লা সংস্থার আধিকারিক, পুলিশকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছন। নিরাপত্তার খাতিরে দেহ সমেত ধস এলাকা ভরাট করে দেওয়া হয়। আজও পাতাল থেকে তোলা যায়নি গাঙটিকুলির মদন মাজি, অর্জুন মাজি, দেন্দুয়ার দুর্গা বাউড়ি বা হীরাপুরের বাবুলাল টুডু ও ছোটু হাঁসদার মতো কয়েক হাজার হতভাগ্যকে। কপাল ভাল থাকলে কখনও মাটি বা কয়লার চাঁই সরিয়ে মৃতদেহ বের করে আনা সম্ভব হয় বটে। কিন্তু কাছের মানুষটির এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে শব্দ করে কাঁদতেও পারেন না পরিবারের জীবিত সদস্যরা। নাম পরিচয় সব গোপন রেখে রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে সৎকার করা হয় শবদেহ। এই একই কারণে আজও ছেলের মৃত্যুর কারণটা প্রকাশ্যে জানাতে পারেন না জেমারির মুচিপাড়ার বাসিন্দা, অশীতিপর বৃদ্ধা তুলসী রুইদাস। বছর কয়েক আগে সেখানকার একটি অবৈধ কয়লা খাদানে মাটি চাপা পড়ে মারা গিয়েছেন তাঁর একমাত্র ছেলে মনোজ রুইদাস।

এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর ময়নাতদন্ত না করিয়েই আত্মীয়-পরিজনেরা দেহের সৎকার করেন। ফলে মৃত ব্যক্তির ডেথ সার্টিফিকেটও মেলে না। স্বভাবতই তাঁদের নামে থাকা জীবনবিমা অথবা ব্যাঙ্কে সঞ্চিত টাকাটুকুও হাতছাড়া হয়। কেন এই লুকোছাপা? শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, অবৈধ খাদানে মৃত্যু মানেই আসলে ‘কয়লা চোর’-এর মৃত্যু। পুলিশ বা আইনের চোখে এরা হলেন দেশের সম্পদ লুঠেরা। তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে এদের পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুর কারণ প্রকাশ্যে এনে আইনি ঝামেলায় জড়াতে চান না। স্বেচ্ছায় নিরুদ্দেশের তালিকায় নাম তুলে দেন।

পরে কিছু ক্ষতিপূরণের টাকা মেলে। সরকার নয়, খাদানের মালিক বড়বাবুরা অন্ধকার ঘনালে মৃতদের বাড়ি এসে পরিবারের সদস্যদের হাতে টাকা গুঁজে মুখ বন্ধ রাখতে বলে। কেউ তিরিশ হাজার, কেউ বা পঞ্চাশ হাজার নিয়ে দলা পাকানো কান্নাকে ঢোক গিলে নেয়। প্রতি পদে এত বিপদ জেনেও খাদানে নামেন কেন? প্রশ্নের উত্তরে মলিন হেসে অমিয় মুচি বলেন, ‘‘বাবু, টাকার চেয়েও কি বিপদ আর শোক বড়?’’