কনকনে শীতের বরফঢাকা বদ্রিনাথে কে থাকে? মন্দিরের হাই-প্রোফাইল নাম্বুদিরিপাদ ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা পর্যন্ত নেমে যান জোশি মঠে। গরম পড়লে— মানে বরফ গললে— ফের উঠে আসা। তবু কেউ কেউ থেকে যান। মন্দির ও লোকালয় থেকে দূরে, পাহাড়ের নির্জন গুহায়।  সমতলের মানুষ— একটু উত্তুরে হাওয়া দিলে বা তাতটা ডিগ্রিখানেক বাড়লেই কেঁপে-ঘেমে যাওয়া মানুষ মাত্রেই যা ভাবতেই ভয় পান, শিউরে ওঠেন। কিন্তু এই যোগীরা দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনা, সুখেষু বিগতস্পৃহ। সুখ-দুঃখের মতোই, তাঁদের কী ঠান্ডা, কী বা গরম!

একশো বছরেরও আগে, তখনকার বদ্রিনাথ মন্দিরের পিছনে ছোটবড় গুহাগুলোর একটায় ধ্যানে বসে ছিলেন এক তরুণ যোগী। বছর উনিশ বয়স, কোমরে ছোট্ট একফালি কাপড় জড়ানো, আদুড় গা। সুদর্শন, এক ঢাল কালো চুল, দাড়ি। যোগীর পূর্বাশ্রম বারাণসীর এক পণ্ডিতগৃহে। তাঁর পূর্বপুরুষেরা শিষ্য ছিলেন এক প্রবাদপ্রতিম যোগীর, যাঁর নাম বাবাজি মহারাজ। তাঁর বয়স কত কেউ জানে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম গিয়েছে, উচ্চ আধ্যাত্মিক ভাবসম্পন্ন শিষ্যদের অনেকেই তাঁর দেখা পেয়েছেন— চিরতরুণ, অনিন্দ্যকান্তি। গুহার মধ্যে ধ্যানমগ্ন এই তরুণ যোগীর নয় বছর বয়সেই বাবা তাকে সঁপে দিয়েছিলেন গুরুর কাছে। তার পরে আরও ন’বছর কেটে গিয়েছে গুরু-সঙ্গে। মাত্র বছরখানেক হল সে একাকী, একক ভ্রামণিক।

গভীর ধ্যানে মগ্ন তরুণ যোগী, আর ঠিক সেই সময়েই গুহামুখে হাজির এক বৃদ্ধ। মাথায় ময়লা সবুজ পাগড়ি, গলায় জপমালা তসবি, দাড়ি মেহেন্দির রঙে রাঙানো। পরনের জোব্বার মতো পোশাকটা নোংরা, ছোঁড়া-ফাটা। বেশভূষা দেখে বোঝা যায়, এক মুসলমান ফকির। হতবল, পরিশ্রান্ত। যোগীকে দেখে যেন দু’চোখে আলো জ্বলে উঠল তাঁর। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে সামনে এসে সটান প্রণিপাত। তাতেই শেষ নয়, দু’হাত বাড়িয়ে বৃদ্ধ জড়িয়ে ধরলেন তরুণ যোগীকে, হারানিধি ফিরে পেয়ে যেমন করে মানুষ!

সাধক: মুমতাজ়। শিবপ্রসাদ। মধুকরনাথ। শ্রী‘ম’। যোগীর যাত্রাপথ।

চমকে, শিউরে উঠলেন তরুণ যোগী। রাগে, ঘৃণায় গা-ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিলেন বৃদ্ধ ফকিরকে। ‘‘এত বড় স্পর্ধা! ছি ছি, ধ্যান তো গেলই, অশুচি হয়ে গেলাম আমি! অলকানন্দায় স্নান সেরে এসে বসতে হবে ফের!’’ কাতর, মরিয়া ফকির বলেন, ‘‘অপরাধ নেবেন না। আমার সুফি গুরু মৃত্যুর আগে আমায় বলে গিয়েছিলেন, অধ্যাত্মচেতনার পরের স্তরে পৌঁছতে তোমাকে যেতে হবে বদ্রির কাছে গুহায় ধ্যানরত এক তরুণ যোগীর কাছে। দু’মাস অনেক খুঁজে, অনেক কষ্ট সয়ে আপনাকে পেয়েছি, ফিরিয়ে দেবেন না আমায়। তা হলে অলকানন্দার জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ বিসর্জন ছাড়া পথ নেই আমার!’’

