• কানাইলাল ঘোষ
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১০

মায়া প্রপঞ্চময়

novel
ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ

Advertisement

পূর্বানুবৃত্তি: ত্রিশ বছর আগে মানিক বলেছিল, কত দূরে গেলে অন্নুর কাছ থেকে সে সত্যিই সরে যেতে পারবে, তা সে জানে না। টিভির পর্দায় অনিকেতকে দেখে সে কথা মনে পড়ায় চোখ জলে ঝাপসা হয়ে 
আসে অন্নুর। গভীর রাতে বিবেক বোস দেখা করতে আসে নেশাগ্রস্ত অনিকেতের সঙ্গে। অন্নুর সঙ্গে 
তার প্রথম দেখায় প্রেম হয়নি, প্রেম শুরু হয়েছিল কথা কাটাকাটি আর চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে। সবটাই যে 
অন্নুর ছেলেখেলা ছিল, তা অনিকেতের মন কখনওই মানতে চায়নি...

অনিকেত কী উত্তর দিত জানা গেল না, কারণ মুহূর্তের মধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে বিবেক বলে উঠল, ‘‘এই ডাক্তারবাবুটা এত বেরসিক যে বলার নয়! ঠিক জায়গামতো এসেছিলাম, আর এখনই কিনা, দেব এক দিন কালীপুর রোডের মাঝখানে ল্যাং মেরে চলন্ত বাসের সামনে ফেলে...’’ পরের কথাগুলো বোঝা গেল না, কথার মতোই চেহারাটাও হাওয়ায় মিলিয়ে গেল হঠাৎ।

টেবিলে রাখা মোবাইলটাও বেজে উঠল সেই সঙ্গে। অনিকেতকে মোবাইল সব সময় অন রাখতে হয়, কখন কী খবর আসে, সেই জন্য। তুলে চোখের কাছে এনে বোঝার চেষ্টা করে কিন্তু ঝাপসা চোখে ঠাওর হল না। কানে ধরতে ডাক্তারবাবুর গলা ভেসে আসে, ‘‘স্যর, ক্যাঙারু বার্থ তো কখনও দেখেননি বলছিলেন কালকে, এক্সপেক্টিং ফিমেল ক্যাঙারুটার বোধ হয় একটু বাদেই বাচ্চা হবে, আসবেন না কি? মারসুপিয়ালদের দ্বিজত্বের বিষয়টা চোখের সামনে পরিষ্কার হবে তা হলে। দেখতে চাইলে সময় নষ্ট না করে চলে আসুন।’’

গতকালই মারসুপিয়াল প্রাণীদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। এরা অপূর্ণাঙ্গ বাচ্চার জন্ম দেয়। তার পর মায়ের পেটের থলি বা পাউচে সেই বাচ্চার থাকা-খাওয়া চলে কয়েকমাস, যত দিন না সে বাইরের জগতে ঘোরাফেরার উপযুক্ত হয়। এই গোত্রের প্রাণীদের নিবাস মূলত অস্ট্রেলিয়া, নিউজ়িল্যান্ড আর সেন্ট্রাল আমেরিকার বিশেষ ধরনের পরিবেশে। কালীপুর জ়ু-তে এখন শুধুই রেড ক্যাঙারু আছে। একটার বাচ্চা হওয়ার কথা আজকালের মধ্যে। অনিকেত ডাক্তারবাবুকে বলেও রেখেছিল, ডেলিভারির ঠিক আগে সুযোগ হলে ওকেও নাইট শেল্টারে ডেকে নিতে।

ওর কৌতূহল ছিল, সদ্যোজাত বাচ্চাকে মা-ক্যাঙারু কী ভাবে তার পেটের থলি বা পাউচে ঢুকিয়ে রাখে, সেটা দেখার জন্য। অনিকেতের ধারণা, বাচ্চা জন্মানোর পরই মা-ক্যাঙারু তাকে মুখে করে তুলে পেটের পাউচে ভরে নেয়।

