এক পশলা বৃষ্টি’তে প্রথম জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে শুটিং করি। নীতীশ রায়ের পরিচালনা। অরোরা স্টুডিয়োতে শুটিং। তখন আমার চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়স। একটা বেসরকারি সংস্থায় অ্যাকাউন্ট্যান্ট-এর কাজ করি। সঙ্গে থিয়েটার। চিত্তবাবু, পরে যিনি ‘পাখি চিত্ত’ নামে পরিচিত হন, আমায় বেছেছিলেন। একটা বাড়িতে দোলের দিন খুব নাচগান করছি। চিত্তবাবুও উপস্থিত ছিলেন। ডেকে বললেন, ‘অভিনয় করবে?’ বললাম, ‘হ্যাঁ’। পরে বাড়ির ল্যান্ডলাইনে ফোন, ‘বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি— তিনটেই বলতে পারো তো?’ বললাম, ‘হিন্দি আর ইংরেজিটা মোটামুটি পারি।’ গম্ভীর গলায় শুধু বললেন, ‘হুঁ’।

তার পর তো শুটিং ফ্লোর। ডিরেক্টর বললেন, ‘তুমি একটা ফাইভ স্টার হোটেলের কিচেন কাউন্টারে বসে আছো। ফোনে অর্ডার নিচ্ছ। বলছ, ‘বয়েল্‌ড এগ? হাউ মেনি মিনিট্‌স স্যর?’ বলতে বলতে তোমার অন্য ফোন আসে। তুমি আগের ফোনটায় ‘জাস্ট আ সেকেন্ড স্যর’ বলে এই ফোনটা ধরে কী একটা শুনে সামনের দিকে তাকিয়ে হিরোর নাম ধরে চেঁচিয়ে ডেকে তাকে বলো, ‘তোমার ফোন’। বলে তুমি আবার আগের ফোনটায় অর্ডার নিতে শুরু করো, কাগজে নোট নিয়ে সেটা ছিঁড়ে কুককে দাও।’ বুম্বাদা ছবির হিরো। বুম্বাদা, অনুপকুমার দুজনকেই সেই প্রথম সামনে থেকে দেখলাম। সেট-এ কিচেন তৈরি করার জন্য কাবাব রাখা হয়েছে। রেডি কাবাব। তার তলায় শিক দিয়ে নীচে রাখা হয়েছে ছোবড়ার ধুনো। তা থেকে ধোঁয়া বেরচ্ছে। দেখে যাতে মনে হয়, কাবাবটা তৈরি হচ্ছে। অনুপকুমার তো সেটে ঢুকেই সেটা দেখে বললেন, ‘ধুনি কাবাব’। সবাই হেসে উঠল।

ডিরেক্টর আমায় তো শট বুঝিয়ে দিলেন। কিন্তু আমি কিছুই বুঝলাম না। এ দিকে ডিরেক্টর বললেন, ‘চলো এ বার টেক-এ যাই।’ বুম্বাদা কিন্তু আমার মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছেন, আমি কিছুই বুঝিনি। উনি ডিরেক্টরকে বললেন, উনি বোধ হয় ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারেননি। বলে বুম্বাদা নিজেই আমায় ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলেন। আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। অত বড় এক জন স্টার এক জন জুনিয়র আর্টিস্টকে এতটা সম্মান দিলেন! ওঁর প্রতি তখন থেকেই আমার একটা শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি হয়ে গেল।

শটটা তো হল। কিন্তু আমার তো ক্যামেরা সম্বন্ধে কোনও ধারণাই নেই। ফলে অন্য জুনিয়র আর্টিস্টরা কাউন্টারের সামনে এসে অর্ডার নেওয়ার পার্টটা করতে করতে আমায় গার্ড করে দিলেন। ক্যামেরায় তাঁদের মুখগুলো দেখা গেল। আমাকে আর দেখাই গেল না। ছবিটা আমি আর কোনও দিন দেখিইনি। অভিমান করে নয়। আসলে, খবরই পাইনি। জুনিয়র আর্টিস্টদের তো কেউ ইনভাইট করে না।

কিন্তু আমার সিনেমায় আসল আত্মপ্রকাশ তপন সিংহের হাত ধরে, তাঁর ‘আজব গাঁয়ের আজব কথা’ ছবিতে। এটাকেও আমি আমার প্রথম ছবিই বলব। এতেই প্রথম আমার মুখ্য চরিত্রে অভিনয়। তপনবাবুর সঙ্গে এর আগেও ছোট ছোট দুটো কাজ করেছি। তখন এড্‌সের ওপর কিছু ডকু-ফিচার হত, নাম খুব সম্ভবত ‘অজানা শত্রু’। সেই ডকু-ফিচার আর ‘হুইলচেয়ার’-এ আমি জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেছি। তপনবাবু এক দিন ডেকে পাঠালেন। বললেন, একটা বাচ্চাদের ছবি করছি। তাতে মেন নেগেটিভ রোলে তোমায় ভাবছি। স্ক্রিপ্টটা শোনো। মনে হয় তোমার ভালই লাগবে। আমার তো প্রায় মাটিতে মিশে যাওয়ার জোগাড়। তপন সিংহ আমায় বলছেন যে, আমার হয়তো কাজটা করতে ইচ্ছে করবে!