‘‘দূর হয়ে যাও চোখের সামনে থেকে! কে তোমার গুরু, কে তুমি, আমি এ সব কিছু জানি না। আমি কারও গুরু নই, আমার শিষ্য নেই কোনও। চলে যাও— বাঁচো, মরো, যা খুশি করো!— যোগীর কথা শুনে ভগ্নহৃদয় সাশ্রুনয়নে বিদায় নিলেন ফকির। তার পর সত্যি সত্যি ঝাঁপিয়ে পড়লেন অলকানন্দার বিস্ফারিত জলরাশির মধ্যে। তরুণ যোগীর কিন্তু কোনও ভাবান্তর নেই। নদীর পাড়ে গিয়ে শুদ্ধিকরণ মন্ত্রটন্ত্র পড়ে, বরফঠান্ডা জলে ডুব দিয়ে উঠে গা মুছে ফের গুহার পথে এগোচ্ছেন, হঠাৎ শুনতে পেলেন আপন গুরুর কণ্ঠস্বর: ‘‘মধু! এ কী আচরণ তোমার! ফকিরের বাইরেটাই দেখলে শুধু? একটু সময় দিলে না, শুনলে না ওর কথা? তোমার সব সাধনার ফল নিমেষে নষ্ট করে দিলে তুমি, এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিলে। যার কষ্টকে তুমি আমল দিলে না, নিজের জীবনে সেই কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হবে তোমাকে। এস, পদ্মাসনে বসে খেচরী মুদ্রায় ক্রিয়াযোগের অন্তিম ক্রিয়াটি করো, আজ্ঞাচক্র দিয়ে নিজের প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায় যে প্রক্রিয়ায়। আবারও জন্ম হবে তোমার— অন্য জায়গায়, ভিন্ন পরিস্থিতিতে। আর একটা জীবন দিয়ে তোমাকে চোকাতে হবে এই জীবনের ভুল।’’

‘এই গল্পটা আমাকে বলেছিলেন আমার গুরু মহেশ্বরনাথ,’ তাঁর বইয়ে লিখেছেন শ্রী‘ম’। না, শ্রীরামকৃষ্ণের গৃহী শিষ্য, কথামৃতকার মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত বা ‘শ্রীম’ নন। ইনি ইংরেজিতে লেখেন ‘শ্রী এম’, বাংলায় তো শ্রী‘ম’ লেখাই যায়। ‘ম’-এ ‘মধু’। ওই যে, এক্ষুনি বলা গল্পে একশো বছর আগের বদ্রিনাথের গুহার তরুণ যোগীকে তাঁর গুরু ডেকেছিলেন ‘মধু’ নামে, সেই মধু! অবিশ্বাস, হাওয়ায় উড়িয়ে দেওয়া অন্য ব্যাপার, কিন্তু একুশ শতকের যোগগুরু শ্রী‘ম’-র এই আধ্যাত্মিক আত্মজীবনীটি আগাগোড়া ওল্টালে পাঠকের ক্ষতি নেই কিছু। বিশ্বাস বা তর্ক যা-ই করুন, অন্তত ‘মুমতাজ়’ থেকে ‘মধু’ হয়ে ওঠার যাত্রাপথের আনন্দগানটুকু ধরা যাবে চমৎকার!

