আর এক বছর পরেই লোকসভা নির্বাচন| সম্প্রতি একের পর এক উপ-নির্বাচনে বিজেপির পরাজয় পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে| বিরোধী শিবির ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে| কিন্তু এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ বিরোধী শিবিরকে ছত্রভঙ্গ করে আবার সিংহাসনে বসতে কোনও কৌশল রচনা করবেন না।

কী হবে সেই স্ট্র্যাটেজি? তা নিয়ে কম আলোচনা হচ্ছে না| বরং বলব, দিল্লি এখন নরক গুলজার ঠিক এই আলোচনা নিয়েই| মোদীবাবু নীরবে হার মানার পাত্র তো নন| তবে কি পাকিস্তানের সঙ্গে কোনও যুদ্ধে যাবেন মোদী?

না কি অযোধ্যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে কোনও আদেশ আসতে চলেছে? সরকার বাহাদুর কি সে জন্য লড়ে যাচ্ছে? উত্তরপ্রদেশটা এই যে হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, তার জন্য আবার জয় শ্রী রাম ধ্বনি দিয়ে বিজেপি নির্বাচনে যাবে?

কিছু দিন আগে অমিত শাহ আমাদের মতো কিছু সাংবাদিককে নৈশভোজে ডেকেছিলেন| অমিত শাহের টেবিলে ওঁর ডান পাশে বসেছিলাম| কেউ এক জন প্রশ্ন করল, ২০১৯ তো আর এক বছরও বাকি নেই| আপনার স্ট্র্যাটেজি কী? জবাবে বিজেপির কৌটিল্য বললেন, ‘‘এখনও তো এক বছর বাকি আছে| অনেক সময়!

মনে পড়ে, বাজপেয়ীজির আমলে এক বার আডবাণীকে কেউ প্রশ্ন করেছিলেন, আপনার স্ট্র্যাটেজি কী? জবাবে আডবাণী বলেছিলেন, স্ট্র্যাটেজিই যদি হয় তবে সেটা ভোটের আগেই সাংবাদিকদের বলব কেন? সে দিন ‘ইকনমিস্ট’ পত্রিকায় প্রকাশিত লেখকদের জন্য স্টাইল বুক-এ বলা হয়েছে, অনেক সাংবাদিক স্ট্র্যাটেজির মতো শব্দ খুব ‘ক্যাজুয়ালি’ ব্যবহার করেন| এটা না করাই বাঞ্চনীয়|

দলের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে অমিত শাহ।

তবে মোদী এবং অমিত শাহের রণকৌশল যা-ই হোক, এটা বুঝতে পারছি যে তাঁরা তাঁদের পুরনো দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছেন!

কোথায় তাদের মানসিকতা বদলাচ্ছে?

বিজেপির এক শীর্ষনেতা বলছিলেন, ‘‘আমরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ঠিক করেছি, আমাদের মধ্যে বিনয় আনতে হবে| ক্ষমতায় থাকলে অহঙ্কার আসে| আমাদের মধ্যেও আসছে| জনসংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও চলবে না|’’ এই কারণে মোদী-অমিত শাহ ১) শরিক দল, ২) মিডিয়া, ৩) আরএসএস, ৪) শিল্পপতি, ৫) পাবলিক ইন্টেলেক্চুয়ালস এবং সেলিব্রিটি প্রমুখের সঙ্গে কথোপকথনের প্রক্রিয়া বাড়িয়ে দিয়েছেন।

একে বলা হয় এনগেজমেন্ট। ২০১৪ সালে ২৮২টি আসনে জিতে এলে এত এনগেজমেন্টের দরকার ছিল না| মোদী তখন এক শক্তিশালী রাষ্ট্রের হিন্দু হৃদয় সম্রাট|

আর এখন? শরিক দল এনডিএ ছেড়ে চলে যাচ্ছে এ মোটেই শুভ সঙ্কেত নয়। ধরুন, চন্দ্রবাবু নাইডু। এই যে ভোটের আগে তিনি বিজেপিকে পরিত্যাগ করলেন তা যতই পূর্বপরিকল্পিত হোক, বিজেপি এখন যতই চন্দ্রবাবুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনুক, এ ঘটনায় লোকসান কার? লোকসান তো বিজেপিরই। মনে পড়ে, বামফ্রন্টের ছোট ছোট শরিক আরসিপিআই-সিপিআইয়ের মতো দলের যত ঝামেলাই হোক, জ্যোতি বসু সে সব ঝামেলা মিটিয়ে নিতেন। কলকাতার রাজপথে বড় বড় সাইনবোর্ড ও হোর্ডিং দেখা যেত, তাতে লেখা হত, বামফ্রন্টের ঐক্যকে নয়নের মণির মতো রক্ষা করতে হবে। শরিক দল যতই ছোট হোক, সমবেত ভাবে থাকার ফলে ভোটব্যাঙ্ক সুসংহত হত। সামাজিক বার্তা যেত। এনডিএ-ও সেই একই রকম এক জোট। বাজপেয়ী ও আডবাণী কত কষ্ট করে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জোট গঠন করেন। আর আজ সুপ্রাচীন শরিক শিবসেনাও ছেড়ে যাওয়ার হুঙ্কার দিচ্ছে।

যা-ই হোক, এখন সংবাদমাধ্যমে যেমন তেমন ভাবে শরিক ও সমাজের নানা বর্গের মানুষের সঙ্গে জনসম্পর্ক স্থাপন করছেন অমিত শাহ। সমস্যা হচ্ছে, এর সবটাই বড় যান্ত্রিক। স্বতঃস্ফূর্ততা কোথায়?

ফাইল চিত্র।