• 1
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

পাকিস্তান সম্পর্কে মোদীর নীতির ধারাবাহিকতা নেই

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বই যে বিতর্কের জন্ম দিল, তাতে আখেরে লাভ কার? প্রশ্ন তুললেন জয়ন্ত ঘোষাল

The Spy Chronicles: RAW
  • 1

বিজেপির শীর্ষ নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণীর সঙ্গে গিয়েছিলাম পাকিস্তান| পারভেজ মুশারফ তখন সে দেশের প্রেসিডেন্ট| আবার সেনাপ্রধানও বটে| ইসলামাবাদে প্রেসিডেন্ট হাউস থাকলেও রাওয়ালপিন্ডির সেনাপ্রধানের বাড়িটিতেই তিনি থাকতেন| সেনা ছাউনির সঙ্গে নিজের বিচ্ছিন্নতা যাতে না হয় তার জন্য তিনি সামরিক পোশাকটাও কখনও পরিত্যাগ করেননি| আডবাণীকে সেই সেনাপ্রধানের বাড়িতেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আডবাণীর সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার শিবশঙ্কর মেনন|

বৈঠকের পর আডবাণী দেখি খুব উৎফুল্ল| তিনি বললেন, জানো, পারভেজ স্বীকার করলেন যে ওঁদের অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি ঘাঁটিগুলি আছে| ওঁদের সেনাবাহিনী ওদের প্রশিক্ষণ দেয়| পারভেজ বলছেন, এ বার তিনি ওই ঘাঁটিগুলি নিশ্চিহ্ন করার দায়িত্ব নিচ্ছেন| আমাকে কিছু দিন সময় দিন| আমি বললাম, এ তো দারুণ খবর! পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নিজে স্বীকার করছেন! মেনন বললেন, না না! সেটা করা অনুচিত| তিনি আডবাণীকে বললেন, এটা কাগজে বেরোলে পারভেজ পাকিস্তানে বিপদে পড়ে যাবেন| তাতে ওঁর পক্ষে কাজটা করা আরও কঠিন হয়ে যাবে| এটা ঠিক, এই প্রচারে দেশের ভেতর সরকার বা বিজেপির রাজনৈতিক লাভ হতে পারে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হবে না! আজ এত বছর পর প্রাক্তন ‘র’ অফিসার এ এস দুলাত এবং প্রাক্তন পাক গোয়েন্দা প্রধান আসাদ দুরানির লেখা নতুন বইটিকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে তা দেখে সেই পুরনো ঘটনাটি মনে পড়ল।

মূল প্রশ্ন হল, আমরা কী চাইছি? আমাদের প্রধান লক্ষ্য কী? পাকিস্তানকে কোণঠাসা করা? পাকিস্তানকে চাপের মধ্যে ফেলা? ভারতে নির্বাচনের আগেই পাকিস্তানকে প্রচারের হাতিয়ার করে তোলা? নাকি ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে শান্তির পথে নিয়ে যাওয়া?

সে দিন আমাদের আলোচনায় এ প্রশ্নটাও উত্থিত হল, এই বিতর্কিত বইটির উদ্যোগ আসলে নন স্টেট অ্যাক্টর নাকি আসলে স্টেট অ্যাক্টর? অনেকের ধারণা, এই বই প্রকাশের পিছনে আছে সরকার বাহাদুরের নেপথ্য সক্রিয় ভূমিকা। পাকিস্তানে ভোট জুন মাসেই। আবার ২০১৯-এ ভারতে লোকসভা নির্বাচন এপ্রিল-মে মাসে! তার আগে এই বই প্রকাশের কোনও বিশেষ তাৎপর্য আছে কি?

ক্রমশ বিজেপি নেতাদের মনে এই ধারণা গভীর ভাবে প্রবেশ করেছে যে পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া অসম্ভব! তাই আলোচনার পথে না গিয়ে সংঘাতের পথে যাওয়াই শ্রেয় | তা হলে আমরা কি পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করব?

কাশ্মীর কবে শান্ত হবে? এ উত্তর আজও অধরা। ফাইল চিত্র। 

আমার তো মনে হয় শান্তি ছাড়া আর কোনও বিকল্প আসলে হয় না| আমরা কোটি কোটি টাকা খরচ করছি পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হতে পারে এই ভেবে| এর আগে ভারত-পাকিস্তান তিন তিন বার যুদ্ধ হয়েছে| কারগিল ধরলে চার বার! এখন দুটো দেশই পরমাণু শক্তিধর| দুটো পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র নিজেরা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলবে? আমরা কি পাগল হয়ে গেছি?