হ্যাঁ। ‘ম’-এ মুমতাজ়ও। মুমতাজ় আলি খান। কেরলের ছোট্ট এক শহরে ১৯৪৮-এর ৬ নভেম্বর জন্ম— এক মুসলমান পরিবারে। তাঁর পূর্বপুরুষেরা কেরলের ত্রিবাঙ্কোরের (অধুনা তিরুঅনন্তপুরম) মহারাজার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন পেশাদার ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে। তার পর এই ভূমেই শেকড় বিছানো। বাবা-মা আর দুই বোন এক ভাইয়ের সংসার। বাড়ির পিছনে বিরাট বড় উঠোন, কাঁঠাল নারকোল আর ফুলঝোপে ভরা। মা সেখানে মুরগি পোষেন, ছাগলও। বাবা বাড়ি তৈরির কনট্রাক্টর, সঙ্গে কাগজের ব্যবসা। উঠোনের এক দিকটায় ডাঁই কাগজের স্তূপ, আলো-আঁধারিতে সেখানে লুকোচুরি খেলে ভাইবোন। সেই উঠোনেই, নরম হলদে-সোনালি আলো-মাখা এক সন্ধেয় দূরে কাঁঠালগাছের তলায় অস্পষ্ট অন্ধকারে হাতছানি দিয়ে মুমতাজ়কে ডাকল কে যেন সাধু এক। খালি গা, খালি পা। বাদামি চুলের জটা, কানে তামার মাকড়ি, হাতে কমণ্ডলু। চোখ থেকে উপচে পড়ছে অচিন স্নেহ। বালকের মাথায় হাত রেখে সাধু বললেন, ‘‘কুছ ইয়াদ আয়া?’’ না তো! বুকে একটা টোকা দিয়ে বললেন, ‘‘পরে মনে পড়বে। ঘরে যাও এখন।’’ স্পর্শে যেন হালকা হয়ে গেল শরীর। পায়ে পায়ে ঘর, মায়ের কাছে। পিছন ফিরে তাকাতে, কই কাঁঠালগাছের তলায় কেউ নেই তো আর! এমন ঘটনা তো মাকেই বলা যায়, বলতে হয়। মুমতাজ় বলার চেষ্টা করে দেখল, মুখ দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না কোনও। অন্য কথা বলা যাচ্ছে সব, শুধু এই ঘটনা নিয়ে মুখ খুলতে গেলেই যেন গলা চেপে ধরছে কে।

মা, বাবা, পাড়ার বন্ধুরা, কেউ জানল না, কিন্তু একটা অন্তর্জীবনের যাত্রা শুরু হল মুমতাজ়ের। লিখছেন, ধ্যান কী জিনিস তা না জেনেই ধ্যান শুরু হল আমার। কেমন করে? মায়ের পাশে শুয়ে আছেন, গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেল। বুকের ঠিক মাঝখানটায় অদ্ভুত সুন্দর একটা অনুভূতি, যেন কেউ নরম পালক বুলিয়ে দিচ্ছে। মেরুদণ্ড বেয়ে শিরশিরিয়ে উপরে উঠছে কী একটা। পাছে মায়ের ঘুম ভেঙে যায়, তাই চোখ বন্ধ করে শুয়েই থাকল ছেলে। মনশ্চক্ষে ভেসে উঠল কাঁঠালতলায় দেখা সেই মানুষটার চোখদুটো। মিলিয়েও গেল। তার পরেই শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা, রুপোলি আলোর একটা স্রোত এসে মিশল হৃদয়ে। সমগ্র চরাচর আর চেতনা জুড়ে যেন এক অনাস্বাদিতপূর্ব আনন্দ কেবল। আর তার পর গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়া। সকাল হল, মা ডাকলেন ঘুম থেকে, ইস্কুল আছে। পড়াশোনা, সব কাজই চলল বহিরঙ্গে। আর রোজ রাতে সঙ্গী সেই আনন্দের স্বাদ।