অনিকেতের সাধের নেশা অনেকটাই বিবেকের সঙ্গে বকবক করতে-করতে চটে গিয়েছিল, ডাক্তারবাবুর ফোনে বাকিটাও উবে যায়। দ্রুত তৈরি হয়ে ও টর্চ আর নাইট-ভিশন বাইনোকুলার নিয়ে নীচের গেটে তালা লাগিয়ে ক্যাঙারুর নাইট শেল্টারে হাজির হয়। জ়ু-কিপাররা সবাই রয়েছে ডাক্তারবাবুকে ঘিরে, ক্যাঙারুটা যেখানে রয়েছে তার থেকে একটু আড়ালে। ডাক্তারবাবুর হাতেও একটা বাইনোকুলার। অনিকেত বুঝতে পারে উনি সেটা দিয়েই মাঝে-মাঝে ওয়াচ করে গিয়েছেন আর মোক্ষম সময় বুঝেই ওকে ফোন করেছেন। বয়স্ক মানুষটার প্রতি ও একটু কৃতজ্ঞ বোধ করে।

উনি তাড়া দেন, ‘‘তাড়াতাড়ি যান স্যর, সিম্পটম যা দেখলাম, যে-কোনও সময় ডেলিভারি হতে পারে। আগের বার সামান্য সময়ের মধ্যে ঘটে গেল ব্যাপারটা। কী হয়েছিল বলব না, সাসপেন্স নষ্ট হয়ে যাবে। নিজে গিয়ে দেখে নিন।’’

ও-দিকটায় আলো রাখা হয়নি আসন্নপ্রসবার ডিসটার্ব হবে বলে। তবে বাইনোকুলারটা চোখে নিয়ে অ্যাডজাস্ট করতেই সামনের দৃশ্য পরিষ্কার ভাবে ফুটে ওঠে। একটু চোখ সেট হতেই অনিকেত অদ্ভুত দৃশ্যটা দেখতে পায়। খুদে টিকটিকির থেকেও ছোট্ট মতো একটা কিছু, মা-ক্যাঙারুর অ্যাবডোমেন বেয়ে উঠছে ক্রল করে করে, গায়ের বড়-বড় ফার আঁকড়ে ধরে। গ্রামে ছেলেবেলা কেটেছে বলে অনিকেত সদ্যোজাত, চোখ না-ফোটা ইঁদুর-বাচ্চা কিংবা পাখির ছানা দেখেছে বহু বার। গোলাপি রঙের মাংসপিণ্ডগুলোয় শুধু বুকের কাছে ধুকপুকুনিতে জীবনের অস্তিত্ব টের পাওয়া যেত। এটাকেও দেখতে অনেকটা সেই রকম, প্রায়-স্বচ্ছ গোলাপি-রঙের একটা জেলিবিন টাইপের চেহারা। মাঝারি গতিতে সেটা মায়ের পেটের মাঝামাঝি পাউচের ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল।

পাশ থেকে ডাক্তারবাবুর গলা শুনে চমকে ওঠে অনিকেত। সামলে নিয়ে বলে, ‘‘হুঁ, দেখলাম বটে, কিন্তু বিশ্বাস হতে চাইছে না যে, এইটুকু টিকটিকির ছা প্রমাণসাইজ়ের একটা ক্যাঙারুতে পরিণত হবে আগামী কয়েকমাসের মধ্যে! তার মানে, ক্যাঙারুর পাউচটা হল ওর দ্বিতীয় ইউটেরাস বা জরায়ু?’’

ডাক্তারবাবু অন্যমনস্ক ভাবে সায় দেন, ‘‘তাই তো দাঁড়ায় পুরোটা ভাবলে। তফাত বলতে, মায়ের শরীরের ভিতরে থাকলে ওর পুষ্টি আমবিলিক্যাল কর্ড বা নাড়ির মধ্য দিয়ে যেত, আর এ ক্ষেত্রে ব্যাটা আরাম করে পাউচে শুয়ে মায়ের দুধ খেতে-খেতে বড় হবে, বাইরের আলো হাওয়া পেয়ে। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়াল, তাই না?’’

