’৮৮ সালের সেই দিনটার কথা আজও মনে পড়ছে। সকাল সকাল পার্লামেন্টে পৌঁছে যেতাম। হঠাৎই দেখি রাজীব গাঁধী লোকসভায় হাজির। সে দিন প্রধানমন্ত্রীর লোকসভায় আসার কথা ছিল না। তিনি এসেই আচমকা ঘোষণা করলেন যে, মানহানি বিরোধী ‘বিলটি’ প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। এই বিলটি নিয়ে দেশ জুড়ে তখন সাংবাদিকদের বিক্ষোভ চলছে। রাজীব গাঁধী প্রথম দিকটায় অনমনীয় ছিলেন, কিন্তু ক্রমশ বুঝতে পারেন সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ হচ্ছে, এই বার্তা গণতন্ত্র বিরোধী বার্তা। বার বার এ ভাবে সংবাদমাধ্যমের উপর শাসক প্রভুদের আঘাত এসেছে। যখনই এসেছে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে দেশ জুড়ে। গণতন্ত্রে আইন, শাসন বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম হল চতুর্থ এস্টেট। তার ওপর আঘাত করে পৃথিবীর ইতিহাসে শেষ পযর্ন্ত কেউ জেতেনি।

রাজীব গাঁধীরও আগে ’৮২ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী জগন্নাথ মিশ্র প্রেস বিল এনে গোটা দেশের মানুষের কাছে খলনায়ক হয়ে উঠেছিলেন। তখন তো এত টিভি চ্যানেল, এত ডিজিটাল, সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। তবু সেই বিলটিও সরকারকে প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। ’৮৪ সালে সাংবাদিকতায় যোগ দিই। ’৮২ সালে ছাত্র। মনে আছে, আমরা জগন্নাথ মিশ্রের প্রেস বিলের বিরুদ্ধে কলেজ স্ট্রিট থেকে ধর্মতলা (তখন বলতাম এসপ্ল্যানেড ইস্ট) পর্যন্ত নীরব মিছিলে শামিল হই। সেই বিল ও প্রত্যাহার করতে হয়েছিল বিহার সরকারকে। ভাগলপুর জেলের বন্দিদের অন্ধ করে দেওয়া হয়। সে খবরের বিপুল প্রচারে রাজশক্তি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন: জানতেন না মোদী! প্রশ্ন স্মৃতিবিধান প্রত্যাহারেও

আজ, এত বছর পরেও শাসকদলের আচরণে কোনও পরিবর্তন দেখছি না। একদা এক প্রবীণ সম্পাদক রসিকতা করে আমাকে বলেছিলেন, জান তো, রাজনৈতিক নেতা আর সাংবাদিকের সম্পর্ক হল খাদ্য এবং খাদকের সম্পর্ক। সাংবাদিককে রাজনেতার সমালোচনা করতেই হবে। তা না হলে সাংবাদিকতার কোনও মানে হয় না আবার সমালোচনা করলেই স্পর্শকাতর রাজনৈতিক নেতারা রে-রে করে ওঠেন।

ক্যামেরা-প্রতিবাদ। ফাইল চিত্র।

’৭৫ সালে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন ইন্দিরা গাঁধী। তার পর আজও রাজনেতাদের এই প্রবণতার কোনও বদল কেন হয় না? স্মৃতি ইরানির দফতর বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলেছিল ‘ফেক’ খবরের জন্য দোষী সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমকে গ্রেফতার পর্যন্ত করা যেতে পারে। ‘ফেক নিউজ’-কে কোনও সৎ সাংবাদিক সমর্থন করতে পারে না। সে তো ঘোরতর অন্যায়, কিন্তু তার জন্য দেশের প্রচলিত ভারতীয় দণ্ডবিধিতেই যথেষ্ট আইন আছে। তার জন্য আবার পৃথক কমিটি সরকার কেন করল? এ বছরই বসুন্ধরা রাজে রাজস্থানে একই ভাবে অর্ডিন্যান্স জারি করে সংবাদমাধ্যমের উপর, এমনকী আমলাদের উপরেও নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিলেন। বসুন্ধরাকেও তা প্রত্যাহার করতে হয়েছে। স্মৃতির আদেশের প্রেক্ষিতে মোদী নিজেও তাই করলেন। পাঁচ বছর হতে চলল বিজেপি ক্ষমতায়। ২১টি রাজ্যে তারা হয় একক ভাবে অথবা জোটের সাহায্য ক্ষমতায় আছে। রাজীব গাঁধী যখন মানহানি বিরোধী বিল এনেছিলেন তখন কংগ্রেসের ছিল ৪০৪ জন সাংসদ। যখন রাজীব বিল আনেন তখন ভোটের আর এক বছর বাকি। দুর্নীতি ও অন্যান্য সমালোচনায় রাজীব গাঁধীর সরকার কাঠগড়ায়। সেই বিলটিতেও ছিল সাংবাদিককে প্রয়োজনে দুই থেকে পাঁচ বছরের জন্য জেলে পাঠানো যেতে পারে। আজ বিপুল ভাবে ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও যখন আর ভোটের এক বছর বাকি তখনই আবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।

শাসক প্রভু বার বার এ ভাবে আমাদের ভয় দেখাতে চেয়েছেন। তাঁরা নতজানু সংবাদমাধ্যম চান। আমরা দুঃখিত। ব্যক্তিগত সম্পর্ক অটুট রাখতে চাই, কিন্তু মস্তিষ্ক আর শিরদাঁড়া— দুটোকেই বন্ধক রাখি কী করে বলুন তো?