নানি গল্প শোনাতেন সুফি সাধকদের। মুসলমান সন্তদের ব্যাপারে তিনি আত্মহারা, হিন্দু সাধক ও দেবদেবীর বেলায় কিন্তু খড়্গহস্ত। তবু জীবন যে কোন স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় কাকে! বাড়িতে বাবার ঘরে একটা দেরাজ তালাবন্ধ থাকে, জানা। এক দিন খোলা পেয়ে ভেতরটা হাতড়ে খুঁজে পাওয়া গেল দুটো ছোট ছোট বই। তার একটা যোগাসনের, অন্যটার নাম ‘জপযোগ ও গায়ত্রী’। লুকিয়ে সেই কাঁঠালতলায় গিয়ে বই খুলতেই বেরিয়ে পড়ল দেবনাগরি অক্ষরে লেখা মন্ত্র— ওঁ ভূর্ভুবস্বঃ... এই মন্ত্রই কাল রাতে স্বপ্নে ভেসে এসেছিল না? তুষারশুভ্র হিমালয়ের কোলে একটা গুহা তো মথিত হচ্ছিল এই উচ্চারণেই! এর পর থেকে মুমতাজ়ের সঙ্গী হল সেই মন্ত্র। একা থাকলেই, বা বহুজনের ভিড়েও নীরবে জপ।

বড় হতে হতে আর যেটা যোগ হল জীবনে— সাধু দর্শন। কখনও পরিকল্পিত, কখনও বা অযাচিত। পাড়ায় বন্ধুর বাড়িতে গোপালস্বামী নামে এক সাধক কাছে ডেকে কপালে আলতো ছুঁয়ে দিলেন— যেন ফুঁসে-ওঠা সমুদ্র শান্ত স্তব্ধ হল নিমেষে, জল ভরে এল চোখে। সাগরপাড়ে এক ন্যাংটো, খ্যাপা সাধু রক্তচোখ মেলে তাকিয়ে খলখল হেসে বলল, ‘‘এখন যাও, পরে তো আসতেই হবে।’’ ঠিকই, পরে আসতেই হয়েছিল ‘কালাডি মস্তান’-এর কাছে। তিরুঅনন্তপুরম পাবলিক লাইব্রেরিতে বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা— উপনিষদ, গীতা, রামকৃষ্ণকথামৃত, বিবেকানন্দের রচনাবলি। ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে রাধাকৃষ্ণণের অনূদিত উপনিষদ আর রমণ মহর্ষির লেখায় ডুবে যাওয়া। নানান বই, নানান প্রশ্ন, সংশয়ও অনেক। উত্তর খুঁজতে জঙ্গলের মধ্যে এক সাধকের সমাধিতে রাত কাটাতে গেলে এক ভীষণদর্শন লোক হাহা হেসে বলে গেল, ‘‘হৃদয়পদ্ম খুঁজছ, জানো না কোথায়? নানান জনেরটা নানান জায়গায়, তোমার অনাহত চক্রে!’’ কন্যাকুমারীর সমুদ্রতীরে নগ্নিকা অবধূত ‘মায়ী মা’ মায়ের মতোই কাছে ডেকে গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন, সঙ্গে আনা দোসার খানিকটা ছিঁড়ে গুঁজে দিলেন সত্যসন্ধানী কিশোরের মুখেই।

