কালো, তা সে যতই কালো হোক ভারতীয় জনসমাজে তার প্রাসঙ্গিকতা বড় ভয়াবহ। এমন একটা দিন আসছে যে দিন টাকাহীন সমাজে আমরা বসবাস করছি এ তো ভাবাই যায় না। মানে বাড়ির পরিচারিকাকে ক্রেডিট কার্ড বা চেক দিয়ে তার মাসিক বেতন দিচ্ছি অথবা রিকশায় উঠে প্লাস্টিক মানিকার্ড ব্যবহার করছি। সে তো এক বিরাট সমাজবিপ্লব!

টাকার ইতিহাস বলে, এ এক বিচিত্র বিনিময় প্রথার ইতিহাস। প্রথমে গরু, ছাগল শূকর-মেষ, ঘোড়া-উট দিয়ে বিনিময় হত, দাস প্রথায় মানুষকেও ব্যবহার করা হয়েছে বিনিময়ে মূল্যে। আঙ্কল টম’স কেবিনে দেখেছিলাম নারীকেও ব্যবহার করা কিছু কম হয়নি। তার পর সোনা বা নানা ধরনের ধাতু। তার পর গরুর দুধ থেকে নিত্যব্যবহৃত দ্রব্য। প্রাক ব্রিটিশ স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ অর্থনীতিতে দেখা গেছে, কৃষক গ্রামবাসী নাপিতকে চাল দেয়, তার বদলে সে চুল কাটে তার কাছ থেকে। শুনেছি ভারতের অনেক গ্রামে এখনও নাকি এই ধরনের বিনিময় প্রথা চালু আছে। কাগজের টাকা আসার পর সমগ্র পৃথিবীতেই একটা বিপ্লব হয়। তারপর কাগজের টাকা থেকে এল প্লাস্টিক মানি। নরেন্দ্র মোদী ক্যাশলেস সোসাইটি নির্মাণের জন্য নীতি আয়োগকে দিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছেন। এই কমিটির প্রধান এখন রতন ওয়াটল। তিনি নীতি আয়োগের উপদেষ্টা। আগে অর্থমন্ত্রকে সচিব ছিলেন। এই কমিটি কিন্তু বলছে ক্যাশলেস সোসাইটি এ দেশে তৈরি করতে গেলে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনও প্রচুর আনতে হবে। সমস্ত স্টকহোল্ডারের কাছ থেকে ১০ অক্টোবরের মধ্যে রতন মতামত চেয়েছিলেন। অগস্ট মাসে এই কমিটি গঠিত হয়। ব্যক্তি, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, নানা কোম্পানি তাদের মতামত দেয়। এক বছরের মধ্যে এই কমিটি তাদের রিপোর্ট জমা দেবে। ৫০০- ১০০০ টাকার নতুন নোট ছাপা হলে কিন্তু সমাজটা টাকাহীন সমাজে পরিণত হয় না। এই নতুন নোট যে আবার জাল হবে না, এই টাকা যে সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে তুলতে আবার কালো টাকা গড়ে তুলবে না তার গ্যারান্টি কে দেবে? পুরো বিষয়টি করতে হয়তো কিছু দিন সময় লাগতে পারে, কিন্তু আমাদের দেশে কালো টাকা তো উইপোকার মতো, যতই পেস্ট কন্ট্রোল করুন আর দোক্তা পাতাই দিন, কাঠ আর কাগজ থাকলে উইপোকাও থাকবে। কাঠের বদলে যদি ইস্পাতের কারখানা করে ফেলেন তবে অবশ্য সমস্যা মিটলেও মিটতে পারে।

এ দেশের বিপুল জনসমাজে ঠিক কত জন মানুষ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছেন? জনধন যোজনার প্রকল্প চালু করার বিজ্ঞাপন দেওয়া হলেও এখনও অ্যাকাউন্ট করার ব্যাপারে সে রকম আগ্রহ কিন্তু এখনও দেখা যায়নি। ছোট ছোট দোকানদাররাই টাকাহীন ভারতের দিকে সমাজকে নিয়ে যেতে দিতে চান না, আবার তাঁরাই হলেন বিজেপির সবচেয়ে বড় ভোটব্যাঙ্ক। কী কাণ্ড!

তা ছাড়া ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে কি এখনও সর্বত্র এটিএম মেশিন বসে গিয়েছে? ব্যাঙ্ক সেখানেই এই মেশিন বসায় যেখানে তাদের উপভোক্তা সমাজ আছে। ব্যাঙ্ক তো সমাজসংস্কারের উদ্দেশ্যে ব্যবসা করবে না। অর্থনীতির চাহিদা ও যোগানের তত্ত্ব মেনে চলবে ব্যাঙ্ক। তাই তাড়াহুড়ো করে উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনের আগে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নরেন্দ্র মোদী বিপ্লবী ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করছেন বটে, কিন্তু গোটা দেশে এই ডিজিটাল অর্থব্যবস্থা গড়ার পরিকাঠামো কোথায়?

২১১ বিলিয়ন ডলার অর্থমূল্যের ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি নিয়ে মোদী এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমেরিকাও (১৮৭৩) সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিলভার ডলার খতম করবে। ১৬.৪ ট্রিলিয়ন টাকা, অর্থাৎ ২৪৫ বিলিয়ন ডলার কারেন্সি ভারতের বাজারে আছে। বড় বড় নোটের দাপট এর মধ্যে শতকরা ৮৬ ভাগ, সতেরো বছর আগে যতটা টাকা (Physical Money) ব্যবহার হত এখন তার চেয়ে ৯ গুণ বেশি ব্যবহার হচ্ছে।

৬৯% চাকরি শহরে ও ৭৫% গ্রামের চাকরি টাকায় চলে, চেকে নয়। এই ব্যবস্থায় এ বার তারা বদল আনতে হয়তো সক্ষম হবে, কিন্তু আমেরিকাতে এ কাজ করতে গিয়ে বিরাট Deflation হয়েছে অর্থনীতিতে। সেই ঝুঁকি তো থেকেই যাচ্ছে। পরিকাঠামো প্রস্তুত না থাকলে বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবায়িত হবে সে সন্দেহ কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। এথেন্স নগরীর প্লেটোবাবু আর পাটলিপুত্রর কৌটিল্যবাবু আজ শাহি দরবারে হাজির হতে পারেননি তাঁদের অন্য এনগেজমেন্ট থাকায়। আগামী বুধবার এই আলোচনা মঞ্চে ওঁদের আনতে পারলে জিজ্ঞাসা করব, ওঁরা কী ভাবছেন।

আপাতত আপনাদের মতামত জানাবেন?