পশ্চিমবঙ্গে লোকসভার আসন সংখ্যা ৪২। এর মধ্যে ১০টি আসন তফসিলি জাতির জন্য। ২০১১ সালের সেন্সাস রিপোর্ট অনুসারে ভোটার সংখ্যা ৬৩,৭৩৫,৯১৫ (৬ কোটি ৩৭ লক্ষ ৩৫ হাজার ৯১৫)। এ রাজ্যে পুরুষ-নারীর সংখ্যার ব্যবধান অন্য রাজ্যের তুলনায় কম। পুরুষ ভোটার ৩ কোটি ৩১ লক্ষ আর মহিলা ৩ কোটি ৬ লক্ষ। ২০১৪ সালে ভোটের সময় জেলার সংখ্যা ছিল ১৮। আলিপুরদুয়ার নতুন এক জেলা।

আবার আর একটা নির্বাচন এসে গেল। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচন। দিল্লিতে বিজেপি বেশ কিছু দিন থেকেই তর্জনগর্জন শুরু করেছে, এ বার পশ্চিমবঙ্গে ভাল ফল করবে। প্রায় ২৫টা আসন পাবেই। কোন কোন আসন বিজেপি পেতে পারে তার একটা তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। বিজেপির শীর্ষনেতাদের হাতে হাতে ঘুরছে সেই তালিকা।

দিল্লির অভিজাত সমাজের অনেকেই আজকাল দেখা হলে জানতে চান এ বার কি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতার দুর্গ ভাঙতে পারবে? বিজেপির শীর্ষনেতারা তো এমনই দাবি করছেন!

প্রত্যেককেই বার বার যে কথা বলছি, সেই কথাটাই আজ আবার ‘শাহি সমাচার’-এও জানাতে চাই, পশ্চিমবঙ্গে মমতার দাপট কোনও ভাবেই বিজেপি কমাতে পারবে না। এমনকি, এখন যে দু’টি আসন বিজেপির আছে, অর্থাত্ দার্জিলিং এবং আসানসোল, সেই দু’টি আসনও বিজেপি বাঁচাতে পারবে কি না সন্দেহের বিষয়।

আমার কথা শুনে সে দিন এবিপি নিউজ চ্যানেলের এক প্যানেল বিতর্কে এক প্রধান হিন্দিভাষী সম্পাদক বিপুল ভাবে চটে গেলেন। তিনি বললেন, রাজ্যে বিজেপি শূন্য ছিল। এখন তো বিধানসভাতেও ২০১৬ সালে তিনটি আসন পেয়েছে। এটাও তো আগে কেউ ভাবেনি, এ বারও ভাবতে পারছে না। আমি বললাম, হিন্দি বলয়ে বসে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ডিএনএ বোঝা এত সহজ নয়।

বাঙালিদের মন বুঝতে ভুল করছেন অমিত শাহরা।—ফাইল চিত্র।

প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গের আর্থ-সামাজিক ভবিষ্যত্ কী? শিল্পায়ন হবে কি হবে না— এ সব বিতর্ক আলাদা। রাজ্যে শিক্ষার হাল কী? এ সবও আলাদা বিষয়। আজ আমার আলোচনার বিষয় তা নয়। আজ আলোচনার বিষয় একটাই, সেটা হল ভোটের সম্ভাব্য ফল। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির পক্ষে জনসমর্থন বাড়ছে এ কথাও আমি অস্বীকার করছি না। রাজনৈতিক মেরুকরণও হচ্ছে। কিন্তু বিজেপির শতকরা ভোট বাড়াতে পারলেও আসন লাভে ব্যর্থ হবে।

দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস, সিপিএমের মতো দলগুলির রাজনৈতিক শক্তি কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায় মমতার রাজনৈতিক লাভ হয়েছে আরও বেশি। রাজ্যে প্রায় শতকরা ৩০ শতাংশ মুসলমান ভোট। এই ভোট মমতাকে ছেড়ে কোথায় যাবে? কংগ্রেস-সিপিএম এবং তৃণমূলের মধ্যে মুসলমান ভোট ভাগাভাগি হলে বিজেপির লাভ হত। কিন্তু মমতা কংগ্রেস-সিপিএম ভোটকে কার্যত অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছেন। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধতেও মমতা রাজি হননি। কারণ মমতা রাজি হলেই তাতে কংগ্রেসের পুনরুজ্জীবন হতে পারে। মুসলিম ভোট কংগ্রেস দখল নিতে পারত, তাতে মমতার লাভ কী? তাই মমতা বিচক্ষণতার সঙ্গে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধতে প্রস্তুত নন। সবল জোট বাঁধতে চায় না, জোট চায় দুর্বলই। তাই আজ দুর্বল চন্দ্রবাবু সব দ্বেষ-দ্বন্দ্ব-অতীত ইতিহাস ভুলে রাহুল গাঁধীর নোঙরে পা দিয়েছেন। কিন্তু মমতার তো সেই রাজনৈতিক দৈন্যদশা নেই। তাই তিনি সে পথে ভোটের আগে হাঁটছেন না।

