‘গ্লোবাল ভিলেজ’ কথাটা আজকাল আমরা খুব ব্যবহার করি। বিশ্বায়নের যুগে সমগ্র পৃথিবীটাই যেন একটা গ্রামে পরিণত।

মার্শাল ম্যাকলুহান তাঁর বই ‘দ্য গুটেনবার্গ গ্যালাক্সি: দ্য মেকিং অফ টাইপোগ্রাফিক ম্যান’ এবং ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া’— এই দু’টি বইয়ে এই ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ কথাটিকে প্রথম জনপ্রিয় করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ইন্টারনেট আসলে চেতনার এক নতুন সম্প্রসারণ যা এই পৃথিবীকে একটি ছোট্ট গ্রামে সঙ্কুচিত করেছে।

এ বার এই সোশ্যাল মিডিয়ার এক প্রবল প্রতাপ দেখছি ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে। এটা যে খুব আকস্মিক তা নয়, মার্কিন মুলুকে ২০০৮ সালে বারাক ওবামার ভোটেও এই সোশ্যাল মিডিয়ার এক অভূতপূর্ব ভূমিকা দেখেছি। সে সময়ে ওবামাও এক গবেষক টিম তৈরি করেছিলেন ভোটযুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহারের জন্য।

ভারতের রাজনীতিতেও ধীরে ধীরে এই সোশ্যাল মিডিয়া বিরাট এক ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। ২০১৪ সালে ১৪ কোটি ৯০ লক্ষ ভোটার প্রথম বারের জন্য ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছেন। গত বার কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত বিজেপি-র চেয়ে চার কোটি বেশি ভোট পায়। এই চার কোটি ভোটে নবীন ভোটারই ছিল প্রধান। আর এই নবীন ভোটাররাই ফেসবুক, টুইট, ওয়াটস আপ, গুগল, ট্যাগ-ওয়ার-এ সক্রিয়। আরও তথ্য জানাই। শহুরে ভারতীয় ভোটারদের শতকরা ৩৭ ভাগ কোনও না কোনও ভাবে অনলাইন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। এটা গুগল-এর সমীক্ষা জানাচ্ছে। ১০ জন শহুরে ভোটারের মধ্যে চার জন ইন্টারনেটে সক্রিয়।

এ বার গুজরাতে মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী টুইট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রথম থেকে সক্রিয় হন। পৃথিবীর নানা প্রান্তে নাগরিক সমাজে ইন্টারনেট ফেসবুকের প্রভাব প্রতিপত্তি আমরা তো দেখছি। আরব বসন্ত ইজিপ্টে টিউলিপ বিপ্লবে ফেসবুক আর টুইটের ভূমিকা তো আজ আর কারওরই অজানা নয়। চিনের মতো বদ্ধ সমাজে এক মতাদর্শের লৌহশৃঙ্খলার মধ্যেও ফেসবুক ও টুইটে কী ভাবে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে আর তা নিয়ে কী ভাবে শাসক দল উদ্বিগ্ন এ সবও দেখছি আমরা। ইরানে গিয়ে দেখলাম, সেখানকার মেয়েদের উপর রাষ্ট্রের নানা বাধানিষেধ থাকায় তাঁরা অন্য নামে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে নানা দেশের বন্ধুদের কাছে নানা ক্ষোভের কথা জানাচ্ছেন।

ভারতে এই সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করে সাংবাদিক শাইলি চোপরা দ্য বিগ কানেক্ট— পলিটিক্স ইন দ্য এজ অফ সোশ্যাল মিডিয়া নামে একটি বই লিখেছেন। সেখানে লেখিকা বলছেন, নানা গবেষণালব্ধ তথ্য হল, ভারতে যে ভোটদানের শতকরা পরিমাণ হু হু করে বাড়ছে তার পিছনে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হল এই সোশ্যাল মিডিয়ার। ২০১৩ সালে বিধানসভা নির্বাচনগুলিতে ভোটদানের শতকরা পরিমাণ দারুণ ভাবে বেড়েছে।