অনিকেত বলে, ‘‘প্রকৃতির ন্যায়বিচারও বলতে পারেন। মানুষের মতো উন্নত প্রাণীর ক্ষেত্রেও স্ত্রী-জাতির গর্ভধারণ আর প্রসববেদনার হাত থেকে রেহাই নেই, অথচ ক্যাঙারু অনেক নিচুস্তরের জীব হয়ে ফাঁকি মেরে বেরিয়ে যাবে, এটা প্রকৃতি মেনে নিতে পারেনি। তাই শুরুর সুবিধেটা পরে সুদে-আসলে উশুল করে নিয়েছে। আকার ও আয়তনে দ্রুত বেড়ে-চলা বাচ্চাকে শুধু ট্যাঁকে নিয়ে দীর্ঘ দিন বয়ে বেড়ানোই নয়, একটু বড় হলেই মর্জিমাফিক সেটা বাইরে বেরবে আবার ভয় পেলেই ধারালো খুরসুদ্ধ ভারী চেহারা নিয়ে লাফিয়ে মায়ের পাউচে ঢুকবে। মা-ক্যাঙারুর বিড়ম্বনার একশেষ!’’

দু’জনে হো হো করে হেসে ওঠে মা-ক্যাঙারুটার ভবিষ্যৎ দুর্দশার কথা ভেবে। ডাক্তারবাবু হাসি থামিয়ে বলেন, ‘‘রাত অনেক হল, চলুন এ বার সবাইকেই একটু রেস্ট নিতে হবে। কেবল নাইট-গার্ডরা একটু অ্যালার্ট থাকলেই হবে, এই বাচ্চা আগামী বেশ কিছু দিন ওর মুখ দেখাবে না আমাদের, যতই সাধ্যসাধনা করুন। তার পর, ইন আ ফাইন মর্নিং দেখা যাবে মাঠে চরতে বেরিয়েছে! কাল সকাল থেকে তো আবার নিত্য-কর্মযজ্ঞ শুরু হবে।’’

ডাক্তারবাবুকে বিদায় করে ঘরে ঢুকে অনিকেত শুধুমাত্র জুতোজোড়া খুলে বিছানায় আশ্রয় নেয়। ওঁর বলা শেষ কথাগুলো কানে বাজে, সত্যি, কর্মযজ্ঞই তো বলতে গেলে। চিড়িয়াখানায় যারা বেড়াতে আসে, ক’জনই বা জানতে চায় যে, এখানকার প্রাণীরা কী খায় আর কতটা খায়, কী ভাবে জন্মায়, বড় হয়, রোগব্যাধি, বার্ধক্য আর মৃত্যুতে তাদের সঙ্গে মানুষের আচার-ব্যবহারে তফাত কোথায়? পেশাগত কারণে জ়ু ম্যানেজমেন্টে না এলে ও নিজেই কি জানতে পারত? এখন ও জানে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় চিড়িয়াখানার কাজকর্ম সকাল ছ’টার আগে থেকে শুরু হয়, চলে সন্ধে পর্যন্ত।

ও এটাও জানে যে, শীতকাল ও পুজো মরশুমে কালীপুর চিড়িয়াখানা হয়ে ওঠে কলকাতার সবচেয়ে বড় ডাইনিং টেবিল আর একইসঙ্গে বিশাল এক আঁস্তাকুড়। দিনের শেষে উৎসাহী দর্শকদের ফেলে যাওয়া ভুক্তাবশেষ আর অন্যান্য আবর্জনার স্তূপ দেড়শোটা বড় সাইজ়ের ভ্যাট উপচে মাঠে-পথে ছড়িয়ে থাকে, দেড় ডজন সাফাইকর্মীর অক্লান্ত পরিশ্রমে দু’-তিনটে ট্রাক ভর্তি করে সেই আবর্জনা সকাল সাতটার আগে জ়ু-এর বাইরে বেরিয়ে যায়। চিড়িয়াখানার নিত্যকর্ম নিয়ে ভাবতে-ভাবতে এক সময় রাজ্যের ঘুম এসে ওর চোখে ভর করে।

সকালবেলার আবশ্যিক টহলে বেরিয়েছে অনিকেত। চিড়িয়াখানার মেন গেট থেকে সোজা রাস্তাটা ধরে ডান দিকে ঝিল আর বাঁ দিকে বাঘের পুরনো এনক্লোজ়ারগুলো ছাড়ালেই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের নতুন কাচে-ঘেরা ওপেন-এয়ার আস্তানা। সেটার সামনে পৌঁছতেই পিছন থেকে দৌড়ে আসে কিষণলাল, বলে, ‘‘ছ্যার, ছলিলছখা ফিরে এয়েচে, ওর মাচগুলান ছরায়ে রেকেচি, দিব কি?’’

জিভের জড়তার জন্যে কিষণলাল উচ্চারণে সমস্যা হয়, কিন্তু লোকটা যথেষ্ট চটপটে এবং ছটফটে। আর সলিলসখা নামটা অনিকেতেরই দেওয়া, একটা পুরুষ অটার অর্থাৎ ভোঁদড়কে মাসদুয়েক আগে বন্যপ্রাণ দপ্তরের উদ্ধারকারী দল সামান্য আহত অবস্থায় রেসকিউ করে কালীপুর জ়ু-তে হস্তান্তর করে গিয়েছে। বেশ লম্বাটে, জলে-ভরা চৌবাচ্চাটা হয়েছে ওর সুইমিং পুল, সর্বক্ষণের জলকেলির জায়গা। সামনে মানুষজন দেখলে ওর অ্যাক্রোব্যাটিক্সের উৎসাহ বাড়ে। জলাধারটা এমনিতেই বেশ বড়, তার চারপাশের অনেকটা জায়গা নিয়ে পুরো এলাকাটা চারপাশ ও উপর দিকে শক্ত স্টিলের জাল দিয়ে ঘেরা। তার দিয়ে লোহার অ্যাঙ্গেলের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা জাল একপাশ থেকে সরিয়ে এর মধ্যেই বারতিনেক সলিল জেলভাঙা কয়েদির মতো খাঁচা থেকে ভেগেছে।

প্রথমবার যখন সলিল বেপাত্তা হয়, তখনও কিষণ এসে বলেছিল, ‘‘ছ্যার, আপনার ভোঁদরের বাচ্চা খাঁচা থেকে ভাগলবা, অনেক খোঁজ করিচি। মন নিচ্চে ও ঝিলে নেবে গ্যাচে, ওখানে টকাটক মাচ ধরবে আর খাবে, ও আর বাছায় ফিরবে না!’’ অনিকেত গম্ভীর ভাবে বলেছিল, ‘‘খাঁচায় ও ফিরবে বাধ্য হয়ে, যেখান দিয়ে ও বেরিয়েছে সেই জায়গাটা একটা ইট দিয়ে একটু ফাঁক করে রাখো।’’

বড়সায়েব ওকে আর ওর অত বড় ঘটনাটাকে তুশ্চু করে দেওয়ায় মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিল কিষণলাল, বিড়বিড় করেছিল, ‘‘ফিরবে না ছাই, আপনি তো বলেই খালাছ— জলের জীব, এত্তো বড় একটা ঝিল পেয়েচে যেখানে...’’ ওর মনের কথা যেন পড়ে নিয়ে অনিকেত বলেছিল, ‘‘যা বলছি তাই করো, আর ওর বরাদ্দ জিয়ল মাছ বন্ধ কোরো না। সাপ্লাই রোজ যেমন আসে, তেমন আসবে। সলিল বাসায় ফিরলে ওকে খাবার দিয়ে আমায় খবর দিয়ো।’’

তৃতীয় দিন সকালে কিষণ অভ্যেসবশত সব ক’টা খাঁচা পর্যবেক্ষণের সময় লক্ষ করল, সলিলসখা অপরাধীর মতো ওর খাঁচার এক কোণে বসে আছে। জ়ু-কিপার হিসেবে হারানো ইনমেট ফিরে আসায় ও যতটা খুশি হল, প্রায় ততটাই বিরক্ত হল ওর নিজের অ্যাসেসমেন্ট ভুল প্রমাণ হওয়ার জন্য। ও এত দিন চিড়িয়াখানায় চাকরি করছে, আর ডিরেক্টর সায়েব ক’বছরই বা এসেছে এখানে? তার আন্দাজ ঠিক হল আর ওরটা ভুল! অথচ কয়েকদিনেই এই অবলা জন্তুটার উপর কেমন মায়া পড়ে গিয়েছে। খোলা জায়গাটা বন্ধ করে দিয়ে ও বালতিতে রাখা শোল-ল্যাটা জাতীয় জিয়ল মাছগুলো চৌবাচ্চায় ছেড়ে দিতেই ভোঁদড়টা অস্বাভাবিক ক্ষিপ্র গতিতে জলে নেমে পড়ল। কিষণলাল চলল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে হারাধন ফিরে আসার খবর দিতে।

কিন্তু সে আর ক’দিন! এক সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই সলিল দ্বিতীয় বার ফেরারি হল। এ বার দু’দিন পর ফিরে এল নিজে থেকেই। রইল দিনদশেক, আবার পালাল খাঁচা থেকে। বারবার ওর দায়িত্বে থাকা জীব এ ভাবে বেরিয়ে চলে যাচ্ছে, কিষণলাল অপ্রস্তুতের একশেষ। ডিরেক্টরের কাছে মুখ দেখানোর উপায় থাকবে না এই রকম চললে। তিন বারের বার সায়েব একটু ধমকের সুরে বললেন, ‘‘কী হচ্ছে কী এ সব? হোক না ভোঁদড়, তা বলে জ়ু-র ডিসিপ্লিন মানবে না! এ বার এলে আমাকে না জানিয়ে ওকে খেতে দেবে না, এটা আমার অর্ডার!’’

অনিকেত একটু ভেবে নেয়, এটা হল সলিলের তৃতীয় বার ফিরে আসা, ও নিজে যেমন প্রথম বার আন্দাজ করেছিল, তেমনই ঘটছে। কিষণলাল ভাবছে, সায়েবের কত অভিজ্ঞতা, যা বলে তাই ফলে যায়! আসলে সিম্পল ডিডাকশন করে অনিকেত বুঝেছে যে, স্বাধীনতাকামী সলিলকে বাসায় ফিরতেই হবে। সেটা দু’দিনের জায়গায় তিন দিন হতে পারে বড়জোর। আসলে খাঁচার ঘেরাটোপের নিরাপত্তা আর চৌবাচ্চার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে কিছুটা হলেও অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে ও। আদিগঙ্গার সঙ্গে কানেকশন থাকার সুবাদে ঝিলের জল নির্মল নয়, চৌবাচ্চার টলটলে জল তো দূরের কথা, কোনও সাধারণ পুকুরের মতোও নয় জলের কোয়ালিটি৷ সর্বক্ষণ জলে-থাকা প্রাণী সহজেই তফাত বুঝে নেবে। দ্বিতীয় কারণটা আরও জোরালো, ভোঁদড় চুনোপুঁটিও খায় না, দশ-বিশ কেজির রুই-কাতলাও ধরতে পারে না, তাই চিড়িয়াখানার মাঝারি আকারের শোল-ল্যাটা পেয়ে সলিলের অবস্থা হয়েছে, মৎস্য মারিব খাইব সুখে।

অনিকেত বেশ কয়েকবছর বাদে ঝিলে জাল দিয়ে মাছ তুলিয়েছে মাত্র মাসতিনেক আগে। সবচেয়ে বড় কাতলাটা বাইশ কেজি আর রুই উনিশ কেজি ওজন, এমনকি এক-একটা তেলাপিয়া এক কেজির থেকেও বেশি, তেমনই তাদের চেহারা। রোগাটে চেহারার সলিল ওই সব মাছ ধরবে কি, মাছেরাই বরং ওকে ধরে ফলার করতে পারে। অনিকেতের বিশ্বাস, বাইরে ঘোরার সময়টা ও অনাহারেই থাকে, তাই বাধ্য হয়ে বাসায় ফেরে। ক’দিন ধরেই মনে হচ্ছে, সলিলের বোধবুদ্ধি এ বার পরীক্ষা করার সময় হয়েছে। প্রাণিজগতে বুদ্ধিমত্তার বিচারে ভোঁদড় প্রথম দশের মধ্যে আসে। ও কিষণকে বলে, ‘‘আমি একটু রাউন্ড দিয়ে আসি, তুমি মাছের বালতি নিয়ে ওর খাঁচায় ঢোকো, তবে একটাও মাছ যেন না দেওয়া হয়। এমন ভাবে রাখবে, যাতে ও দেখতে পায় অথচ নাগাল না পায়, ঠিক আছে? আজ তো বৃহস্পতিবার, মানে জ়ু ক্লোজ়ড।’’