যা হোক, এই ছবি দিয়ে আমার প্রথম নেগেটিভ-এ পা দেওয়া শুরু। রোলটার জন্য একটা আর্মির পোশাক দরকার ছিল। আমার চরিত্রটা একটা ডাকাত দলের সর্দারের। সে আর্মির পোশাক পরে ঘোরে। ধর্মতলার একটা দোকান থেকে কাপড় কিনে প্রোডাকশনের লোকেরা পোশাকটা বানিয়ে নিয়ে এল। তখন আমি বাসে যাতায়াত করি। কিন্তু ছবিতে কাজ পেয়েছি বলে ট্যাক্সিতে চড়ে কস্টিউমটা নিয়ে ফিরছি। এবং কস্টিউমটা নিয়ে আসছি— সেই উত্তেজনায় ওটা গাড়িতে রেখেই নেমে পড়লাম।

জীবনের প্রথম ছবি। অথচ আমি গিয়ে প্রোডাকশন হাউসের লোকজনকে বলছি, আমার কস্টিউমটা এ ভাবে খোওয়া গেছে! গুছিয়ে মিথ্যে বলাটা তেমন রপ্ত করতে পারিনি। ফলে সত্যি যা ঘটেছে, তেমনটাই বললাম। এমনকী, কস্টিউমটা যে নতুন করে বানিয়ে নেব, সে পয়সাটাও তখন আমার কাছে নেই। কিন্তু তপনবাবু সব শুনে একটুও বকাবকি না করে বললেন, ওকে আর একটা সেট বানিয়ে দাও। একটু তাড়াতাড়ি করো। শুটিংয়ের আর খুব বেশি দেরি নেই।

উনি স্ক্রিপ্টটা পড়ার জন্য ডাকলেন। তার পর যে অভিনেতা যে যে কথা বলবে, উনি নিজে করে দেখিয়ে দিলেন। তখন ওঁর শরীর খারাপ। ‘সফেদ হাতি’ করতে গিয়ে উনি হাতির আক্রমণে জখম হয়েছেন। চেয়ার থেকে উঠতে কষ্ট হয়। বারুইপুরের রাজবাড়িতে শুটিং হয়েছিল। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, মনোজ মিত্র, নির্মলকুমার, দেবশ্রী রায় অভিনয় করেছিলেন। ছবিতে প্রথমে নানা পটেকরের কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু পরে বিভিন্ন কারণে তিনি করে উঠতে পারেননি। সেই রোলটা করেছিলেন দেবেশ রায়চৌধুরী। যাঁরা প্রোডিউসার ছিলেন, তখন ওটা তাঁদের হয়তো তিন কি চার নম্বর ছবি। দুটি বাচ্চা বাচ্চা ছেলে। সবে বোধহয় কলেজ ছেড়ে বেরিয়েছে। তপন সিংহ তখন এতটাই আমাকে ঘিরে রয়েছেন, যে প্রোডিউসারদের সঙ্গে আলাদা করে আলাপ করার কথা মনেই নেই। পরে, আরও বছর দশেক বাদে আমি একটি হাউসে ছবি করতে যাই, তখন তাঁরা বলেন, আমরা কিন্তু একসঙ্গে কাজ করেছি। আমি অবাক। আমি তো কখনও এই অফিসে আসিনি। বললেন, আপনার খেয়াল নেই, সেই যে ‘আজব গাঁয়ের আজব কথা’... খেয়াল পড়ল। তাঁরা বেশ প্রতিষ্ঠিত প্রোডিউসার তখন। সেই ঝকঝকে চেয়ারের আড়ালে সেই ছেলেমানুষ মুখ দুটো তখন মনে পড়ল। তাঁরা হচ্ছেন মণি এবং শ্রীকান্ত।

কিন্তু তখন শট দিতে গেলে যে নার্ভাসনেসটা আসত, এখনও ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে সেই টেনশনটাই অনুভব করি। মনে হয়, অভিনেতাদের সেই নার্ভাসনেসটা বোধহয় সারা জীবনের সঙ্গী।

 

rajatava8@gmail.com