২০১২-র ১৬ ডিসেম্বর দিল্লির গণধর্ষণ, তার পর অন্না হজারে ও অরবিন্দ কেজরীবালের গণ আন্দোলনেও এই টুইট-ফেসবুক ছিল এক মারাত্মক অস্ত্র। কেজরীবাল তো আম আদমি পার্টির তহবিল সংগ্রহও অনলাইনের মাধ্যমে করেছেন।

প্রবীণ রাজনীতিক, যাঁরা মোবাইল পর্যন্ত ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারতেন না, তাঁরাও ভারতের রাজনীতিতে এই ফেসবুক-টুইটে কার্যত সামিল। অরুণ জেটলি এখনও মোবাইলে এসএমএস করতে পারেন না। কিন্তু এখন তাঁর নামে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট। সেখানে কত জন ‘লাইক’ করছেন, কত জন কত রকম মন্তব্য প্রকাশ করছেন— এ সবই বিচার্য বিষয়। অরুণ জেটলি তো নিয়মিত ব্লগও লিখতে শুরু করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। প্রথমত, এটি এক প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। জন সমাবেশে আপনি যখন বক্তৃতা দিচ্ছেন তখন সেটি একমুখী। আপনি বলছেন, শ্রোতারা শুনছেন। কখনও কখনও তালি দিচ্ছেন। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত ভাবে মন্তব্য ও মতামত প্রকাশের পরিসর থাকছে। ভোটারদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করার কাজেও এই মাধ্যমকে ব্যবহার করা যাচ্ছে। ২০১৩-র ডিসেম্বরে বিধানসভা নির্বাচনে শতকরা ৬৭ ভাগ ভোট পড়ে। ৯৩ সালে তা ছিল ৬১.৭৫ ভাগ। স্বাধীনতার পর এটা না কি দ্বিতীয় বৃহত্তম ভোটদান।

সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অনেক নতুন নতুন লেখক, নতুন নতুন ভোট বিশেষজ্ঞ তৈরি হচ্ছেন। এঁরা সংবাদ মাধ্যমের মূল স্রোতের বাইরে। এই যে গুরুচণ্ডালি বা সাংবাদিকতার ছাত্রছাত্রীদের সামাজিক গোষ্ঠীর মতো হাজারো সংস্থা মতামত প্রকাশ টুইটারে তার সামাজিক প্রভাবকে তো অবজ্ঞা করা যায় না। গোটা দেশের মানুষ ঠিক কী ভাবছেন, কে কার উপর কতটা রেগে আছেন, কতটা খুশি, কতটা প্রত্যাশা এ সবেরও এক অসাধারণ ব্যারোমিটার এই সোশ্যাল মিডিয়া।

আইএএমএআই এবং আইএমআরবি ইন্টারন্যাশানাল-এর সমীক্ষা অনুসারে ২০১৩ সালে শহুরে ভারতে সাত কোটি আশি লক্ষ মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত। ২০১৪ সালে এটি দ্বিগুণ হবে। ভারতীয় জনসংখ্যার শতকরা ৫০ ভাগ এখন ২৫ বছর বয়সের নীচে। এই জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগ সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত। ৩৫টি শহরে সমীক্ষা করে দেখা যাচ্ছে, এক কোটি ৯৮ লক্ষ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী এই ফোনের মাধ্যমে ওয়েবসাইটের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন।

