আঠেরো শতকের গোড়ার দিক। জুলাইয়ের এক দুর্যোগের রাত। ইংলিশ চ্যানেল পার হচ্ছে একটি নৌকা। তাতে সওয়ার এক হবু দম্পতি, তাদের সঙ্গে এক যুবতী। ডোভার থেকে তাদের গন্তব্য ক্যালে। ঝড়ের দাপটে মাঝেমধ্যেই আছাড়ি-পিছাড়ি খাচ্ছে নৌকা। মাত্র দু’ঘণ্টার রাস্তা। কিন্তু তিন জনের মনে হচ্ছে, তারা চলেছে এক অনন্ত যাত্রাপথে। পথ আর ফুরায় না যেন।

ওই শতকেই আর একটু পিছনের দিকে তাকানো যাক। ১৮০৪ সালে ইটন স্কুলে পড়তে ঢুকল বছর বারোর একটি ছেলে। বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, চলনে-বলনে সপ্রতিভ। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে রোজকার হুল্লোড়ে তার কোনও আগ্রহ নেই। সে বরং ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারে বইয়ে মুখ গুঁজে। আর ভালবাসে বিজ্ঞানের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে। কলেজবেলায় তার বন্ধু তো হয়ইনি। উল্টে সহপাঠী এবং ক্লাসের দাদাদের কাছে সে ছিল খ্যাপা, পাগল। হ্যাঁ, আর একটা বিষয়ে ছেলেটির বেশ আগ্রহ ছিল। সেটা হচ্ছে লেখালিখি। কলেজ পাশ করে কিশোরটি ঢুক‌ল অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। তত দিনে সে একটা উপন্যাস লিখে ফেলেছে। মকসো করতে শুরু করেছে কবিতা লেখাও। সেটা ১৮১০ সাল। পরের বছর ছেলেটি নাম গোপন করে লিখল ‘দ্য নেসেসিটি অব অ্যাথেজিম’। সেই লেখা পড়ল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নেকনজরে। তাঁরা তলব করলেন ছাত্রটিকে। ডাক পড়ল তার বাবারও। কিন্তু ছেলের এক গোঁ। সে যা ঠিক মনে করেছে, সেখান থেকে তাকে নড়ায় কার সাধ্য! ফল? তাকে বারই করে দিলেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বাবাও ত্যাজ্য করলেন ছেলেকে। তখন কি কেউ জানত, এই ছেলেই তার লেখনীর গুণে এক দিন হয়ে উঠবেন বিশ্বের অন্যতম কবি?

পুরো নাম পারসি বিশ শেলি। টিমোথি শেলি ও এলিজাবেথ পিলফোল্ডের বড় ছেলে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সে-ই বড়। অক্সফোর্ড থেকে বিতাড়িত হওয়ার চার মাসের মাথায়, ১৯ বছর বয়সে শেলি বাড়ি থেকে পালালেন। সঙ্গে প্রথম প্রেমিকা, নিজের বোনের সহপাঠী হ্যারিয়েট ওয়েস্টব্রুক। দুই পরিবারের অমতে শুরু হল শেলি-হ্যারিয়েটের নতুন জীবন। একই সঙ্গে শেলি আকৃষ্ট হলেন ২৮ বছরের স্কুলশিক্ষিকা এলিজাবেথ হিচেনারের প্রতি। She was the sister of my soul, my second self – পরবর্তীকালের একটি কবিতায় বলেছেন শেলি।

প্রথম সম্পর্ক টিকল ঠিক দু’বছর। প্রথম কন্যাসন্তান এলিজাবেথ ইয়ানথে শেলির জন্মের পর পরই হ্যারিয়েটের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হল শেলির। আবার বেরিয়ে পড়লেন তিনি। ঘরে তখন এক বছরের মেয়ে আর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী। ইতিমধ্যে শেলির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে লেখক, দার্শনিক উইলিয়াম গডউইনের। তাঁর স্ত্রী, এক মেয়ের জন্মের কিছু দিন বাদেই মারা গিয়েছেন। গডউইনের কাঁধে তখন সেই মেয়ে, মেরি ওলস্টেনক্রাফট গডউইনকে বড় করার ভার। স্কটল্যান্ডে পড়াশোনা করা মেরি বিদূষী, সুন্দরী। প্রথম দর্শনেই তাঁর প্রেমে পড়লেন শেলি। তত দিনে গডউইন আবার বিয়ে করেছেন।

সে সময়ে গডউইনদের বাড়িতে আসতেন অন্য কবিরা। মেরি ক্রমে পরিচিত হলেন কোলরিজ এবং ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার সঙ্গে। অবসর সময়ে তিনি পড়েন একের পর এক বই, লিখতে ভালবাসেন গল্প। আর স্বপ্ন দেখেন, এক দিন বাড়ির একঘেয়ে জীবন ছেড়ে তাঁর কল্পজগতের সন্ধানে বেরোবেন।