পশ্চিমবঙ্গে তফসিলি ভোট, ওবিসি ভোট এবং মতুয়া ভোটের আইডেন্টিটি রাজনীতিও আজ খুবই প্রবল। মতুয়াদের জন্য পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে, আদিবাসীদের জন্য পৃথক বোর্ড হচ্ছে। নিম্নবর্গের সঙ্গে আদিবাসী তফসিলি এবং ওবিসি ভোট পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক ভাবে যুক্ত। শুধু অর্থনৈতিক শ্রেণি হিসেবে নয়, সামাজিক সত্তার ভোটব্যাঙ্কও রাজ্যে তৈরি হয়েছে গত দশ বছরে সুস্পষ্ট ভাবে। এই ভোট মমতারই অধিকারে।

বাম রাজনীতি থেকে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল রাজনীতির দাপট কী ভাবে বাড়ল তা যদি বিশ্লেষণ করা হয় তা হলে ২০০৬ থেকে ২০১৩ সালে নানা ভোটের আসন সংখ্যাগুলি দেখুন। চিত্র অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

 

 

       আসন

       আসন

 

 

     বামফ্রন্ট

      টিএমসি

বিধানসভা

       ২০০৬

        ২৩৫

         ৩৫

পঞ্চায়েত সমিতি

       ২০০৮

       ৪৩০০

       ২০১৯

লোকসভা

       ২০০৯

          ১৫

         ১৯

পুরসভা

        ২০১০

          ৩৩

          ৯৫

রাজ্য বিধানসভা

        ২০১১

          ৬১

         ২২৭

পঞ্চায়েত সমিতি

        ২০১৩

        ২৪০৮

        ৪০১৬

 *সূত্র রাজ্য নির্বাচন কমিশন

১৬তম লোকসভায় বিজেপির শতকরা ভোট ছিল ১৭, আসন ২। তৃণমূলের শতকরা ভোট ৪০। বামফ্রন্ট ৩০। কংগ্রেস ১০। এই শতকরা ভোটের অঙ্ক দেখে অনেকে ভেবেছিলেন কংগ্রেস-সিপিএম জোট হলেই মমতা পরাস্ত হবেন। বাস্তবে কিন্তু তা হয়নি। তার কারণ মমতার ভোটব্যাঙ্কের আনুগত্যে কোনও ফাটল ছিল না। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে বামফ্রন্ট ২, ৯১ সালে যা ছিল ৩৭। আর ২০১৪ সালে টিএমসি ৩৪।

এ বারের ভোটে মমতা আরও কৌশলী। লড়াইটা যতই মমতা বনাম বিজেপি হচ্ছে মমতার জন্য ততই ভাল। আর বিজেপি, আরএসএস এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ যত উগ্র হিন্দুত্বের পথে যাচ্ছে ততই মমতার লাভ। মমতা নিজে এক জন ‘প্র্যাক্টিসিং হিন্দু’। বাড়িতে কালীপুজো করেন। চণ্ডীর মন্ত্র মুখস্থ বলে যান গড়গড় করে। সেই মমতাকে আর যাই হোক হিন্দু বিরোধী বলে প্রচার করলে বাঙালি হিন্দু সমাজেও বিদ্রোহ হয়ে যাবে।

বিজেপি বাঙালির ডিএনএ-টা বুঝতে ভুল করছে। বাঙালি হিন্দু হয়েও সাম্প্রদায়িক নয়। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আর বিবেকানন্দর হিন্দুধর্ম আর নাগপুরের হিন্দুত্ব এক নয়। সেই গরমিল আছে বলেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের শহরে এ যাবত্ বিজেপি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। অতীতে যা পারেনি বিজেপি, ২০১৯-এও তা পারবে না।

(অনিবার্য কারনবশত এ সপ্তাহে ‘শাহি সমাচার’ প্রকাশ করা সম্ভব হল না)