সত্যি কথা বলতে, আমাদের পাকিস্তান নীতিটা কী?

আরও পড়ুন: ‘দেশদ্রোহী’! প্রাক্তন ‘র’ প্রধানের সঙ্গে বই লিখে রোষে অবসরপ্রাপ্ত আইএসআই চিফ

প্রাক্তন আইএসআই প্রধান অবসরপ্রাপ্ত লেফ্টেন্যান্ট জেনারেল আসাদ দুরানির বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে| ২৮ মে তাঁকে পাক সেনা তাদের সদর দফতরে ডেকে পাঠায়| তাঁকে দেশের বাইরে কোথাও যাওয়া আপাতত নিষিদ্ধ করা হয়েছে| দুরানির বয়স এখন ৭৭| তিনি ১৯৯০-এর অগস্ট মাস থেকে ১৯৯২-এর মার্চ মাস পর্যন্ত আইএসআই-এর প্রধান ছিলেন|

এই বইটিতে ভারতীয় নাগরিক কুলভূষণ যাদবের ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে পাক সেনার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছেন দুরানি| ‘র’-এর প্রাক্তন প্রধান দুলাতের সঙ্গে যৌথ ভাবে বই লিখে অভিযোগ জানানো, সেটা কিন্তু চাট্টি খানি ব্যাপার নয় | পাকিস্তান সেনেটের প্রাক্তন চেয়ারম্যান রাজা রাব্বানি তীব্র সমালোচনা করে বলেন, কোনও রাজনৈতিক নেতা যদি বই লিখে এ সব কথা বলতেন তা হলে গোটা দেশ তাঁকে বিশ্বাসঘাতক বলত| আর আজ প্রাক্তন আমলা, প্রাক্তন সেনা অফিসার যদি সে কথা বলেন তা হলে তার শাস্তি কী হবে?

দুলাত নিজেও প্রাক্তন গোয়েন্দা প্রধান| এটা দেখে ভাল লাগছে, ‘র’ এবং আইএসআই-এর দুই প্রাক্তন কর্তা একসঙ্গে বই লিখছেন| দু’পক্ষই অনেক কথা স্বীকার করেছেন| বইটির নাম ‘দ্য স্পাই ক্রনিকল্স র আইএসআই অ্যান্ড দ্য ইলিউশন অব পিস’।

সমস্যা অন্যত্র| এই স্বীকারোক্তিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তোলা আমাদের অভিযোগগুলি হয়তো শক্তিশালী হবে| পাক সেনা এবং আইএসআই এ সব করে বলে আমরা অভিযোগ করতাম। এখন দুনিয়ার কাছে আমরা বলতে পারবো, এই তো দেখুন, ওরাই বলছে| ওই প্রাক্তন সেনা অফিসারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানে তীব্র জনমত তৈরি হবে| কিন্তু তাতে আখেরে আমাদের কী লাভ হবে বলতে পারেন?

পাকিস্তান সম্পর্কে মোদীর বিদেশনীতি কী?

অতীতে দেশভাগের পর থেকে পাকিস্তান নিয়ে অনেক ভুলভ্রান্তি হয়েছে। কিন্তু অতীতের কথা থাক। গত পাঁচ বছরে মোদীর পাক নীতিরও কোনও ধারাবাহিকতা দেখছি না। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর শপথগ্রহণের সময় তিনি নওয়াজ শরিফকেও ডাকেন, আবার কিছু দিন পর বিদেশ সচিব পর্যায়ের আলোচনা বন্ধ করে দেন। আবার প্রথা ভেঙে আকস্মিক ভাবে নওয়াজের নাতনির বিয়েতে গিয়ে হাজির হলেন লাহৌরে। আবার এখন যুদ্ধ যুদ্ধ রণকৌশল। আসলে নীতি হওয়া উচিত একটাই। সেটা হল শান্তি প্রক্রিয়া। অটলবিহারী বাজপেয়ী সেটা বুঝেছিলেন। মোদী বুঝেও বুঝছেন না। ভোট রাজনীতিই শেষ কথা। মনমোহন চাইলেও কংগ্রেস তাকে পাকিস্তান যেতে দেয়নি। আর আজ মোদী নিজেই এক দিকে মেহবুবাকে সঙ্গে নিয়ে কাশ্মীরে সরকার চালাচ্ছেন। অন্য দিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের তীব্রতা বাড়াচ্ছেন ২০১৯-এর লক্ষে! এটা কি বিদেশনীতি?

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন