পরিত্যক্ত খাদানের পাশেই উঁকি দিচ্ছে জনবসতি। ভোরের আলোয় দেখে মনে হয়, রাতে রান্নার জন্য ওরা উঠোনে কয়লার উনুন জ্বালিয়েছে। কিন্তু কাছে গেলে টের পাওয়া যায়, ওটা উনুনের ধোঁয়া নয়। কয়লার উনুন জ্বলছে মাটির কয়েকশো ফুট নীচে। মাটির গভীরে ওই রাক্ষুসে আঁচেই পুড়ে-ধসে যাচ্ছে ধানবাদের ঝরিয়ার এক একটা জনবসতি।

রামায়ণে সীতা অপমান সহ্য করতে না পেরে পাতালে প্রবেশ করেছিলেন। ঝরিয়ার ফুলারীবাদ, ধনুডি বা বোকাপাহাড় এলাকার বাসিন্দাদেরও মাঝেমধ্যে পাতালপ্রবেশ হয়। তবে সীতার মতো স্বেচ্ছায় নয়। কারও পাতালে প্রবেশ হয়েছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিস্কুট খেতে খেতে, কারও হয়েছে বিছানায় শুয়ে, শৌচালয়ে গিয়ে, কারও বা সকালে দোকান খুলতে গিয়ে।

ঝরিয়ার ইন্দিরা চকের পাশে থেকেই শুরু ফুলারীবাদ। ফুলারীবাদের বাসিন্দা সাবিনা খাতুনের দাদা বাবলু খান ও ভাইপো রহিম খানের কিছু দিন আগেই পাতালপ্রবেশ হয়েছে। সাবিনা বলেন, ‘‘ওরা একেবারে মাটির তলায় সেঁধিয়ে গেল। এখন ত্রিপল টানিয়ে বাড়ির পাশে মাঠে শুই। শোয়ার সময় একে অপরকে ধরে থাকি।’’ কেন একে অপরকে ধরে শুয়ে থাকো? সাবিনা বলেন, ‘‘হঠাৎ করে ধস নামলে, মাটির তলায় সেঁধিয়ে যাওয়ার আগে এক জন আর এক জনকে ধরে ফেলতে পারবে। তাতে কিছুটা হলেও বাঁচার সম্ভাবনা থাকে।’’ সাবিনার পাশ থেকে ডুকরে কেঁদে উঠে এক মহিলা বলেন, ‘‘হাত ধরেও তো ছেলেকে বাঁচাতে পারল না বাবলু। ছেলেটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিস্কুট খাচ্ছিল। বাবা পাশেই দোকান খুলছিল। হঠাৎ মাটি ধসে দু’জনেই গায়েব।’’    

ফুলারীবাদ যেন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই আগ্নেয়গিরির এক-একটা জ্বালামুখ থেকে বেরোচ্ছে ধোঁয়া। হঠাৎ ধসে পড়ছে মাটি। ধসের তলায় দেহও খুঁজে পাওয়া যায় না। বাবলু আর রহিমের দেহ খুঁজে পায়নি বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। বাবলুর বাড়ির সামনে আত্মীয়দের জটলা। ওদের এক জন বললেন, ‘‘আমরা তো মরার আগেই আগুনের বিছানার ওপর রোজ শুয়ে থাকি। মাঝেমধ্যে আগুন আমাদের পাতালে টেনে নিয়ে যায়। গোটা ঘরই ধিকধিক করে জ্বলছে। রাতে কখনও ভূমিকম্পের মতো কাঁপুনিও টের পাই।’’

এদের কাছে ধস নামা, মাটি কাঁপা সত্যিই গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। ট্রেনে তো মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে। তা বলে কি ট্রেনে চাপা বন্ধ করে দেব? অনেকটা এ রকমই মনোভাব। তাঁদের ঘরের নীচেই যে আগুন জ্বলছে, তার আঁচে মেঝে আলগা হয়ে যাচ্ছে, নামাজ পড়তে গিয়ে টের পেয়েছিলেন ফুলারীবাদের সাবানা পরভিন।

সাবানার ঘরে ঢুকে দেখা গেল, ছোট চৌকি পাতা। এক কোণে দুটি শিশু খেলা করছে। চৌকির পাশে এক চিলতে জায়গায় মাদুর পেতে নামাজ পড়তে গিয়ে সাবানা বুঝতে পারেন, মাদুরটা গরম হয়ে উঠছে। সেই গরম মাদুরেই নামাজ পড়া শুরু করেন। সাবানা বলেন, ‘‘ঘরের নীচেই আগুন জ্বলছে জানি। ঘর ধসে পড়ার আগে তালাবন্ধ করে দিতে হবে। ভাগ্য যদি খারাপ থাকে, হয়তো নামাজ পড়তে পড়তেই এক দিন পাতালে চলে যাব।’’

বছর খানেক আগে যেমন ফুলারীবাদের পাশের পাড়া কেন্দুয়াতে সুরেশপ্রসাদ চৌরাসিয়া ও তাঁর স্ত্রী নীলম দেবীর একসঙ্গে পাতালপ্রবেশ হয়েছিল বিছানায় ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই। সুরেশের এক আত্মীয় বললেন, রোজকার মতোই সুরেশ আর তাঁর স্ত্রী রাতে চৌকিতে শুয়ে ছিলেন। মাঝরাতে বিকট শব্দে পাড়ার লোকেদের ঘুম ভেঙে যায়। তাঁরা এসে দেখেন, চৌকিসুদ্ধ স্বামী-স্ত্রী পাতালে চলে গিয়েছেন। গর্তের মুখ থেকে গলগল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। কারও দেহ পাওয়া যায়নি।

ফুলারীবাদের যুবক রাহুল প্রসাদ জানালেন, শৌচালয়ে প্রাকৃতিক কাজ সারতে গিয়ে অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন। ‘‘হঠাৎ করে খুব জোরে মাটি কাঁপতে শুরু করে। রুদ্ধশ্বাসে ছুটে বেরিয়ে যাই। চোখের সামনে দেখলাম, বাথরুমের প্যান মাটির গর্তে মিলিয়ে গেল। পুরো এলাকাটায় ধস নেমে চার ফুট গর্ত হয়ে গেল।’’

এখানকার রাস্তাও নিরাপদ নয়, জানালেন এলাকার মানুষ। রাস্তার ডাবওয়ালার কাছ থেকে ডাব কিনে আমাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে এক জন বললেন, ‘‘আপনি হয়তো ডাব খেতে খেতেই মাটির তলায় চলে যেতে পারেন। কেউ আর খুঁজেই পাবেন না।’’ রাস্তার দু’ধারে কোনও কোনও বাড়ির দেওয়ালে সাপের মতো আঁকাবাকা ফাটল। কোনও কোনও ফাটল থেকে বেরোচ্ছে ধোঁয়াও। বেশি ধোঁয়া বেরোতে থাকলে সেই ঘর বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওঁরা বুঝতে পারেন, এই ঘরটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। তখন পাশের ঘরে চলে যান।

মাঠের মধ্যে যে সব ফাটল দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে, তা অবশ্য গ্রামবাসীদের কাজেও আসে। সাবানা হাসতে হাসতে বলেন, ‘‘ওই ফাটলের আশপাশ এতটাই গরম থাকে যে ঘুঁটে জলদি শুকিয়ে যায়। শীতকালে ভাত রান্নাও করে ফেলতে পারব।’’

ফুলারীবাদ থেকে একটু এগিয়ে বোকাপাহাড়ী, পরিত্যক্ত খনির একেবারে কোল ঘেঁষে। যেন একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা। একটা বড় পাথরের ওপর হিন্দিতে লেখা, ‘সাবধান। অগ্নি প্রভাবিত ও ভূধ্বস্ত এলাকা। এখানে ঢুকবেন না।’ যদিও ওই পাথরের পাশেই পাড়ার কচিকাঁচারা ক্রিকেট খেলতে ব্যস্ত।

সন্ধ্যা নামার আগে বিকেলের আলোয় বোকাপাহাড়ীর নতুন জনবসতিতে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, দূরে খনির কাছে লকলকে অগ্নিশিখা। বোকাপাহাড়ীর বাসিন্দা রাম মাহাতো বলেন, ‘‘সন্ধ্যা হলে বাচ্চাদের তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসতে বলি। এখান থেকে বাচ্চা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আমরা জানি, বাচ্চা চুরি-টুরি হয়নি। ধসের মধ্যে পড়ে মাটিতে সেঁধিয়ে গিয়েছে।’’

মাটির নীচে এই কয়লার আগুন কিন্তু আজকের নয়। ১৯৩০ সালে ব্রিটিশরা ঝরিয়ার এই সব কয়লাখনি থেকে কয়লা তোলার কাজ শুরু করে। বেশির ভাগ কয়লা তোলার কাজই হত অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে। স্বাধীনতার পর এই কয়লাখনিগুলো ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হয়ে যায়। তখনও এ রকমই অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কয়লা তোলা হতো। ১৯৬৯ সালে সরকার কয়লাখনিগুলো অধিগ্রহণ করার পরে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কয়লা তোলার কাজ শুরু হয়।

কিন্তু বহু কাটা সুড়ঙ্গ থেকেই যায়। আবার নতুন সুড়ঙ্গও তৈরি হয়েছে। খনি থেকে পুরো কয়লা তোলা শেষ হলে সেই খনিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। পরে অবৈধ ভাবে ওই সব পরিত্যক্ত খাদান থেকে নতুন সুড়ঙ্গ কেটে কয়লা তোলার কাজ চলতে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মত, এই সব সুড়ঙ্গ দিয়ে অক্সিজেন ঢুকছে। আর অক্সিজেন পেয়ে মাটির ভেতরের কয়লা ধিকধিক জ্বলতে শুরু করছে।

আগুনের বিছানার ওপর দিন কাটালেও এই জায়গা ছেড়ে চলে যেতে চান না বাসিন্দারা। অনেকেই আছেন যাঁরা পরিত্যক্ত খনি থেকে কয়লা তুলেই জীবিকা নির্বাহ করেন। ঝরিয়ার বেনেগারিয়াতে ঝরিয়া রিহ্যাবিলিটেশন ডেভলপমেন্ট অথরিটি-র পুর্নবাসন কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। বেশ কয়েকটি ঘর তৈরি, তবু তাঁদের কর্মস্থল থেকে ওই পুর্নবাসনকেন্দ্র অনেক দূর বলে অধিকাংশ মানুষের যেতে অনীহা। 

সাবধানবাণী এখানে সিগারেটের প্যাকেটে বিজ্ঞপ্তির মতোই উপেক্ষিত। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, মাটির নীচে জ্বলন্ত কয়লা কিন্তু পুরো ঝরিয়া জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে। বছরের পর বছর জ্বলন্ত কয়লার ওপরের মাটি আলগা হয়ে গিয়েই যখন-তখন ধস নামছে বিভিন্ন জায়গা জুড়ে। এলাকার এক বাসিন্দা বললেন, ‘‘কোনও দিন মাছের বাজারে মাছ কিনতে কিনতে হয়তো মাটির তলায় ডুবে যাবে কেউ। হয়তো গোটা মাছের বাজারটাই মাটির তলায় চলে যাবে, কে জানে!’’

সন্ধ্যা নামলে দেখা যায়, ফুলারীবাদ, বোকাপাহাড়ী, ধনুডিহির বিস্তীর্ণ এলাকা আবছা ধোঁয়ায় ঢাকা। মাটির নীচে জ্বলন্ত কয়লার আগুনের ওপরে থাকা এই সব জনবসতি হয়তো আর কয়েক বছর পরে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। পরিত্যক্ত সেই সব বসতিতে উঁকি মারলে হয়তো তখনও দেখা যাবে, ভাঙাচোরা দেওয়ালের ফাটল থেকে বিষাক্ত ধোঁয়া তিরতির করে বেরিয়েই যাচ্ছে।