ইউটিউব-এর মাধ্যমেও এখন কংগ্রেস, বিজেপি, এমনকী, সিপিএমের মতো মার্কসবাদী দলও তাদের জনসভাগুলির ভিডিও ফুটেজ দেখাচ্ছে। ২০০৭ সালে সিএনএন এক অনুষ্ঠানে একটি বাক্য চয়ন করে। সেটি হল You Tube-fication of election। বাংলা করা যায় নির্বাচনের ইউটিউবীকরণ। ওবামা বনাম ম্যাকেনের প্রচারের সময় এমনটা হয়েছিল। নরেন্দ্র মোদীর ইউ টিউব চালু হয়েছিল ২০০৭ সালে। গ্রাহক ১ লক্ষ ৯ হাজার ৩০০ আর দর্শক ১ কোটি ২৩ লক্ষ ২ হাজার ৫৩। মোদী ইন্ডিয়া ২৭২.কম এবং নীতি সেন্ট্রাল.কম-এর মাধ্যমে বিজেপি তথা মোদী সমর্থকদের একটি মঞ্চ গড়ে উঠছে ধীরে ধীরে। প্রচারের বিষয় ‘মোদীফাইং ইন্ডিয়া’।

সোশ্যাল মিডিয়ার আর একটি বৈশিষ্ট্য হল, এক জন সচেতন নাগরিক নিজের রাজনৈতিক সত্তাকে প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠা করা ও মতামত জানানোর সুযোগ পাচ্ছেন। আপনি বামপন্থী বা দক্ষিণপন্থী তা নিয়ে শুধু কফি হাউসে তুলকালাম করলেই হবে না। সোশ্যাল মিডিয়াকে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করে নিজের ‘ইগো’কেও আদরে লালন করতে পারেন আপনি।

ওবামা এবং ডেভিড ক্যামেরুনকে অনুসরণ করেন অসংখ্য মানুষ। এখন তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সক্রিয়। ৬ লাখ ফ্যান তাঁর অ্যাকাউন্টে। বরং সংবাদমাধ্যমের মূলস্রোতে তাঁর সমালোচনার জবাবের কাজেও তৃণমূল কংগ্রেস সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করছে। ভাবা যায়! কমিউনিস্ট পার্টি পর্যন্ত এখন সরাসরি না হলেও নানা কর্মী-সমর্থকদের মাধ্যমে এই মাধ্যমে সক্রিয়। বিজু জনতা দল থেকে নীতীশ কুমার, জয়ললিতা-করুণানিধির মতো নেতারাও এখন এই মাধ্যমে এ বারের ভোটে সামিল।

আবার ধরুন, অর্ণব গোস্বামীকে দেওয়া রাহুল গাঁধীর সাক্ষাৎকার নিয়েও তর্ক-বিতর্ক, তার সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়েও আলোচনার মঞ্চ হল এই সোশ্যাল মিডিয়া। তবে প্রশ্ন একটা থাকে। সেটা হল, ভারত এখনও এক রূপান্তর পর্বের মধ্য দিয়ে চলেছে। আজও এক বিপুল গ্রামীণ ভারত আছে যেখানে এই ফেসবুক- টুইট-ইউটিউব সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা এক বিষয়। তা হলে এই সোশ্যাল মিডিয়ায় কি কৃত্রিম ভাবে নানা কৌশলে এক পরা বাস্তবতা বা ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’  তৈরি করা যায় যা আসল মা-মাটি-মানুষের বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে? উমবার্তো ই কো যাকে হলোগ্রামের রাজনীতি বলেছেন। বিজ্ঞাপনের সুকৌশলী প্রচারের মাধ্যম হয়ে ওঠে সোশ্যাল মিডিয়া। যা অনেকটাই গাণিতিক সৃজন, স্বতঃস্ফূর্ত সচেতনতার ক্যাথারসিস নয়?

এ প্রশ্নের সঠিক জবাব আমিও জানি না। বাস্তবতা এবং পরাবাস্তবতা এই রাজনৈতিক সমাজে বড় মিলেমিশে আছে। কোথায় যে বাস্তবতার সীমা অতিক্রান্ত হয়, আর আমরা মায়া বাস্তবতাকেই বাস্তবতা বলে ভ্রমের শিকার হই, সেটাও জানি না।