ফেব্রুয়ারির এক সকালে বাড়ি থেকে পালাল ছেলে। গুরু, গুরুর সন্ধান চাই তার, সেই যে কাঁঠালতলায় দেখেছিল যাঁকে। ট্রেনে চেন্নাই, দিল্লি, পরে হরিদ্বার। সঙ্গের পয়সায় কেনা হল হলদে ধুতি-কুর্তা আর ঝোলা, মাথা মোড়ানো হল নাপিতের কাছে। হর কি পৌরিতে গঙ্গাস্নান করে ব্রহ্মচারীর বেশ ধারণ। এক আখড়ায় দেখা হল এক দেশোয়ালি ভদ্রলোকের সঙ্গে, তরুণের উদ্দেশ্য শুনে তিনি অবাক! মুসলমান বাড়ির ছেলে হিমালয় এসেছে যোগগুরুর খোঁজে! পরামর্শ দিলেন, ‘‘আসল নামটা বোলো না। বোলো, তোমার নাম ‘শিবপ্রসাদ’।’’ তা-ই সই। হরিদ্বার থেকে হৃষীকেশ, বহু আখড়া, হরেক আশ্রম দর্শন। দেখা হল গঙ্গার মতোই ভারতবর্ষের অধ্যাত্মসাধনার আবহমান ধারাস্রোতকে। বশিষ্ঠ গুহা হয়ে বদ্রিনাথের মন্দির দর্শনও হল। কিন্তু কোথায় সেই যোগী, স্বপ্নে দেখা দুই স্নেহভরা চোখ? তীব্র শীত, দুর্গম পথ পেরিয়ে সন্ধের মুখে ব্যাস গুহায় পৌঁছে থমকে দাঁড়ান শিবপ্রসাদ। গুহার মুখে জ্বলন্ত এক ধুনি! ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন দীর্ঘদেহী, জটাধারী এক সাধু। ‘‘এত দিন কোথায় ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছ, মধু?’’ মধু! কে মধু! আমি তো শিবপ্রসাদের ছদ্মবেশে মুমতাজ়! ‘‘থাক। আমি সব জানি। সেদিনের সেই কাঁঠালতলা থেকে আজকের ব্যাস গুহা... এসো, ক্লান্ত তুমি। খাও কিছু, ঘুমোও। পরে কথা।’’ গুহার মধ্যে শুকনো পাতার গালিচার ‌উপরে কম্বল বিছানো, নির্ভার ঘুম নেমে এল চোখের পাতায়। আর জ্বলন্ত ধুনির সামনে পদ্মাসনে জেগে রইলেন মানুষটা।

টানা সাড়ে তিন বছরের গুরুসান্নিধ্যের সেই শুরু। আদিনাথ-প্রবর্তিত নাথ সম্প্রদায়ভুক্ত যোগী মহেশ্বরনাথ, মুমতাজ় তথা শিবপ্রসাদ তথা ‘মধু’কে শেখালেন ক্রিয়াযোগের তত্ত্ব ও প্রয়োগ দুই-ই। জানালেন, তিনি পরম যোগী ‘শ্রীগুরু বাবাজি’র শিষ্য। সেই শ্রীগুরু বাবাজি, যাঁর শিষ্য ছিলেন লাহিড়ীমশাই, যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী। এমনকি শ্যামাচরণ লাহিড়ীকে প্রথম দিন গুরু-সকাশে নিয়ে গিয়েছিলেন এই মহেশ্বরনাথই। শুনে বিস্ময়ের ঘোর কাটে না মধুর। সে তো একশো বছরেরও বেশি আগের ঘটনা! তা হলে আপনার বয়স কত? গুরু মৃদু হাসেন, মধুকে শেখাতে বসেন ক্রিয়া-প্রাণায়াম। বলেন, যোগী ক্রিয়াযোগ শিখবে স্রেফ ধ্যানের জন্য নয়, শ্রীগুরু-সাক্ষাতের জন্যও নয়; চেতনার উচ্চতর, সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছনোর জন্য— যেখানে পৌঁছলে নিশ্চিত উপলব্ধি হয় ‘আমি’ কে, আমি কী, আমি কেন। আবার সব সময় শুধু এ-ই নয়। কী করে ঠিকমতো সব্জি কাটতে হয়, গুরু শেখান তা-ও। বলেন, তুমি যদি ভাত রান্না, আনাজ কাটার মতো কাজটাই ঠিকঠাক করতে না পারো, তা হলে যোগীর পাখির চোখ যা, সেই চরম ও পরম ‘ঠিক’-এর সাধনা করবে কী করে? মহেশ্বরনাথই শোনান মধু নামের সেই তরুণ যোগী আর সেই মুসলমান ফকিরের কথা।

অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতার কথা বইয়ে লিখেছেন মধু। দাউদাউ ধুনি জ্বলছে, হঠাৎ একটা অগ্নিশিখা লাফিয়ে উঠে, নাভি ছুঁয়ে স্পর্শ করে মেরুদণ্ডকে, বেয়ে উঠতে থাকে মস্তিষ্কে। গুরুর সঙ্গে কৈলাসের পথে এক বৌদ্ধ মঠের বাইরে তাঁবুতে রাতে শুয়ে আছেন, আবছা আলোয় গোরিলার মতো ও কে? তুষারমানব ইয়েতি? ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্সে কতশত ফুল! গুরু চিনিয়ে দেন— এটা ইমেলা, ওটা কোবরা লিলি, এটা এডেলওয়াইস, ওটা হগউইড... কেদারনাথে রীতিমতো গুপ্ত অনুষ্ঠান, শবাসনে শুইয়ে গুরু বললেন, ‘‘চোখ বন্ধ করো, তোমার আত্মাটাকে দেহ থেকে বার করে দাও।’’ মধু গুহামুখে দাঁড়িয়ে নিজেই দেখছেন নিজের শরীরটাকে! যখন সম্বিৎ ফিরল, মনে হল, নবজন্ম হয়েছে— পথের ধূলিকণা থেকে মহাকাশের মিল্কিওয়ে অবধি সব কিছু জবজব করছে চৈতন্যে।
বেশ চলছিল। এই পথ শেষ না হলে ভালই হত। কিন্তু এক দিন শিক্ষক বললেন, এ বার পথ চলতে হবে একা। তিনি থাকবেন অলক্ষে, যখন প্রয়োজন, আসবেন। শত কান্নাকাটি, অভিমানে পাষাণ গলল না। কেনই বা গলবে? গুরুই বলেছেন, মধুর জন্য ভবিষ্যতে অপেক্ষা করে আছে ভরভত্তি কাজ। অন্য জীবন। যে কাজ, যে জীবনের জন্য তিনি পূর্বনির্দিষ্ট। আজ যার সন্ন্যাসীর বেশ, ক’দিন পর তাঁকেই ফিরে যেতে হবে সংসারে, গৃহস্থের জীবনে। নাথ যোগীদের মতো নিয়ত ধুনি জ্বালিয়ে রাখতে হবে না, সাধারণের বেশে তিনি থাকবেন সাধারণ্যেই। বিয়ে করবেন, জন্ম দেবেন সন্তানের। কিন্তু যোগে সম্পৃক্ত থাকবে অন্তর্জীবন। নাথ যোগী-পঙ্‌ক্তিতে তাঁর নাম হবে ‘মধুকরনাথ’, সে জন্যেই প্রথম দিন গুরু তাঁকে ডেকেছিলেন ‘মধু’ বলে। মধু, মধুকরনাথের আদ্যক্ষরই হবে তাঁর বিশ্বজনীন পরিচয়— শ্রীএম।

তা-ই হয়েছিল। কিন্তু গৃহকোণে ফেরার আগে কাজ বাকি ছিল আরও। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে ব্রহ্মচারী হয়ে ছিলেন কিছু কাল, গুরুরই নির্দেশ ছিল তা। বহু বছর ছিলেন আর এক ভারতবিখ্যাত দার্শনিক-বক্তা জিড্ডু কৃষ্ণমূর্তির প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে। জীবনে যা কিছু এসেছে, ফিরে গিয়েছে, সব কিছুকেই বরণ করেছেন সহজ সত্যের আলোয়। তার কিছু মনে হতে পারে অলৌকিক, অবাস্তব, অবান্তরও। মনগড়া, ভাওঁতাবাজি বলে প্রত্যাখ্যানও করতে পারেন, কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না। ভারতের যোগসাধনার ধারা কোথাও ফল্গুর মতো গভীর গোপন, কোথাও অলকানন্দা-ভাগীরথীর মতো ফেনিল স্বপ্রকাশ। গণ-যোগাসনের ছবি দিয়ে যোগ দিবস উদ্‌যাপনের দেখনদারি ছাড়িয়ে বহু বিচিত্র পথে তার বিস্তার।

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও।সাবস্ক্রাইব করুনআমাদেরYouTube Channel - এ।