কিষণ ঘাড় নেড়ে এগিয়ে যায় সোজা রাস্তা ধরে, অনিকেত পাশের রাস্তা দিয়ে সিংহের ঘর বাঁয়ে রেখে জিরাফ এনক্লোজ়ারের দিকে হাঁটতে থাকে। ওকে এখন অনেকটা সময় ব্যয় করতে হবে অন্য বাসিন্দাদের এক বার নিজের চোখে দেখে নেওয়ার জন্য। যতটা দেরি করা যায় সলিলের কাছে পৌঁছতে, ততটাই সাকসেস আশা করছে ও। ও ঠিক করে, মোটামুটি সকাল ন’টার পর ওখানে উদয় হবে। ভয় একটাই, কিষণ না আবার ওকে খাবার দিয়ে বসে! তবে ওর অনুমান, কিষণেরও যথেষ্ট কৌতূহল আছে এ ব্যাপারে, আর ডিরেক্টরের কথা অমান্য করলে কী হবে, সেটাও ও জানে।

কিছুটা বেশি সময়ই ব্যয় করে অনিকেত ওর সকালের রাউন্ড কমপ্লিট করতে। রেপটাইল হাউসের কাজ শেষ হয়েই গিয়েছে প্রায়, ফিনিশিং টাচ দিচ্ছে রংমিস্ত্রিরা। সেখানে খানিকটা সময় লাগে বাকি কাজ বুঝিয়ে দিতে, অনেকটা সময় দিতে হয় বিপুলের অভিমান ভাঙানোর জন্য। কাজের চাপে চার-পাঁচ দিন ওর কাছে আসা হয়নি। তাই ওর গলার আওয়াজ পেয়ে সে ক্রালের শেষ মাথায় গিয়ে উল্টো দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল, অনেক তোয়াজ করে ওকে লোহার রেলিং-এর ধারে এনে গায়ের ছোটখাটো ঘাগুলোয় ওষুধ লাগিয়ে দিতে প্রায় আধঘণ্টা লাগল। মাঝে মাঝে এই কাজটা ও নিজের হাতে করে, আর বিপুলও বাধ্য ছেলের মতো চোখ বুজে দাঁড়িয়ে থাকে। অনিকেত জানে, এই বডি-কনট্যাক্টটাই ওকে বিপুলের কাছে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে। ষোলো-আঠেরো বছর ধরে বিপুলের দেখভাল করছে যে জ়ু-কিপাররা, তাদের কথাও বিপুল শোনে না খেপে গেলে, কিন্তু অনিকেত চেষ্টাচরিত্র করে ওকে বাগে আনে। অত বড় অবোলা জীবটা মানুষের আন্তরিকতা বোঝে। অনিকেতের ব্যবহারে, ওর মাথায়-কানের পাশে হাত বুলিয়ে দেওয়ার মধ্যে, ওর পছন্দের এক ধরনের পাতা নিজের হাতে ধরে খাইয়ে দেওয়ার সময় বড় বড় চোখ মেলে বিপুল ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। কেবল চাউনি দিয়ে বুঝিয়ে দেয় যে ও-ও সামনের মানুষটাকে পছন্দ করছে।

বিপুলের মায়া এড়িয়ে বেরতে সময় লাগে, সরে আসতে গেলেই মুখে অব্যক্ত শব্দ করে পৌনে দু’টনের গন্ডারটা রেলিং বরাবর ওর পাশে-পাশে হেঁটে চলে। ঘড়িতে এখন সোয়া ন’টা, অন্য দিকে আর-এক জন না খেয়ে রয়েছে, অনিকেত সেখানে পৌঁছয়নি বলে। সলিলের গোবেচারা মুখটা মনে পড়তে অনিকেত কিছুটা জোর করেই বিপুলের সান্নিধ্য ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসে, ওর পিছু-পিছু কিছুটা এসে হতাশ হয়ে হুড়মুড় করে জলে ভরা পরিখায় নেমে পড়ে বিপুল।

অটার এনক্লোজ়ারের গেট ঠেলে ঢুকতেই কিষণ হাঁউমাউ করে ওঠে, ‘‘দ্যাহেন না ছ্যার, ছলিলটা আমার ছঙ্গে ক্যামন ব্যাভারটা করচে! আমি আর আপনাদের মদ্যে নাই...’’

ক্রমশ

 

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন