১৯৯২ সালে তখন ভারতের বিদেশসচিব জে এন দীক্ষিত। দিল্লিতে কর্মরত পাকিস্তানের হাইকমিশনার আবদুস সাত্তার সাউথ ব্লকে এসেছিলেন দেশে ফিরে আগে শেষ সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকার করতে। কূটনীতির পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘ফেয়ার ওয়েল-কল।’ জুলাই মাসের মাঝামাঝি এই একান্ত বৈঠকে আবদুস সাত্তার দুঃখ করে মণি দীক্ষিতকে বলেছিলেন, “আমরা দু’জন দু’জনকে চিনি তা প্রায় কুড়ি বছর হল। ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার কাজে আমার অর্ধেক জীবন কেটে গেল। এখন মনে হচ্ছে আমরা আমাদের জীবনে তো বটেই তারপর আরও দু’প্রজন্ম কেটে গেলেও ভারত আর পাকিস্তানের সম্পর্ক ভাল হবে না।”  সাত্তার ভারত দু’দফায় হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। ’৯২ সালের আগে ’৭৮ থেকে ’৮৩ সাল-এই সময়েও তিনি দিল্লিতে কর্মরত ছিলেন। দুঁদে ওই কূটনীতিক পরে বিদেশসচিব হয়েছেন। মস্কোর রাষ্ট্রদূত হয়েছেন। ওই লোকটিরও মনে হয়েছিল দু’দেশের এই সম্পর্ক পুনরুদ্ধার কার্যত অসম্ভব।

দেশ ভাগ খুব ভাল হয়েছিল একথা কোনও ভারতবাসীই আজ বলবে না। সাবেকি ধারণা হল, মহম্মদ আলি জিন্নার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আকাঙ্খা ছিল জাতীয় নেতৃত্বের শীর্ষাসনে আরূঢ় হওয়া। কিন্তু ১৯২০ সালের গোড়াতেই গাঁধী ও নেহরু সে কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ান। ভারতীয় মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধি দল হিসাবে মুসলিম লিগকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন জিন্না। কিন্তু সে কাজে তিনি সফল হননি। লর্ড মাউন্টব্যাটেন তখন ভারত থেকে চলে যেতে ব্যস্ত ছিলেন। কংগ্রেসও ভারতের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতা দখল করা দু’টো কাজের জন্যই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। একমাত্র মহাত্মা গাঁধী ও মৌলানা আবুল কালাম আজাদ-দু’জনেই ক্ষমতার আসনে বসার জন্য এত অসহিষ্ণু হয়ে পড়েননি।

এমনকী বি আর অম্বেডকর নিজে কংগ্রেসের দর্শনের ঘোরতর বিরুদ্ধ হলেও দেশভাগের পক্ষে ছিলেন না। যে সব যুক্তির ভিত্তিতে পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন হয়েছিল সেগুলি তিনি মেনে নিতে পারেননি। অম্বেডকর পাঁচটি প্রশ্ন তোলেন। প্রথমত, পাকিস্তান পৃথক রাষ্ট্র হওয়া প্রয়োজন কারণ ভারতের এক বিপুল মুসলমান জনসমাজ এমন এমন জায়গায় ঘনবসতি করে আছে যেসব এলাকা ভারতের অন্য এলাকাগুলি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে? দ্বিতীয়ত, হিন্দু-মুসলমান বিরোধ আছে বলেই আলাদা পাকিস্তান? তৃতীয়ত, মুসলমান সমাজ কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপর আস্থা হারিয়েছে? চতুর্থত, মুসলমান সমাজ এক পৃথক জাতি তাই পৃথক রাষ্ট্র? পঞ্চমত, পাকিস্তান আলাদা হতেই হবে তা না হলে স্বরাজ হবে হিন্দু রাজ? অম্বেডকর এই পাঁচটি যুক্তিই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

তা-ও পাকিস্তান নামক এক পৃথক রাষ্ট্র গঠন হয়। জে এন দীক্ষিত তাঁর জনপ্রিয় গ্রন্থ, Anatomy of a flawed inheritance-গ্রন্থে ১৯৭০ থেকে ১৯৯৪ সালের ভারতে পাক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন, ’৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে যখন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠন হল তখন থেকে পাকিস্তান আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। জেনারেল আয়ুব খানের সময় থেকেই পাকিস্তান দ্রুত পশ্চিমের বন্ধু হয়ে উঠতে থাকে। কারণ? মণি দীক্ষিত বলছেন, নেহরু তাঁর বিদেশ ও প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে অনেক বিতর্কে জড়ান। কিন্তু ঠাণ্ডা যুদ্ধে পাকিস্তান ছিল পশ্চিমের ইচ্ছুক শরিক (willing partner)। এরপর ভুট্টো আসার পরে চিনের সঙ্গেও সখ্য বাড়ে। শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু এ ছিল পাক নীতি। ’৬২ সালের যুদ্ধ যার পরিণতি। চিনকে ২০০০ বর্গমাইল জমি সীমান্তে দিয়ে দিয়ে চিনের সঙ্গে এক সীমান্ত চুক্তিতে ব্রতী হয় পাকিস্তান।


পাঠানকোটে অভিযান শেষে জওয়ানরা।

’৭১ সালের পর থেকে পাক রণকৌশল আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের এক প্রবীণ কূটনীতিক বলছিলেন, বাংলাদেশে স্বাধীন হওয়ার পর ইন্দিরা গাঁধী পশ্চিমী চাপে বড় তাড়াহুড়ো করে সিমলা চুক্তি করে ফেললেন। এই চুক্তিতেই দর কষাকষি করে ভুট্টোর সঙ্গে উনি কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করে নেওয়ার সুযোগ হারান এ হেন প্রবল জয়ের পরেও। বাংলাদেশ এই চুক্তিতে খুব আহ্লাদিত হয়নি।

যাই হোক আজ এত বছর পর ইতিহাসের ময়নাতদন্ত করে লাভ নেই। কী হলে কী হত সে সব ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ। কিন্তু একটা কথা তো স্পষ্ট কার্গিল থেকে পঠানকোট হয়ে উরি-এ তো ইতিহাসের ধারাবাহিক পুনরাবৃত্তি। কিন্তু তবু মনে হয়, দুই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র কথা বলা ছাড়া অন্য কোনও পথ থাকতে পারে না।

আলোচনা, আলোচনা এবং আলোচনা-মোদী সরকার সংঘাতের পথে গিয়ে কি নতুন কোনও ইতিহাস তৈরি করতে পারবেন? সম্ভবত উত্তরটি ‘না।’

 

ছবি: পিটিআই