ক্রমে মেরি-শেলির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হল। শেলি তখন ২২ বছরের যুবক, মেরি ১৭। গডউইন তাঁদের সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু মেরি-শেলি তত দিনে ঠিক করে ফেলেছেন, ঘর বাঁধবেন।

এক অজানিত বাঁক নিয়ে জীবন বইতে শুরু করল নতুন খাতে। মেরি, শেলি এবং মেরির সৎ বোন ক্লেয়ার বেরিয়ে পড়লেন। ঋণে জর্জরিত তখন তাঁরা। তার মধ্যেই ঘুরে বেড়ালেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। ডোভার থেকে গেলেন ফ্রান্সে। সে দেশে পৌঁছে ‘যেন পুনর্জন্ম হল’ – তাঁর জার্নালে লিখছেন মেরি। তিন বছর পরে সেই জার্নাল বই হয়ে বেরোবে ‘হিস্ট্রি অব আ সিক্স উইক্স টুর’ নামে। ইউরোপ ঘুরে কেটে গেল ছ’সপ্তাহ। কিন্তু ঘরের টান যে কিছুতেই ভুলতে পারছেন না মেরি। অগত্যা তাঁরা ফিরে এলেন ইংল্যান্ডে। থাকতে শুরু করলেন সারে-তে। সেখানেই শেলি লিখলেন ‘দ্য স্পিরিট অব সলিচিউড’। সেই কবিতা তাঁর সাফল্যের মুকুটে প্রথম পালক।

দু’বছর পরে, ১৮১৬ সালে প্রেমিক-প্রেমিকা বেরিয়ে পড়লেন সুইৎজারল্যান্ডের পথে। সেখানে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে দেখা হল লর্ড বায়রনের। তিনি মেরি-শেলিকে আমন্ত্রণ জানালেন তাঁর বাড়িতে। এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় সেখানে বসল ভূতের গল্প লেখার আসর। সেই আসরেই মেরি লিখতে শুরু করলেন তাঁর জীবনের সেরা সৃষ্টি ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’। তিন বছর পরে সেই লেখা বেরোল ছাপার অক্ষরে। মেরি ওলস্টোনক্রাফটের নাম জানল বিশ্ব।

ওই বছরেরই ডিসেম্বরে দেশে ফিরে প্রথম স্ত্রী হ্যারিয়েটের মৃত্যুসংবাদ পেলেন শেলি। আত্মঘাতী হওয়ার আগে এক চিঠিতে হ্যারিয়েট শেলিকে তাঁর নতুন জীবনের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়ে গিয়েছিলেন, যে সাহচর্য থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছিলেন জীবনভর। হ্যারিয়েটের মৃত্যুর তিন সপ্তাহ কাটতেই গাটছড়া বাঁধলেন শেলি ও মেরি। মেরি ওলস্টোনক্রাফট হলেন মেরি শেলি। নবদম্পতি থাকতে শুরু করলেন ইতালিতে। সেখানে লর্ড বায়রনের কবিতার জগতের সঙ্গে পরিচয় হল শেলির। নতুন করে যেন প্রতিভার স্ফূরণ ঘটল। শেলি লিখতে শুরু করলেন ‘ওড টু দ্য ওয়েস্ট উইন্ড’, ‘টু আ স্কাইলার্ক’, ‘হিম টু দ্য ইন্টেলেকচুয়াল বিউটি’র মতো কবিতা।

মেরি-শেলির দাম্পত্য জীবন অবশ্য খুব সুখের হয়নি। স্বামীর বোহেমিয়ান জীবনযাপনে ব্যথিত হয়েছেন মেরি। বিপর্যয় এসেছে দুই সন্তানের মৃত্যুতেও। কিন্তু তা তাদের ভালবাসায় কখনও চিড় ধরাতে পারেনি। ১৮২২-এর ৮ জুলাই। ৩০তম জন্মদিনের আগে বন্ধু এডওয়ার্ড উইলিয়ামসের সঙ্গে নৌকা করে ফিরছিলেন শেলি। হঠাৎই ছন্দপতন। মাঝসমুদ্রে ডুবে গেল নৌকা। পরে ভেসে উঠল শেলির দেহ। অকস্মাৎ থেমে গেল রঙিন এক জীবন। মাত্র ২৪ বছর বয়সে তাঁর সবচেয়ে বড় বন্ধুকে হারালেন মেরি।

স্বামীর মৃত্যুর পরে বাকি জীবন তাঁর সাহিত্যর্কীতি সযত্নে রক্ষা করেছেন মেরি। বাঁধা ছকের বাইরে গিয়ে জীবন কাটানো, আপসহীন ভাবে লিখে যাওয়া এবং নিজের প্রতি অটল বিশ্বাস – এই তিন গুণ আজও উজ্জ্বল করে রেখেছে এই দম্পতিকে।